ফন্ট সাইজ:
থিম:
তাকদীরের খাতা

পর্ব 2

লেখক: Jannatul Naima

তাকদীরের খাতা

লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা

পর্ব-২ যে নামটি সে খুঁজছিল

_____

ফজরের আজানের আগেই ফাইজাহ উঠে পড়ল। সারা রাত সে ঘুমায়নি। সিজদায় কাঁদতে কাঁদতে কখন চোখ লেগে গিয়েছিল, আবার কখন ভেঙেছে, নিজেই জানে না।

জানালার পর্দা সরাতেই দেখল বৃষ্টি থেমে গেছে, আকাশ ধোয়া নীল, আর বাগানের জবা গাছটা ভেজা পাতায় ঝিলমিল করছে। পৃথিবী কত স্বাভাবিক। অথচ তার টেবিলে একটা খাতা, যাতে একজন মানুষের নাম আর একটা ভয়ংকর ইঙ্গিত লেখা।

সে ওজু করে তাহাজ্জুদে দাঁড়াল। সালাম ফিরিয়ে হাত তুলল আসমানের দিকে। “ইয়া আল্লাহ, আমি জানি না এই খাতা কীসের চিহ্ন। আমি শুধু জানি, গায়েবের খবর আপনি ছাড়া কেউ রাখে না। আপনিই তো আমাদের নবীর মুখ দিয়ে জানিয়েছেন, দোয়া ছাড়া আর কিছুই তাকদীর বদলায় না। তাই আমি আপনার কাছে চাইছি, ইয়া রব। যে ছেলের নাম আমি পড়েছি, তাকে সুস্থ রাখুন। আমি তাকে চিনি না, কিন্তু আপনি তাকে চেনেন। তার বুকের ভেতর যদি কোনো কষ্ট থেকে থাকে, আপনি তাকে শিফা দিন। আর যদি আমার দাদুর অনুমান ভুল হয়ে থাকে, তাহলে আমার দোয়ার বরকতে সেই ভুল সত্যি করে দিন।”

ফজরের নামাজের পর সে সিন্দুক থেকে সেই বাদামি ছবিটা আবার বের করল। কম বয়সী দাদু আর পাশে দাড়িওয়ালা সেই যুবক, আবদুল্লাহ। ছবির পেছনের লেখাটা ফাইজাহ বারবার পড়ল।

শহরের পুরোনো মহল্লার মসজিদের ইমাম হাফেজ আবদুল্লাহ সাহেবকে সে ছোটবেলা থেকে চেনে। দাদুর সঙ্গে প্রতি শুক্রবার তিনি আসতেন, চোখে মোটা চশমা, মুখে সবসময় কোমল হাসি।

তাহলে এই আবদুল্লাহই কি সেই?

আর তাহলে তাহসিনুল আবির কে?

রহিমা খালা জোর করে দুটো পরোটা আর ডিম খাইয়ে দিলেন, তারপর রিকশা ডেকে আনলেন। “আপা, দোয়া পড়ে বের হন। কেমন যেন লাগছে আপনাকে, মুখটা শুকনো।” ফাইজাহ মলিন হেসে বলল, “খালা, আমার জন্য দোয়া করবেন।” রিকশা চলতে চলতে সে মনে মনে আয়াতুল কুরসি পড়ল, আর খাতাটা কাপড়ে মুড়ে বুকের কাছে চেপে রাখল, যেন ওটা জীবন্ত কিছু।

মসজিদের পাশের ছোট ঘরটায় হাফেজ সাহেব তখন কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন। ফাইজাহকে দেখে মোটা চশমার ভেতর দিয়ে তাকালেন, তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। “মা, এত সকালে! কামরুলের জন্য মন খারাপ করছে বুঝি?” সে কিছু না বলে ছবিটা বাড়িয়ে দিল।

হাফেজ সাহেব ছবিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাঁর কাঁপা আঙুল ছবির ওপর বুলাতে লাগল, তারপর হঠাৎ ঠোঁট কেঁপে উঠল। “কামরুল... আমার ভাই,” তিনি ফিসফিস করে বললেন। “আল্লাহ তোমাকে জান্নাতের সবচেয়ে সুন্দর বাগানে রাখুন।” তাঁর চশমার কাচ ভিজে উঠল।

অনেকক্ষণ পর তিনি সামলে নিয়ে বললেন, “একসঙ্গে একই মসজিদে নামাজ পড়তাম। সে ডাক্তারি পড়ত, আমি হাদিস। দুজনেই ভাবতাম, একজন শরীর সারাবে, আরেকজন আত্মা। এখন সে চলে গেল, আমি একা পড়ে রইলাম।”

ফাইজাহর গলা ধরে এল। সে ধীরে ধীরে মোড়ানো কাপড়টা খুলে খাতাটা টেবিলে রাখল। হাফেজ সাহেব সোনালি অক্ষরের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বললেন না। শুধু চোখ বন্ধ করে বললেন, “ইন্না লিল্লাহ।”

“আপনি জানতেন?” ফাইজাহ জিজ্ঞেস করল।

“খাতার কথা জানতাম। তার ভেতরে কী আছে, জানি না।” তিনি একটু থেমে বললেন, “মরার কয়েকদিন আগে কামরুল এসেছিল। আমার হাত ধরে বলেছিল, ‘আবদুল্লাহ, একদিন আমার নাতনি তোমার দরজায় আসবে। তখন তাকে বাধা দিয়ো না।’ আমি ভেবেছিলাম, মরণাপন্ন মানুষের আবোল-তাবোল কথা।”

ফাইজাহর বুকের ভেতর ধক করে উঠল। “চাচা, তাহসিনুল আবির কে?”

হাফেজ সাহেবের মুখ থেকে রক্ত সরে গেল। তিনি ধীরে ধীরে চশমা খুলে চোখ মুছলেন। “আমার ছেলে,” তিনি বললেন।

“আমার একমাত্র ছেলে। শহরের দারুল ইলম লাইব্রেরিতে কাজ করে। আলাদা থাকে, আমার সঙ্গে কথা কম বলে।”

তাঁর গলা নেমে এল, যেন কথাগুলো পাথরের মতো ভারী। “আমার বড় ভাইকে হারিয়েছি আটাশ বছর বয়সে। হঠাৎ বুক চেপে ধরে পড়ে গিয়েছিল। আর ওঠেনি। সেই থেকে আমার ঘুম হয় না, মা। আবিরের বয়সও আজ আটাশ।”

ফাইজাহর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল। সে ঢোক গিলে বলল, “তিনি কি অসুস্থ?”

“আমাকে কিছু বলে না,” হাফেজ সাহেব মাথা নাড়লেন। “একবার তার ঘরে গিয়ে বিছানার পাশে ওষুধের খালি পাতা দেখেছি। জিজ্ঞেস করলে হেসে বলে, ‘বাবা, সামান্য গ্যাস্ট্রিক।’ কিন্তু বাবার চোখ ফাঁকি দেওয়া যায় না, মা। আমি দেখি, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে সে থেমে থেমে ওঠে। আমি দেখি, তার ঠোঁটের রং কেমন নীলচে হয়ে যায়।”

ফাইজাহর জিভে যেন পাথর বেঁধে গেল। খাতার শেষ পাতাটা সে বলতে পারল না। কোনো বাবাকে ছেলের মৃত্যুর তারিখের কথা বলার অধিকার তার নেই। আর সে তো নিশ্চিতও নয়। দাদু যা-ই লিখে থাকুন, আসল ফয়সালা আল্লাহর হাতে। সে শুধু মাথা নিচু করে বসে রইল।

হাফেজ সাহেব হঠাৎ দুই হাত তুলে বললেন, “মা, আমার সঙ্গে একটু দোয়া করবে?”

মসজিদের নীরব কোণে, ফজরের আলো তখন জানালা দিয়ে ঢুকছে, বৃদ্ধ ইমামের কাঁপা কণ্ঠে দোয়া উঠল: “ইয়া আল্লাহ, আমি ত্রিশ বছর ধরে প্রতি রাতে একটা দোয়াই করে আসছি। আপনি আমার আবিরকে আমার আগে নেবেন না। আমি বুড়ো হয়েছি, আমার পিঠ বেঁকে গেছে, আমি আর কাউকে কবরে শুইয়ে দেওয়ার শক্তি রাখি না। তবু যদি আপনার ফয়সালা অন্য হয়, তাহলে আমাকে সবর দিন, ইয়া রব। আমি যেন আপনার ওপর অভিযোগ না করি। আমি যেন বলতে পারি, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।” ফাইজাহর “আমীন” বলার গলা ভেঙে গেল। দুজনের চোখের পানি একই সঙ্গে ঝরছিল, অথচ দুজনেই অন্যজনের কান্নার আসল কারণটা জানে না।

বিদায়ের সময় হাফেজ সাহেব তার মাথায় হাত রেখে বললেন, “মা, তুমি যদি আবিরের সঙ্গে দেখা করো, একটা কথা বোলো। বোলো, তার বাবা প্রতি রাতে তার জন্য সিজদায় কাঁদে। আর বোলো, বাবার কাছে ছেলের সবচেয়ে বড় অসুখ হলো দূরত্ব।”

পরদিন দুপুরে ফাইজাহ দারুল ইলম লাইব্রেরির কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। পুরোনো কাগজ আর চন্দনকাঠের মিষ্টি গন্ধ। উঁচু উঁচু তাকের সারি, মাঝে মাঝে ছোট ছোট পাঠকক্ষ। প্রথমে কাউকে দেখল না, তারপর সবচেয়ে ভেতরের তাকের দিকে নজর পড়ল। সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় কালো টুপি, লম্বা, পাতলা, ফ্যাকাশে একজন যুবক সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে একটা বই তাকে তুলে রাখছে। তার চলাফেরায় একটা অদ্ভুত সতর্কতা, যেন প্রতিটা পদক্ষেপ সে গুনে গুনে ফেলছে।

ফাইজাহ একটা তাকের আড়ালে থেমে গেল। হঠাৎ দেখল যুবকটি সিঁড়ির মাঝখানে থমকে গেছে। এক হাত দিয়ে সে তাকের কোনা শক্ত করে ধরল, অন্য হাতটা বুকের ওপর। তার মুখের রেখাগুলো ধীরে ধীরে কুঁচকে এল, কপালে ঘাম ফুটল, ঠোঁট নীল হয়ে উঠল। ফাইজাহর দম বন্ধ হয়ে এল। সে ছুটে যেতে চাইল, কিন্তু পা যেন মাটিতে গেঁথে গেছে।

যুবকটি আস্তে আস্তে সিঁড়ি থেকে নামল, পকেট থেকে ছোট একটা সাদা বড়ি বের করে জিহ্বার নিচে রাখল, তারপর চোখ বন্ধ করে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঠোঁট নড়ছে নিঃশব্দে। ফাইজাহ বুঝল, সে যিকির করছে। কয়েক মুহূর্ত পর তার নিঃশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এল, মুখে রং ফিরল। ফাইজাহর নিজের চোখ ভিজে উঠল। সে মনে মনে বলল, “ইয়া শাফি, ইয়া আল্লাহ, আপনি ওকে শক্তি দিন।”

যুবকটি চোখ খুলতেই ফাইজাহকে দেখতে পেল। এক মুহূর্তের জন্য তার চোখে চমক খেলে গেল, তারপর সে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। “আসসালামু আলাইকুম। কোনো বই খুঁজছেন?”

ফাইজাহ গলা পরিষ্কার করে বলল, “ওয়ালাইকুমুস সালাম। আপনি কি তাহসিনুল আবির?”

“জি। আমিই।”

“আমি ফাইজাহ আলম। ডা. কামরুল আলমের নাতনি।”

নামটা শুনেই আবিরের মুখের ওপর দিয়ে একটা ছায়া সরে গেল। সে কিছু বলার আগেই ফাইজাহর হাতের কাপড়ে মোড়ানো জিনিসটার কোনা থেকে সোনালি একটা অক্ষর ঝিলিক দিল। আবিরের চোখ সেদিকে আটকে গেল। তার ঠোঁট কেঁপে উঠল, আর মুখ থেকে প্রায় অস্ফুট একটা শব্দ বেরিয়ে এল।

“তাহলে আপনি জেনে গেছেন।”

ফাইজাহ বুঝতে পারল না, সে কোন কথার কথা বলছে। খাতার, নাকি তার অসুখের?

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 2 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন