#প্রেম আমার
#পর্ব -১
শরতের এক মায়াবী রাত।
আকাশজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অগণিত ঝিকিমিকি তারা। দূর আকাশের চাঁদটা মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছে। জানালার ফাঁক গলে ভেসে আসছে শরতের স্নিগ্ধ বাতাস, যার মৃদু পরশে জানালার পাশে ঝুলে থাকা পর্দাটা ধীরে ধীরে দুলছে। চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন রাতের গভীরতাকে আরও নিবিড় করে তুলেছে। প্রকৃতি তার সমস্ত ব্যস্ততা ভুলে শান্ত হয়ে আছে, অথচ কারও কারও মনে তখনও বয়ে চলেছে অজস্র ভাবনার ঢেউ।
ঘরের এক কোণে রাখা কাঠের চেয়ারটিতে বসে আছে একটি মেয়ে। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ মুঠোফোনের আলোকিত পর্দায়। কাঁধ ছুঁয়ে নেমে আসা ঘন কালো চুলগুলো আলতোভাবে ছড়িয়ে রয়েছে কাঠের ওপর। মুখজুড়ে শান্ত, স্নিগ্ধ এক আভা। কিন্তু সেই শান্ত মুখের আড়ালে চোখ দুটো যেন হারিয়ে গেছে কোনো এক অজানা ভাবনায়। মাঝেমধ্যে আঙুলের স্পর্শে ফোনের পর্দাটা জ্বলে উঠছে, আবার নিভেও যাচ্ছে। অথচ মেয়েটির মনোযোগের যেন কোনো নড়চড় নেই।
সে আর কেউ নয়, রহমান পরিবারের একমাত্রকন্যা— সিদরাতুল ঈশিতা রহমান।
বয়স মাত্র পনেরো। কৈশোরের চঞ্চলতা আর বেড়ে ওঠার নীরব পরিবর্তনে গড়ে ওঠা এক মায়াবী বয়স তার। বাবা-মায়ের আদর, ভাইয়ের শাসন আর পরিবারের ভালোবাসায় ঘেরা তার ছোট্ট পৃথিবী। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, জীবনের কাছে তার চাওয়ার কিছুই বাকি নেই। অথচ মানুষের মনের ভেতর যে কত অজানা গল্প লুকিয়ে থাকে, তা কি আর বাইরে থেকে বোঝা যায়?
ঈশিতার বাবা সাবির রহমান পেশায় একজন চিকিৎসক। পেশাগত ব্যস্ততা থাকলেও পরিবারের প্রতি তাঁর ভালোবাসায় কোনো কমতি নেই। মেয়ে তাঁর ভীষণ আদরের। আর মা ফাহিমা রহমানের কাছে ঈশিতা যেন এক টুকরো প্রশান্তি—যার হাসিতে ঘরের প্রতিটি কোণ আলোকিত হয়ে ওঠে।
পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য হওয়ায় ঈশিতার আবদারেরও শেষ নেই। কখনো মায়ের কাছে বায়না, কখনো বাবার কাছে ছোট্ট কোনো দাবি, আবার কখনো ভাইয়ের সঙ্গে খুনসুটি—এভাবেই কেটে যায় তার দিনগুলো।
ঈশিতার একমাত্র ভাই ইশান রহমান। বয়সে তার চেয়ে দুই বছরের বড়, সতেরো বছরের এক কিশোর। বোনের সঙ্গে খুনসুটি করা, অকারণে বিরক্ত করা আর সুযোগ পেলেই তাকে রাগিয়ে দেওয়া যেন তার নিত্যদিনের অভ্যাস। তবে সেই দুষ্টুমির আড়ালে বোনের প্রতি তার গভীর স্নেহও লুকিয়ে আছে। ঈশিতার মন খারাপ হলে সবার আগে তা বুঝতে পারে ইশানই।
রহমান পরিবারের এই ছোট্ট পৃথিবীটা ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। সেখানে অভাব নেই হাসির, নেই আপনজনের স্নেহের। তবুও জীবনের কিছু মুহূর্ত আসে, যখন কোনো কারণ ছাড়াই মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে যায়। চারপাশে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও হৃদয়ের গভীরে জন্ম নেয় অদ্ভুত কিছু অনুভূতি, যার ব্যাখ্যা নিজের কাছেও অজানা থেকে যায়।
আজকের রাতটা ঠিক তেমনই।
জানালার বাইরে শরতের আকাশ নীরবে তার সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। দূর থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার মৃদু ডাক। ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে রাতের গভীরতার দিকে। অথচ ঈশিতার চোখে ঘুমের কোনো চিহ্ন নেই।
ফোনের পর্দায় একবার চোখ বুলিয়ে সে আবারও জানালার বাইরে তাকাল। ঠান্ডা বাতাস এসে আলতো করে ছুঁয়ে গেল তার মুখ। কপালে এসে পড়া চুলগুলো কানের পেছনে সরিয়ে নিল সে।
তারপর অন্যমনস্কভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল, রাতগুলো কি সত্যিই এত সুন্দর, নাকি নীরবতার মধ্যেই মানুষ নিজের অজান্তে খুঁজে ফেরে অজানা কোনো গল্প?
উত্তরটা তার জানা নেই।
শুধু এটুকু জানে, শরতের এই রাতটা অন্য রাতগুলোর মতো নয়। কেন এমন মনে হচ্ছে, তা নিজেও বুঝতে পারছে না ঈশিতা।
হয়তো কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
হয়তো এই নীরব রাতের বুকেই লুকিয়ে আছে এমন কোনো গল্প, যার শুরুটা আজ হলেও শেষটা লেখা থাকবে আরও অনেক দূর পর্যন্ত।
আর সেই গল্পের প্রথম পাতায়, অজান্তেই, নিজের নাম লিখে ফেলেছে সিদরাতুল ঈশিতা রহমান।
হঠাৎ ফোনের শব্দে নীরব ঘরটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল অচেনা একটি আইডি থেকে আসা মেসেজ।
“আসসালামু আলাইকুম। I think you are my Mehu Jaan.”
মেসেজটা দেখে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল ঈশিতা। অপরিচিত কথাগুলোর আড়ালে যেন লুকিয়ে আছে কোনো এক অজানা রহস্য।
কিছু একটা মনে করে সে অচেনা আইডিটা দেখতে লাগল। প্রোফাইল দেখে বোঝা গেল, এটি একটি ছেলের আইডি। ঈশিতা ভীষণ অবাক হলো। এর আগে তো কখনো এমনটা ঘটেনি! কে এই ছেলে? আর হঠাৎ করেই বা তাকে এমন মেসেজ পাঠাল কেন?
আর কিছু না ভেবেই সে উত্তর দিল,
— কে আপনি?
মেসেজ পাঠানোর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অপর প্রান্ত থেকে উত্তর এল,
— আমি কে, সেটা তোমার জেনে লাভ নেই। অনেক রাত হয়েছে, ঘুমিয়ে পড়ো, ঈশিতা।
মুহূর্তেই ঈশিতার বিস্ময় যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। ছেলেটি শুধু তার নামই জানে না, বরং রাত জেগে থাকার কথাটাও যেন বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে!
মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
— কে এই অচেনা আইডির মালিক? আর সে আমার নাম জানল কীভাবে?
বিষয়টা তার কাছে ভীষণ অদ্ভুত লাগল। অপরিচিত একজন মানুষ, অথচ তার কথার ধরনে এমন একটা পরিচিতির ছাপ, যেন সে ঈশিতাকে অনেক আগে থেকেই চেনে।
মেসেজটা পড়ে ঈশিতা আর কিছু বলল না। তবে কৌতূহল যেন কিছুতেই তার পিছু ছাড়ছিল না। সে আবারও অচেনা আইডিটার দিকে তাকাল।
আইডির নাম— Mehur Raja।
নামটা দেখে ঈশিতা মনে মনে বলে উঠল,
— Mehur Raja! তার মানে, এই আইডির মালিকের মনের মানুষ আছে! কিন্তু একটা বিষয় আমার চোখ এড়াল না। ‘মেহু’— নামটা ধরে অপর প্রান্তের মানুষটিও তো আমাকে ডেকেছে!
কথাটা মনে আসতেই সে আবারও মেসেজটা খুলে পড়ল। প্রতিটি শব্দ যেন নতুন করে তার মনে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছিল। কে এই মানুষটা? কেনই-বা তাকে নিজের মনের মানুষ বলে সম্বোধন করল? আর তার নামই বা জানল কীভাবে?
কোনো প্রশ্নের উত্তরই তার কাছে ছিল না।
রাত বাড়তে লাগল। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত দেড়টা ছুঁয়েছে।
জানালার পাশে চুপচাপ বসে শরতের মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে ঈশিতা। চোখে তার ঘুম নেই, মনে একরাশ অজানা কৌতূহল। বারবার একই প্রশ্ন ফিরে আসছে—
কে সে?
কেন জানি না, অচেনা মানুষটার পাঠানো কয়েকটি শব্দই তার সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে। অথচ সে মানুষটিকে কখনো দেখেনি, তার কণ্ঠস্বরও শোনেনি। শুধু একটি নাম আর কয়েকটি মেসেজ— এতটুকুই তার পরিচয়।
তবুও মনের ভেতর কেমন এক অদ্ভুত অনুভূতি জমতে শুরু করেছে। কৌতূহল, বিস্ময় আর অজানা প্রশ্নের ভিড়ে নিজের ভাবনাগুলোই যেন নিজের কাছে অপরিচিত হয়ে উঠল।
একসময় ক্লান্ত চোখের পাতায় ধীরে ধীরে ঘুম নেমে এল। সমস্ত প্রশ্নের উত্তর নিজের অজান্তেই মনের গভীরে আটকে রেখে চোখ বন্ধ করল ঈশিতা। দীর্ঘ সময়ের অস্থিরতার পর অবশেষে ঘুমের কাছে হার মানল সে।
ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে দূরের মসজিদ থেকে ভেসে এল ফজরের আজান। শরতের শীতল বাতাসে মিশে গেল সেই সুমধুর ধ্বনি। জানালার বাইরে তখনও হালকা অন্ধকারের আবেশ, ঘাসের ডগায় জমে আছে শিশিরবিন্দু। ধীরে ধীরে পূর্ব আকাশে আলো ফুটতে শুরু করল।
পাখির মিষ্টি ডাক আর শিউলি ফুলের সুবাসে চারপাশ ভরে উঠল এক অপূর্ব স্নিগ্ধতায়। মনে হলো, নতুন দিনটি যেন এক মুঠো প্রশান্তি নিয়ে পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছে।
প্রকৃতি তার আপন নিয়মে নতুন সকালকে বরণ করে নিলেও ঈশিতার মনের আকাশে তখনও জমে রয়েছে রাতের সেই অজানা রহস্য।
সাধারণত সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে নতুন দিনের ব্যস্ততায় নিজেকে হারিয়ে ফেলে ঈশিতা। কিন্তু আজ তার মনটা কেমন যেন আনমনা। রাতের সেই মেসেজগুলো বারবার মনে পড়ছে। অচেনা আইডির নামটা যেন মনের মধ্যে গেঁথে গেছে।
Mehur Raja।
নামটা মনে পড়তেই সে একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আজকের সকালটা অন্য সব সকালের মতো নয়। চারপাশে এত আলো, এত স্নিগ্ধতা, অথচ ঈশিতার মনের ভেতর কোথাও যেন একটুকরো অন্ধকার রয়ে গেছে।
কে এই অচেনা মানুষটি? কেনই-বা সে ঈশিতাকে ‘মেহু জান’ বলে ডাকল?
চলবে ইনশাল্লাহ
পর্ব -২