*উপন্যাস: তুমি আমার রূপসী*
*লেখক নাবিলা জান্নাত -
*পর্ব -২*
সকাল ৭ টা।
ঘুম ভাঙলো রূপসীর। সে দেখলো, সে বিছানায় শুয়ে আছে, গায়ে পাতলা একটা কাঁথা। আর আরিয়ান রুমের কর্নারে, সোফায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। কালো শার্টটা এখনো গায়ে, চোখ লাল। সারারাত ঘুমায়নি।
রূপসী উঠতে গেলো। পা ফেলতেই টুং করে একটা শব্দ হলো।
পায়েল।
কাল রাতে আরিয়ান যেটা পরিয়ে দিয়েছে।
শব্দ শুনে আরিয়ান তাকালো। ল্যাপটপ বন্ধ করলো।
"ঘুম ভালো হয়েছে?"
রূপসী উত্তর দিলো না। সে ওয়াশরুমে যেতে চাইলো।
"আজ থেকে কোথাও যাওয়ার আগে আমাকে বলবে। কলেজ, ছাদ, রান্নাঘর, সব জায়গায়।"
"কলেজ?" রূপসী অবাক হয়ে তাকালো, "আমি কলেজে যাবো আজ?"
"না।"
"কেন?"
"কারণ আজ তোমার কলেজ নেই। আমি ছুটি নিয়েছি তোমার জন্য।"
"আপনি আমার কলেজের ছুটি কেন নেবেন? আমার সামনে ফাইনাল!"
আরিয়ান উঠে এলো। রূপসীর একদম সামনে দাঁড়ালো।
"কারণ কাল তুমি পালাতে চেয়েছিলে। আর যে মেয়ে পালাতে চায়, তাকে আমি বাইরে পাঠাই না।"
"আমি পালাবো না বলেছি তো!"
"তোমার মুখ বলছে পালাবে না, কিন্তু তোমার চোখ বলছে সুযোগ পেলেই দৌড় দেবে। আর আমি রিস্ক নিতে পারি না, রূপসী।"
রূপসী রাগে কাঁদতে শুরু করলো। আরিয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো, তারপর হঠাৎ তাকে টেনে নিয়ে ভিতরের সেই বড় সিঁড়ির কাছে নিয়ে এলো। দোতলা থেকে নিচতলা পর্যন্ত পুরো সিঁড়িটা খালি।
"শোনো।"
"কি?"
"এই সিঁড়ি দিয়ে তুমি রোজ নামবে, উঠবে। তোমার পায়ের এই পায়েলের শব্দ আমি নিচ থেকে শুনবো। এটাই আমার শান্তি। তুমি এই বাড়িতেই আছো, আমার চোখের সামনে আছো।"
রূপসী এবার আর সহ্য করতে পারলো না।
"আপনি আমাকে ভালোবাসেন না! আপনি আমাকে বন্দি করে রেখেছেন! এটা ভালোবাসা না, এটা অসুস্থতা!"
পুরো বাড়ি কেঁপে উঠলো তার চিৎকারে। কাজের লোকেরা ভয়ে সরে গেলো।
আরিয়ান কিন্তু রাগলো না। সে আস্তে করে রূপসীর দুই কাঁধ ধরলো।
"ঠিক বলেছো। এটা অসুস্থতা। আর এই অসুস্থতার নাম তুমি। তুমি আমার রূপসী। ডাক্তার বলেছে, এই অসুস্থতার কোনো ওষুধ নেই। শুধু তুমি কাছে থাকলে আমি সুস্থ থাকি।"
বলেই সে রূপসীকে কোলে তুলে নিলো। ঠিক কভারের মতো করে, পিছন থেকে যেমন দেখা যায়। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগলো।
"আরে, নামান! সবাই দেখছে!"
"দেখুক। সবাই জানুক, তুমি আমার।"
নিচে নেমে ডাইনিং টেবিলে বসালো। নিজে হাতে খাবার বেড়ে দিলো।
"খাও।"
"খাবো না।"
"না খেলে আমি খাইয়ে দেবো। আর আমি খাইয়ে দিলে তোমার ঠোঁটে আমার হাত লাগবে, সেটা কি তুমি চাও?"
রূপসী লাল হয়ে গেলো। তাড়াতাড়ি খেতে শুরু করলো।
আরিয়ান তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। তার চোখে এক অদ্ভুত মায়া, আর তার নিচে এক ভয়ংকর অধিকারবোধ।
খাওয়া শেষে আরিয়ান একটা কার্ড বের করলো।
"আজ সন্ধ্যায় আমার একটা বিজনেস পার্টি আছে। তুমি যাবে আমার সাথে।"
"আমি যাবো না।"
"যাবে। কারণ সেখানে তোমাকে সিম্পল লাল শাড়িতেই যেতে হবে। যে শাড়িটা পরে তুমি প্রথম আমার বাড়িতে এসেছিলে। আর মুখটা... মুখটা লুকিয়ে রাখবে না আজ। আজ সবাই দেখবে, আরিয়ান চৌধুরীর রূপসী কে।"
রূপসীর বুক ধক করে উঠলো। পার্টি মানে অনেক মানুষ। অনেক চোখ। আর আরিয়ান পাশে থাকলে...
"আর শোনো," আরিয়ান তার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললো, "পার্টিতে যদি কোনো ছেলে তোমার দিকে তাকায়, আমি তার চোখ তুলে নেবো। তাই তুমি শুধু আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে। শুধু আমার। বুঝেছো, আমার রূপসী?"
রূপসী কাঁপতে কাঁপতে বললো, "আপনি সত্যিই পাগল।"
আরিয়ান হাসলো, "তোমার জন্যই তো।"
____
ঠিক আছে, *পর্ব ০৪: পার্টির রাতে* - এবার সবচেয়ে বড় করে, ফুল ডার্ক রোমান্টিক ডিটেইলে লিখে দিলাম।
---___
বিকাল ৫ টা থেকেই বাড়িতে সাজ সাজ রব।
রূপসী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে সেই সিম্পল লাল শাড়িটা, যেটা আরিয়ান পছন্দ করে। কোনো ভারী গয়না নেই, শুধু পায়ে সেই সোনার পায়েলটা টুং টাং করছে। চুলগুলো খোলা, মুখে একটুও মেকআপ নেই। তবুও তাকে দেখে মনে হচ্ছে, একটা লাল পদ্ম ফুটে আছে।
আরিয়ান পিছন থেকে এসে দাঁড়ালো। কালো পাঞ্জাবি, হাতে ঘড়ি।
"তৈরি?"
রূপসী ঘুরে তাকালো, "আমাকে যেতেই হবে?"
"হ্যাঁ। কারণ আমি চাই, পুরো দুনিয়া দেখুক, আমার ঘরে কি চাঁদ আছে। কিন্তু মনে রাখবে, তুমি শুধু আমার পাশে থাকবে। আমার হাত ছাড়বে না।"
গাড়িতে পুরো রাস্তা আরিয়ান তার হাত ধরে রাখলো। শক্ত করে। যেন ছেড়ে দিলেই রূপসী উড়ে যাবে।
পার্টি হাউসে ঢুকতেই সব আলো যেন রূপসীর উপর পড়লো।
আরিয়ান চৌধুরী, যে কখনো কোনো মেয়েকে নিয়ে পার্টিতে আসে না, সে আজ বউ নিয়ে এসেছে। সবাই অবাক।
মেয়েরা হিংসায় তাকাচ্ছে, ছেলেরা মুগ্ধ হয়ে।
রূপসী অস্বস্তিতে আরিয়ানের শার্টের হাতা খামচে ধরলো।
"ভয় পাচ্ছো?" আরিয়ান ফিসফিস করে বললো।
"হুম। সবাই তাকিয়ে আছে।"
"তাকাতে দাও। কিন্তু তুমি শুধু আমার দিকে তাকাও।"
তখনই এলো রাহাত। আরিয়ানের বিজনেস পার্টনার, বয়স ২৮, অনেকদিন ধরে আরিয়ানের জায়গা নিতে চায়।
সে সোজা রূপসীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো, একটা হাসি দিয়ে, "হাই, ভাবি। আমি রাহাত। আপনাকে তো কখনো দেখিনি। আরিয়ান তো লুকিয়ে রেখেছিল..."
তার হাতটা রূপসীর হাত থেকে মাত্র ২ ইঞ্চি দূরে।
পরের সেকেন্ডে যা হলো, তার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না।
আরিয়ান এক ঝটকায় রাহাতের হাতটা ধরে ফেললো মাঝপথে। এত জোরে ধরলো যে রাহাত ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলো।
পুরো পার্টির মিউজিক বন্ধ হয়ে গেলো।
আরিয়ানের চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। গলার রগ ফুলে উঠেছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
*"Don't touch her. Don't even look at her. She is allergic to other men's touch and other men's eyes."*
"আরিয়ান... আরিয়ান ছাড়ো, লাগছে আমার..." রাহাত বলছে।
আরিয়ান ছাড়লো না। সে রূপসীর দিকে তাকালো। রূপসী ভয়ে কাঁপছে, চোখে পানি।
এই দৃশ্য দেখে আরিয়ানের রাগ আরও বেড়ে গেলো। কারণ রূপসী ভয় পেয়েছে।
সে এক ঝটকায় রাহাতকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। তারপর সবার সামনে, প্রায় ১০০ জন মানুষের সামনে, রূপসীকে কোলে তুলে নিলো।
একদম সেই কভারের মতো করে। এক হাতে পা, আরেক হাতে পিঠ। রূপসী লজ্জায়, ভয়ে তার বুকে মুখ লুকালো। তার খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। পায়ের পায়েলটা টুং করে বেজে উঠলো।
আরিয়ান জোরে বললো, "My wife is not feeling well. We are leaving. And Rahat, you are fired. My company doesn't need people who don't know where to look."
বলেই হনহন করে বেরিয়ে এলো।
কেউ একটা কথাও বলার সাহস পেলো না।
বাইরে এসে গাড়ির কাছে এসে রূপসীকে নামালো না। গাড়ির দরজা খুলে ভিতরে বসিয়ে দিলো কোলে করেই। তারপর নিজে ড্রাইভিং সিটে বসলো।
গাড়ি চলছে। খুব জোরে। রূপসী জানালার দিকে তাকিয়ে কাঁদছে।
আরিয়ান এক হাতে স্টিয়ারিং, আরেক হাতে রূপসীর হাতটা টেনে নিজের বুকের উপর রাখলো।
"কাঁদছো কেন? আমি তো তোমাকে বাঁচালাম। ও তোমাকে ছুঁতে চেয়েছিল।"
"আপনি সব জায়গায় এমন করেন! আমি কি কোনো পুতুল? যে যখন খুশি কোলে তুলে নেবেন?"
আরিয়ান গাড়ি থামালো। নির্জন রাস্তায়।
সে রূপসীর দিকে ঘুরলো। তার মুখটা দুই হাতে ধরলো।
"হ্যাঁ, তুমি পুতুল। আমার পুতুল। আমার সিম্পল লাল শাড়ি পরা পুতুল। যাকে আমি ছাড়া কেউ ছুঁতে পারবে না, দেখতেও পারবে না। এই জন্য তো তোমাকে বলেছিলাম মুখ ঢেকে রাখতে। কিন্তু তুমি শোনোনি।"
"আমি কি সারাজীবন মুখ ঢেকে রাখবো?"
"হ্যাঁ, রাখবে। শুধু আমার সামনে খুলবে। কারণ তুমি আমার রূপসী।"
বলেই আরিয়ান তার কপালে একটা গভীর চুমু খেলো। প্রথমবার। খুব আলতো করে, কিন্তু অধিকার নিয়ে।
রূপসী চোখ বন্ধ করে ফেললো। তার রাগ, ভয়, সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। এই পাগল, পজেসিভ মানুষটার বুকের ভিতর যে ভালোবাসাটা আছে, সেটা সে টের পাচ্ছে।
আরিয়ান ফিসফিস করে বললো, "চলো বাড়ি যাই। আমাদের বাড়ির সেই বড় সিঁড়িটা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। আজ তোমাকে কোলে নিয়ে ওই সিঁড়ি দিয়ে উঠবো, আর নামতে দেবো না।"
গাড়ি আবার চলতে শুরু করলো, বাড়ির দিকে।
*চলবে...*
কেমন হয়েছে বলে যাবে প্লিজ 👀