বর্ষা হিমেলের প্রেমের ছোঁয়া
পর্ব : ৫
মাগরিবের কিছুক্ষণ পরেই মায়াকে দেখতে পাত্রপক্ষের লোকজন চলে এলো। বাড়ির গৃহিণীরা অতিথি আপ্যায়নের জন্য রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এদিকে নুরুল ইসলাম পাত্রপক্ষকে বসার ঘরে নিয়ে বসালেন।
মাতব্বর হাফিজুল ইসলাম সহ জহিরুল ইসলাম, আলেয়া বেগম, শাকিল, জাহিদ—সবাই এসে হাজির হলেন সেখানে।
বাড়ির সকল পুরুষ সদস্য একসঙ্গে থাকেন না বললেই চলে। জহিরুল ইসলাম আর নুরুল ইসলাম ব্যবসা সামলানোর কারণে বেশিরভাগ সময় রাজধানীতেই থাকেন। সপ্তাহে দুদিনের মতো বাড়িতে আসেন। তবে আজ মায়াকে দেখতে আসবে, তাও আবার খানদানি বড় পরিবার থেকে—এই খবর শুনে দুজনই ভোরেই ট্রেনে চড়ে বাড়িতে চলে এসেছেন।
পাত্রপক্ষ এসেছে মোট নয়জন। ছেলে নিজে, তার বাবা-মা, বড় চাচা-চাচি, মামা-মামি আর দুইটা ছোট ছেলে বাচ্চা।
ছেলের নাম মাসুম। ছেলের সম্পর্কে ঘটক মজিদ মিয়ার মাধ্যমে আগেই সবকিছু জানা হয়ে গেছে। যার কারণে ছেলেপক্ষ সম্পর্কে নতুন করে কেউ আর তেমন কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করল না।
বসার ঘরের পেছনের ঘরের জানালাটা অল্প একটু খুলে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল ছোঁয়া। তার পাশে দাঁড়িয়ে জাহিদের বউ বিপাশাও একইভাবে সবকিছু দেখছিল।
ছোঁয়া নিচু গলায় বলল,
—মাইয়া দেহনের লিগা এত মানুষ আসে? কই, রুমা আপার সময়ে তো এত মানুষ আসে নাই?
ছোঁয়ার কথা শুনে বিপাশা মৃদু হেসে বলল,
—আসেই তো। তোমার ভাই আমারে দেহার আগে আরো কয়েকডা পাত্র আমারে দেকছিল। তহন মেলা মানুষ নিয়া আমাগো বাড়িতে আইছিল। আবার কেউ কেউ তো মুহের উপরেই যৌতুক চাইয়া বইছে। এর লিগাই আমার বাপে বিয়াতে রাজি হয় নাই।
এদিকে হাফিজুল ইসলাম সৌজন্য সাক্ষাৎ আর প্রাথমিক কিছু জিজ্ঞাসাবাদ সেরে নিলেন।
ঘটক মজিদ মিয়া পাত্রপক্ষের উদ্দেশে বললেন,
—কি কইছিলাম, তোমাগো সব মিললো তো? কইছিলাম না, মাইয়ার চেহারা-সুরত থেইকা শুরু কইরা মাইয়ার বাপ-চাচাগো জমি-জুমা, ট্যাহা-পয়সা—কোনো কিছুরই অভাব নাই। এই বকুলতলী গেরামের যারে জিগাইবেন মাতব্বর বাড়ির মাইয়াগো কথা, তারাই কইবো—লাখে একখান। মাইয়ার ব্যবহার-আচরণ সবদিক থিকাই ভালা। আপনাগো প্রয়োজন হইলে গেরামের সবাইরে জিগাইতে পারেন।
মজিদ মিয়ার কথায় পাত্রপক্ষের সবাই বেশ খুশি হলেন। তা দেখে ঘটক মজিদ মিয়াও মনে মনে খুশি হলেন। খুশি হওয়ার অবশ্য কারণও আছে—পাত্রপক্ষ যত বেশি সন্তুষ্ট হবে, তার পারিশ্রমিকও তত বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা।
পাত্রের বাবা মমিন সর্দার এবার বললেন,
—তা মাইয়া কই? নিয়া আসেন দেহি, মাইয়া দেখতে কেমন। আমার পোলার লগে মানাইবো কিনা।
জহিরুল ইসলাম ডাক ছাড়লেন,
—জাহিদের মা, কই তুমি? মাইয়ারে নিয়া আসো।
সালেহা খাতুন যেন স্বামীর ডাকের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন।
মায়াকে লাল পাড়ের কালো ঢাকাই জামদানি শাড়িতে বেশ সুন্দর লাগছে। শাড়িটা ওর বাবা রাজধানী থেকে কিনে এনেছে। আর কাকলিও মেয়েটাকে বেশ গুছিয়ে সাজিয়ে দিয়েছে।
নাজমা বেগম এগিয়ে এসে বললেন,
—শোন মায়া, ওরা যা কইবো তুই খালি তার জবাব দিবি, কেমন? কোনো বাড়তি কতা কস না।
ছোট চাচির কথায় মায়া শুধু সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল।
সালেহা খাতুন এসে চা, বিস্কুট আর ফলের ট্রেটা মায়ার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
—শোনো মাইয়া, ভুলভাল কিছু কইও না আবার। বাপ-চাচাগো মান রাইখো।
তাসলিমা বেগম মায়ার মাথার ঘোমটাটা একটু ঠিক করে দিয়ে বললেন,
—যাও আম্মা, ভয় পাইও না। তোমার দাদি ওই হানে আছে। ঠান্ডা মাথায় সব উত্তর দিও, কেমন?
বড় আম্মার কথায় মায়া আবারও মাথা নাড়ল।
মা-চাচিদের একের পর এক কড়া নিষেধ আর সাবধান করে দেওয়া কথাগুলো শুনে মায়ার মনে ধীরে ধীরে একরাশ অজানা ভয় জমতে লাগল।
তবে সেই ভয়টুকু শুকনো ঢোক গিলে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল মায়া। তারপর হাতে ট্রেটা নিয়ে মা-চাচিদের সঙ্গে ধীর পায়ে বসার ঘরে এসে দাঁড়াল।
মায়া বিনীতভাবে সবাইকে সালাম জানাল। যা যা শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেভাবেই বলল। এরপর হাতের ট্রেটা সামনে রাখা কাঠের ছোট টেবিলের ওপর রেখে দিল।
আলেয়া বেগম মায়াকে উদ্দেশ করে বললেন,
—বোনু, আমার এইহানে আইসা বহো।
মায়া দাদির পাশে ফাঁকা জায়গাটায় গিয়ে বসল।
মাসুমের মা মর্জিনা বেগম মায়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,
—মাশাআল্লাহ! মাইয়া তো দেহি মেলা সুন্দর আছে। মজিদ মিয়ার মুহে যতটুকু শুনছিলাম, তার চাইতেও মেলা বেশি সুন্দর।
একটু থেমে আবার জিজ্ঞেস করলেন,
—তা মাইয়া, লেহাপড়া কিছু পারে? নাকি ইস্কুলের গণ্ডি পার হয় নাই?
হাফিজুল ইসলাম বললেন,
—মাইয়া ম্যাট্রিক পন্ত পড়ছে। তারপর আর পড়ে নাই।
—মাশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ! তা ভালা।
মর্জিনা বেগম এবার নিজের ছেলের প্রশংসা করতে শুরু করলেন,
—আমার পোলা খুলনা শহরে মেলা বড় ব্যপসা আছে। আল্লাহর রহমতে ভালাই নাম-ডাক, ট্যাহা-পয়সা হইছে। আমার পোলার লগে মাইয়ারে ভালাই মানাইবো। তা কি কন বড় ভাবি?
পাত্রের বড় চাচি বললেন,
—হ, দেইখা তো তাই মনে হইতাছে।
আলেয়া বেগম বললেন,
—হ, মজিদ মিয়ার মুহে আপনাগো পোলার বেগগুন কতা শুনছি।
মাসুমের বড় চাচি এবার মায়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—তা মাইয়া, একটু হাইটা দেহাও তো দেহি। পা সোজা না বেহা।
মায়া একবার বাবার দিকে, একবার দাদির দিকে তাকাল। পরক্ষণেই তার চোখ গিয়ে পড়ল পেছনের জানালার দিকে।
সেখানে বিরক্তি আর রাগ মেশানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছোঁয়া।
মায়া বুঝতে পারল, এসব নিয়মনীতি, কথাবার্তা—কোনো কিছুই ছোঁয়ার পছন্দ হচ্ছে না।
শুধু ছোঁয়াই নয়, হাফিজুল ইসলামেরও এসব কথা ভালো লাগল না। তবে তিনি চুপ রইলেন। বড় ভাইকে চুপ থাকতে দেখে জহিরুল ইসলাম আর নুরুল ইসলামও এই বিষয়ে কোনো কথা বললেন না।
তারা জানেন, এসবই সামাজিক নিয়মনীতি। এভাবেই সব জায়গায় মেয়েকে দেখা হয়।
আসলে এটাকে মেয়ে দেখা বললে ভুল হবে। মনে হচ্ছে যেন কোনো দোকানের পণ্য কিনতে এসেছে। আর কেনার আগে সবকিছু যাচাই-বাছাই করে নিচ্ছে, যাতে পরে আফসোস করতে না হয়।
সমাজের নিয়ম হোক কিংবা মানুষের তৈরি কোনো রীতি—তো তাদের জন্য ভাঙবে না কেউ। ভাঙবে আরো কত মেয়ের বিয়ে।
আলেয়া বেগম বললেন,
—যাও তো হাইটা দেহাও বোনু। এক্কারে ওই দরজা পন্ত যাইবা, পরে আবার এইহানে আইসা বইবা।
বৃদ্ধা হাতের ইশারায় মায়াকে পথটা দেখিয়ে দিলেন।
দাদির কথা মতো মায়া উঠে হাঁটল। দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে এসে আগের জায়গায় বসে পড়ল।
পাত্রের মামি এবার বললেন,
—তা মাইয়া, তোমার ঘোমটা খান একটু তোলো তো। চুলগুলান একটু দেহি। কত লম্বা তোমার চুল!
কথা বলতে বলতেই নিজেই মাতব্বরি করে হাত বাড়িয়ে ঘোমটা খোলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু মাঝপথেই আলেয়া বেগম বাধা দিয়ে ভদ্রভাবে বললেন,
—পরপুরুষের সামনে মাইয়া ঘোমটা খুলবো না। আমাগো বাড়ির মেলা নিয়ম-নীতি আছে।
বৃদ্ধার কথাটা যেন পাত্রপক্ষের কারও পছন্দ হলো না। একটু তেজ মিশিয়েই পাত্রের বড় চাচি বললেন,
—কা গো, পরপুরুষ কইতাচ্ছেন আপনি? বিয়ার পরে তো হেগো সামনেই কাম-কাজ করতে হইবো। আর এইহানে তেমন কেউ তো নাই। সবাই আমাগো রক্তের।
আলেয়া বেগম আবারও শান্ত গলায় বললেন,
—বিয়ার পরের কতা পরে। এহনো তো আর বিয়াডা হয় নাই। আর আমাগো ধর্মে তো চুল দেহানো জায়েজ না। মা-চাচিগো কাছ থেইক্যা তো এইডাই জানছি। তাই মাইয়ার ঘোমটা তোলা যাইবো না।
বৃদ্ধার কথায় উপস্থিত সবার মুখ পাংশুটে হয়ে গেল।
তবে জানালার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা দাদির এই কথায় মনে মনে বেশ খুশিই হলো।
পাত্রের মা এবার বললেন,
—এ আবার কেমন ধারার কতা কন? মাইয়া দেখবার আইছি, তয় মাইয়ার চুল দেখমু না? যাচাই না কইরা ঘরে বউ তুললে, বিয়ার পরে দেখমু বউ ন্যারা। তহন কি হইবো আমার পোলার? তহন তো আর সমাজে মুখই দেহাইবার পারমু না।
আলেয়া বেগম শান্তভাবেই বললেন,
—আমি কি সেই কতা কইছি তোমাগো? চুল দেখবা না কেন? অবশ্যই দেখবা। হেডা তোমাগো অধিকারের মধ্যেই পরে। কিন্তু ঘরে গিয়া মাইয়ার চুল দেখতে হইবো।
—আইচ্ছা, তাই চলেন।
কথাটা একটু বাঁকা সুরেই বললেন পাত্রের বড় চাচি।
নাজমা বেগম এগিয়ে এসে তাদের সবাইকে নিয়ে গেলেন পেছনের ঘরে। সেখানে অবশ্য আগে থেকেই উপস্থিত ছিল ছোঁয়া আর জাহিদের বউ বিপাশা।
ঘরে সবাইকে ঢুকতে দেখে জানালাটা বন্ধ করে সেখান থেকে একটু দূরে সরে দাঁড়াল দুজন।
সবাই ঘরে প্রবেশ করতেই তাদের চোখ গিয়ে পড়ল ছোঁয়া আর বিপাশার দিকে। তবে সেদিকে তেমন পাত্তা না দিয়ে তারা যে কাজে এখানে এসেছে, সেটাতেই ব্যস্ত হয়ে উঠল।
ব্যস্ত বললে ভুল হবে—কামড়াকামড়ি করে দেখতে শুরু করল।
পাত্রের মামি এসে একটু জোর করেই টান দিয়ে মায়ার ঘোমটা খুলে দিলেন। দেখে মনে হলো, সুযোগ পেয়ে নিজের কিছুটা রাগও যেন মায়ার ওপর ঝেড়ে নিলেন।
তারপর মায়ার মুখটা হাত দিয়ে এপাশ-ওপাশ করে দেখতে লাগলেন কেউ। আবার কেউ শাড়িটা পায়ের দিক থেকে একটু উঁচু করে হাঁটুর খানিকটা নিচ পর্যন্ত দেখে নিলেন—গায়ের রং আসলেই ফর্সা নাকি কৃত্রিম কিছু লাগানো হয়েছে, সেটাও যেন যাচাই করে নিতে হবে।
পাত্রের মামি মায়ার হাতের কব্জির ওপরের চামড়া হাত দিয়ে ডলতে ডলতে বললেন,
—না, মাইয়াডা আসলেই ফর্সা আছে।
এসব কিছুই একটু দূরে দাঁড়িয়ে রাগে মুখ শক্ত করে, ভ্রুর ওপর ভাঁজ ফেলে দেখছিল ছোঁয়া।
আর পাশে বিপাশা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছিল তাদের সব উশৃঙ্খল অভদ্রতা।
এদের অভদ্রই বলা উচিত। কারণ মেয়ে হয়ে কীভাবে একটা মেয়েকে এভাবে দেখা যায়?
এদের দেখে মনে হচ্ছে, যেন কোনো সবজি বা মাছ কিনতে এসেছে—টিপে টিপে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দোষ-গুণ বের করার চেষ্টা করছে।
পাত্রের বড় চাচি এবার এগিয়ে এসে মায়ার চুলের খোঁপাটা খুলে দিলেন। এলোপাতাড়ি করে চুলগুলো একটু টেনে টেনে দেখলেন—আসল চুল, নাকি পরচুলা।
মায়ার মাথার ঘন কালো কোমর পর্যন্ত লম্বা চুল দেখে পাত্রের বড় চাচি বেশ খুশি হলেন।
মর্জিনা বেগম এবার বললেন,
—তা রান্দা-বাড়া কিছু পারো তো? নাকি এইসব কাম-কাজ কিছু তোমার মায় শেখায় নাই?
পেছন থেকে আলেয়া বেগম বললেন,
—আমাগো বাড়ির মাইয়ারা সব কাম পারে। কিন্তু পাকশালায় ঢুকবার দেই না। আমাগো পরিবার মেলা বড়, সবাই এক লগে খাই। তাই মেলা রান্দা-বাড়া থাহে। আর সেই কাম করনের লিগা মেলা মাইয়া মানুষ আছে।
হঠাৎ করে কথাটা কানে আসতেই সবাই হকচকিয়ে পেছনে ফিরল। বৃদ্ধাকে দেখে সবাই একটু দূরে সরে গেল।
আলেয়া বেগম এসে ছোঁয়ার পাশ ঘেঁষে খাটে বসলেন।
পুনরায় বললেন,
—কাম-কাজ না বুজলে একটু বুঝাইয়া দিবা। আমাগো ঘরের বউগরেও তো এমন কইরাই কাম-কাজ শিহাইছি।
মর্জিনা বেগম মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন। তবে সেই হাসিটা মন থেকে, নাকি শুধু দেখানোর জন্য—তা বোঝা গেল না।
পাত্রের বড় মামি একটু এগিয়ে এসে বললেন,
—এই দুইডা ক্যাডা? আর ওই মাইয়াডা মুখডা ওড়না দিয়া ঢাইকা রাখছে ক্যা?
ছোঁয়ার দিকে আঙুল তাক করে দেখালেন মহিলাটি।
আলেয়া বেগম হাতের ইশারায় বিপাশাকে দেখিয়ে বললেন,
—ওইডা আমার বড় নাতির বউ। আর পাশেরডা আমার বড় পোলার মাইয়া।
পাত্রের বড় চাচি এগিয়ে এসে বললেন,
—তা মাইয়া ওমন মুখ ডাকছে ক্যান?
পাশ থেকে ঠাট্টার সুরে পাত্রের মামি বলে উঠলেন,
—মনে হয় মাইয়ার দাঁত পোকায় খাইছে, তাই গিয়া মুখ ডাকছে।
কথাটা বলেই তিনজন হাসিতে ভেঙে পড়লেন।
আলেয়া বেগম বিরক্তি চেপে বললেন,
—দাঁতে পোকা ধরবো ক্যা? আমাগো এই মাইয়া কারো সামনে যায় না। পরপুরুষ তো দূরের কথা, অচেনা মাইয়া মানুষের সামনে যাইতেও লজ্জা পায়।
পাশ থেকে পাত্রের বড় চাচি কিছু একটা ফিসফিস করে বললেন মর্জিনা বেগমকে।
সঙ্গে সঙ্গে মর্জিনা বেগমের মুখে ফুটে উঠল একটা শয়তানি হাসি।
এগিয়ে এসে বললেন,
—ও বাবা, এত লজ্জা মাইয়ার! তা দেহি, এই লজ্জাপতি মাইয়াডা দেখতে কেমন ।
কথাটা মুখ থেকে বের হতে যতটুকু সময় লাগল, মুখের ওড়নাটা খুলতে তার একমুহূর্তও লাগল না।
এতক্ষণ ছোঁয়ার চোখ দুটো ভালো করে দেখা যাচ্ছিল না। যার কারণে তারাও ভালো করে খেয়াল করেনি। কিন্তু এখন মুখ দেখা যেতেই পাত্রের বড় চাচি বলে উঠলেন,
—ও আল্লাহ! এই মাইডা তো মেলা সুন্দর! মাশাআল্লাহ। এ তো দেহি ওই মাইয়াডার চাইতেও বেশি ভালা দেহা যায়।
মহিলাটি মায়ার সঙ্গে ছোঁয়ার তুলনা করে কথাটা বললেন।
—কি যে কন তুমি আপা ! ভালা মানে? আসমানের পরির মতো সুন্দর! চোখগুলা দেহো, কী সুন্দর রং! আমি জীবনেও এমন চোখ দেহি নাই। এই জীবনের প্রথম দেখলাম।
ছোঁয়ার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে কথাগুলো বললেন পাত্রের মামি।
এতক্ষণ মুখের চোয়াল শক্ত করে ধারালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল ছোঁয়া।
একদম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল—মানুষ এত নির্লজ্জ, বেহায়া আর অসভ্য কীভাবে হয়?
একজনকে দেখতে এসে আরেকজনকে খুঁটিয়ে দেখা, তার ওপর আবার কার থেকে কে বেশি সুন্দর সেটাও যাচাই করা!
এসব করার অধিকার আর সাহস কে দিল তাদের?
ছোঁয়ার ইচ্ছে হলো কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিতে। কিন্তু মুখ খোলার আগেই দেখল, দরজার সামনে তাসলিমা বেগম দাঁড়িয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে আছেন। ইশারায় বোঝালেন, কিছু না বলতে।
রাগে আর বিরক্তিতে ছোঁয়ার চকচকে নীল চোখগুলো যেন আরও চকচক করে উঠল।
মহিলাগুলো ভেবেছিল, ছোঁয়া দেখতে হয়তো কুৎসিত, যার কারণে মুখ ঢেকে রেখেছিল। কিন্তু তাদের সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হওয়ায় আর লোভ সামলাতে পারলেন না পাত্রের বড় চাচি।
গলাটা একটু খেঁকারি দিয়ে তিনি বললেন,
—তয় এই মাইয়ার নাম কি? লেহাপড়া কিছু জানে?
আলেয়া বেগম বললেন,
—মাইয়ার নাম ছোঁয়া। কেলাস নাইনে পড়ে।
মর্জিনা বেগম বৃদ্ধার দিকে একটু এগিয়ে এসে বললেন,
—আইচ্ছা, এই মাইয়াডার বিয়া দিবেন না আপনারা? আমার বড় জায়ে একখান পোলা আছে। আমার মাসুমের দুই বছরের ছুডু। ট্যাহা-পয়সার কোনো কমতি নাই, সরকারি চাকরি করে পোলা।
তয় যদি বিয়া দেন, আপনাগো দুই মাইয়ার বিয়াই আমরা পাকা কইরা যামু।
কথাটা কানে আসতেই ছোঁয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মর্জিনা বেগমের দিকে তাকাল।
আলেয়া বেগম ছোঁয়ার রাগটা বুঝতে পেরে তাদের উদ্দেশে বললেন,
—না, এই মাইয়ার বয়স কেবল পনেরো চলতাছে। এত ছুডু মাইয়া আমরা বিয়া দিমু না। আর আমার বড় পোলার শখ, মাইয়ারে সে মেলা পড়ালেহা করাইবো।
কথাটা বোধহয় সামনে উপস্থিত থাকা মহিলাদের কারোরই পছন্দ হলো না।
পাত্রের বড় চাচি বললেন,
—মাইয়া মানুষের আবার এত পড়ালেহা করায়া লাভ কি? সেই তো শউর ঘরে গিয়া ঘর-দোর, পোলাপাইন সামলাইতে হইবো।
ছোঁয়া এবার আর চুপ থাকতে পারল না। তার ধৈর্যের বাঁধ যেন ভেঙে গেল।
মুখে কৃত্রিম হাসি রেখে তেজ দেখিয়েও ভদ্রভাবেই জবাব দিল,
—পড়াশোনা কইরা পোলাপাইন সামলাবো, না চাকরি করমু—সেইডা না হয় আমাগোই বুইঝা নিবার দেন। সব বিষয়ে আপনাগো এত মাথা না ঘামাইলেও চইনবো।
—ও মা! মাইয়ার মুহে দেহি ভালাই চোপা!
ছোঁয়া আরও কিছু বলবে, তখনই তাসলিমা বেগম এগিয়ে এসে মর্জিনা বেগমকে বললেন,
—আরে আপা, ছুডু মানুষ। কি কইতে কি কইয়া ফেলছে, কিছু মনে কইরেন না।
এরপর তাসলিমা বেগম রাগী দৃষ্টিতে ছোঁয়ার দিকে তাকিয়ে ইশারায় পাশের রুমে চলে যেতে বললেন।
ছোঁয়া রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে পাশের রুমে চলে গেল। পিছন পিছন বিপাশাও গেল।
মেয়ে দেখার পর্ব শেষ হলে সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
---
রাতের খাবার খেয়ে সবাই বসার ঘরে বসে আছেন।
কাঠি দিয়ে দাঁতে আটকে থাকা মাংসের টুকরো বের করতে করতে পাত্রের বড় চাচা বললেন,
—ভাইজান, বিয়ার সময় কিন্তু মাইয়ারে গা ভর্তি কইরা সাজাইয়া দেওন লাগবো। আর ঘরের সব আসবাবপত্রও দিবেন। এইসবকিছুই তো আপনার মাইয়ারই থাকবো। এই ছোট ছোট জিনিস না দিলে কি হয়? আমাগো বাড়ির বড় পোলার বউ হইবো বইলা কতা।
হাফিজুল ইসলাম বললেন,
—এইডা আপনারা না কইলেও দিমু।
বড় ভাইয়ের কথার সঙ্গে একমত হলেন জহিরুল ইসলাম আর নুরুল ইসলামও।
হাফিজুল ইসলাম বুঝলেন, তারা সরাসরি না চেয়ে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে যৌতুক চাইছেন।
অবশ্য এই সমাজে এসব কোনো বিষয়ই নয়। তবুও কথাগুলো হাফিজুল ইসলামের ভালো লাগল না।
পাত্রের বাবা এগিয়ে এসে বললেন,
—তাইলে ভাইজান, পাকা কতাখান কি আইজক্য জানাইবেন?
হাফিজুল ইসলাম সরাসরি বললেন,
—আগে মাইয়ার মত নেই। তারপর মজিদ মিয়া আপনাগো কাছে খবর দিবো।
—আইচ্ছা, আইজক্য তাইলে আসি ভাইজান।
—আইচ্ছা। রাস্তা দেইখা-শুইনা যাইবেন।
সবাইকে বিদায় দিয়ে হাফিজুল ইসলাম বললেন,
—এই ছোটলোকগো পরিবারে আমাগো মাইয়া আমি জীবনেও দিমু না।
বড় ভাইয়ের কথার সঙ্গে একমত পোষণ করলেন জহিরুল ইসলামও।
তিনি বললেন,
—হ, ভাইজান হক কতা কইছেন। মুহের উপর যৌতুক চয়। আবার বাড়ির মহিলা গুলানও বেশি সুবিধার মনে হইলো না। কেমন কুটনি স্বভাবের! খানদানি পরিবার হইলে কি হইছে, মন-মস্তিষ্কের ছোটলোকে ভরা।
নুরুল ইসলাম বললেন,
—তাইলে ভাইজান, মজিদ মিয়ার কাছে আমাগো উত্তর দিয়া দিমু আর ভালো পাত্র দেখবার কমু।
—হ, তাই কইয়া দিস।
হাফিজুল ইসলাম কথাটা বলেই নিজের ঘরে চলে গেলেন।
---
এদিকে মায়া নিজের গায়ের সুন্দর জামদানি শাড়ি, হাতে আর গলার অলংকার—সবকিছু মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলে বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করছে।
কান্না করারই কথা।
আজ তাকে অনেকভাবে অপমান করা হয়েছে। তাও আবার তার পরিবারের সকলের সামনে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তারা কেউ কোনো প্রতিবাদ করেনি।
একটাই অজুহাত—এসব নাকি সমাজের নিয়মনীতি।
জীবনে প্রথম তাকে বিয়ের জন্য দেখতে আসবে শুনে মেয়েটা মনে মনে লজ্জা পেলেও মায়ের কথা মতো কত সুন্দর করে হাতে মেহেদি, পায়ে আলতা দিয়ে শাড়িও পরেছিল।
এতটুকু সময়ের মধ্যে বিয়ে সম্পর্কে কত সুন্দর সুন্দর কথাই না সে ভেবেছিল।
তবে আজ যা ঘটল, তার পর বিয়ে নামের এই সম্পর্কটার প্রতিই মেয়েটার মনে একরকম বিদ্বেষ তৈরি হয়ে গেল।
চলবে...................