ফন্ট সাইজ:
থিম:
শীতল স্বামী

পর্ব 2

লেখক: Megh

পর্ব : ০২

ইরা এখন আর আগের মতো আয়ানের পেছনে ঘোরে না।

সে জানতে পেরেছে আয়ানের অতীত। তার বন্ধু রাফির বউ একদিন গল্পে গল্পে বলেছিল, আয়ানের একটা মেয়ে ছিল - নীরা। চার বছরের সম্পর্ক। নীরা হঠাৎ আমেরিকা চলে যায় অন্য ছেলেকে বিয়ে করে। আয়ান সেদিন থেকে আর কাউকে বিশ্বাস করে না।

তাই ইরা একটা বুদ্ধি করলো।

সে এখন নিজের মতো থাকে। সকালে উঠে রান্না করে, দুপুরে বই পড়ে, বিকালে ছাদে গাছে জল দেয়। আয়ান অফিস থেকে ফিরলে আর চা নিয়ে দৌড়ায় না। দরজা খুলে দেয় না।

প্রথম দুই দিন আয়ান খুশি ছিল। ভাবলো যাক, মেয়েটা বুঝেছে।

তৃতীয় দিন থেকে তার অস্বস্তি শুরু হলো।

রাতে ঘরে ঢুকে দেখে ইরা ফোনে হেসে হেসে কথা বলছে। আয়ান কান পাতলো।

"হ্যাঁ ভাইয়া, আমি ভালো আছি..."

আয়ানের ভ্রু কুঁচকে গেল।

"কার সাথে কথা বলো?"

ইরা ফোন রেখে বলল, "আমার কলেজের ভাইয়া। কেন?"

"এত রাতে হেসে কথা বলার কি আছে?"

ইরা অবাক হয়ে বলল, "আপনি তো বলেছেন আমার ব্যাপারে আপনার মাথা ঘামানোর দরকার নেই।"

কথাটা আয়ানের বুকে গিয়ে লাগলো।

রাতে আয়ান ঘুমাতে পারছে না। বারবার ইরার দিকে তাকাচ্ছে। ইরা আজ সোফায় না, মেঝেতে মাদুর পেতে শুয়েছে।

"মেঝেতে কেন?"

"সোফাটা আপনার, খাটটাও আপনার। মেঝেটা তো আর আপনার না। তাই।"

আয়ান উঠে গিয়ে ইরার হাত ধরে টেনে তুললো।

"চুপচাপ সোফায় গিয়ে শোও। ঠান্ডা লেগে আবার জ্বর বাধাবে, তখন আমার ঘাড়ে এসে পড়বে।"

ইরা হাত ছাড়িয়ে বলল, "আমাকে নিয়ে আপনার এত ভাবতে হবে না, শীতল স্বামী।"

"শীতল স্বামী?"

"হ্যাঁ। আপনি তো শীতল স্বামী-ই। বউকে ভালোবাসেন না।"

বলেই ইরা মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে পড়লো।

আয়ান সারারাত জেগে রইলো। তার মনে একটাই প্রশ্ন - যে মেয়েটাকে সে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিল, তার দূরে চলে যাওয়াটা সে সহ্য করতে পারছে না কেন?

আজ ইরার বাবার বাড়ি যাওয়ার দিন।

সকাল থেকেই ইরার মন খারাপ। এই বাড়িটা, এই মানুষগুলোকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু আর কত অপমান সহ্য করবে? যে মানুষটা তাকে বউ বলেই মানে না, তার ঘরে থেকে কি লাভ?

ব্যাগ গুছিয়ে নিচে নামলো ইরা। শাশুড়ি বলল, "আবার তাড়াতাড়ি আসিস মা।"

ইরা হাসলো। দরজার কাছে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।

আয়ান অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরেছে আজ। ড্রয়িংরুমে বসে আছে। ইরাকে ব্যাগ হাতে দেখে উঠে দাঁড়ালো।

"কোথায় যাচ্ছো?"

ইরা শান্ত গলায় বলল, "বাবার বাড়ি।"

"বাবার বাড়ি যাচ্ছো নাকি চলে যাচ্ছো?"

"চলে যাওয়াই তো উচিত। আপনি তো আমাকে চান না। আপনি বলেছিলেন আমার কোনো অধিকার নেই। তাহলে থেকে কি করবো?"

আয়ানের মাথায় রক্ত উঠে গেল। সবার সামনে গিয়ে ইরার হাত ধরে ব্যাগটা ফেলে দিলো।

"কে বলেছে অধিকার নেই? আমি বলেছি?"

"হ্যাঁ, আপনিই বলেছেন। প্রথম রাতেই বলেছেন।"

"আমি ভুল বলেছিলাম।"

পুরো বাড়ি চুপ।

আয়ান এবার গলা নামিয়ে বলল, "আমি ভালোবাসতে ভয় পাই, ইরা। নীরা চলে যাওয়ার পর আমি ভেবেছিলাম সব মেয়ে এক। তাই তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। কিন্তু তুমি যখন আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলে, যখন অন্য কারো সাথে হেসে কথা বলো, আমার বুকের ভেতর জ্বলে। আমি বুঝেছি আমি তোমাকে..."

আয়ান থেমে গেল।

ইরার চোখে জল।

"কি? বলেন?"

"আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না। থেকে যাও। প্লিজ।"

ইরা ব্যাগটা ছেড়ে দিলো। বলল, "আর কখনো শীতল স্বামী হয়ে থাকবেন না তো?"

আয়ান ইরার হাতটা শক্ত করে ধরলো, "না। আজ থেকে আমি শুধু তোমার স্বামী।"

রাত ১১টা।

সবাই ঘুমিয়ে গেছে। ইরা ঘরে ঢুকে দেখে টেবিলে দুটো প্লেটে খিচুড়ি রাখা। পুড়ে কালো হয়ে আছে, লবণে ভরা। পাশে আয়ান দাঁড়িয়ে আছে, মাথা নিচু করে।

"এটা কি?"

"আমি... আমি রান্না করেছি। জীবনে প্রথমবার। ইউটিউব দেখে।"

ইরা এক চামচ মুখে দিয়েই বুঝলো জঘন্য হয়েছে। কিন্তু সে হাসতে হাসতে খেতে লাগলো।

"আরে হাসছো কেন? খারাপ হয়েছে জানি। ফেলে দাও।"

"না, অনেক মজা হয়েছে। আমার শীতল স্বামীর হাতের প্রথম রান্না বলে কথা।"

আয়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এই মেয়েটা এত কষ্ট পেয়েও কিভাবে হাসে?

ইরা বলল, "জানেন, আমি ভেবেছিলাম আপনি কোনোদিন গলবেন না।"

আয়ান আস্তে করে ইরার কাছে এসে তার চোখের জল মুছিয়ে দিলো।

"আমাকে মাফ করে দাও, ইরা। প্রথম রাতে তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি।"

"মাফ করে দিয়েছি অনেক আগেই।"

"তাহলে আজ থেকে সোফা না, খাটে ঘুমাবে। আমার পাশে।"

ইরা লজ্জায় মাথা নিচু করলো।

আয়ান ইরাকে জড়িয়ে ধরে বলল, "আমার বউকে আমি আর কখনো কাঁদতে দেবো না। যে ভালোবাসা আমি হারিয়েছিলাম, তার থেকে হাজার গুণ বেশি ভালোবাসা তোমাকে দেবো।"

বাইরে তখনো শীতের হাওয়া। কিন্তু ঘরের ভেতর আর কোনো শীত নেই। শীতল স্বামীটা অবশেষে গলে গেছে।

পরদিন সকালে ইরা ঘুম থেকে উঠে দেখে আয়ান তার জন্য নিজে হাতে চা বানিয়ে এনেছে। ইরা অবাক। আয়ান বলল, আজ থেকে প্রতিদিন আমি তোমার জন্য চা বানাবো। ইরা হাসলো। শাশুড়ি এসে এই দৃশ্য দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারলো না। তিনি মনে মনে বললেন, অবশেষে আমার সংসারটা পূর্ণ হলো। ইরা আর আয়ান ছাদে গেল। সকালের রোদে দুজন দাঁড়িয়ে আছে। আয়ান বলল, তোমাকে অনেক ভালোবাসি, আগে বলতে পারিনি। ইরা বলল, আমিও। এরপর থেকে তাদের সংসারে আর কোনো ঝগড়া রইলো না, শুধু ভালোবাসা আর ভালোবাসা।ইরা কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি ভেবেছিলাম আপনি আমাকে কখনো ভালোবাসবেন না। আয়ান বলল, ভুল ভেবেছিলে। তুমি আমার সব। তোমাকে ছাড়া আমি শূন্য। ইরা আয়ানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।আজ ইরা আর আয়ানের ৫ম বিবাহবার্ষিকী।
আয়ান ছাদে পুরো ফুল দিয়ে সাজিয়েছে। মাঝখানে লেখা - "আমার শীতল থেকে গরম হওয়ার গল্পটা তোমার জন্য।"
ইরা শাড়ি পরে এসে দেখে আয়ান হাঁটু গেড়ে বসে, হাতে আংটি।
"ইরা, আবার একবার আমার বউ হবে? এবার ভালোবেসে বিয়ে করবো।"
ইরা কাঁদতে কাঁদতে বলল, "হ্যাঁ হবো। হাজার বার হবো।"
উষ্ণতা হাততালি দিচ্ছে।
আকাশে চাঁদ, বারান্দায় দুজন, আর শেষ হলো একটা শীতল স্বামীর গলে যাওয়ার গল্প।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 2 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন