ফন্ট সাইজ:
থিম:
কে বাঁশি বাজায় রে

পর্ব 14

লেখক: মিথুবুড়ি

#কে_বাঁশি_বাজায়_রে
#মিথুবুড়ি
#পর্ব_১৪

নিহালের চোখ এই বুঝি কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসবে।এখনও সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। বারবার দু’হাতে চোখ কচলাচ্ছে, মাথা নাড়ছে। তবুও না, দৃশ্যটা মিথ্যে হচ্ছে না। কিন্তু এটা কেমন করে সম্ভব? সাপে-নেউলে একসঙ্গে হাসছে!

আদিল আর স্নেহা হাসিমুখে গল্প করছে! আর তাদের পাশে গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তিবা। তার মুখে বজ্রপাত নামানোর মতো জমকালো অভিব্যক্তি। নিহাল যেন চব্বিশ ভোল্টের শর্টসার্কিট খেয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে। তাকে বিস্ময়ের চূড়ান্ত তুফান তুলে আদিল করে বসল আরও এক অবাক করা কাণ্ড। একগুচ্ছ কদম ফুল পাড়তে সে সটান গাছে উঠে পড়ল! শুধু ওঠেই নি, সোজা ডালপালার শেষপ্রান্তে গিয়ে সবচেয়ে বড় ফুলগুলো বেছে তুলল সে। এরপর স্নেহার বাড়িয়ে দেওয়া হাতের মুঠোয় ফুলগুলো গুঁজে দিতেই খুশিতে একপাক খেয়ে লাফিয়ে উঠল মেয়েটা।

নিহাল এখনও ঠিকমতো দম নিতে পারছে না। সকালবেলা এতগুলো ধাক্কা একটা শরীর একা কীভাবে সামলাবে? কাঁধে কারও চেনা স্পর্শে চমকে উঠল সে। পেছনে ঘুরতেই দেখল, রণয় ভ্রু কুঁচকে শান্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। নিহাল দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হতভম্বের মতো আওড়ালো,

"ভাই, এটা কীভাবে সম্ভব?"

রণয় কপাল ভাঁজ করে জিজ্ঞেস করল,"কী?"

"এক বনে দুই বাঘ! আর তারা এমন গলায় গলায় ভাব করছে?"

মানে বুঝে না রণয়। নিহাল তখন রোবটের মতো হাত তুলে ইশারা করে ওদিকটা দেখাল। রণয় আর সাজন একসাথে সেদিকে তাকিয়ে দেখল আদিল গাছ থেকে নামছে। একগুচ্ছ তাজা কদম ফুল স্নেহার হাতে তুলে দিচ্ছে, আর মেয়েটা খুশিতে ডানা ছাড়া যেন দুলছে। সাজনের চোখদুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। কিন্তু রণয়ের মুখভঙ্গি একদম স্বাভাবিক। একগাল মুচকি হাসি দিয়ে সে অন্যদিকে ঘুরে হাঁটা শুরু করল। নিহাল আর সাজনও তার পিছু পিছু হাঁটতে লাগল। এখনও তাদের মাথায় পুরো বিষয়টি ঠিকমতো ঢুকছে না।

আসলে রণয় আগেই জানত এমন কিছু একটা হবেই। কারণ বাইরে থেকে মুখচোটা আর তেড়ে আসা মানুষগুলো ভেতরটাতে সবচেয়ে কোমল হয়। তাদের মধ্যে কোনো অহংকার থাকে না, থাকে কেবল একটুখানি দুর্ভাগ্য আর জমাট বাঁধা কিছু ভুল বোঝাবুঝি। আদিল আর স্নেহা দু’জনেও ঠিক এমন প্রকৃতিরই। তাদের মান ভাঙানোর জন্য বড় বড় কোনো কনফেশনের প্রয়োজন হয় না। একটা মিষ্টি হাসি আর ছোট্ট একটুকরো সরি তাতেই সব বরফ গলে জল হয়ে যায়।

______

নিশ্ছিদ্র ভালো-মন্দের মিশেলে গড়ে ওঠে এক-একটি জীবনসংগ্রাম। এক ফোঁটা ভালোবাসার দিন পেতে কখনো কখনো পার হতে হয় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ঝাঁঝালো নদী। আবার কখন যে জীবন মানুষকে কোনো মোড় এনে দাঁড় করায়, তারও তো কোনো পূর্বাভাস থাকে না। রবের বাণীই একমাত্র আশ্রয়। এইরকমই কিছু অনিশ্চিত দিনের মধ্যে ঘটে হঠাৎ ঘটে যায় একটি ঘটনা। সময় আপাতদৃষ্টিতে অনুকূল হলেও অশান্ত ও বিবর্ণ হয়ে আছে দুই প্রান্তের দুটি হৃদয়—রণয় ও স্নেহা।

বাধ্য হয়ে, না বলা অভিমানে, একদিন হঠাৎ-ই স্নেহা করে বসে এমন এক কাজ, যার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল নিঃসন্দেহে সঙ্গদোষে। বন্ধুদের উস্কানিতে একদিন স্নেহা চুপি চুপি চলে যায় স্টেডিয়ামে লাইভ খেলা দেখতে। যা ছিল স্নেহর সম্পূর্ণ অজানা। স্নেহার জীবনে তার বড় ভাইই ছিল একমাত্র আস্থার জায়গা, একমাত্র শক্তি। মুখের কথা না বললেও, চোখের ভাষায় সে স্নেহার মনের সবটুকু পড়ে নিতে পারত। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বের ভারে চাপা পড়ে যায় তাদের অনেক না বলা চাওয়া। স্নেহা তাই নিজের ইচ্ছেগুলো আড়ালে রাখতে শিখেছে, আর তাতে বিশ্বস্ত সাথী হয়ে পাশে থেকেছে তিবা।

স্টেডিয়ামে সেদিন স্নেহা সবার সঙ্গে মেতে উঠেছিল আনন্দের জোয়ারে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে হঠাৎ স্টেডিয়ামের ক্যামেরা ঘুরে যায় তার দিকে। জায়ান্ট স্ক্রিনজুড়ে ভেসে ওঠে তার ুকটি শিশুসুলভ কিউট অভিব্যক্তি। ঘামে ভেজা কপালে লেপ্টে থাকা বেবি হেয়ার, লজ্জায় লাল হয়ে ওঠা মুখ আর পাউট করে থাকা ঠোঁট—সব মিলিয়ে তাকে জীবন্ত পুতুল বলে মনে হচ্ছিল। সেই ছোট্ট মুহূর্তটি ক্যামেরা বন্দি হয়ে রেকর্ড হয়ে যায়।

ঝড় তোলে সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়ায়। “কিউটনেস ওভারলোডেড”, “স্টেডিয়ামের পুতুল”, “ড্রিম গার্ল”—এইরকম নানা শিরোনামের বন্যায় প্লাবিত হয় অনলাইন জগৎ। কেউ ভিডিওতে রোমান্টিক গান জুড়ে এডিট করে, কেউ আবার স্ক্রিনশট নিয়ে ছড়িয়ে দেয় নানা চটুল ক্যাপশনে।

কিন্তু এই সাময়িক আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। রণয় যখন এই খবর পায়, মুহূর্তের মধ্যে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সহায়তায় ইন্টারনেট থেকে সমস্ত ক্লিপ সরিয়ে ফেলে। যাদের হাত ছিল এই ঘটনার পেছনে, তাদের প্রত্যেককে দেওয়া হয় বিশেষ আপ্যায়ন। বিশেষভাবে স্টেডিয়ামের ক্যামেরাম্যানকে।

কিন্তু এতেও শেষরক্ষা হয় না। সীমানা পেরিয়ে সীমান্ত তাফসিরের অফিসেও পৌঁছে যায় সেই ভিডিওর রেশ। সহকর্মীদের সস্তা ঠাট্টা আর প্রিন্সিপালের কটু মন্তব্য সব মিলিয়ে উনার মনে জ্বলে ওঠে অপমানের আগুন। কেউ কেউ বাহবা বা প্রশংসা করলেও, সেই বিদ্রুপগুলোর বিষাক্ত বাণ গেঁথে বসে হৃদয়ে। যার ফলস্বরূপ তিনি বন্ধ করে দেয় স্নেহার কলেজে যাওয়া।

অন্যদিকে, এই ঘটনায় পুড়ে খাক হতে থাকে রণয়। ছটফটানিতে তার রাত কেটে যায়, দিন কেটে যায় অস্থিরতায়। প্রথম ক’দিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেও এখন তার আচরণ হয়ে উঠেছে অত্যন্ত বিস্ময়কর ও রূঢ়। হঠাৎ হঠাৎ সে জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলে, মানুষের ওপর রাগ ঝাড়ে, নিজের ভেতরের পুঞ্জীভূত যন্ত্রণা প্রকাশ পায় তার আগুনের হলকায়। দু’দিন ধরে বাসায় ফেরে না রণয়। মা-বাবার কোনো ফোনেরই উত্তর সে দেয় না। মিসেস রুকাইয়ার দুশ্চিন্তায় রক্তচাপ বেড়ে গেছে বিপজ্জনকভাবে, আর মি. রেদোয়ান ছেলের চিন্তায় গোপনে লোক লাগিয়েছেন তার ওপর নজর রাখতে। বন্ধুরা খবর নিতে গেলেও রণয় খেপে যায়। সবাইকে দূরে ঠেলে দেয়। ভেতরে ভেতরে তখন সবকিছু পুড়ছে।

হনহনিয়ে ক্লাবঘরে প্রবেশ করে রণয়। তার জুতোর ভারী শব্দে গুটিয়ে বসে সকলে। ভয়ে সবার রণয়ের চোখ এড়িয়ে যাওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা। কে জানে, আজ কার ভাগ্যে জুটবে রণয়ের রোষানল! কিন্তু আজকের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ আলাদা। আজ সে অদ্ভুতভাবে নির্বিকার। নেই কোনো চিৎকার, নেই কোনো ভাঙচুরের উন্মত্ততা। ক্লান্ত শরীরটা কেবল এলিয়ে দেয় কাউচের ওপর। গলায় একরাশ চাপা কষ্ট আর ভার নিয়ে জিজ্ঞেস করে,

"কোনো খোঁজ পেয়েছিস?"

মাথা নিচু করে সাজন বলল,"না ভাই... আজও কলেজে আসেনি।"

রণয় ধীরে ধীরে চোখ বুজে। বুক চিরে বেরিয়ে আসে ফাঁপা নিঃশ্বাস৷ হঠাৎ করেই গমগমে গম্ভীর কণ্ঠস্বর ডেকে ওঠে রণয়,"আদিল।"

ভয়ে ভয়ে এগিয়ে আসে আদিল,"জ্বী ভাই।"

"ওর সাথে যে সবসময় থাকত, মেয়েটার নাম কী যেন?"

"তিবা, ভাই।"

"নিয়ে আয়।"

________

"সিঙ্গেল কা বাঞ্জা রানি…"

পিছন ফিরে আদিলের দিকে একপলক কটমট করে তাকায় তিবা, তারপর মুখ ফিরিয়ে দ্রুত পা চালায়। এমনিতেই মনটা তার ভারাক্রান্ত, তার ওপর এদের এই উপহাস সেই বোঝা আরও ভারী করে তোলে। প্রতিদিন কারো না কারো মুখে স্নেহার নাম ভেসে ওঠে, আর প্রতিবারই তিবার বুকটা একটু একটু করে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সেদিন সে যদি জোর না করত... তবে হয়তো এমন মর্মান্তিক পরিণতি হতো না! আদিলকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে চলে যাচ্ছিল সে, এমন সময় দৌড়ে এসে তার সামনে পথ আটকে দাঁড়ায় আদিল। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না তিবা। তীব্র ক্ষোভ ঝাঁঝিয়ে উঠল,

"আপনার কি আর কোনো কাজ নেই? এখানে আবার ফ্লার্ট করতে এসেছেন বুঝি?"

ভেংচি কেটে চটকদার ভঙ্গিতে আদিল জবাব দেয়,"নাটক কম করো, পিও! তুমি এতটাও সুন্দরী নও যে তোমার জন্য লাইন দেবো। চলো, ভাই ডাকছেন।"

নামটা শোনামাত্রই শুকনো ঢোক গিলে তিবা। বুকের ভেতরটা অজানা ভয়ে থরথর করে কেঁপে ওঠে। সেদিন টিএসসির ঘটনার পর থেকে রণয়ের ছায়া দেখলেও তার সারা শরীর ভয়ে শিউরে ওঠে। অজানা আশঙ্কায় বুক বেঁধে মিইয়ে মিইয়ে আদিলের পেছনে হাঁটতে শুরু করে সে। আজ তার কপালে কী লেখা আছে তা কেবল উপরওয়ালাই জানেন!

_______

"ভাই, নিয়ে এসেছি।"

ঘাড় কাত করে তাকায় রণয়। আদিলের পেছনে কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়ে আছে তিবা। রণয় উঠতেই আদিল সরে দাঁড়ায়। রণয় এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় তিবার একেবারে মুখোমুখি। তিবার মাথা নুয়ে থাকে নিচের দিকে, চোখ তুলে তাকানোর সাহসও হয় না তার। কোনো ভণিতা না করে রণয়ের কণ্ঠে সোজাসাপটা প্রশ্ন,

"স্নেহা কোথায়?"

"ও আসেনি ভাইয়া… বাসায় নেই।" নিভু নিভু কণ্ঠে জবাব দেয় তিবা।

"সেটা আমিও জানি। কোথায় আছে?"

"স্নেহ ভাই গ্রামে নিয়ে গেছে।"

"কেন?"

"আঙ্কেল ভার্সিটিতে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। তাও একদিন স্নেহ ভাই নিয়ে এসেছিল... তখন রাস্তায় ওকে দেখে অনেকে মজা করছিল...

লাইন সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই রণয়ের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। বজ্রের ন্যায় মুষ্টিবদ্ধ হয়ে ওঠে বলশালী দু-হাত। তিবার কথা শেষ না হতেই সে চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞেস করল,"ওর সাথে কে আছে এখন?"

"ওরা সবাই গ্রামে।"

"কল কর।"

রণয়ের কণ্ঠের তীব্রতা ক্রমশ বাড়ে। ঘাবড়ে যেতে থাকে তিবা। সে শুষ্ক ঢোক গিলে বলল,

"স্নেহার ফোন বন্ধ, ভাইয়া।"

"জানি।"

চমকে ওঠে তিবা। রণয় কঠিন স্বরে প্রশ্ন করে,"স্নেহার বাবার নাম্বার নেই?"

"না, ভাইয়ার আছে।"

"কল কর ওর ভাইকে। এখনই। আমি ওর গলা শুনতে চাই।"

রণয়ের কণ্ঠে স্পষ্ট উত্তেজনা টের পায় তিবা। বুকের ভেতরটা ছটফট করে ওঠে তৃষার্ত পুরুষটার, চোখ দুটো যেন চাতক পাখির মতো প্রতীক্ষায় থাকে এক নজর সাক্ষাতে। তিবার মনে জন্ম নেয় আরও একরাশ প্রশ্ন। স্নেহার প্রতি রণয়ের এই অস্থিরতা—কী মানে দাঁড়ায় এ সবকিছুর? আর দেরি করে না তিবা। কল দেয় স্নেহ ভাইয়ের নম্বরে।

তিনবার রিং হতেই ফোন রিসিভ করে স্নেহ। রণয়ের ইশারায় তিবা ফোনটি স্পিকারে দেয়।

"হ্যাঁ তিবা, বল।"

"স্নেহার ফোন বন্ধ কেন, স্নেহ ভাই?"

"স্নেহু পাগলামি করছে। ওকে একটু বোঝা, বোন।"

‘বোন’ শব্দটা কানে আসতেই তিবার মুখটা তেতো হয়ে ওঠে। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলল,"ওর কাছে ফোনটা দাও।"

"দরজা খুলছে না কাল থেকে। জ্বর বাঁধিয়ে বসে আছে। না খাচ্ছে খাবার, না ঔষধ নিচ্ছে। দরজা খুলতে গেলে ধাক্কা দিয়ে আটকে দিচ্ছে। আমি ফোনটা নিচ দিয়ে দিয়ে দিচ্ছি, তুই কথা বল।"

দরজার নিচ দিয়ে ফোনটি ঠেলে দেয় স্নেহ। তিবার গলা শোনা মাত্রই ওপাশ থেকে ফোনটা টেনে নেয় স্নেহা।

"স্নেহা!"

"আম্মু আমাকে নিয়ে গেল না কেন, তিবা? আমি মরে গেলেই ভালো হতো…

ফোন পাওয়া মাত্রই ভাঙা গলায় কান্নায় ফেটে পড়ে স্নেহা। স্নেহার এই কান্নাভেজা কণ্ঠে রণয়ের বুকের ভেতরে মোচড় দিয়ে ওঠে। কোনো অদৃশ্য হাত যেন হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে তার বুকের পাঁজরে। চোখে-মুখে থমথমে যন্ত্রণা জমে ওঠে। তিবাও অস্থির হয়ে পড়ে, কাঁপা গলায় বলল,

"স্নেহা, কী হয়েছে? কান্না করছিস কেন? বল আমাকে…"

স্নেহার কণ্ঠ তখন কান্নার ধারায় গলে গলে ঝরছে,

"আমি আর থাকতে পারছি না এখানে… দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার। আমাকে এখান থেকে নিয়ে যা তিবা, প্লিজ। আব্বু… আব্বু আমাকে এত ঘৃণা কেন করেন? আমি খু নি নই! আমি মা রিনি আম্মুকে! কেন ভালোবাসেন না তিনি? আমি তো তাঁরই মেয়ে… একটা স্পর্শও দেন না, একটুও আদর করে না… যেন আমি কেউ নই! এই খু নির তকমা গায়ে মেখে আমি তিলে তিলে পুড়ে যাচ্ছি। ওনার চোখের এই ঘৃণা আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আমিও তো চেয়েছিলাম বাবার কোলে মাথা রাখতে, একমুঠো ভালোবাসা পেতে, আবদার করে কিছু চাইতে… একটু আদর, একটু যত্ন। আম্মুকে হারানোর কষ্ট কি আমার হয় না? আমি কি পাথর? আমিও তো মায়ের বুকে মাথা রেখে গল্প শুনতে চেয়েছিলাম… কিন্তু আমি তো কাউকেই পেলাম না—না মা, না বাবা! আব্বু কেন বোঝেন না? আমি তাঁকে খুব খুব ভালোবাসি অথচ, তিনি শুধু আমাকে দূরে সরিয়ে রাখেন। আল্লাহ কেন আম্মুর বদলে আমাকে নিয়ে যাননি? তাহলে আব্বু হয়তো খুশি থাকতেন। ভাইয়াকেও হয়তো এই বোঝা বইতে হতো না… একটা পরিপূর্ণ পরিবার পেত… আর আমি, আমি দূর আকাশের তারা হয়ে শুধু তাকিয়ে দেখতাম… ওদের হাসিমুখগুলো…"

স্নেহার গলা ধরে আসে। একের পর এক হেঁচকি উঠতে থাকে তার। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে বোনের এই কান্না আর সহ্য করতে পারে না স্নেহ। সে চিৎকার করে ওঠে,

"স্নেহু সোনা! একদম কান্না করবি না। ভাইয়ার বুক ফেটে যাচ্ছে তোর কান্নায়। দরজা খোল, বাবু। প্লিজ, দরজা খোল! কাঁদিস না… তোর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাবে… আমি আছি না তোর তোর জন্য? কাউকে লাগবে না! দরজা খোল প্লিজ, সোনা!"

কিন্তু দরজা খোলে না স্নেহা। স্নেহ দৌড়ে যায় ডুপ্লিকেট চাবি আনতে। সীমান্ত তাফসির তখন এককোণে দাঁড়িয়ে আছেন একদম নিথর, যেন তিনি কোনো জড়বস্তু। মুখে কোনো অনুভূতি নেই৷ ভেতরে ঝড়ের সৃষ্টি হলেও বাইরে তার লেশমাত্র নেই।

স্নেহার গলা কাঁপছে। তার কণ্ঠে কোনো সাধারণ দুঃখ নেই, আছে বুকফাটা হাহাকার,"আব্বু আমাকে জন্মের সময় মে রে ফেললেন না কেন? কেন বাঁচিয়ে রাখলেল? আমি হাঁপিয়ে উঠেছি এই জীবনটা নিয়ে। একটু ভালোবাসা চেয়েছিলাম, একটু ছায়া… এতটুকু চাওয়া কি খুব বেশি ছিল, তিবা? আমার ম রে যাওয়া উচিত ছিল… সবাই ভালো থাকত। আম্মু থাকতেন, আব্বুও খুশি থাকতেন।

আমি খু নি! আম্মুকে আমিই মেরে ফেলেছি, না? সবাই তো তাই ভাবে। আম্মু তো আমায় ভালোবাসতেন, তাই নিজের জীবনটা বাজি রেখেছিলেন আমার জন্য। তাহলে আব্বু আমায় আম্মুর অংশ ভেবেও একটু ভালোবাসতে পারলেন না? কেন পারলেন না? আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে, তিবা। আমার কিছুই নেই… বাবা থেকেও আমার কেউ নেই… জন্মের পরেই মাকে খেয়ে ফেলেছি! খু নি আমি। ভাইয়াব্বু যদি না থাকত, তাহলে আমি হয়তো আজ কোনো অনাথ আশ্রমে পচে মরতাম।

জানিস তিবা? আজ প্রথম আব্বু আমাকে ছুঁলেন। কিন্তু সে ছোঁয়ায় ছিল না কোনো ভালোবাসা, ছিল রক্তিম লাঞ্ছনা। আমার গালে তাঁর চার আঙুলের ছাপ… আমার খুব লেগেছে। কিন্তু আমি খুশি…! অন্তত একবার তো ছুঁলেন। মারুক… আরও মারুক। তাও কাছে থাকুক… এভাবে দূরে না সর.....

এই পর্যন্ত বলে কান্নায় ভেঙে পড়ে স্নেহা। ততক্ষণে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ে স্নেহ। ঝড়ের বেগে ছুটে এসে দুই হাতে আঁকড়ে ধরে বোনকে। জাপটে ধরে গালজুড়ে একের পর এক চুমু খেতে থাকে সে। বুঝতে আর বাকি থাকে না যে, বোনের এই জ্বর এবং ঘরবন্দি হয়ে থাকার পেছনে আসল কারণ কী। স্নেহার গালে তখনো চার আঙুলের দাগ স্পষ্ট। স্নেহের নির্মল চোখ মুহূর্তেই জলে ভরে ওঠে এবং পরক্ষণেই সেই চোখ দুটোতে জ্বলে ওঠে আগুনের শিখা। বোনকে ছাড়িয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায় সে। কণ্ঠে ঝরে পড়ে তীব্র ক্ষোভ, উগ্রভাবে চেঁচাতে থাকে সে,

"সীমান্ত তাফসির!! সীমান্ত তাফসির!"

নীরবতা ভেঙে যায়। আজন্ম শান্ত, ভদ্র ও বিনয়ী ছেলেটি আজ ধৈর্যের সব সীমা পার করে ফেলে। বাবার নাম ধরে ডাকতে থাকে, বারবার। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা সীমান্ত তাফসির সামনে এসে দাঁড়াতেই গর্জে ওঠে স্নেহ,

"আপনার সাহস হয় কী করে আমার বোনের গায়ে হাত তোলার?"

"স্নেহ, ভদ্রভাবে কথা বল।"

"আপনি আমার ভদ্রতার সীমা কবেই ছাড়িয়ে গেছেন, মিস্টার সীমান্ত তাফসির। কোন সাহসে আমার বোনের গায়ে আপনি হাত তুলেছেন? যে বোনের গায়ে আমি একটা ফুলের টোকাও পড়তে দিইনি কখনও! কে আপনি এই অধিকার ফলানোর?"

সীমান্ত তাফসির গম্ভীর গলায় বললেন,"স্নেহা আমার মেয়ে, ভুলে যেও না।"

"বাবা হিসেবে সেই দায়িত্ব কখনও পালন করেছেন আপনি?"

সীমান্ত তাফসিরের মাথা নিচু হয়ে যায়। স্নেহ একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে এগিয়ে আসে এক ধাপ। তার গলার স্বর তখন তীরের মতো ধারালো,

"কী হলো? চুপ করে গেলেন কেন? উত্তর নেই? থাক, উত্তরটা আমিই দিচ্ছি—স্নেহা আপনার মেয়ে নয়। স্নেহা শুধু আমার বোন, শুধুই আমার! যখন সবাই ওকে অপয়া, খু নি বলে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল, তখন কোথায় ছিলেন আপনি আর আপনার এত অধিকার ? আমি বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলাম ওকে… আমি, স্নেহ তাফসির! কোনোদিন তো দেখতেও আসেননি, একটা আট বছরের ছেলে কীভাবে দুধের শিশুকে সামলেছে। আমার বোন কাঁদত… ‘বাবা, বাবা’ বলে কোল চাইত। তখন আপনি তাকে ধমক দিতেন! একসময় ভয়ে ওর মুখ দিয়ে ‘বাবা’ ডাকটাই বন্ধ হয়ে গেল। স্কুলে অন্য বাচ্চাদের বাবারা যখন আদর করত, আমার বোন তখন তাকিয়ে থাকত, তারপর মুখ ঘুরিয়ে কেঁদে ফেলত। আমি দু’হাতে আগলে রাখলেও মা-বাবার অভাব তো কখনোই পূরণ করতে পারিনি! আমার হাসিখুশি বোনটা ধীরে ধীরে চুপ হয়ে গেল, নিজের ভেতরেই গুমরে মরতে থাকল। আপনি আর আপনার আত্মীয়স্বজন মিলে তাকে খু নির তকমা দিয়েছেন। অলক্ষীর গালি দিয়েছেন। এসবের জন্য আপনি একা দায়ী। আজই ঢাকা চলে যাচ্ছি আমরা। এখন থেকে স্নেহা নিজের মতো করে বাঁচবে, যেভাবে সে বাঁচতে চায়। সেই স্বাধীনতা আমিই দেব। দেখি কে আটকায়!”

এক নিঃশ্বাসে সব বলে হাঁপাতে থাকে স্নেহ। রাগে থরথর করে কাঁপছে তার শরীর। সীমান্ত তাফসির তখনো নিশ্চুপ। তার মুখে বিন্দুমাত্র অনুশোচনার রেশ মাত্র নেই। কেবল একবার চোখ তুলে স্নেহার দিকে তাকিয়ে শুধু ঠান্ডা স্বরে বললেন,

"তোমার বোনের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তাকে ইনহেলার দাও।"

তারপর আর একটি কথাও না বলে সেখান থেকে চলে যান তিনি। স্নেহ দৌড়ে যায় বোনের কাছে। অন্যপাশে ফোন কেটে দেয় তিবা। ইতোমধ্যে স্নেহার কান্নায় তিবার নিজের গলাটাও ভিজে উঠেছে, হেঁচকি উঠে গেছে তার। চোখের কোণে জল শুধু তিবারই নয়। স্নেহার হাহাকার আদিলের চোখও ভিজিয়ে দিয়েছে। চঞ্চল, প্রাণোচ্ছল মানুষের ভেতরেও যে এমন চাপা ব্যথা লুকানো থাকতে পারে, তা কেউ কখনো ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। সবাই ভাবে যারা হাসে, তারা বুঝি ভালো থাকে! কিন্তু না… আমাদের সবার ভেতরেই এমন কিছু ক্ষত লুকিয়ে থাকে, যা কাউকে বলা যায় না, আবার যা কোনোদিন সারেও না। আমাদের কেবল শিখে নিতে হয় কীভাবে তা সবার আড়ালে লুকিয়ে রাখতে হয়।

স্নেহার এই কষ্টের জন্য আজ সবাই কাঁদছে। সবাই… শুধু কাঁদছে রণয়। সে সম্পূর্ণ নির্বাক। তার মুখে কোনো শব্দ নেই, কেবল ভারী নিঃশ্বাসের মাঝে হাত বাড়িয়ে তিবার দিকে টিস্যু এগিয়ে দেয় সে।

তিবা চোখ মুছে কাঁপা গলায় বলল, "ধন্যবাদ।"

"কাল সকালে ওকে বাসা থেকে নিয়ে আসবে।"

তিবা চমকে উঠে চোখ তুলে তাকায়। তার মুখে তখন বিস্ময়ের ছায়া রেখা। সে কিছু একটা বলতে যাওয়ার আগেই রণয় ঠান্ডা ও দৃঢ় কণ্ঠে বলে ওঠে,

"লোকের কথা ভাবতে হবে না। পুরো দুনিয়া সামলে নেব আমি। যাও।"

তিবা আর কথা বাড়ায় না শুধু মাথা নাড়িয়ে সেখান থেকে চলে যায়। কিন্তু তার মনজুড়ে বারবার বাজতে থাকে রণয়ের বলা বাক্যটি—"পুরো দুনিয়া সামলে নেব আমি।"চোখ বন্ধ করে মনের গভীর থেকে সে প্রার্থনা করে, স্নেহা যেন ফিরে পায় নিরঙ্কুশ ভালোবাসা ও সুখ, যা তার জন্ম থেকেই প্রাপ্য ছিল।

_______

তখন রাতের তৃতীয় প্রহর। স্নেহ সবেমাত্র বোনের পাশ থেকে সরে গেছে। যাওয়ার সময় ভুলবশত ফোনটা স্নেহার পাশেই ফেলে যায় সে। এতক্ষণ স্নেহা ভাইয়ের বুকে মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল। কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লে স্নেহ বোনকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে চলে যায়। সে বাসের টিকিট কেটে ফেলেছে। সকালেই রওনা দেবে। সকাল হতে আর কতক্ষণ? মাত্র এক-দু’ঘণ্টা বাকি!

হঠাৎ স্নেহর ফোনটি বেজে ওঠে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটি অচেনা নম্বর। ফোনের রিংটোনের শব্দে স্নেহার ঘুম ভেঙে যায়। সে চোখ বন্ধ রেখেই ফোনটি রিসিভ করে কানে ধরে। ঘুমজড়িত কণ্ঠে "হ্যালো" বলতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে পুরুষালী কণ্ঠস্বর,

"থ্যাঙ্ক গড, ফোনটা তোমার কাছেই ছিল!"

শোয়া থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল স্নেহা। চোখের পাতা থেকে ঘুমের রেশ নিমেষেই কর্পূরের মতো উবে গেল। ভাইয়ের নম্বর এই মানুষটা কোথায় পেল, এত রাতে সে কেনই বা ফোন করল এসব প্রশ্ন করার বিন্দুমাত্র আগ্রহও জাগল না তরুণীর মনে। কেবল ওই পুরুষটির চেনা কণ্ঠস্বরই তার ক্লান্ত শরীরকে বসন্তের শিশিরভেজা হাওয়ায় শিহরিত করে তুলল।

"বারান্দায় এসো, রাইট নাও।"

স্নেহা এবারও কোনো প্রশ্ন করল না। সে ছুটে গেল বারান্দার দিকে। রাতের শীতল বাতাসে তার গা থেকে ঝরে পড়া ওড়নাটি আঁধার আকাশের বুকে যেন তুলোর মতো উড়ে গেল।

ঢাকা থেকে নরসিংদীর দূরত্ব খুব বেশি নয়। কিন্তু এই গভীর রাতে ১,১৪০.৭৬ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্য থেকে স্নেহাকে খুঁজে বের করা ছিল ভীষণ জটিল। তবে সদ্য প্রেমে উন্মত্ত এক পুরুষের কাছে সেই জটিলতা টিকল না বেশিক্ষণ। শেষ পর্যন্ত সে ঠিকই স্নেহাকে খুঁজে বের করল। চিরায়ত ধৈর্যের জন্য প্রশংসিত মানুষটা আজ সকাল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার ধৈর্যটুকুও পেল না! তার চাতক পাখির মতো মনটা এমন অস্থিরতায় ভুগেছিল যে, সব শঙ্কা ও শত্রুর পরোয়া না করে সে একাই এত দূরে, এত রাতে ছুটে এসেছে।

বাঁশির মৃদু শব্দে স্নেহা বারান্দায় গিয়ে দেখতে পেল, নিচে দাঁড়িয়ে আছে রণয়। সে একটি কালো রঙের বাইকে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ঠোঁট গোল করে বাঁশির সুরে মৃদু শিষ বাজাচ্ছে। সুরে সুরে নিজের প্রেয়সীকে যেন আহ্বান জানাচ্ছে সে। রণয়ের এক কানে ফোন গোঁজা, ঘাড়টা একটু উঁচুতে বারান্দার দিকে তাক করা। স্নেহা বারান্দায় ছুটে আসতেই দুটি তৃষিত দৃষ্টি এসে আটকে গেল একবিন্দুতে। দুজনেরই চেহারায় ক্লান্তির ছাপ, বিধ্বস্ততার ছাপ। রণয়ের পরনে সেই স্বভাবসুলভ পোশাক! দু’দিন আগের গ্রে শর্টসের ওপর একটি ব্লু টি-শার্ট। পরিপাটি চুলগুলো আজ ভীষণ উসকোখুসকো। ফোন ধরা হাতের গোড়ালিটা থেঁতলে গেছে। রণয়ের এই বিধ্বস্ত রূপ দেখে স্নেহার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। মুখে কেউ কিছু না বললেও একে অপরের মনের না বলা কথা যেন দুজনেই পড়ে ফেলল অনায়াসে।

স্নেহা ঠোঁট কামড়ে কান্না চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল,"কেন এসেছেন?"

স্নেহার অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে রণয় হাসল। এই মুহূর্তে নিজের বুকের ভেতর প্রশান্তির যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তা গভীরভাবে অনুভব করতে করতে সে মৃদুস্বরে আওড়াল

"আজ যদি না আসতাম, তবে তোমার গায়ে লাল শাড়ি জড়ানোর আগে হয়তো সাদা জড়াতে হতো। বুঝলে,তোতাপাখি?"

~চলবে.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 14 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন