তাকদীরের খাতা
লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা
পর্ব ৪
____
লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে ফাইজাহ রিকশায় না উঠে অনেকক্ষণ হাঁটল। বিকেলের রোদ ফিকে হয়ে আসছে, রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে রেডিওতে কেউ আস্তে করে কোরআন তেলাওয়াত চালিয়ে রেখেছে। তার এক হাতে দাদুর চিঠি, অন্য হাতে বুকের সঙ্গে চেপে ধরা খাতা।
সপ্তম পাতা কেউ ছিঁড়েছে, আর আবির সেটা জানে অথবা আন্দাজ করে, এই ভাবনাটা কাঁটার মতো বিঁধছিল। কিন্তু সে নিজেকে বোঝাল, প্রমাণ ছাড়া কাউকে সন্দেহ করা ঠিক নয়। আল্লাহ তো কোরআনে ধারণার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন, কারণ কিছু ধারণা গুনাহ।
মাগরিবের আজান হতেই সে পাশের মসজিদের মহিলাদের অংশে ঢুকে নামাজ পড়ল। সালাম ফিরিয়ে হাত তুলে ফিসফিস করে বলল, “ইয়া আল্লাহ, আমি সত্য খুঁজছি, কিন্তু অন্যায়ভাবে কাউকে দোষী করতে চাই না। আমার জিহ্বা আর অন্তরকে অপবাদ থেকে রক্ষা করুন। ইয়া রব, যে মানুষটা নিজের কষ্ট একা বহন করছে, তার বোঝা একটু হালকা করে দিন। আর যে সত্য আমার দাদু রেখে গেছেন, আপনি আমাকে সেদিকে পথ দেখান। আমি দুর্বল, আপনার সাহায্য ছাড়া এক পাও এগোতে পারব না।”
ওদিকে লাইব্রেরি বন্ধ করে আবির যখন বাড়ি ফিরল, রাত নেমে এসেছে। পুরোনো মহল্লার দোতলা বাড়ির বসার ঘরে বাবা চেয়ারে ঘুমিয়ে আছেন, কোলে খোলা কোরআন, নাকের ডগায় চশমা ঝুলছে। আবির দরজায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। বৃদ্ধের বুকটা ধীরে ধীরে ওঠানামা করছে। তার গলার ভেতর কান্না ঠেলে উঠল।
সে নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে বাবার কোল থেকে কোরআনটা তুলে বন্ধ করল, চশমা খুলে টেবিলে রাখল, চাদরটা কাঁধ পর্যন্ত টেনে দিল। এই মানুষটা আমার জন্য ত্রিশ বছর কেঁদেছে, সে ভাবল, আর আমি তাঁকে একটা সত্যও বলিনি।
নিজের ঘরে গিয়ে সে ওজু করে সালাতুল হাজতে দাঁড়াল। সিজদায় গিয়ে ভেঙে পড়ল। “ইয়া আল্লাহ, আজ একটা মেয়ে আমার সামনে বসে আমার মৃত্যুর কথা বলে গেল। অথচ আমার ভয় লাগেনি, জানেন কেন? কারণ আমি জানি আপনি আছেন। কিন্তু আমার বাবার জন্য আমার বুক কাঁপছে, ইয়া রব। আমি চলে গেলে তাঁকে কে দেখবে? কে তাঁর ওষুধ এগিয়ে দেবে, কে তাঁর হাত ধরে মসজিদে নিয়ে যাবে? আপনি তাঁকে সবর দিন। আর আমাকে সাহস দিন, যেন আমি তাঁকে সত্যটা বলতে পারি, আর তিনি যেন ভেঙে না পড়েন।”
কান্নায় তার দাড়ি ভিজে গেল। অনেকক্ষণ পর সে উঠে ড্রয়ার থেকে একটা ছোট নোটবুক বের করল। প্রতিটা পাতায় তারিখ, আর পাশে ছোট ছোট লেখা: “আজ সিঁড়িতে দুবার থামতে হলো। আলহামদুলিল্লাহ, নামাজে দাঁড়াতে পেরেছি।”সে কলম ধরে লিখল, “আজ ডা. কামরুলের নাতনি এলেন। তাঁর চোখে করুণা ছিল না, ছিল ব্যথা। এটা আমাকে অবাক করল।” কলম থেমে গেল।
তারপর খুব আস্তে লিখল, “সপ্তম পাতাটা কোথায় গেল, আমি জানি। কিন্তু কথাটা বলার সময় এখনো আসেনি। আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন।” সে খাতাটা বন্ধ করে বালিশের নিচে রেখে দিল।
ফাইজাহ বাড়ি ফিরল রাত আটটায়। রহিমা খালা ভাত বেড়ে অপেক্ষা করছিলেন, কিন্তু সে সামান্য পানি খেয়ে সোজা দাদুর স্টাডিতে চলে গেল। ঘরটা এখনো দাদুর গন্ধে ভরা।
পুরোনো বইয়ের তাকে ঠাসা কিতাব, টেবিলে কাচের পেপারওয়েট, কোণে সেই কাঠের আলমারি। সে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে খাতাটা মেলে ধরল। সপ্তম পাতার জায়গায় সূক্ষ্ম কাগজের একটা সরু রেখা, এত নিপুণভাবে কাটা যে ব্লেডের কাজ বলেই মনে হয়। কে এমন যত্ন করে পাতা কাটে? যে চায় না কেউ টের পাক।
হঠাৎ একটা পুরোনো স্মৃতি তার মনে ভেসে এল। ছোটবেলায় একবার সে দাদুর টেবিলে বসে কাগজের ওপর কিছু লিখছিল। লেখা শেষ হলে কাগজটা ছিঁড়ে ফেলল। দাদু হেসে পরের কাগজটা তুলে নিয়ে পেনসিলের পাশ দিয়ে হালকা করে ঘষলেন। অবাক হয়ে সে দেখেছিল, সাদা কাগজে ধীরে ধীরে তার লেখা ফুটে উঠছে।
দাদু বলেছিলেন, “দিদিভাই, মনে রাখিস, কলম যা লেখে কাগজ তা মনে রাখে। মানুষ ভুলে যেতে পারে, কাগজ ভোলে না। আর আল্লাহর কিরামান কাতিবিন আমাদের প্রতিটা কথা লিখে রাখছেন, তাদের কাগজ কখনো ছেঁড়া যায় না।”
তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। সে ড্রয়ার হাতড়ে একটা নরম পেনসিল বের করল। কাঁপা হাতে খাতার অষ্টম পাতাটা সামনে আনল, যেটা সপ্তম পাতার ঠিক পরে। পেনসিলের পাশটা কাগজের ওপর খুব আস্তে, খুব ধীরে ঘষতে শুরু করল।
প্রথমে কিছু নেই। তারপর ধূসর পটভূমির ভেতর থেকে অদৃশ্য রেখাগুলো যেন নিঃশ্বাস নিয়ে জেগে উঠতে লাগল। একটা অক্ষর, তারপর একটা শব্দ, তারপর পুরো লাইন। দাদুর হাতের লেখা, কাগজের গভীরে চাপ দিয়ে বসানো।
সে ল্যাম্পটা আরও কাছে টেনে নিল এবং পড়ল:
“সপ্তম পাতায় আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা লিখেছিলাম। মনসুর তা জানে। তাকে ঘৃণা কোরো না। সে আমার একটা অন্যায়ের সাক্ষী। পারলে আমার হয়ে তার কাছে ক্ষমা চেয়ো। আল্লাহ যেন আমাকে ক্ষমা করেন। আবিরের সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে, কিন্তু আবির নির্দোষ।”
ফাইজাহর হাত থেকে পেনসিলটা খসে পড়ল। ভুল? তার দাদুর ভুল? যে মানুষটাকে সে পুরো জীবন ফেরেশতার মতো দেখে এসেছে, যাঁকে পাড়ার লোক ওলি বলত, তাঁর কোন ভুল এত বড় যে তিনি নিজে সেটা খাতা থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছেন? আর আবিরের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক?
চোখ ঝাপসা হয়ে এল। সে ধীরে ধীরে জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়াল। দুই রাকাত নফল শেষে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে সে প্রায় শব্দ করে কেঁদে ফেলল। “ইয়া গাফফার, ইয়া রহমান, আমার দাদু একজন মানুষ ছিলেন। মানুষ ভুল করে। আপনি আমাদের সবাইকে ভুল করার স্বভাব দিয়েই সৃষ্টি করেছেন, আর বলেছেন, আপনি তাওবা কবুলকারী। আমার দাদু যদি কোনো অন্যায় করে থাকেন, ইয়া আল্লাহ, আপনি তাঁকে মাফ করে দিন। তাঁর যত ভালো কাজ, যত রোগীকে বিনা পয়সায় দেখেছেন, যত রাত তাহাজ্জুদে কেঁদেছেন, সবকিছুর উসিলায় তাঁর ভুল ঢেকে দিন। কবরের অন্ধকারে আপনি তাঁকে একা ফেলবেন না। ইয়া রব, আমি তাঁর হয়ে ক্ষমা চাইছি।”
সে অনেকক্ষণ সিজদা থেকে মাথা তুলল না। জানালার বাইরে রাতের হাওয়া পর্দা দুলিয়ে দিচ্ছে, আর সে মনে মনে ভাবছে, দাদু কেন আগে বলে যাননি? কেন একটা কথাও না বলে চলে গেলেন?
তারপর হঠাৎ তার মনে হলো, হয়তো এটাই দাদুর শেষ শিক্ষা। যে সত্যটা সরাসরি বললে সে গ্রহণ করত না, সেটা নিজে খুঁজে পেলে তার ভেতরে গেঁথে যাবে।
সে উঠে বসে চিঠিটা আবার পড়ল। “কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস কোরো না। আল্লাহকে ছাড়া।"আর অষ্টম পাতার ছাপে লেখা: “তাকে ঘৃণা কোরো না।” দুটো কথা যেন একে অন্যের সঙ্গে লড়ছে। বিশ্বাস কোরো না, আবার ঘৃণাও কোরো না। এই মনসুর কে?
সে খাতার আগের পাতাগুলো উল্টাতে লাগল। বহু আগের কয়েকটা এন্ট্রিতে একটা নাম চোখে পড়ল। “মনসুর আজ সকালে দেরিতে এসেছে, মুখ শুকনো। জিজ্ঞেস করলাম, বলল মায়ের অসুখ। আল্লাহ তার মাকে শিফা দিন।” “মনসুরকে আজ বেতনের বাইরে কিছু টাকা দিলাম, ও নিতে চায়নি।” নামটা ফিরে ফিরে আসছে, প্রতিবার স্নেহের সঙ্গে।
হঠাৎ ফাইজাহর মনে পড়ল, দাদুর চেম্বারে একজন কম্পাউন্ডার ছিল, রোগা, ঠান্ডা চোখের এক মানুষ। ছোটবেলায় সে লোকটাকে ভয় পেত। চার-পাঁচ বছর আগে হঠাৎ একদিন সে কাজ ছেড়ে দিয়েছিল, আর কেউ কখনো জানতে পারেনি কেন। দাদুও কখনো বলেননি।
বাইরে রহিমা খালার পায়ের শব্দ শোনা গেল, আর দরজায় মৃদু টোকা। সে তাড়াতাড়ি পেনসিলের ছাপ পড়া পাতাটা বন্ধ করে খাতাটা কাপড়ে মুড়ে ফেলল। “আপা, দরজা খুলেন,” রহিমা খালার গলায় অস্বস্তি। “এত রাতে একজন মানুষ এসেছেন। বলছেন, কর্তার পুরোনো কম্পাউন্ডার।”
ফাইজাহর বুকের রক্ত যেন জমে গেল।
“নাম কী?” সে শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করল।
“মনসুর সাহেব,” রহিমা খালা ফিসফিস করে বললেন। “আপা, উনি বলছেন, কর্তার খাতাটা ফেরত নিতে এসেছেন। আর বলছেন, ‘যে খাতা আমার নাম জানে, সেটা আমি অন্যের হাতে রেখে যেতে পারি না।’”
ফাইজাহ বুকের কাছে খাতাটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। জানালার কাচে হঠাৎ কার যেন ছায়া পড়ল, আর বাইরে বাগানের গাছের পাতা ঝড়ের মতো দুলে উঠল। সে ঠোঁট নেড়ে ফিসফিস করে পড়ল, “হাসবুনাল্লাহু ওয়া নিমাল ওয়াকিল।” আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, আর তিনি কত উত্তম কর্মবিধায়ক।
তারপর সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে পা বাড়াল।
চলবে...