বর্ষা-হিমেলের প্রেমের ছোঁয়া
পর্ব : ৪
ছোঁয়াকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসার পথেই মাগরিবের আজান পড়ে যাওয়ায় নামাজ আদায় করে তবেই বাড়ি ফিরল হিমেল।
হাত-মুখ ধুয়ে যখন নিজের ঘরে ঢুকল, তখনই তার চোখে পড়ল—পড়ার টেবিলের পাশে রাখা চেয়ারে বসে আছে বৃষ্টি।
বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে হিমেল ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ ভাবল।
এই অসময়ডায় আবার আমার ঘরে আইছে ক্যা? কী মতলব হের?
হিমেলকে দেখেই বৃষ্টির ঠোঁটে ফুটে উঠল চওড়া এক হাসি। তারপর জিজ্ঞেস করল,
— কী খবর তোমার?
হিমেল গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে দায়সারা ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
— কী খবর চাও?
বৃষ্টি হিমেলের দিকে একটু এগিয়ে এসে বলল,
— তোমার তো এহন কোনো পাত্তাই পাই না! আমার কুনো খবরও লও না, ক্যান?
হিমেল বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল,
— ক্যান, কী হইছে যে সবসময় আমার তোমার খবর নেওন লাগবো?
হিমেলের এমন কাঠখোট্টা কথায় বৃষ্টির একটু কষ্ট হলো। তবে সেই কষ্টটা মাটিচাপা দিয়ে আবারও বলল,
— আইজক্যা বিকালবেলায় তোমাগো বাড়িতে ওই মাতব্বরের মাইয়াডা আইছিল ক্যান, হিমেল? আর হের লগে তোমার এত কীসের কতা?
হিমেল এবার মুখটা গম্ভীর করে বলল,
— হের জবাব কি তোমারে দেওন লাগবো? হোনো বৃষ্টি, তোমারে একখান কথা কই—বেশি পাকনামো আমার পছন্দ না। আর আমার ব্যাপারে তোমার এত মাথা ঘামাইবারও দরকার নাই। নিজের চরকায় তেল দাও।
— ও হিমেল, কার লগে কতা কস বাপ?
হিমেলের মা তার ঘর থেকে জিজ্ঞেস করলেন।
— বৃষ্টি লগে, আম্মা।
হিমেলের এমন মুখের ওপর জবাব শুনে বৃষ্টি সাপের মতো ফোঁসফোঁস করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
বৃষ্টি হিমেলদের পাশের বাড়ির মেয়ে। দুই বাড়ির মাঝখানে কোনো বেড়া দেওয়া নেই। তাই দূর থেকে দেখলে মনে হয়, দুটো বাড়ি যেন একই বাড়ির অংশ।
বৃষ্টিরা দুই বোন। তাদের মধ্যে বৃষ্টিই বড়। হিমেল আর বৃষ্টির বয়সের ব্যবধানও খুব বেশি নয়—হিমেল বৃষ্টির চেয়ে মাত্র তিন দিনের বড়। সেই কারণেই বৃষ্টি তাকে নাম ধরেই ডাকে।
হিমেল যতক্ষণ বাড়িতে থাকে, বৃষ্টি সুযোগ পেলেই তার ঘরে এসে হাজির হয়। নানান ধরনের কথা বলে, অকারণে বসে থাকে—সঙ্গে একটু গায়ে পড়া স্বভাব তো আছেই।
বৃষ্টির এই বাড়াবাড়িটা হিমেলের একদমই পছন্দ না। কতবার যে তাকে নিজের কাজে ব্যস্ত থাকার কথা বলে ঘর থেকে সরিয়ে দিয়েছে, তার হিসাব নেই। তবুও বৃষ্টি সুযোগ পেলেই চলে আসে।
হিমেলের ধারণা, মেয়েরা মায়ের জাত। তাদের সবসময় সম্মানের সঙ্গে, শালীনতা বজায় রেখে পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলা উচিত। অন্তত ছোঁয়াকে সে ঠিক তেমনই দেখে।
আসলে বৃষ্টি ছোটবেলা থেকেই হিমেলকে পছন্দ করে। হিমেলের প্রতি তার যেন অন্য রকম একটা টান আছে—যাকে এক কথায় দুর্বলতাই বলা যায়। হিমেল ছোঁয়াকে প্রতিদিন স্কুলে নিয়ে যায়, আবার ছোঁয়াও মাঝেমধ্যে হিমেলদের বাড়িতে আসে—এসব কোনো কিছুই বৃষ্টির ভালো লাগে না।
তার ওপর ছোঁয়া মেয়েটা দেখতে মারাত্মক সুন্দর।
বৃষ্টির গায়ের রং শ্যামলা। পাতলা, লম্বাটে গড়ন। মুখের গড়নটা ভীষণ মায়াবী। মাথার চুলগুলো কোমরের নিচ পর্যন্ত লম্বা। তাকে দেখলে যে কোনো ছেলে প্রথম দেখাতেই পছন্দ করে ফেলতে পারে। বিশেষ করে বৃষ্টির তাকানোর ধরনটা বেশ সুন্দর।
কারণ তার চোখ দুটো একটু বড় বড়, টানা টানা। সবসময় চোখে মোটা করে কাজল দেওয়া থাকে। ঠোঁটজোড়ায় সবসময়ই লেগে থাকে কৃত্রিম রঙের হালকা, কোমল আভা।
কপালে থাকে ছোট্ট কালো টিপ। দুই হাতে থাকে কয়েকগাছি কাচের চুড়ি।
আর গলায় সবসময় কালো সুতোয় ঝুলিয়ে রাখে একটা সাদা দুধ-কড়ি।
এত মায়াবী চেহারা, এত সুন্দর করে নিজেকে সাজিয়ে রাখে—তবুও কেন জানি হিমেল বৃষ্টিকে সহ্য করতে পারে না।
---
পরদিন সকাল গড়িয়ে বেলা এগারোটা নাগাদ ছোঁয়ার দাদি আলেয়া বেগম বসেছেন ছোঁয়ার মাথায় তেল দিতে। বিলি কেটে কেটে যত্ন করে তেল দিয়ে দিচ্ছিলেন বৃদ্ধা। চুলের বেহাল অবস্থা দেখে তিনি একটু ধমকের সুরেই বললেন,
— এই ছেমরি, তোর চুলগুলানের কী হাল করছোস ক? ঠিকমতোন আঁচড়াস না, তেলও দিস না মাতায়! চুলগুলান এমন উল্টাপাল্টা কইরা রাখোস ক্যান? চুলের একটু যতন নিলি না, দুই দিন পর যহন এই সুন্দর চুলগুলান ঝইরা ঝইরা পইড়া যাইবো গা। তহন কই যাইবো তোর এই রূপ-যৌবন? চুলই যদি না থাহে, রূপ এত ভালো লইয়া কী করবি ক?
ছোঁয়া দাদির কথা শুনে ফিক করে হেসে বলল,
— আহা বুড়ি, তুমি আমার চুল নিয়া পড়ছো ক্যান? চুল পইড়া গেলে পইড়ুক গা! যে জিনিস থাহনের না, তা যতই যতন কইরা রাহো, জীবনেও থাকবো না। বুজছো, আমার সুন্দরী বুড়ি? আর তোমার নাতনির রূপ কি আর চুলের লগে বাঁনধা যে, চুল পইড়া গেলেই রূপও পইড়া যাইবো গা?
আলেয়া বেগম মুখে পানের পিকটা খ্যাক করে এক পাশে ফেলে বললেন,
— ওমা, দেহছে ছেমরি কী কয়! এত কতা কস ক্যান? চুপ মাইরা বইসা থাক, নড়িস না। বেনিখান কইরা দিবার দে, তারপর যত খুশি কতা কইস!
ছোঁয়ার মাথায় সুন্দর করে বেনি করা শেষ হতেই সে উঠে দাঁড়িয়ে বিরক্তির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে হলো, এতক্ষণ যেন তাকে জোর করে জেলখানায় আটকে রাখা হয়েছিল!
চুলের যত্নের ব্যাপারে ছোঁয়া ভীষণ অলস। অলস হওয়াটাও অবশ্য অস্বাভাবিক নয়—হাঁটু ছুঁইছুঁই লম্বা চুলে নিয়ম করে তেল দেওয়া, আঁচড়ানো, যত্ন নেওয়া মোটেই সহজ কাজ নয়। তার ওপর এই বয়সের মেয়েরা একটু অগোছালোই থাকেই।
তাই মাঝে মাঝেই দাদি আর তার আম্মা মিলে তাকে জোর করে বসিয়ে রেখে মাথায় তেল দিয়ে দেন।
---
— উফ..... কেডা রে।
হঠাৎ চুলের লম্বা বেনিতে টান পড়তেই ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল ছোঁয়া।
পেছনে তাকিয়ে দেখল, মায়া।
— ওহ আপা, তুমি!
মায়া হেসে বলল,
— হ, আমি। তোরে ডাকতাছিলাম, হুনোস না ক্যান? কই যাস এহন?
— কোথাও না। ক্যান, কিছু কইবা আপা?
— হ, কমু জন্যই তো ডাকতাছিলাম।
— কী কইবা আপা?
মায়া একটু লাজুক লতার ন্যায় মুখটা করে বলল,
— কচ্ছি, আমার দুই হাতে সুন্দর কইরা মেন্দি আর পায়ে আলতা পরায়া দে তো। আম্মা মেন্দির পাতা বাইটা আনতাছে।
ছোঁয়া মুখে হাসি রেখেই জিজ্ঞেস করল,
— হঠাৎ কইরা মেন্দি আর আলতা পরবা ক্যান আপা?
মায়া একটু বিস্মিত হয়ে বলল,
— ও মা! হোনো মাইয়ার কতা! ক্যান, তুই জানোস না? আইজক্য আমারে পাএ পক্ষ দেখবার আইবো।
ছোঁয়া চোখ দুটো বড় বড় করে বলল,
— কি কও আপা! সত্যি?
— হ রে পাগলী! এই লিগাই তো আইজক্য তোরে ইস্কুলে যাইবার দেয় নাই। আমারে দেখবার আসবো, আর তুই না থাকলে হয় ক?
মায়া আপার কথা শুনে এতক্ষণ ছোঁয়ার মুখে যে হাসিটুকু ছিল, মুহূর্তেই তা মলিন হয়ে গেল। মুখটা ছোট করে সে জিজ্ঞেস করল,
— তাইলে রুমা আপার লেহান তোমারও বিয়া হইয়া যাইবো গা? তাইলে আমি কার লগে সময় কাটামু, গল্প করমু? আর কার লগেই বা কড়ি খেলমু? আমার এহন একটুও ভালো লাগতাছে না আপা।
মায়া ছোঁয়ার মাথায় আলতো করে টোকা দিয়ে বলল,
— আরে পাগলী, মাইয়া হইয়া জন্ম নিছি, পরের ঘরে তো একদিন যাইতেই হইবো। সারাজীবন কি আর বাপের ঘরে থাকার কপাল হয়, মাইয়া গো?
কথাটা বলেই মায়া ছোঁয়াকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিল।
— তুই মন খারাপ করিস না রে। আইজক্য খালি দেখবার আইবো, বুজলি? বিয়া তো আর আইজক্য হইবো না। আমারে তাগো পছন্দ হইলে, কতা পাকাপাকি করবো, তারপরে তো বিয়া হইবো।
দুজনের কথার মাঝেই মায়ার মা সালেহা খাতুন ঘরে এসে বললেন,
— দুইজন এত কী কতা কস হ্য?
হাতের মেন্দির বাটিটা মায়ার হাতে দিয়ে বললেন,
— নে, সুন্দর কইরা পরিস।
এরপর ছোঁয়ার দিকে তাকাতেই সালেহা খাতুন দেখতে পেলেন, মেয়েটার চোখে পানি চিকচিক করছে। তিনি চিন্তিত স্বরে বললেন,
— আরে ছোঁয়া কান্দে ক্যা? কী হইছে ওর? ও মায়া, তুই কি ওরে ধমক দিছিস, না মারছিস কোনডা?
মায়া হেসে বলল,
— আরে আম্মা, তোমার মাইয়ার মন খারাপ হইছে আমার বিয়া হইবো শুইনা। আমি কইতাছি, আইজক্য খালি দেখবার আইবো—তাও কানতাছে!
সালেহা খাতুন ছোঁয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
— মন খারাপ কইরো না আম্মা। যাও, মেন্দি পরায়া দেও। বেশি কইরা বাটছি, তুমিও হাতে নিও কেমন। দেরি হইয়া যাইবো। পাএ পক্ষরা দুপুরের কতা কইয়া আবার সন্ধ্যার দিক আইবার চাইতাছে। আর সন্ধ্যায় আইলে রাতের খাওন তো খাওয়ায়া পাঠাইতে হইবো। এহনো মেলা কাম পইরা আছে।
ওদের কথার মাঝেই রান্না ঘর থেকে নাজমা বেগমের ডাক ভেসে এলো,
— মেঝো ভাবি কই গেলেন? এই হানে আহেন। চুলায় মাছের ঝুলডা চড়ায়া দেন।
ছোট জায়ের ডাক কানে আসতেই সালেহা খাতুন আর দেরি করলেন না। তাড়াহুড়ো করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বাড়িতে আজ অনেক আয়োজন। গ্রামের মাতব্বরের বাড়িতে মেয়ে দেখতে পাত্রপক্ষ আসবে—আয়োজনেও তো কোনো কমতি রাখা চলে না।
মায়া হলো ছোঁয়ার মেঝো চাচা জহিরুল ইসলামের ছোট মেয়ে। ছোঁয়ার চেয়ে চার বছরের বড়। তবে তাদের মধ্যে সম্পর্কটা বান্ধবীর মতো। জহিরুল ইসলামের তিন সন্তান—বড় ছেলে জাহিদ হোসেন, এরপর দুই মেয়ে রুমা আর মায়া। রুমার বিয়ে হয়েছে প্রায় তিন বছর হয়েছে।
আর নুরুল ইসলামের দুই সন্তান—বড় ছেলে শাকিল আর তিন বছরের ছোট মেয়ে সাথি।
মায়া, সাথি ওদের সবার আরো ভাই-বোন থাকলেও ছোঁয়া তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তাসলিমা বেগমের বিয়ের অনেক বছর পর ছোঁয়ার জন্ম হয়। এরপর আর তাদের কোনো সন্তান হয়নি।
সেই কারণেই হাফিজুল ইসলামের চোখের মণি তার একমাত্র মেয়ে ছোঁয়া। মেয়েটার সামান্য মন খারাপও যেন বাবার বুকের ভেতরটা ভার করে দেয়।
---
বিকেল বেলা ছোঁয়া আর ছোঁয়াদের পাশের বাড়ির মেয়ে কাকলি মিলে মায়াকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিচ্ছে। কাকলি মেয়েটা শাড়ি পড়ানো হোক বা বউ সাজানো হোক—দুটোতেই বেশ পারদর্শী।
লাল পাড়ের কালো জামদানি শাড়িটাতে মায়াকে দেখতে ভীষণ রকমের রূপবতী লাগছে ছোঁয়ার কাছে।
ছোঁয়া সেই কখন থেকে খাটের একপাশে চুপ মেরে বসে কুঁচোনো আমের ভর্তা খাচ্ছে আর কাকলির সাজানো দেখছে।
শাড়ি পরানো হলে উৎফুল্লতার সঙ্গে মায়া জিজ্ঞেস করল,
— এই ছোঁয়া, ভালা কইরা দেইখা ক তো, আমারে কেমন লাগতাছে? সুন্দর দেহা যাইতাছে?
ছোঁয়া এক গাল হেসে বলল,
— তুমি কি যে কও আপা! সুন্দর মানে—একদম সুন্দরী অপ্সরার মতোন লাগতেছে, বুইজলা।
ছোঁয়ার কথায় মায়া একটা লাজুক হাসি দিল।
পাশ থেকে কাকলি বলল,
— মায়া আপা, এইহানে বহেন। আপনার চোখগুলানে সুন্দর কইরা কাজল আর হালকা কইরা সেডো কালার দিয়া দেই।
কাকলির কথায় মায়া টপ করে বসে পড়ল সাজার জন্য।
মায়ার মনে কেন যেন আজ অন্যরকম একটা আনন্দ হচ্ছে। জীবনে এই প্রথম তাকে বিয়ের জন্য দেখতে আসবে—ভাবতেই বুকের ভেতর কেমন যেন শিহরণ জাগছে। পাত্রপক্ষ তাকে পছন্দ করবে কি না, কেমন হবে তারা—এসব নিয়েও মনে মনে নানা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে।
তার ওপর নিজের বিয়ের কথা উঠেছে, তাই সাজগোজ করতেও আজ তার বেশ ভালোই লাগছে। আয়নায় নিজের সাজানো মুখটা বারবার দেখছে আর লাজুক হাসি ফুটে উঠছে ঠোঁটের কোণে।
---
ঠক ঠক ঠক.......
পাশের ঘর থেকে জানালায় কেউ শব্দ করছে।
শব্দটা কানে আসা মাত্রই ছোঁয়ার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন অন্য কিছুর জানান দিল। পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
মনে মনে যার জন্য এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল, হয়তো সে এসেছে।
হ্যাঁ, সত্যিই সে।
টেবিলে রাখা হিমেলদের টিফিন বাক্সটা হাতে নিয়েই দৌড়ে নিজের ঘরে গেল ছোঁয়া।
বন্ধ জানালাটার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই শুনতে পেলো হিমেলের কণ্ঠ,
— ছোঁয়া, তুমি কি ঘরে আছো?
হঠাৎ করেই নিজের বুকের ভেতর ধুকপুকানিটা কেন যেন বেড়ে গেল। বড় করে একটা শ্বাস ছেড়ে জানালার একপাশের পাল্লাটা খুলে পর্দার আড়ালে থেকেই বলল ছোঁয়া,
— হ, আছি হিমেল ভাই।
— আইজক্য ইস্কুলে গেলা না ক্যা?
— আমার মায়া আপারে দেখবার আইবো পাএ পক্ষ।
— ওহ, তা কহন আইবো তারা?
— আম্মা কইলো মাগরিবের পরে।
— তাইলে ইস্কুলে তো যাইতেই পারতা।
— হ, কিন্তু আম্মা যাইতে দিলো না। কইলো, আইজক্য বাড়িতেই থাকতে।
— আইচ্ছা। এই নাও, এইগুলা তোমার লিগা।
কাগজে মোড়ানো জিনিসটার দিকে তাকিয়ে ছোঁয়া বলল,
— এইডার ভিতরে কি আছে, হিমেল ভাই?
— খুইলা দেহো।
ছোঁয়ার যেন ধৈর্যে কুলালো না। সঙ্গে সঙ্গেই গোল করে মোড়ানো কাগজটা খুলে দেখল, ভিতরে বেশ অনেকগুলো আমলকি।
ছোঁয়া মুখে হাসি দিয়ে বলল,
— আমলকি গুলান বেশ টাটকা, কাগো গাছের তা?
— জব্বার দাদাগো গাছের। বুইড়া মানুষ পাড়তে কইলো। হেরে পাইড়া দিয়া তোমার লগে কয়ডা চাইয়া নিয়াইছি।
— ওহ, আইচ্ছা।
বলেই জানালাটা দিয়ে টিফিন বাক্সটা হিমেলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
— এইহানে আমের ভর্তা আছে।
হিমেল বাটিটি হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— তুমি খাইছো?
— হ, একটু আগেই খাইছি। তুমি অহন যাও, হিমেল ভাই।
— আইচ্ছা।
হিমেল আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না সেখানে। বাড়ির দিকে রওনা হলো।
ছোঁয়া পর্দার আড়াল থেকে মুখটা বের করে হিমেলের প্রস্থান দেখল।
হিমেল চোখের আড়াল হতেই ছোঁয়া দৌড়ে পাকশালায় গেল। গিয়ে দেখল, সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত।
তাসলিমা বেগম গরুর গোশত নেড়ে দিতে দিতে বললেন,
— এইহানে কী চাস তুই? ঘরে যা, মেলা গরম এহানে।
— যামু। তার আগে আমারে একটু নুন আর শুকনা ঝালের গুঁড়া দাও তো।
— কী করবি এইসব দিয়া?
— আমলকি খামু।
কথাটা শুনে নাজমা বেগম একটা ছোট বাটিতে নুন আর শুকনা মরিচের গুঁড়া দিয়ে দিলেন। সেগুলো হাতে নিয়েই ছোঁয়া আবার দৌড়ে চলে গেল মায়ার ঘরে।
মায়া জিজ্ঞেস করল,
— কি রে, এমন দৌড়দাপ পারতাইসোস ক্যান?
মায়ার কথার জবাব না দিয়ে ছোঁয়া তার হাতে থাকা আমলকি আর ঝালের বাটিটা সামনে ধরে বলল,
— আমলকি খাইবা আপা?
আমলকির দিকে একবার তাকিয়ে পুনরায় আয়না দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল,
— আমলকি পাইলি কই?
— হিমেল ভাই দিছে আপা।
— ওহ, আইচ্ছা।
বলেই হাতের আয়নাটা সামনের টেবিলের উপর রেখে একটা আমলকি হাতে তুলে নিল মায়া।
ঝাল লাগিয়ে এক কামড় দিতেই কষা স্বাদে মুখটা কুঁচকে নিলো, অথচ একটু পরেই জিভের ডগায় মিষ্টি রেশ টের পেলো।
মানুষের কিছু অনুভূতিও বোধহয় এমনই হয়—শুরুতে যতটা অচেনা, সময় গড়ালে ততটাই আপন।
মায়া আর ছোঁয়াকে খেতে দেখে কাকলিও মুখে পুরে নিল একটা আমলকি।
চলবে...........।