#কে_বাঁশি_বাজায়_রে
#মিথুবুড়ি
#পর্ব_১৫
সেদিনের ঘটনায় সীমান্ত তাফসির আর স্নেহকে আটকে রাখতে পারেনি। ভোরের বাসে ঢাকায় ফিরে আসে সে, সঙ্গে নিঃসাড় স্নেহা। স্নেহার জ্বর এখন কিছুটা সহনীয়। সকাল হতেই স্নেহ ব্যস্ত হয়ে পড়ে বোনের প্রিয় নাস্তা বানাবে বলে। চটজলদি গ্যাসে আলু সিদ্ধ বসায়। ঘি-তে ভাজা পরোটা হবে, যা স্নেহার সবচেয়ে প্রিয়। সঙ্গে পাতলা ঝোলের গরুর মাংস। রুটির ডো তৈরি করে ফ্রিজ থেকে বের করে আনে আগেই কসিয়ে রাখা মাংস।
হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল। এত সকালে কে এল ভেবে দরজার দিকে এগোয় স্নেহ। দরজা খুলতেই সামনে ভেসে ওঠে তিবার ক্লান্ত মুখ,কপাল ঘামে ভেজা। একটুও অবাক হয় না স্নেহ। ছোটবেলা থেকে একসাথে ওরা। কারো পক্ষে কাউকে ছাড়া বেশিদিন থাকা সম্ভব নয়। তিবা চোখ বড় করে চেয়ে থাকে স্নেহর দিকে। স্নেহের গা খালি। গরমে রান্নাঘরে গেঞ্জি খুলে রেখেছিল সে, আর দরজা খুলতে গিয়ে তা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। তিবার চোখে হঠাৎ লাজুক চমক খেলে যায়। লাজুক হেসে মাথা নিচু করে বারবার সামনের চুল কানে গুঁজে নেয় সে। তিবার এমন লজ্জা মাখা অভিব্যক্তি দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলে স্নেহ। কপালে হাত দিয়ে ভাবে কিছু লেগে আছে কি না, তখুনি টের পায় তার গায়ে কিছু নেই! লজ্জায় সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে চলে যায় স্নেহ।
তিবা মুখ চেপে হেসে ফেলল। সেই হাসি ধরা পড়ে না কারো চোখে। দরজা বন্ধ করে সে সোজা ঢুকে পড়ে স্নেহার রুমে। পাঁচ মিনিট পরেই হাতে লেবুর শরবতের গ্লাস নিয়ে স্নেহার রুমে ঢোকে স্নেহ। তিবা তখনও নানাভাবে স্নেহার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু স্নেহা নির্বাক, চোখের ভাষাও নিঃস্ব। স্নেহকে দেখে তিবা একটু গুছিয়ে বসে। স্নেহার দিকে একপলক তাকিয়ে তিবার হাতে গ্লাসটা ধরিয়ে দিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে যায় স্নেহ।
একসাথে নাস্তা করে তিনজন। টেবিল জুড়ে ভারী নীরবতা। কারণ যে মেয়েটা একদিন এই বাড়ির প্রাণ ছিল, আজ সে যেন নিজের একটা ছায়া মাত্র! খাওয়া শেষে প্লেট গুছাতে গুছাতে তাড়াহ দিতে শুরু করে স্নেহ,
"কিরে, হলো? বের হ জলদি, পরে বাস মিস করবি!"
"তুমি তো এখনও রেডি হওনি।" নিভু স্বরে বলে স্নেহা।
এগিয়ে গিয়ে স্নেহার কপালের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে স্নেহ বলল,"আমি রেডি হব কেন? আমার কোর্ট তো এগারোটায়।"
অবোধ নয়নে ভাইয়ের দিকে তাকায় স্নেহা,"তুমি দিয়ে আসবে না?"
স্নেহ হাতের আঁজলায় বোনের মুখ চেপে ধরল,"আমি কেন দিয়ে আসব? তুই কি বাচ্চা?"
স্নেহা মাথা নাড়ে, ফিসফিস করে বলে,"না।"
একটু থেমে স্নেহ ঠান্ডা গলায় বলল,"তিবা তো রোজ একা যাওয়া-আসা করে। তোর হাত আছে, পা আছে, চোখ-কান সবই আছে। তাহলে তুই পারবি না কেন? আমার বোন পিছিয়ে থাকবে কেন? আমার বোন সব দিক থেকে এগিয়ে থাকবে, এটাই আমি চাই।"
অতঃপর একটুখানি নিঃশ্বাস নিয়ে সে আবার বলতে আরম্ভ করল,"আজ থেকে যেভাবে ইচ্ছে, সেভাবেই চলবি। বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাবি, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাবি, কাশফুলে হাঁটবি, প্রোগ্রামে পার্টিসিপেট হবি—কেউ কিচ্ছু বলবে না তোকে।"
স্নেহার চোখে পানি এসে যায়। নিভু চোখে সে চেয়ে থাকে ভাইয়ের দিকে। স্নেহ আঙুল দিয়ে তার চোখের পানি মুছে দেয়। তারপর কপালে আদুরে ছোঁয়া দিয়ে পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে এগিয়ে দেয়,"এটা রাখ। যেভাবে ইচ্ছে খরচ করবি।"
স্নেহা চোখ নামিয়ে মাথা নাড়ে,"এসব লাগবে না ভাইয়াব্বু!"
"উমম! রাখতে বলেছি রাখ। তিবা, ক্লাস শেষে স্নেহাকে নিয়ে শপিংয়ে যাবি।" কিছুটা রাগী গলায় বলল স্নেহ। তিবা মুচকি হেসে মাথা নাড়ে। ভাইবোনের এই নিঃশর্ত ভালোবাসা যত দেখে, ততই মুগ্ধ হয় সে।
স্নেহাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে তিবা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কাঁপতে থাকে স্নেহার বুক। যদি আবার সেদিনের মতো কেউ রাস্তায় দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলে ওঠে—‘ওই কিউটি টা, ওই পুতুল... আরে সেই মাল টা না!’ তার অন্তরাল ভয়ের সেই স্রোত টের পেয়ে যায় তিবা। সে শক্ত করে চেপে ধরে স্নেহার হাত। স্নেহা খেয়াল না করলেও তিবার চোখ এড়ায় না যে, কিছু ছেলে শুরু থেকেই তাদের অনুসরণ করছে। দূরে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলা, চা খাওয়া সবকিছুর আড়ালে তাদের নজর ঠিক স্নেহার দিকেই, স্নেহার নিরাপত্তার দিকে। তবে আজ আর তেমন কিছু ঘটেনি। বরং আজকের রাস্তাগুলো যেন অন্যরকম মনে হচ্ছিল৷ ঝকঝকে, গা ঘেঁষে হাঁটতে হয়নি কাউকে, কেউ ছুঁয়ে দেয়নি অচেনা কুৎসিত ইচ্ছায়। মনে হচ্ছিল, হয়তো আজ কেউ ছুঁতে সাহস পায়নি।
ভার্সিটির যত কাছে আসে, স্নেহার ভেতরের অস্থিরতা তত বাড়ে। মেইন গেইট পেরোতেই বুকের মাঝে মোচড় দিয়ে ওঠে। মনে হলো, কতদিন পর মানুষটার দেখা! তবে সে মুহূর্ত স্থায়ী হয় না।
চোখ নামিয়ে নেয় স্নেহ। চাইলেও পারে না চোখ মেলাতে। মানুষটা কি তাকিয়ে ছিল তার দিকেই? তার জন্যই কি দাঁড়িয়ে ছিল গেইটের কাছে? লোকটার চেহারায় ক্লান্তির ছায়া, শুকনো মুখ! তবে কি সেও পুড়েছিল এই দূরত্বের বিরহে? পুড়ছিল বলেই মাঝরাতে এতদূর ছুটে গিয়েছিল?
ভাবনার মাঝেই আচমকা তুলতুলি ঝাঁপিয়ে পড়ে স্নেহার পায়ের গোড়ালি জড়িয়ে ধরে। হঠাৎ এই আদরে কেঁপে ওঠে স্নেহা। তবে তার পরের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঠোঁটে ভরে ওঠে অনিন্দ্য সুন্দর হাসিতে। স্নেহা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে তুলির সামনে।
"কেমন আছিস তুলি?"
"আমি ভালো আছি আপু।"
স্নেহার ভ্রু কুঁচকে যায়। তুলির মুখে এমন শুদ্ধ বাংলা! কিছু বলতে যাবে, তার আগেই দৌড়ে আসে বাকি চারজন। স্নেহার দুই কাঁধে দু’জন করে জড়িয়ে ধরে তারা। সকলের হাতে গোছা গোছা লাল গোলাপ।
তিবা ছেলেগুলোর হাতে এত লাল গোলাপ দেখে অবাক হয়। প্রথমে ভেবেছিল হয়তো বিক্রি করছে। তবে যখন তারা একসাথে বলে ওঠে,
"ওয়েলকাম আপু!" তখন বিস্ময়ে থমকে যায় স্নেহা ও তিবা। চারজন একসাথে ফুলের গুচ্ছ বাড়িয়ে দেয় স্নেহার দিকে। স্নেহা হতবাক, মুখ হা করে তাকিয়ে থাকে। ওয়েলকাম? কিসের ওয়েলকাম? তিবা বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থাকে, মনে হয় যেন কোনো স্বপ্ন দেখছে। স্নেহা ধাতস্থ হয়ে একটু গম্ভীর গলায় বলল,
"এই, তোরা আজ এত ফুল পেলি কোথায়?"
"সুন্দর ভাইয়া দিয়েছে!" তুলতুলি লাফিয়ে ওঠে উত্তেজনায়।
"আপু, ধরো না! হাত ব্যথা হয়ে গেল তো!"
ছেলেগুলো ফুল রেখে দেয় স্নেহার কোলে। ফুলে ভরে উঠতে থাকে কোল। ভরে গিয়ে প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলে দু’হাতে তা আগলে নেয় স্নেহা। কী বলবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না সে।
আবারও অবাক লাগে ছেলেগুলো কীভাবে এমন পাল্টে গেছে দেখে! শালীন পোশাক, মিষ্টি শুদ্ধ ভাষা, আচরণে অপূর্ব ভদ্রতা।
হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে তুলতুলি,"সুন্দর ভাইয়া! সুন্দর ভাইয়া!"
বলে লাফাতে লাফাতে দৌড়াতে থাকে গেইটের দিকে। হাসতে হাসতে ছুটে যায় বাকিরাও। কৌতুহলী চোখে চেয়ে ওঠে দাঁড়িয়ে পড়ে স্নেহা। তার ভিতরটা তখন টলমল করে উঠছে আশ্চর্য অনুভূতিতে। কে এই মানুষ? যিনি রঙহীন জীবনের রাস্তাগুলো রঙিন করে তুলেছেন এই পথশিশুদের জন্য?
এক ঝলকে দৃষ্টি ধাঁধিয়ে যায় তার—রণয়! সে হাসছে। শুষ্ক ঠোঁটে প্রাণখোলা, ঝলমলে হাসি। স্নেহা কখনো দেখেনি এই রূপ। হাসির তালে তালে ঠোঁটের নিচের কালো তিলটা কেমন প্রসারিত হচ্ছে। এই মানুষটার হাসির ভেতর কোনো বিরক্তি নেই, নেই দম্ভ। আছে শুধু স্নিগ্ধতা আর গভীর প্রশ্রয়। তুলতুলি তো ততক্ষণে রণয়ের কোলে উঠে বসে পড়েছে!
এই-ই কি তবে সেই ‘সুন্দর ভাইয়া’?
ভতরে জমে থাকা অনুভূতিগুলো চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে আজ। যে জীবন একসময় ছিল শুধু ধোঁয়াশা, সেখানে আজ রঙের ছোঁয়া দিয়েছে এই মানুষটা। এমন অভিনন্দন! এমন লাল গোলাপের শুভেচ্ছা! স্নেহা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। দেখতে থাকে রণয়ের এই দুর্লভ হাসি। পুরুষের এমন হাসি থাকতে নেই। এই হাসি বিপজ্জনক! হঠাৎ রণয় চোখে তাকায় স্নেহার দিকে। মুহুর্তেই চোখাচোখি হয় দু’জনের।
আজ আর চোখ নামায় না স্নেহা। অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। ওদিকে ক্লাসের সময় হয়ে যাচ্ছে। তিবা হাতঘড়িতে সময় দেখে স্নেহার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। অযথা মুচকি মুচকি হাসছে স্নেহা। তিবা ভ্রু কুঁচকে কনুই দিয়ে গুঁতো দিয়ে প্রশ্ন ছোড়ে,
"কিরে? কী হলো?"
"আচ্ছা তিবা, আমি তাকানোর আগেই দেখি কেউ আমার দিকে তাকিয়ে আছে—এই অনুভূতিটা কেমন?"
তিবা মুচকি হেসে বলল,"সেই, মামা! সেই!"
একটু থেমে নিজেই জিজ্ঞেস করল,"কেন?"
স্নেহা চোখ নামায়, কাঁধ ঝাঁকায়,"এমনি!"
তিবার মুখে ভেংচি, "এই ‘এমনি’-টাও এখন বিশেষ কিছু হয়ে গেছে, সবই বুঝি আমি।"
স্নেহা তখনও হেসেই যাচ্ছে। একটা মুক্ত, নির্মল, রোদঝলমলে হাসি, যেটা রণয়ের সামান্য এক হাসিতেই খুলে দিয়েছে অবলীলায়।
______
"তুমি ক্লাসে যাও, আমি আছি।"
ওয়াশরুমের কর্নারে দাঁড়িয়ে ছিল তিবা। রণয়কে হঠাৎ দেখে সে একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায়। তিবাকে দ্বিধায় পড়ে থাকতে দেখে রণয় শান্ত গলায় বলল,
"আমি পারব, তুমি যাও। ম্যাম ক্লাসে গেছেন।"
মাথা নাড়িয়ে সরে যায় তিবা। রণয়ের ওপর তার এখন অটুট বিশ্বাস জন্মেছে। লোকটা কথা রেখেছে, স্নেহাকে কেউ কিছু বলেনি, অপদস্থ হতে হয়নি, সবটাই সে সামলে নিয়েছে।
তা ছাড়া তিবারও এখানে থেকে লাভ নেই। সে বমির দৃশ্য একদম সহ্য করতে পারে না। স্নেহা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার পর থেকেই অনবরত বমি করে যাচ্ছে। ‘ওয়াক ওয়াক’ শব্দেই তিবার গা গুলিয়ে আসছিল। রণয় ঠিক সময়ে এসে যেন তাকে বাঁচিয়ে দিল।
তিবা মাথা নাড়িয়ে চলে যেতেই ওয়াশরুমের ভেতর ঢোকে রণয়। বেসিনের পাইপ ধরে কাঁশতে কাঁশতে বমি করছিল স্নেহা। আচমকা পেছন থেকে কেউ তার চুলগুলো সরিয়ে ধরে, পিঠে হাত রেখে ধীরে ধীরে ঘষে দেয়। স্নেহা ভাবে, তিবাই বুঝি! ভালোই হয়েছে, চুলগুলো খুব ঝামেলা করছিল। মুখ ধুয়ে একটু ধাতস্থ হতে চায় সে। নিঃশ্বাস নিতে নিতে হঠাৎ-ই নাকে এসে ধাক্কা লাগে এক পরিচিত পুরুষালি পারফিউমের ঘ্রাণ। হালকা অথচ স্পষ্ট। সে অনুভব করে, পিঠে রাখা হাতটি অনেক বড়… অনেক শক্ত!
চকিতে মাথা তোলে সে। চমকে ওঠে। রণয়? চোখ ছানাবড়া হয়ে ছিটকে দূরে সরে যায় স্নেহা।
"ঠিক আছো? ডক্টর আনতে হবে?" রণয়ের কণ্ঠে উদ্বেগের ঝাঁজ, চোখে তীব্র দৃষ্টি, যা জানার আগ্রহে ভরা।
"আ… আপনি এখানে?"
"আমি যা বলেছি, তার উত্তর দাও আগে। ফিলিং বেটার নাও?"
"আই’ম… ফাইন।"
রণয়ের মন মানে না। সে উদ্বিগ্ন মুখে এগিয়ে এসে হাত রাখে স্নেহার কপালে।
"না, জ্বর নেই।"
সঙ্গে সঙ্গে বেলুনের মতো চুপসে যায় স্নেহা। তাকে আরও চুপসে দিয়ে হঠাৎ-ই রণয় করে বসে এক আকস্মিক কাণ্ড! স্নেহার দেহ নিথর হয়ে আসে। তার মাথা ঠেকেছে রণয়ের চওড়া বুকে। রণয়ের এক হাত তার মাথার পেছনে, অন্য হাত বুকের মাঝখানে চেপে ধরে রেখেছে স্নেহাকে। চোখ বন্ধ করে বুকের ভেতর ওকে চেপে ধরে রাখে কিছুক্ষণ। তপ্ত শ্বাস ফেলতে ফেলতে যেন নিজের সব অস্থিরতা ঝেড়ে দিচ্ছে রণয়।
অতঃপর নিঃসাড় স্বরে সে বলল, "তোতাপাখি… শুনতে পাচ্ছো ভেতরের অস্থিরতা?"
অসাড় স্নেহার ঠোঁট হালকা কাঁপে,"উমহু… অনুভব করছি।"
ওভাবে থেকেই মন্ত্রতাড়িতের ন্যায় উত্তর দেয় স্নেহা। রণয়ের ঠোঁটে তখন চওড়া হাসি। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই যেন বজ্রপাত!
"ভাইয়া!"
এক ঝাঁকায় স্নেহাকে দূরে ঠেলে দেয় রণয়। দেয়ালে গিয়ে লাগে স্নেহার কাঁধ। ফেক পেইনের ভঙ্গিতে মুখ কুঁচকে স্নেহা বলল,
"আহ! ভাইয়া, লাগল তো!"
রণয়ের চোখ জ্বলে ওঠে দগদগ ক্রোধে। সে আঙুল তুলে শাসিয়ে বলল,"আর একবার ভাইয়া বললে এবার সত্যি সত্যি লাগাব।"
স্নেহা শিশু অভিব্যক্তিতে ছোট ছোট চোখ করে জানতে চায়,"কী লাগাবেন, ভাইয়া?"
"স্ট্রেপলার, তোমার মুখে।"
বলে হনহনিয়ে বেরিয়ে যায় সে। স্নেহা মুখ চেপে হাসে।
রণয় হাঁটছে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে। এই মেয়ে শুরু করেছে কী? “ভাইয়া ভাইয়া” বলে মাথা খারাপ করে দিচ্ছে! এভাবে চললে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দুনিয়ায় আনবে কীভাবে?
হঠাৎ পেছন থেকে ছুটে এসে স্নেহা চেঁচিয়ে ওঠে,
"খুব বড় মনের মানুষ আপনি, তাজওয়ার সাহেব! বড় মনের না হলে কি আর পথশিশুদের পাশে দাঁড়ানো যায়?"
রণয় থেমে যায়। ঘুরে তাকায়। দু’জনের চোখাচোখি হয়। একটুও না থেমে, একটুও না দ্বিধা করে নিরেট ঠান্ডা গলায় সে বলে উঠল,
"কিন্তু তোমার জন্য শুধুই প্রেমিক পুরুষ।"
কামিজ খামচে ধরল স্নেহা। বুকের ভেতর উথালপাথাল ঢেউয়ের তাণ্ডব শুরু হয়। নীল আকাশে কালো মেঘেরা রাজত্ব ঘোষণা করেছে, ঘুরঘুর করে হুংকার ছাড়ছে। দমকা হাওয়ার ধাক্কায় এলোমেলো হয়ে যায় চুল, ওড়নাটাও সরে যায় বুক থেকে। নৈঃশব্দ্যে এগিয়ে আসে রণয়। স্নেহা একদৃষ্টিতে আছে থাকে তার দিকে। দূরত্ব কমায় রণয়। ধীর হাতে সরে যাওয়া ওড়নাটা ঠিকঠাক করে আগলে দেয় সে।এক নারীর গোপন সম্বল ঢেকে দেয় তারই চোখে চোখ রেখে।
মাথা নিচু করে নেয় স্নেহা। লজ্জায় স্তব্ধ সে। রণয় কণ্ঠ নামিয়ে খাদে এনে ধীর গলায় বলল,
"অস্থায়ী জীবনে দুঃখগুলোকে স্থায়ী করো না। সময় গেলে সব কেটে যায়। জীবন আমাদের হাতে নেই; আমরা কেবল গুটি, চলার গতি ঠিক করে সময়। খারাপ সময় আসে সময়ের মূল্য শিখিয়ে দিতে। নিজেকে গুটিয়ে রেখো না। জীবন সুন্দর, যদি জানো কীভাবে বাঁচতে হয়। অনেকে ভাঙতে চাইবে তোমায়, আঘাত করবে; কিন্তু তোমাকে শক্ত হতে হবে, সংগ্রামী হতে হবে। কারণ কেউ এসে তোমাকে তুলবে না, যা করার তোমারই করতে হবে। একবার গর্জে ওঠো। বিশ্বাস রাখো, শেষটা সুন্দরই হবে।"
থামে রণয়। কিছুটা দূরে সরে গিয়ে দু’হাত ছড়িয়ে ডাকে,
"প্রজাপতির মতো উড়িয়ে দিলাম তোমায়। যাও, তুমি মুক্ত। পাখির মতো উড়ে বেড়াও খোলা আকাশে। যদি কখনও গতি হারাও, আগলে ধরব আমি।"
স্নেহার চোখ গড়িয়ে টপটপ করে নেমে আসে অশ্রু। তার দৃষ্টি নিচে, বুক কাঁপছে। রণয় তাকে সময় দেয়। ভেতরের ঝড়কে ঝরতে দেয় নিঃশব্দে। বেশ কিছুক্ষণ পর চোখ তোলে স্নেহা।
"কিন্তু অতীত আমাদের ভালো থাকতে দেয় না যে।"
রণয় আবার এগিয়ে আসে। দুই হাতে তুলে ধরে স্নেহার মুখ। বুড়ো আঙুলে মুছে দেয় অশ্রু। চোখে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
"অতীত সংখ্যার মতো। গুনলে পাওয়া যায়, আর না গুনলে শূন্য। যা বর্তমানে নেই, তা ভেবে বা গুনে কী লাভ, সুইটহার্ট?"
বৃষ্টি পড়তে শুরু করে। প্রকৃতিও যেন সেই মুহূর্তে তাদের সায় দেয়। বৃষ্টির দিকে নির্দিষ্ট দৃষ্টি নিক্ষেপ করে স্নেহা। বেখেয়ালি গলায় আওড়ায়,
"বৃষ্টি বিরহকে দশ গুণ বাড়িয়ে দেয়।"
আকস্মিকভাবে রণয় স্নেহাকে কোমরে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। তার পেলব হাতে একটানে নিয়ে যায় রেলিংয়ের কাছে। ব্যাপারটা এত দ্রুত ঘটে যে স্নেহা কিছু বুঝে উঠতে পারে না। বৃষ্টির ধারা এসে পড়ে চোখে-মুখে। রেলিংয়ের বাইরে স্নেহার অর্ধেক শরীর ঝুলছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো সরাসরি পড়ছে তার মুখে। রণয় হালকা ঝুঁকে পড়ে স্নেহার ওপর। এবার আর চোখে বৃষ্টি পড়ে না। চোখ খুলে তাকাতেই স্নেহা দেখে, রণয় তার দিকে একগুঁয়ে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মাদকীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে সুরেলা সুরে সে আওড়ালো,
"তবে বৃষ্টির সাথে ঝরিয়ে দাও সকল বিরহ। মিশে যাক মাটির সাথে, কবর হোক সকল চাপা কষ্টের।"
বরফখণ্ডে পরিণত হয় স্নেহা। অনড়ভাবে ঝুঁকে থাকে রণয়। বৃষ্টি আর হাওয়ার সঙ্গমে, চোখে চোখে, এক যুগলের দৃষ্টির অভ্যন্তরে তৈরি হয় ঘোর। এতো ঘনিষ্ঠ অবস্থায় থাকায় পুরুষালী নিষিদ্ধ কামনা জেগে উঠলে সরে আসে রণয়। সোজা হয় স্নেহাও। একপলক স্নেহার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“আমি প্রেমিক হিসেবে জঘন্য হতে পারি, তবে হিসেবনিকেশে অনন্য। যখনই জীবনের সমীকরণ মেলাতে ব্যর্থ হবে, ছুটে এসো আমার কাছে। আমি আছি।"
চলে যায় রণয়। আর ফিরে তাকায় না, একবারও না। নীরব হাসে স্নেহা। তার প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে নিভু স্বরে আওড়ায়,
"প্রেমিক হিসেবে অনন্য আপনি, জনাব।"
________
"বিয়ান লিভ হার!"
শরীরের শেষ শক্তিটুকু একত্র করে গর্জে উঠল রণয়। তার কণ্ঠ পুরো পরিত্যক্ত ভবনটাকে কাঁপিয়ে তুলল। গলার শিরাগুলো টানটান হয়ে ফুলে উঠেছে, চোখদুটো দাউদাউ আগুনের মতো জ্বলছে। অথচ সেই আগুনও বিয়ানকে থামাতে পারল না।
বরং ঠোঁটের কোণে বিকৃত হাসি ফুটিয়ে সে ছু রি র ধার আরও গভীরভাবে চেপে ধরল স্নেহার গলায়। ধারালো ফলার নিচে ত্বক কেঁপে ওঠে। নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ল একফোঁটা র ক্ত।
স্নেহার চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে আসে। অসহায়, কাঁপা দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে থাকে রণয়ের দিকে। তার চোখে ভয় আছে, কিন্তু তার থেকেও বেশি আছে বিশ্বাস, রণয় তাকে বাঁচাবেই!
অন্যদিকে চারজন লোক মিলে পিলারের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে রেখেছে রণয়কে। কবজির দড়ি চামড়া কেটে র ক্ত বের করে এনেছে। কপাল বেয়ে টুপটুপ করে র ক্ত ঝরছে। বাঁধনের বিরুদ্ধে মরিয়া হয়ে ছটফট করতে করতে তার শিরা-উপশিরা ফুলে উঠেছে, অথচ একচুলও নড়তে পারছে না রণয়।
হঠাৎ বিয়ান ভুবন কাঁপিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকার ভবনের প্রতিটি দেয়ালে সেই হাসি প্রতিধ্বনিত হয়ে যেন মৃত্যুর ঘণ্টাধ্বনিতে পরিণত হলো। হাসতে হাসতে বিয়ানের চোখে পানি চলে এলো। সে আঙুলে একফোঁটা পানি নিয়ে মেখে ফুঁ দিয়ে ছিটিয়ে দিল স্নেহার মুখে। পানির ক্ষুদ্র কণাগুলো চোখে পড়তেই ঘৃণায় মুখ কুঁচকে ফেলল স্নেহা। দৃশ্যটা দেখে রণয়ের ভেতরের সব বাঁধ ভেঙে গেল। পশুর মতো গর্জে উঠল সে,
"স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম হার! স্নেহা... ডোন্ট প্যানিক। আমি আছি!"
মাত্র কয়েকটি শব্দ! এই কয়েকটি শব্দই স্নেহার ভেঙে পড়া সাহসটুকু আবার জোড়া লাগিয়ে দিল। পৃথিবী যদি তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েও যায়, এই একজন মানুষ এখনও হার মানেনি।
রণয়ের কপাল থেকে র ক্ত ঝরছে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। তবে তার চোখে ভয় নেই। আছে শুধু একটাই সংকল্প, স্নেহাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। বিয়ান ধীরে ধীরে আরও কাছে এগিয়ে এলো। আলতো করে স্নেহার এলোমেলো চুল কানের পেছনে সরিয়ে দিয়ে নির্লজ্জভাবে চুলে মুখ গুঁজে গভীর শ্বাস নিল। তার চোখে অসুস্থ লালসা। ঠোঁটে ফুটে উঠল কুটিল হাসি। রণয়ের দিকে তাকিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
"মানতেই হবে... তোর পছন্দ আছে। অলওয়েজ বেস্ট এন্ড ফার্স্ট ক্লাস।"
"ওকে ছেড়ে দে, বিয়ান... এখনই।"
বিয়ান ভান করা বিস্ময়ে ভ্রু তুলল,"ও কে? ওহ... ইউ মিন হার? স্নেহা?"
রণয়ের চোখে আগুন জ্বলে,"ডোন্ট কল হার নেম উইথ ইওর ডার্টি মাউথ!"
বিয়ান হেসে উঠল,"এভাবে বলিস না ভাই। ভাবি হয় আমার। আমরা তো...”
"বিয়ান... আই বেগ ইউ। স্নেহাকে যেতে দে। তোর যা করার আমার সঙ্গে কর। তোর শত্রু আমি।"
বিয়ানের ঠোঁটের হাসি আরও চওড়া হলো,"এত সহজে ছেড়ে দেওয়া যায়? কত কষ্ট করে খুঁজে বের করেছি তোর প্রাণভোমরা কে। একটু যত্ন তো নিতেই হয়।"
বলে আবার স্নেহার চুলে হাত বুলিয়ে দিল সে। এই দৃশ্য ছিল রণয়ের কাছে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর। সে সর্বশক্তি দিয়ে বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে। পিলার কেঁপে উঠল। দড়ি কটমট শব্দ করে টান খেল। বিয়ান একবার আঙুল তুলতেই একজন গার্ড লোহার রড নিয়ে এগিয়ে এল। রডের নির্মম আঘাত গিয়ে পড়ল রণয়ের হাঁটুতে। হাড়ভাঙা যন্ত্রণায় তার শরীর কেঁপে উঠল। হাঁটু ভেঙে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সে। তবু চোখ দুটো নিভল না। আগুনের মতো জ্বলতেই থাকল। দাঁতে দাঁত চেপে সে উচ্চারণ করল,
"ইফ ইউ টাচ হার আ সিঙ্গেল হেয়ার, আই উইল বার্ন ইওর হোল ওয়ার্ল্ড!"
এই প্রথম বিয়ানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। গলা শুকিয়ে এলো। সে খুব ভালো করেই জানে, রণয় যদি আজ বেঁচে যায়, যদি একবারও এই বাঁধন ছিঁড়ে বের হতে পারে, তাহলে পৃথিবীর কোনো প্রান্তই তাকে লুকিয়ে রাখতে পারবে না। কিন্তু ভয়কে গিলে ফেলল সে। ঠোঁট বাঁকিয়ে বিষাক্ত স্বরে বলল,
"সে গুডবাই টু ইওর লাভ।'
এক মুহূর্ত। শুধু এক মুহূর্ত। তারপর ছু রি টা সোজা চালিয়ে দিল স্নেহার গলায়। সময় থেমে গেল। শব্দ থেমে গেল। শ্বাস থেমে গেল। রণয়ের বুকের ভেতর পুরো পৃথিবী একসঙ্গে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। পরিত্যক্ত ভবনের প্রতিটি দেয়াল কাঁপিয়ে তার আর্তচিৎকার ছড়িয়ে পড়ল,
"নাআআআআআআআআআ!"
~চলবে.....
[পরবর্তী পর্ব আসবে ৮০০ রিয়েক্ট সম্পূর্ণ হলে।]