*উপন্যাস: তুমি আমার রূপসী*
*লেখিকা: নাবিলা জান্নাত*
*জনরা: ডার্ক রোমান্টিক
---
পর্ব - ০১ : বাড়িতে প্রবেশ
রাত ১১ টা ৪৭ মিনিট।
পুরো চৌধুরী বাড়ি নিস্তব্ধ। ভিতরের বড় সিঁড়ির আলোটা শুধু জ্বলছে।
আরিয়ান চৌধুরী কালো শার্টে, কোলে একটা মেয়েকে নিয়ে ভিতরের বড় সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছে। মেয়েটার গায়ে একদম সিম্পল একটা লাল শাড়ি, মুখটা পুরো তার বুকে লুকানো। পিছন থেকে দেখলে মনে হচ্ছে, মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু আসলে মেয়েটা কাঁপছে।
"ছাড়ুন আমাকে, আমি হাঁটতে পারবো।" ফিসফিস করে বলল রূপসী।
আরিয়ান কোনো উত্তর দিলো না। তার শক্ত হাত আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো তাকে। সিঁড়ির প্রতিটা ধাপে তার পায়ের শব্দ প্রতিধ্বনি হচ্ছে।
"আমি বলেছি, আমার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করবে না। তুমি আমার রূপসী, শুধু আমার।"
রূপসী চোখ বন্ধ করে ফেলল। আজ সকালে সে ভেবেছিল পালিয়ে যাবে। কিন্তু এই মানুষটার চোখ ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব।
তিন মাস আগে, বাবার ঋণের জন্য তাকে বিয়ে করতে হয়েছিল ঢাকার সবচেয়ে ডেঞ্জারাস বিজনেসম্যান আরিয়ান চৌধুরীকে। যে মানুষটা হাসে না, যে মানুষটা ভালোবাসতে জানে না, শুধু অধিকার করতে জানে।
সিঁড়ি শেষ। আরিয়ান তাকে নিয়ে নিজের রুমের দরজার সামনে দাঁড়ালো। কোল থেকে নামালো না। এক হাতে দরজা খুলল।
"মনে আছে, আমি কি বলেছিলাম? এই বাড়ি থেকে পালানোর একটাই শাস্তি, তুমি আমার বুকের আরও কাছে থাকবে।"
রূপসী এবার তার দিকে তাকালো। চোখে পানি।
"আপনি আমাকে ভালোবাসেন না, আপনি শুধু আমাকে আটকে রাখতে চান।"
আরিয়ান হঠাৎ তাকে দেয়ালের সাথে আটকে ফেলল, কিন্তু খুব যত্নে, যাতে ব্যথা না লাগে। তার মুখটা রূপসীর একদম কাছে আনলো।
"ভালোবাসা? ভালোবাসা কি আমি জানি না, রূপসী। আমি শুধু জানি, তোমাকে ছাড়া আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। তোমার ওই সিম্পল শাড়ি, তোমার ওই মুখ লুকানো, সব আমার। বুঝেছো? তুমি আমার রূপসী।"
বলেই তাকে আবার কোলে তুলে নিয়ে রুমের ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো।
বাইরে থেকে শুধু সিঁড়িটা খালি পড়ে রইলো। আর ভিতরে শুরু হলো এক অন্ধকার ভালোবাসার নতুন অধ্যায়।
---
দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দটা রূপসীর বুকে গিয়ে লাগলো।
আরিয়ান তাকে কোল থেকে নামালো না। সরাসরি নিয়ে গিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিলো। তারপর নিজে সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো।
রূপসীর সিম্পল লাল শাড়ির আঁচলটা মাটিতে পড়ে আছে। সে তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নিলো। তার চোখ নিচের দিকে।
"আমার দিকে তাকাও।"
আরিয়ানের গলা শান্ত, কিন্তু সেই শান্ত গলায় এমন একটা আদেশ আছে যেটা অমান্য করার সাহস রূপসীর নেই।
রূপসী তাকালো না।
আরিয়ান এবার তার থুতনি ধরে মুখটা উপরে তুললো। রূপসীর চোখে জমে থাকা পানি এবার গড়িয়ে পড়লো।
"কাঁদছো কেন? আমি কি তোমাকে মেরেছি? বকেছি?"
"আপনি আমাকে এভাবে আটকে রেখেছেন কেন? আমি তো আপনার স্ত্রী, আপনার আসামী না।"
কথাটা শুনে আরিয়ান হাসলো। সেই হাসি দেখলে যে কারো রক্ত ঠান্ডা হয়ে যাবে।
"কারণ তুমি বুঝো না, রূপসী। তুমি বাইরের দুনিয়া চেনো না। বাইরে সবাই তোমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আর আমি সেটা সহ্য করতে পারি না। তোমার ওই মুখ, যেটা তুমি সবার থেকে লুকিয়ে রাখো, সেটা শুধু আমি দেখবো।"
সে উঠে গিয়ে একটা আলমারি খুললো। সেখান থেকে একটা ছোট ভেলভেটের বক্স বের করে আনলো।
"আজ সকালে পালানোর চেষ্টা করেছিলে, মনে আছে? পাসপোর্ট, টাকা সব গুছিয়েছিলে। কোথায় যেতে চেয়েছিলে?"
রূপসী চমকে উঠলো। সে ভেবেছিল আরিয়ান জানবে না।
"আমি... আমি মায়ের কাছে..."
"মিথ্যা।"
এক শব্দে রূপসী চুপ।
আরিয়ান বক্সটা খুললো। ভিতরে একটা সোনার পায়েল। খুব সিম্পল, কিন্তু অনেক দামি।
সে আবার রূপসীর সামনে বসলো। তার পা টা নিজের হাঁটুর উপর তুলে নিলো। রূপসী পা সরাতে চাইলো, কিন্তু পারলো না।
"এটা কি?" রূপসী জিজ্ঞেস করলো।
"তোমার শাস্তি। আজ থেকে এটা তোমার পায়ে থাকবে। যাতে তুমি হাঁটলেও আমি শুনতে পাই তুমি কোথায় আছো। যাতে তুমি পালাতে না পারো।"
"আপনি পাগল!"
"হ্যাঁ, তোমার জন্য পাগল।"
আরিয়ান খুব যত্ন করে পায়েলটা পরিয়ে দিলো। তার ঠান্ডা হাতের ছোঁয়া রূপসীর পায়ে লাগতেই সে কেঁপে উঠলো।
পায়েল পরানো শেষে আরিয়ান তার পায়ে একটা চুমু খেলো না, শুধু হাত দিয়ে আলতো করে ধরে রাখলো।
"আরিয়ান, প্লিজ আমাকে একটু নিজের মতো থাকতে দিন।"
"থাকতে তো দিচ্ছি। এই বাড়িটা তোমার, এই সিঁড়ি, এই ঘর, আমি, সব তোমার। শুধু তুমি আমার। এটাই ডিল ছিল, মনে নেই? তোমার বাবার সব ঋণ আমি শোধ করেছি, বিনিময়ে তুমি।"
রূপসীর বাবার মুখটা মনে পড়লো। বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত। টাকার জন্য সে নিজেকে বিক্রি করে দিয়েছে এই মানুষটার কাছে।
"আমি তো পালাচ্ছি না আর। তাহলে কেন..."
"কারণ আমি ভয় পাই, রূপসী।"
এই প্রথম আরিয়ানের গলা নরম হলো। সে রূপসীর কোলে মাথা রাখলো। রূপসী পুরো জমে গেলো। এত বড় একজন মানুষ, যাকে পুরো শহর ভয় পায়, সে তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে।
"আমি জীবনে কখনো ভয় পাইনি। কিন্তু যেদিন তোমাকে প্রথম দেখেছি, সিম্পল একটা শাড়িতে, সিঁড়ি দিয়ে নামছিলে, মুখটা লুকানো ছিল, সেদিন থেকে ভয় পাই। যদি তুমি হারিয়ে যাও?"
রূপসী কিছু বলতে পারলো না। তার হাতটা আপনা-আপনি আরিয়ানের চুলে চলে গেলো। সে নিজেও বুঝলো না কেন করলো।
আরিয়ান চোখ বন্ধ করে ফেললো।
"এভাবেই থাকো। নড়বে না।"
বাইরে রাত বাড়ছে। ভিতরের বড় সিঁড়িতে আলোটা এখনো জ্বলছে। আর সেই সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসা দুটো মানুষ, একটা ঘরের ভিতর, এক অদ্ভুত অন্ধকার ভালোবাসায় আটকে গেছে। যেখানে একজন আটকে রাখতে চায়, আর আরেকজন পালাতে চেয়েও পারছে না।
রাত ২ টা। রূপসী ঘুমিয়ে পড়েছে, আরিয়ানের কোলে মাথা রেখেই। আরিয়ান তাকিয়ে আছে তার দিকে। তার চোখে ঘুম নেই।
ফিসফিস করে বললো,
"তুমি আমার রূপসী, শুধু আমার। তোমাকে আমি কোথাও যেতে দেবো না, কখনো না।"
---
*চলবে...*