ফন্ট সাইজ:
থিম:
তাকদীরের খাতা

পর্ব 3

লেখক: Jannatul Naima

তাকদীরের খাতা

জান্নাতুল নাঈমা

পর্ব ৩ আবিরের গোপন কথা

____

লাইব্রেরির ভেতরটা হঠাৎ অস্বাভাবিক নীরব হয়ে গেল। দূরে কোথাও একটা বইয়ের পাতা উল্টানোর শব্দ, দেয়ালঘড়ির টিকটিক, আর দুজনের মাঝখানে না-বলা প্রশ্নগুলো।

আবির চোখ নামিয়ে নিল। “এখানে নয়,” সে নিচু গলায় বলল। “পেছনের পাঠকক্ষে চলুন। আমি দরজা খোলা রাখব, সেটাই ঠিক।” ফাইজাহ মাথা নেড়ে সায় দিল। সে লক্ষ করল, আবির তার দিকে একবারও সরাসরি তাকাচ্ছে না। দৃষ্টি নত, পদক্ষেপ সংযত, যেন প্রতিটা কথা বলার আগে সে নিজের ভেতরে একবার ওজন করে নিচ্ছে।

ছোট ঘরটার জানালা দিয়ে লাইব্রেরির বাগান দেখা যায়। টেবিলের এক পাশে ফাইজাহ বসল, অন্য পাশে আবির, মাঝখানে একটা দূরত্ব। ফাইজাহ কাপড়ের মোড়ক খুলে কালো চামড়ার খাতাটা টেবিলের মাঝখানে রাখল। আবির সোনালি অক্ষরগুলোর দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে রইল, তারপর ধীরে ধীরে বলল, “এই খাতার কথা আমি শুনেছি। কিন্তু চোখে দেখিনি।”

“কার কাছে শুনেছেন?”

“আপনার দাদুর কাছে।”

ফাইজাহ চমকে উঠল। আবির জানালার দিকে তাকিয়ে বলে চলল, “দুই বছর আগে একরাতে আমার বুকে এমন ব্যথা উঠল যে মনে হলো কেউ পাঁজর চেপে ধরেছে। বাবাকে কিছু না বলে চুপিচুপি ডা. কামরুল আলমের চেম্বারে গিয়েছিলাম। বাবার বন্ধু, তাই ভরসা করেছিলাম। উনি পরীক্ষা করলেন, রিপোর্ট দেখলেন, অনেকক্ষণ কিছু বললেন না। তারপর আমার হাত ধরে বললেন, ‘আবির, তোমার হার্ট ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এটা বংশগত। তোমার চাচার ঠিক এই রোগেই চলে গিয়েছিলেন।’”

ফাইজাহর বুক ধক করে উঠল। সে শুধু চোখ তুলে তাকাল।

“আমি বলেছিলাম, বাবাকে যেন না জানান। উনি রাজি হয়েছিলেন। শর্ত দিয়েছিলেন, নিয়মিত চেকআপে আসতে হবে, আর প্রতি ফজরের পর একটা দোয়া পড়তে হবে।” আবিরের ঠোঁটে একটা ক্ষীণ হাসি ফুটল। “বলতেন, ‘ওষুধ আমি দেব, বাবা। কিন্তু শিফা দেবেন আল্লাহ। আমাদের কাজ শুধু চেষ্টা করা।’ শেষবার যখন গিয়েছিলাম, ওনার হাতটা কাঁপছিল। বললেন, ‘আমার নাতনি একদিন তোমার কাছে আসবে। ভয় পেয়ো না।’”

ভয় পেয়ো না। খাতার সেই একই কথা। ফাইজাহর চোখ ভিজে উঠল।

“আমি তখন বুঝিনি,” আবির বলল। “ভেবেছিলাম অসুস্থ মানুষের আবোল-তাবোল। তারপর উনি চলে গেলেন।” তার গলা একটু ভাঙল। “জানাজায় গিয়েছিলাম। সবার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার ডাক্তার, আমার একমাত্র সাক্ষী, আমার রোগের একমাত্র রাজদার চলে গেলেন। সেদিন প্রথম আমি বুঝলাম, আমি একা।”

ফাইজাহ গলা পরিষ্কার করে খুব আস্তে বলল, “আপনি একা নন।” আবির ম্লান হাসল। “সবাই এ কথাই বলে। কিন্তু রাতে যখন বুক ধড়ফড় করে, তখন ঘরে তো কেউ থাকে না।”

কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না। জানালার বাইরে একটা চড়ুই ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। তারপর ফাইজাহ সাহস করে প্রশ্নটা করল, “আপনার ডাক্তার কি বলেছিলেন, কতদিন...?”

“মাসগুলো গোনা,” আবির শান্ত গলায় বলল, যেন অন্য কারও কথা বলছে। “বলেছিলেন, হয়তো আগামী রমজান পর্যন্ত। তারপর নিজেই বললেন, ‘কিন্তু ডাক্তারের গোনা আর আল্লাহর গোনা এক নয়। আমি অনেক রোগীকে দেখেছি, যাদের আমি বলেছিলাম তিন মাস, তারা তিন বছর বেঁচেছে। আবার অনেককে বলেছিলাম তিন বছর, তারা তিন মাসে চলে গেছে।’”

ফাইজাহ কাঁপা হাতে খাতার শেষ পাতাটা খুলে সামনে ধরল। “এখানে আপনার নাম লেখা আছে।”

আবির ঝুঁকে পড়ল। কাঁপা অক্ষরে লেখা সেই দুটো লাইন সে পড়ল। বহুক্ষণ। তারপর সোজা হয়ে বসে চোখ বন্ধ করল। ফাইজাহ দেখল, তার ঠোঁট নড়ছে। ইন্না লিল্লাহ, না অন্য কিছু, বোঝা গেল না।

“আমি দুঃখিত,” ফাইজাহ প্রায় ফিসফিস করে বলল। “আমি জানি না এটা বলা ঠিক হলো কি না। কিন্তু আপনার নাম যখন পড়লাম, আমি আর চুপ থাকতে পারিনি।”

আবির চোখ খুলল। তার চোখে কোনো ভয় ছিল না, শুধু এক অদ্ভুত স্থিরতা। “আপনি দুঃখিত হবেন না। আমি বরং কৃতজ্ঞ। কারণ প্রথমবারের মতো কেউ আমাকে সোজাসুজি বলল।” সে একটু থেমে বলল, “তবে একটা কথা বলি। এই খাতা যা-ই লিখুক, কেউ আমার মৃত্যুর তারিখ জানে না। জানে শুধু আল্লাহ। আপনার দাদু এ কথা জানতেন, তাই প্রথম পাতায় লিখে রেখেছেন, ‘ভুল হলে ক্ষমা চাই।’”

ফাইজাহ অবাক হয়ে তাকাল। “আপনি পড়ার আগেই বুঝে গেলেন?”

“আমি রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে একটা দোয়া করি,” আবির বলল। “ইয়া আল্লাহ, আজ যদি আমার জন্য মৃত্যুই কল্যাণকর হয়, তাহলে আমাকে সহজ মৃত্যু দিন, কালেমাসহ। আর যদি জীবন কল্যাণকর হয়, তাহলে আমাকে সুস্থ করুন এবং আমার সব অসমাপ্ত কাজ পূর্ণ করার সুযোগ দিন। এই দোয়া করতে করতে আমি বুঝেছি, মৃত্যুর তারিখ নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভয় পাওয়ার আছে শুধু আল্লাহর কাছে খালি হাতে যাওয়া।”

ফাইজাহর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ল। সে চট করে ওড়নার কোনা দিয়ে মুছল। “আর আপনার বাবা?” সে ধরা গলায় জিজ্ঞেস করল। “আপনি কেন তাঁকে বলেননি?”

আবিরের মুখের শান্ত ভাবটা এই প্রথম টলে উঠল। “কারণ আমি বাবার চোখে সেই ভয়টা দেখতে চাই না, যা আমি রোজ ভোরবেলা আয়নায় নিজের চোখে দেখি।” তার কণ্ঠ কাঁপছিল। “আমার বাবা আমার চাচাকে হারিয়েছেন। তিনি সারা জীবন এক ভয়ে কাটিয়েছেন, ছেলেটাকে যেন কখনো কিছু না হয়। আমি তাঁর শেষ বয়সের এই শান্তিটুকু কেড়ে নিতে পারি না।”

ফাইজাহ এবার নিজেকে আর সামলাতে পারল না। “আপনার বাবা আমাকে আজ সকালে একটা কথা বলতে বলেছেন,” সে ভাঙা গলায় বলল। “বলেছেন, আপনি যেন জানেন, আপনার বাবা প্রতি রাতে সিজদায় আপনার জন্য কাঁদে। আর বলেছেন, বাবার কাছে ছেলের সবচেয়ে বড় অসুখ হলো দূরত্ব।”

আবিরের মুখ থেকে হাসিটা পুরোপুরি মুছে গেল। সে ধীরে ধীরে দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেলল। কোনো শব্দ হলো না, শুধু তার কাঁধ দুটো কাঁপতে লাগল। একজন আটাশ বছরের পুরুষ, যে এতদিন সবার সামনে মজবুত হয়ে দাঁড়িয়েছে, আজ লাইব্রেরির এক নির্জন কোণে ছোট্ট শিশুর মতো কাঁদছে।

ফাইজাহ মাথা নিচু করে রইল। সে জানত, এ কান্নায় কারও সান্ত্বনা চলে না। শুধু নীরবে দোয়া করা যায়। সে মনে মনে বলল, “ইয়া আল্লাহ, ওর হৃদয়ে প্রশান্তি দিন। ওর বাবার দোয়া কবুল করুন।”

অনেকক্ষণ পর আবির মুখ তুলে চোখ মুছল। “আপনি কেন এসেছেন, ফাইজাহ আলম?” তার গলা এখন কঠিন, যেন নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। “আমার প্রতি দয়া দেখাতে? আমি কারও দয়া নিতে পারি না। আমি চাই না কেউ আমাকে কফিনের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে হাত ধরুক। দয়া মানুষকে ছোট করে দেয়।”

ফাইজাহ সোজা তার চোখের দিকে তাকাল, এই প্রথম। “আমি দয়া করছি না। আমি আমার দাদুর আমানত পালন করছি। তিনি আমাকে বলেছিলেন, আল্লাহর আমানত যত্নে রাখতে। আমি জানি না আপনার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কী। আমি শুধু জানি, খাতা আমাকে এখানে পাঠিয়েছে, আর আমি আল্লাহর কাছে চেয়েছি যেন আমি ঠিক পথে থাকি।”

আবির কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। “আজ আপনি আসুন। দয়া করে।” তার কণ্ঠে অনুরোধ, আদেশ নয়। “আমাকে একটু ভাবতে সময় দিন।”

ফাইজাহ খাতাটা আবার কাপড়ে মুড়ে উঠে দাঁড়াল। দরজার কাছে পৌঁছে সে থেমে গেল। পেছন থেকে আবিরের কণ্ঠ শোনা গেল, “দাঁড়ান।”

আবির ড্রয়ার খুলে একটা পুরোনো সাদা খাম বের করল। কোণায় সামান্য হলদেটে হয়ে যাওয়া। “আপনার দাদু আমাকে এটা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘ফাইজাহ এলে তাকে দিয়ো।’ আমি ভেবেছিলাম, কখনো এমন দিন আসবে না।” সে খামটা টেবিলে রেখে সরে দাঁড়াল, যেন সরাসরি হাত বাড়াতে চায় না।

ফাইজাহ কাঁপা হাতে খামটা তুলে নিল। ভেতরে ভাঁজ করা একটা কাগজ, দাদুর পরিচিত হাতের“দিদিভাই, তুমি যখন এই চিঠি পড়ছ, আমি আর নেই। আমার খাতায় একটা কথা আমি তোমাকে বলে যেতে পারিনি। খাতার সপ্তম পাতাটা আমি নিজে ছিঁড়িনি। কেউ ছিঁড়েছে। কে ছিঁড়েছে, কেন ছিঁড়েছে, তা খুঁজে বের করলে তুমি বুঝবে, আবিরের কাহিনি শুধু অসুখের নয়। আর শোনো, এ খোঁজ করতে গিয়ে কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস কোরো না। আল্লাহকে ছাড়া।”

ফাইজাহর হাত থেকে চিঠিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। সে তাড়াতাড়ি সেটা বুকে চেপে ধরল, তারপর কাপড় খুলে খাতাটা আবার বের করল। সপ্তম পাতায় এসে দেখল, পাতাটা সত্যিই নেই। সূক্ষ্ম কাগজের একটা সরু রেখা মাত্র বাঁধাইয়ের ভেতরে লেগে আছে, খুব সাবধানে কাটা, এতক্ষণ খেয়ালই করেনি।

কে ছিঁড়েছে? আর কেন?

সে মুখ তুলে আবিরের দিকে তাকাল। আবির জানালার দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার কাঁধ দুটো সামান্য শক্ত হয়ে উঠেছে, যেন কোনো কথা সে গিলে ফেলছে।

“আপনি কি জানেন, কে...” ফাইজাহ শুরু করেও থেমে গেল।

আবির ফিরে তাকাল না। শুধু খুব আস্তে বলল, “আসুন, ফাইজাহ। আজ আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না।”

ফাইজাহ ধীরে ধীরে দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে গেল। বাইরে বিকেলের রোদ তখন লাইব্রেরির কাচের দরজায় সোনালি আভা ছড়াচ্ছে। সে ভেবে পেল না, তার বুকের ভেতর এত ভার কেন, আর পেছনে ঘরের নির্জনতায় কেউ কেন নিঃশব্দে আসমানের দিকে হাত তুলেছে।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 3 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন