তুমি আমার রূপসী - পর্ব ০৩
*লেখিকা: নাবিলা জান্নাত*
বাড়ি ফিরে সিঁড়ির শাস্তি শেষ। রাত ১টা।
আরিয়ান রূপসীকে কোলে করেই ঘরে নিয়ে এলো। দরজা বন্ধ করলো। লক করলো।
রূপসী ভয়ে ভয়ে বললো - "এবার কি? আবার শাস্তি?"
আরিয়ান তাকে বিছানায় বসিয়ে দিলো। তারপর আলমারি খুললো। একটা নতুন শাড়ি বের করলো। টকটকে লাল বেনারসি। সাথে ভারী সোনার গয়না।
"এটা পরো।"
"এত রাতে? কেন?"
"কারণ আজ আমাদের বাসর।"
রূপসী হা হয়ে গেলো - "কি! বাসর মানে? আমাদের তো বিয়ে হয়েছে অনেকদিন..."
"হয়েছে, কিন্তু আমি কখনো তোমাকে বউয়ের মতো করে সাজতে দেখিনি। আজ পার্টিতে সবাই তোমাকে দেখেছে। আমার সহ্য হয়নি। তাই আজ আমি নিজের হাতে তোমাকে সাজাবো, যাতে শুধু আমি দেখতে পারি।"
রূপসী লজ্জায় লাল - "আমি পারবো না... আপনি বাইরে যান..."
"না। আমি এখানেই থাকবো। তুমি ওয়াশরুমে গিয়ে পরো।"
রূপসী শাড়িটা নিয়ে ওয়াশরুমে গেলো। ১৫ মিনিট পর বের হলো।
আরিয়ান তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলো। লাল বেনারসি, খোলা চুল, কপালে ছোট্ট টিপ, চোখে কাজল। পায়ে সেই সোনার পায়েলটা। মনে হচ্ছে সত্যিই একটা রূপসী পরী নেমে এসেছে।
"মাশাআল্লাহ..." আরিয়ানের মুখ থেকে বেরিয়ে গেলো।
রূপসী লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
আরিয়ান আস্তে আস্তে এগিয়ে এলো। তার হাতে সিঁদুরের কৌটা।
"এদিকে এসো।"
সে নিজের হাতে রূপসীর সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিলো। গাঢ় করে। তারপর কপালে একটা বড় করে চুমু খেলো।
"আজ থেকে তুমি পুরোপুরি আমার।"
তারপর সে বিছানার মাঝখানে একটা কোলবালিশ রাখলো।
"এটা কি আবার?"
"বর্ডার। তুমি বলেছিলে না আমি সাইকো? তাই আজ আমি নিজেকে কন্ট্রোল করবো। এই বর্ডার ক্রস করবো না। যদি তুমি ডাকো, তবেই করবো।"
রূপসী অবাক। এই ছেলেটা কখনো এত ভালো হয়, কখনো এত পাগল।
দুজনেই শুয়ে পড়লো। মাঝখানে বর্ডার।
লাইট অফ। শুধু ডিম লাইট জ্বলছে।
১০ মিনিট... ২০ মিনিট... কেউ ঘুমাচ্ছে না।
রূপসী ফিসফিস করে বললো - "আরিয়ান..."
"হুম?"
"আমার ঠান্ডা লাগছে..."
আরিয়ান হাসলো - "বর্ডার ক্রস করতে বলছো?"
"না... মানে... একটু..."
আরিয়ান আর পারলো না। কোলবালিশটা এক টানে ফেলে দিলো। রূপসীকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিলো।
"তুমি ডেকেছো, আমি এসেছি। এখন আর কোনো বর্ডার নেই।"
রূপসী তার বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে। আরিয়ানের হার্টবিট শোনা যাচ্ছে। ধক ধক।
"আরিয়ান, আপনি আমাকে এত ভালোবাসেন কেন? আমি তো সাধারণ একটা মেয়ে।"
"তুমি সাধারণ না। তুমি আমার রূপসী। আমার ঘরের চাঁদ। যাকে আমি ৭ বছর ধরে লুকিয়ে ভালোবেসেছি। যখন তুমি ক্লাস ১০ এ পড়তে, তখন থেকে।"
রূপসী চোখ বড় করে তাকালো - "কি! তখন থেকে!"
"হ্যাঁ। তখন তুমি নীল স্কুল ড্রেস পরে যেতে। আমি বাইকে করে তোমাকে ফলো করতাম। তুমি জানতেও না।"
"আপনি তো সত্যিই সাইকো!"
"তোমার জন্য।"
বলেই আরিয়ান তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। রূপসী আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে গেলো তার বুকে।
আরিয়ান ঘুমালো না। সারারাত সে তার রূপসীকে দেখলো। তার খোলা চুল, তার লাল শাড়ি, তার পায়ের পায়েল।
ভোর ৫টায় রূপসীর ঘুম ভাঙলো। দেখলো আরিয়ান এখনো তার দিকে তাকিয়ে আছে।
"আপনি ঘুমাননি?"
"না। তোমাকে দেখছিলাম। যদি ঘুমিয়ে গেলে তুমি হারিয়ে যাও..."
রূপসী এবার নিজে থেকেই আরিয়ানের গালে হাত রাখলো।
"হারাবো না। আমি কোথাও যাবো না। আমি আপনারই রূপসী।"
এই প্রথম রূপসী নিজে থেকে তাকে ছুঁলো। আরিয়ানের চোখে জল চলে এলো।
সে রূপসীর হাতটা ধরে তার বুকে রাখলো।
"এই কথাটা মনে রেখো রূপসী। সারাজীবন।"
বাইরে তখন সূর্য উঠছে। রাজপ্রাসাদের সিঁড়িতে রোদ পড়েছে। আজকের দিনটা তাদের জন্য নতুন দিন। প্রথম রাত শেষ, এবার নতুন সকাল।
কিন্তু এই সকালটা বেশি দিন থাকবে না। কারণ নিচে মাধুরী চৌধুরী আর রাহাত মিলে নতুন প্ল্যান করছে। রূপসীকে পার্টি থেকে ফায়ার করার প্রতিশোধ নেবে রাহাত।
---
🙂
সকাল ৯টা।
রূপসী ঘুম থেকে উঠে দেখলো আরিয়ান নেই। বিছানায় একটা চিরকুট - "আমার রূপসী ঘুমাচ্ছে, তাই ডাকিনি। ব্রেকফাস্ট টেবিলে এসো। তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। - তোমার সাইকো"
রূপসী হেসে ফেললো। চিরকুটটা বুকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর লাল শাড়িটা ঠিক করে নিচে নামতে গেলো।
সেই রাজকীয় সিঁড়ি। লাল কার্পেট। আজ সে একা নামছে। পায়েলের শব্দ টুং টাং।
নিচে মাধুরী চৌধুরী বসে আছে। সাথে রাহাত।
রূপসীকে দেখেই রাহাত হেসে উঠলো - "আরে ভাবি! Good morning! কাল রাতে তো পার্টি থেকে পালালেন। আজ কেমন আছেন?"
রূপসী ভয়ে পিছিয়ে গেলো। এই ছেলেটাই কাল তার হাত ধরতে চেয়েছিল।
"আপনি এখানে কেন?"
মাধুরী বললো - "রাহাত আমাদের ফ্যামিলি ফ্রেন্ড। ওর সাথে আমার কিছু বিজনেস কথা আছে। তুমি যাও, রান্নাঘরে যাও।"
রূপসী চলে যেতে নিলো, রাহাত পেছন থেকে বললো - "ভাবি, কাল আরিয়ান আমাকে ফায়ার করেছে শুধু আপনার জন্য। আমার ৫ কোটি টাকার প্রজেক্ট গেলো। এর শোধ তো নিতেই হবে, তাই না?"
রূপসী কিছু বুঝলো না, রান্নাঘরে চলে গেলো।
*১০ মিনিট পর...*
রূপসী রান্নাঘরে চা বানাচ্ছে। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ তার মুখে রুমাল চেপে ধরলো। সেই রাহাত!
রূপসী ছটফট করছে - "উমম... ছাড়ুন..."
রাহাত ফিসফিস করে বললো - "চুপ ভাবি। বেশি চিৎকার করলে তোমার ওই সাইকো বর তোমাকে আর খুঁজে পাবে না। চলো, তোমাকে একটা সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাই।"
২ মিনিটের মধ্যেই রূপসী অজ্ঞান। রাহাত তাকে কোলে তুলে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো। মাধুরী সব দেখেও চুপ। তার চোখে শান্তি।
"এবার বুঝবে আরিয়ান, এই মেয়েকে ঘরে রাখার ফল কি।"
---
*১১টা...*
আরিয়ান অফিস থেকে ফিরে এলো। "রূপসী! রূপসী! কোথায় তুমি?"
পুরো বাড়ি খুঁজলো, কোথাও নেই। শুধু রান্নাঘরে একটা পায়েল পড়ে আছে। রূপসীর পায়ের সোনার পায়েলটা। যেটা আরিয়ান নিজে বানিয়ে দিয়েছিল।
আরিয়ানের মাথায় রক্ত উঠে গেলো।
সে সোজা মাধুরীর ঘরে গেলো। দরজা লাথি দিয়ে খুললো - "মা! রূপসী কোথায়?"
"আমি কি করে জানবো? ও তো..."
"মিথ্যা বলবে না! রাহাত কোথায়? রাহাত এখানে এসেছিল, আমি সিসিটিভিতে দেখেছি!"
মাধুরী ভয় পেয়ে গেলো। আরিয়ানের চোখ লাল।
"ও... ও চলে গেছে..."
আরিয়ান তার ফোন বের করে রাহাতকে ফোন করলো। রাহাত ফোন ধরলো, হাসতে হাসতে - "হ্যালো বস! ভাবিকে খুঁজছো?"
"রাহাত! তুই যদি আমার রূপসীর একটা চুলও ছুঁয়ে থাকিস, তোকে আমি জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে ফেলবো! কোথায় ও?"
"শান্ত হও বস। ভাবি আমার সাথেই আছে। খুব সুন্দর লাগছে লাল শাড়িতে। আমি শুধু একটু... আদর করছি..."
আরিয়ান ফোনটা আছাড় মেরে ভেঙে ফেললো। তারপর তার গাড়ির চাবি নিয়ে বেরিয়ে গেলো।
"রাফি! রাহাতের ফোন ট্র্যাক কর! এক্ষুনি!"
---
*অন্যদিকে, পরিত্যক্ত ফার্মহাউস...*
রূপসীর জ্ঞান ফিরেছে। হাত-পা বাঁধা চেয়ারে। সামনে রাহাত বসে মদ খাচ্ছে।
"ভাবি, কেমন লাগছে? তোমার বর তো এখন পাগলের মতো তোমাকে খুঁজছে।"
"আমাকে ছেড়ে দিন... প্লিজ... আমার স্বামী আপনাকে মেরে ফেলবে..."
"তোমার স্বামী? ওই আরিয়ান? ও তো তোমাকে পুতুল বানিয়ে রেখেছে। আমি তোমাকে মুক্তি দেবো। তুমি শুধু আমার হয়ে যাও।"
বলেই রাহাত রূপসীর দিকে এগিয়ে এলো। তার শাড়ির আঁচল ধরতে যাবে...
ঠিক তখনই দরজাটা বোমার মতো ফেটে গেলো।
আরিয়ান!
পুরো শরীর ঘামে ভেজা, চোখ লাল, হাতে একটা লোহার রড।
"রাহাত!!!"
রাহাত ভয়ে পিছিয়ে গেলো - "আরিয়ান! তুই... তুই কিভাবে..."
আরিয়ান কোনো কথা না বলে রাহাতের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। রড দিয়ে মারতে শুরু করলো। একের পর এক।
"আমার রূপসীকে ছুঁয়েছিস! তোর সাহস কি করে হয়! ও আমার! শুধু আমার!"
রাহাত মাটিতে পড়ে কাঁদছে - "মাফ কর... ভুল হয়ে গেছে..."
আরিয়ান থামলো না। ততক্ষণ মারলো, যতক্ষণ না রাহাত অজ্ঞান হয়ে গেলো।
তারপর সে ছুটে গিয়ে রূপসীর বাঁধন খুলে দিলো।
রূপসী তাকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো - "আরিয়ান..."
আরিয়ান তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। কোলে তুলে নিলো। তার কপালে, তার চোখে পাগলের মতো চুমু খেতে লাগলো।
"আমি এসে গেছি... আমার রূপসী... কেউ তোমাকে আর ছুঁতে পারবে না... আমি আছি..."
রূপসী তার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে - "আমি ভেবেছি আপনি আর আসবেন না..."
"আমি না এসে কোথায় যাবো? তুমি আমার নিঃশ্বাস।"
বলেই আরিয়ান তাকে কোলে করেই ফার্মহাউস থেকে বেরিয়ে এলো। বাইরে পুলিশ দাঁড়িয়ে।
আরিয়ান কারো দিকে তাকালো না। সোজা গাড়িতে গিয়ে রূপসীকে বসালো। নিজে ড্রাইভ করে বাড়ির দিকে রওনা দিলো।
গাড়িতে রূপসী তার বুকে মাথা রেখে আছে।
"আরিয়ান, আমার ভয় করছে..."
"ভয় নেই। আমি তোমাকে আবার সেই সিঁড়ি দিয়ে কোলে করে উপরে নিয়ে যাবো। আজকের পর থেকে তুমি এক সেকেন্ডের জন্যও আমার চোখের আড়াল হবে না।"
"সত্যি?"
"হ্যাঁ। তুমি আমার রূপসী। তুমি শুধু আমার বুকেই থাকবে।"
গাড়ি চলছে রাজপ্রাসাদের দিকে। পেছনে পড়ে রইলো অজ্ঞান রাহাত আর তার ভাঙা অহংকার।
আর বাড়িতে মাধুরী চৌধুরী তখনো জানে না, তার প্ল্যান আবার ফেল করেছে। আর এবার আরিয়ান তাকে ছাড়বে না।
---
*চলবে...*
কেমন হয়ছে বলে যাবেন প্লিজ 🥹