ফন্ট সাইজ:
থিম:
তাকদীরের খাতা

পর্ব 1

লেখক: Jannatul Naima

তাকদীরের খাতা

লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা

পর্ব১- দাদুর রেখে যাওয়া খাতা

____

দাদুর মৃত্যুর আজ চল্লিশ দিন।

ফাইজাহ আলম গভীর রাতে জায়নামাজে বসে ছিল। ঘরে শুধু টেবিল ল্যাম্পের হলুদ আলো, জানালার বাইরে ঝিঁঝি পোকার একটানা ডাক। তসবিহর দানাগুলো আঙুলের ফাঁকে ঘুরছে, কিন্তু তার মন পড়ে আছে চল্লিশ দিন আগের সেই ভোরে।

ডা. কামরুল আলম, ফাইজাহর দাদু, মারা গিয়েছিলেন ফজরের একটু আগে। শেষ কয়েকদিন তিনি প্রায় কিছুই বলতেন না। শুধু নাতনির হাতটা ধরে রাখতেন, আর তাঁর ঠোঁট নিঃশব্দে নড়ত। শেষ রাতে হঠাৎ চোখ খুলে বললেন, “দিদিভাই, ওজু করে আয়। আমার পাশে একটু বস।” ফাইজাহ ওজু করে ফিরে এসে দেখল, দাদু আর নেই। তাঁর ডান হাতের তর্জনী তখনো সামান্য উঁচু হয়ে আছে, যেন শেষ মুহূর্তেও তিনি সাক্ষ্য দিচ্ছেন, আল্লাহ এক।

সেদিন সে কাঁদেনি। জানাজায় এসেছিল হাজার মানুষ, রিকশাওয়ালা থেকে হাইকোর্টের বিচারক। সবাই বলেছিল, “এত ভালো মানুষ আজকাল হয় না।” ফাইজাহ শুধু মাথা নেড়েছে, আর ভেতরে ভেতরে কেমন যেন পাথর হয়ে গেছে। কাঁদতে চেয়েছিল, পারেনি। যেন কান্নার চাবিটাও দাদু সঙ্গে নিয়ে চলে গেছেন। গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম সে ভেঙে পড়ল, দাদুর ইজি চেয়ারটা খালি পড়ে আছে দেখে। ওই চেয়ারে বসে তিনি প্রতিদিন আসরের পর বলতেন, “দিদিভাই, চা বানা। আর বল, আজ আল্লাহর কাছে কী চেয়েছিস?” আজ আর কেউ জিজ্ঞেস করবে না।

সাত বছর বয়সে এক বর্ষার রাতে ফাইজাহর মা-বাবা গাড়ি দুর্ঘটনায় চলে যান। সেই রাতে দাদু তাকে বুকে জড়িয়ে সারা রাত বসে ছিলেন। ভোরে নরম গলায় বলেছিলেন, “দিদিভাই, আল্লাহ যাদের ভালোবাসেন, তাদের একটু আগেই কাছে ডেকে নেন। তোর মা-বাবা এখন এমন জায়গায়, যেখানে আর কোনো কষ্ট নেই। আর তুই? তুই আমার কাছে আল্লাহর আমানত।”

সেদিন থেকে দাদুই তার সব হয়ে গেলেন। ফজরে ঘুম ভাঙিয়ে ওজু করাতেন, হাত ধরে সূরা ফাতিহা শেখাতেন। বলতেন, “দুঃখে আল্লাহকে ডাকিস। ওঁর দরজা থেকে কেউ কখনো খালি হাতে ফেরে না। মানুষের কাছে চাইলে সে বিরক্ত হয়, আল্লাহর কাছে না চাইলে তিনি রাগ করেন।” ছোট্ট ফাইজাহ একবার জিজ্ঞেস করেছিল, “দাদু, তুমি কখনো ভয় পাও না?” দাদু হেসেছিলেন। “পাই রে। কিন্তু ভয়ের পাশে বিশ্বাস রাখলে ভয় ছোট হয়ে যায়। মুমিন আগে ভরসা করে, তারপর চেষ্টা করে, তারপর ফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেয়।” সেই কথাগুলো আজ রাতে তার বুকের ভেতর হু হু করে বাজছে।

আজ সে আর বাঁধ দিয়ে রাখল না। সিজদায় মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল, “ইয়া আল্লাহ, আমি জানি আপনি আমার চেয়েও আমার দাদুকে বেশি ভালোবাসেন। তাই তো তাঁকে নিজের কাছে ডেকে নিয়েছেন। আমি আপত্তি করছি না, ইয়া রব। শুধু আমার বুকটা এত খালি লাগছে।” চোখের পানি জায়নামাজ ভিজিয়ে দিচ্ছিল। “আপনি তাঁর কবরকে প্রশস্ত করে দিন। সেখানে জান্নাতের একটা জানালা খুলে দিন, যেন ঠান্ডা বাতাস আসে। তিনি যতবার আমার জন্য দোয়া করেছেন, তার প্রতিটা অক্ষরের বদলে তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। আর আমাকে সবর দিন, ইয়া আল্লাহ। আমি একা হয়ে গেছি। আপনি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। আপনি আমাকে একা ফেলে দেবেন না।”

তারপর কাঁপা গলায় সেই আয়াত পড়ল, যা দাদু প্রায়ই পড়তেন: “রব্বি ইন্নি লিমা আনজালতা ইলাইয়্যা মিন খাইরিন ফাকির।”

" হে আমার রব, আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণই নাজিল করুন, আমি তার মুখাপেক্ষী।"

অনেকক্ষণ পর যখন মাথা তুলল, মনে হলো বুকের ওপর থেকে একটা পাথর একটু সরেছে। ঠিক তখন, কেন জানি না, তার মনে পড়ল দাদুর খাটের নিচে একটা পুরোনো সিন্দুক আছে।

পরদিন সকালে সে দাদুর ঘর গোছাতে বসল। রহিমা খালা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আঁচলে চোখ মুছছিলেন। চল্লিশ বছর ধরে তিনি এ বাড়িতে আছেন। “আপা, কর্তার জিনিসে হাত দিতে আমার বুক কাঁপে,” তিনি বললেন। “আপনি দেখেন। আমি বরং চা নিয়ে আসি।”

খাটের নিচে সত্যিই একটা কাঠের সিন্দুক, পিতলের তালা ঝুলছে। ফাইজাহ কখনো ওটা খুলতে দেখেনি। হঠাৎ মনে পড়ল, দাদুর তসবিহর শেষ দানার সঙ্গে ছোট একটা চাবি বাঁধা ছিল। সে ভেবেছিল ওটা কোনো শখের জিনিস। চাবি ঘুরতেই তালা খুলে গেল।

ভেতরে নেপথলিনের গন্ধ। কয়েকটা সাদা পাঞ্জাবি, আতরের একটা খালি শিশি, আর একটা বাদামি হয়ে যাওয়া ছবি: কম বয়সী দাদু, আর তাঁর পাশে সাদা পোশাকে দাড়িওয়ালা এক যুবক, দুজনের কাঁধে হাত। ছবির পেছনে লেখা: *“আমি আর আবদুল্লাহ, ১৯৭৪।”* আর সবার নিচে একটা কালো চামড়ার খাতা। মলাটে সোনালি কালিতে দাদুর হাতের লেখা:

"তাকদীরের খাতা"!

ফাইজাহর হাত অবশ হয়ে এল। তাকদীর। যে শব্দের অর্থ সে বই পড়ে শিখেছে, আজ প্রথম তার ভার টের পেল।

প্রথম পাতায় দাদুর পরিচিত হাতের লেখা: *“আল্লাহর খাতায় কী আছে, তা কেউ জানে না। এ খাতায় আমি শুধু আমার চোখে দেখা চিহ্নগুলো লিখে রাখি। ভুল হলে ক্ষমা চাই, ঠিক হলে শুকরিয়া জানাই। এ খাতা যেন কখনো কাউকে অহংকারী না করে।”*

কাঁপা আঙুলে সে পাতা ওল্টাতে লাগল। প্রতিটা পাতায় তারিখ, একটা নাম, একটা লাইন। *“আজ বিকেলে প্রবল ঝড় আসবে, নৌকা ঘাটে বেঁধে রেখো।” “মজিদের স্ত্রীর কোলে ছেলে আসবে, আল্লাহ সহজ করুন।” “বদরুল সাহেবকে আর বেশি দিন ধরে রাখা যাবে না, তাঁকে কালেমা স্মরণ করিয়ে দিয়ো।”* প্রতিটার পাশে ছোট একটা টিক চিহ্ন। মিলে গেছে, মিলে গেছে, মিলে গেছে।

শেষ দিকের একটা পাতায় এসে সে থমকে গেল। শেষ এন্ট্রির তারিখ আজকের তারিখ। *“আজ বিকেলে বৃষ্টি নামবে। রহিম মাঝির ছেলে জ্বরে পড়বে। ফাইজাহ, ভয় পেয়ো না।”* ভয় পেয়ো না। দাদু কি জানতেন, সে এ লাইন পড়বে? জানালার বাইরে তখন নীল আকাশ। এক টুকরো মেঘও নেই।

আসরের নামাজ শেষে সে সালাম ফেরাতেই জানালায় টুপটাপ শব্দ। প্রথমে আস্তে, তারপর ঝমঝম। ফাইজাহ স্থির হয়ে বসে রইল, হাতের তালু বরফের মতো ঠান্ডা। রহিমা খালা হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকলেন। “আপা! রহিম মাঝি এসেছে। তার ছেলের বিকেল থেকে জ্বর, একশো তিন! বলছে, কর্তা বেঁচে থাকলে ঠিক ওষুধ দিতেন।”

ফাইজাহ আর দেরি করল না। দাদুর পুরোনো প্রেসক্রিপশন আর ফার্স্ট এইডের বাক্স নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে ছুটল। ছোট্ট শিশুটির কপালে ভেজা কাপড় দিল, ওষুধ খাওয়াল, আর বারবার ফিসফিস করে বলল, “ইয়া শাফি, ইয়া আল্লাহ, আপনি ছাড়া শিফা দেওয়ার কেউ নেই। এই নিষ্পাপ শিশুটাকে সুস্থ করে দিন।” রাত বাড়তে বাড়তে জ্বর নামল। ছেলেটির মা কাঁদতে কাঁদতে তার হাত জড়িয়ে ধরলেন, “মা, আল্লাহ আপনাকে দুনিয়া-আখিরাতে সুখী রাখুন।” ফাইজাহ কিছু বলতে পারল না। তার মাথায় শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছিল: দাদু কীভাবে জানতেন?

ঘরে ফিরে সে বহুক্ষণ ওজু করল। পানির ঠান্ডা স্রোত যেন মাথা পরিষ্কার করে দিল। হঠাৎ মনে পড়ল একটা হাদিস: যে গণকের কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করে, চল্লিশ রাত তার নামাজ কবুল হয় না। চল্লিশ। আজ দাদুর চল্লিশা, আর ঠিক আজই এই খাতা। বুকের ভেতর কেউ যেন চেপে ধরল। “ইয়া আল্লাহ, আমি কি শিরকের কাছাকাছি গেলাম? আমি তো কারও কাছে যাইনি, কিছু জিজ্ঞেসও করিনি। এ খাতা তো আমার দাদুর। আপনি আমার নিয়ত জানেন। আমাকে ক্ষমা করুন, আর সত্যটা দেখিয়ে দিন। গায়েবের জ্ঞান শুধু আপনার, এতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।”

সে মনকে বোঝাল, দাদু নিজেই লিখেছেন, এ খাতা শুধু চোখে দেখা চিহ্ন। দাদু ছিলেন আলেম, ডাক্তার, মুত্তাকি। তিনি কখনো গায়েব দাবি করবেন না। তাহলে এ চিহ্নগুলো কীসের? উত্তর পেতে হলে খাতার শেষটা পড়তে হবে। অথচ শেষ পাতায় যেতেই তার বুক কাঁপছিল, যেন সেখানে অমোঘ কিছু অপেক্ষা করছে।

কাঁপা হাতে সে একেবারে শেষ পাতাটা খুলল। প্রায় ফাঁকা। মাঝখানে দুটো লাইন, কালি অন্যগুলোর চেয়ে ফিকে, আঁকাবাঁকা, যেন দাদু মৃত্যুর খুব কাছে বসে লিখেছেন:

*“তাহসিনুল আবির। বয়স আটাশ। রমজানের শেষ দশকে তার খাতা বন্ধ হবে।”*

*“আল্লাহ তাকে সবরের সঙ্গে নিন। আর ফাইজাহকে সবর দিন।”*

ফাইজাহর চোখে অন্ধকার নেমে এল। দাদু তার নামও লিখে গেছেন, একজন অচেনা ছেলের নামের ঠিক নিচে। সে ধীরে ধীরে সিজদায় লুটিয়ে পড়ল। বুকের ভেতর থেকে কান্না ঠেলে উঠল, এমন কান্না যা দাদুর মৃত্যুর দিনেও আসেনি।

“ইয়া আল্লাহ, এ কী পরীক্ষা আমার ওপর? যে ছেলেকে আমি চিনি না, তার জন্য আমার বুক কেন কাঁপছে? ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অটল রাখুন। যদি এটা আপনার ফয়সালা হয়, আমাকে সহ্য করার শক্তি দিন। আর যদি পরিবর্তনের কোনো পথ থাকে, ইয়া রব, সেই পথ আমাকে দেখান। আপনি তো বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেব। আমি ডাকছি, ইয়া আল্লাহ। আমি অসহায় হয়ে ডাকছি।”

বাইরে বৃষ্টি থামেনি। আর শহরের অন্য প্রান্তে, তখন আটাশ বছরের এক যুবক বুকে হাত চেপে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। রাত গভীর, চোখে ঘুম নেই। সে জানত না, একজন মৃত মানুষের খাতায় তার নাম লেখা আছে। সে শুধু জানত, প্রতিটা ভোরে সে এক ধাপ করে নিঃশব্দে মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছে।

আর জানালার ওপারে আসমানে তখন একটা তারা খসে পড়ল।

চলবে...

প্রিয় পাঠক আসসালামু আলাইকুম গল্পটি ভালো লাগলে কমেন্ট করে জানিও!!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন