ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার

পর্ব 2

লেখক: আরজিনা খাতুন

#প্রেম আমার
#পর্ব - ২

নামাজ আদায় করেই ঈশিতা তার বিজ্ঞান বই নিয়ে পড়তে বসে পড়ল। আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল, আজ বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ভালোভাবে পড়ে শেষ করবে। তাই আর সময় নষ্ট না করে বই খুলে মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করল সে।

পড়ার মধ্যে এতটাই ডুবে গিয়েছিল যে আশপাশের কোনো দিকে তার খেয়ালই ছিল না।

হঠাৎ—

টিং!

ফোনে মেসেজ আসার শব্দে চমকে উঠল ঈশিতা। বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,

— কে রে, এত সকালে আবার কার আমাকে মনে পড়ল? ধুর! পড়ার মুডটাই নষ্ট করে দিল!

পরক্ষণেই কৌতূহল যেন বিরক্তিকে হার মানাল। তাড়াতাড়ি বইটা বন্ধ করে পাশে রেখে ফোনের দিকে হাত বাড়াল সে।

ফোনের স্ক্রিনে চোখ পড়তেই মুহূর্তের জন্য থমকে গেল ঈশিতা।

আবারও সেই অচেনা আইডি!

গত রাতের ঘটনাটা মনে পড়তেই তার কপালে চিন্তার ভাঁজ ফুটে উঠল। এই ছেলেটা আবারও মেসেজ করেছে! এবার কী লিখেছে, তা জানার জন্য আর অপেক্ষা করতে পারল না সে।

তাড়াতাড়ি মেসেজটা খুলল ঈশিতা।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল কয়েকটি শব্দ—

“Good morning, Mehu Jaan.”

মেসেজটা পড়ে ঈশিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর অবাক হয়ে বিড়বিড় করে বলল,

— আবারও মেহু জান! আরে বাবা, এই লোকটা আমাকে মেহু জান বলে ডাকে কেন? কে সে? আর আমাকে নিয়েই বা এত মাথাব্যথা কেন তার?

আর চুপ করে থাকতে পারল না ঈশিতা। সঙ্গে সঙ্গেই মেসেজের উত্তর দিল।

“I am not Mehu. My name is Sidratul Eshita Rahman.”

মেসেজ পাঠানোর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অপর প্রান্ত থেকে উত্তর এল—

“I know.”

উত্তরটা দেখেই ঈশিতার রাগ যেন আরও বেড়ে গেল।

— কী আশ্চর্য! আমার নাম থাকতে এই অচেনা লোকটা আমাকে মেহু বলে ডাকবে কেন? আর জানেই যখন, তাহলে আবার এই নামে ডাকার কী দরকার?

রাগে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল সে। কিন্তু আর কোনো উত্তর দিল না। অচেনা আইডির মালিকের সঙ্গে তর্ক করে সময় নষ্ট করার কোনো ইচ্ছাই তার ছিল না।

ফোনটা পাশে রেখে আবারও বিজ্ঞান বইটা হাতে তুলে নিল ঈশিতা। ঠিক করল, এবার মন দিয়ে পড়বে। কিন্তু যতই চেষ্টা করুক, কিছুতেই পড়ায় মন বসাতে পারল না।

বারবার সেই অচেনা আইডিটার কথা মনে পড়তে লাগল। ছেলেটার কথাবার্তা, তাকে ‘মেহু জান’ বলে ডাকা—সবকিছুই কেমন যেন অদ্ভুত লাগছিল।

একসময় একগাদা চিন্তায় মাথাটা বেশ ধরে গেল তার। আর সহ্য করতে না পেরে বইটা বন্ধ করে রাখল ঈশিতা। তারপর ওষুধের বাক্স থেকে একটা ট্যাবলেট বের করে খেয়ে নিল। বিছানায় শুয়ে সমস্ত চিন্তা দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করল সে।

চোখ বন্ধ করতেই ধীরে ধীরে ঘুম নেমে এল তার চোখের পাতায়।

যোহরের আজান কানে আসতেই ঘুম ভাঙল ঈশিতার। উঠে বসে কিছুক্ষণ নিজেকে সামলে নিল সে। তারপর অজু করে নামাজ আদায় করে নিল।

নামাজ শেষে মনটা আগের তুলনায় কিছুটা শান্ত লাগল তার।

---

দুই মাস পর

এভাবেই দেখতে দেখতে কেটে গেল প্রায় দুই মাস।

এই দুই মাসে ঈশিতার সঙ্গে সেই অচেনা আইডির মালিকের বেশ ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। প্রথমদিকে যার মেসেজে ঈশিতা বিরক্ত হতো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গেই কথা বলা যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

কথায় কথায় তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত বোঝাপড়া। কখনো পড়াশোনা নিয়ে কথা হয়, কখনো দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো ঘটনা নিয়ে। কখনো আবার দুজনের মধ্যে চলে খুনসুটি।

তবে একটা বিষয় এত দিন অজানা ছিল ঈশিতার কাছে—ছেলেটির পরিচয়।

প্রায় এক মাস আগে একদিন ঈশিতা নিজেই তাকে প্রশ্ন করেছিল,

— আচ্ছা, আপনার নাম কী? আপনার পরিচয়টা কী?

অপর প্রান্ত থেকে উত্তর এসেছিল,

— আমি তোমাকে সবকিছু বলতে পারব না। তবে আমি চৌধুরী পরিবারের একমাত্র ছেলে, নিহাদ চৌধুরী।

উত্তরটা পড়ে ঈশিতা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। ছেলেটি তার পরিচয়ের সবটা জানাতে চায়নি, শুধু নিজের নামটুকু জানিয়েছে। ঈশিতাও আর বেশি কিছু জানতে চায়নি।

সেই থেকে সে জানে, অচেনা আইডির আড়ালে থাকা মানুষটির নাম নিহাদ চৌধুরী।

তবে তাদের বন্ধুত্বের এই দুই মাসে ঈশিতা একবারও কল্পনা করতে পারেনি, এই পরিচয়ের আড়ালে নিহাদের মনে তার জন্য অন্য রকম কোনো অনুভূতিও জন্ম নিতে পারে।

---

আজ শুক্রবার।

নামাজ আদায় করে ঈশিতা নিচে খেতে গেল। রহমান পরিবারের একটি সুন্দর নিয়ম হলো, শুক্রবারে পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাবার খায়। ব্যস্ততার কারণে অন্য দিনগুলোতে সব সময় তা সম্ভব না হলেও শুক্রবারের এই সময়টুকু সবাই একসঙ্গে কাটানোর চেষ্টা করে।

ঈশিতা নিচে নেমে দেখল, পরিবারের সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছেন।

— এই তো, আমার মেয়ে এসে গেছে!— সাবির রহমান মেয়েকে দেখে মৃদু হেসে বললেন।

ঈশিতা বাবার পাশে গিয়ে বসল।

— সরি, আব্বু। একটু দেরি হয়ে গেল।

— কোনো ব্যাপার না। এবার খাওয়া শুরু করো।

পরিবারের সবাই একসঙ্গে খেতে বসল। খাবারের টেবিলে চলল টুকটাক কথাবার্তা, হাসি আর পরিবারের ছোটখাটো গল্প।

খাওয়া শেষ করে ঈশিতা কিছুক্ষণ তার বাবা সাবির রহমানের সঙ্গে কথা বলল। বাবার সঙ্গে কথা বলতে তার সব সময়ই ভালো লাগে। বাবার কাছে সে যেমন নিজের ছোট ছোট আবদার করতে পারে, তেমনি মনের কথাও নির্দ্বিধায় বলতে পারে।

কিছুক্ষণ পর মায়ের কাছ থেকে ফোনটা নিয়ে নিজের ঘরের দিকে রওনা হলো ঈশিতা।

ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। তারপর বিছানায় বসে ফোনের স্ক্রিনে মনোযোগ দিতেই তার চোখ কপালে উঠে যাওয়ার উপক্রম হলো।

নিহাদ তাকে একসঙ্গে একশো র বেশি মেসেজ পাঠিয়েছে!

ঈশিতা অবিশ্বাসের চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

— এই মানুষটা কি পাগল নাকি? এতগুলো মেসেজ! একসঙ্গে এত মেসেজ কেউ পাঠায়?

রাগে গজগজ করতে করতে সে মেসেজগুলো দেখতে শুরু করল।

কিন্তু কয়েকটা মেসেজ পড়তেই তার অবস্থা আরও খারাপ হলো।

মেসেজের বেশির ভাগ জুড়েই লেখা—

“I love you, Eshita.”

“Please, tumi amar hoye jao.”

“I love you so much.”

“Please, Eshita.”

একটার পর একটা মেসেজ।

ঈশিতা যতটা অবাক হয়েছিল, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি রাগ হলো তার।

যে মানুষটাকে সে বন্ধুত্বের জায়গা দিয়েছে, যার সঙ্গে এত দিন একজন বন্ধুর মতো কথা বলেছে, সেই মানুষটাই এখন তার কাছে ভালোবাসার স্বীকৃতি চাইছে!

বিষয়টা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না ঈশিতা।

রাগের মাথায় সে পরপর কয়েকটি মেসেজ লিখে পাঠিয়ে দিল। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই নিজের সমস্ত ক্ষোভ উগরে দিল নিহাদের ওপর।

---

মূল সূচনা

“ছি, নিহাদ ভাইয়া! ছি! যে মানুষটা আপনাকে বন্ধুত্বের জায়গা দিয়েছিল, এখন তার কাছেই আপনি ভালোবাসার মর্যাদা চাইছেন? এটা আপনার মুখে মানায় না!”

ঈশিতা শুধু এটুকু বলেই থামেনি। রাগের মাথায় আরও অনেক কথা শুনিয়ে দিল নিহাদকে। তার প্রতিটি মেসেজে জমে ছিল অভিমান, বিরক্তি আর একরাশ অভিযোগ।

অপর প্রান্তে বসে নিহাদ একের পর এক মেসেজ পড়ে গেল।

সবগুলো মেসেজ সিন করল সে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, একটারও উত্তর দিল না।

না কোনো প্রতিবাদ, না কোনো অভিযোগ, এমনকি নিজের অনুভূতিগুলোর পক্ষেও একটি কথা বলল না।

শুধু ঈশিতার পাঠানো মেসেজগুলো পড়ে নীরবে অফলাইনে চলে গেল নিহাদ।

ঈশিতা তখনও রাগে অস্থির। ফোনটা পাশে রেখে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল, সে যা বলেছে, ঠিকই বলেছে।

কিন্তু সে জানত না, তার কয়েকটি কঠিন কথা অপর প্রান্তের মানুষটাকে কতটা নীরব করে দিয়েছে।

এরপর কেটে গেল পাঁচটা দিন।

পাঁচটা দীর্ঘ দিন।

নিহাদ একবারও মেসেজ করল না। এমনকি অনলাইনেও এল না।

যে মানুষটা আগে একসঙ্গে এতগুলো মেসেজ পাঠাত, যার মেসেজে ফোনের স্ক্রিন ভরে থাকত, সেই মানুষটা যেন হঠাৎ করেই কোথাও হারিয়ে গেল।

প্রথম দিন ঈশিতা বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি।

দ্বিতীয় দিনেও নিজেকে বোঝাল, ভালোই হয়েছে। অন্তত আর বিরক্ত হতে হচ্ছে না।

কিন্তু দিন যত গড়াতে লাগল, মনের ভেতর জমতে থাকল এক অদ্ভুত শূন্যতা।

পঞ্চম দিনে এসে ঈশিতা আর নিজেকে বোঝাতে পারল না।

বারবার ফোনটা হাতে নিচ্ছে, আবার রেখে দিচ্ছে। মেসেজের তালিকায় নিহাদের নামটা দেখছে, অথচ কোনো নতুন মেসেজ নেই।

তার বুকের ভেতর কেমন একটা খচখচানি শুরু হয়েছে।

যে মানুষটা তাকে এতটা ভালোবাসে, সেই মানুষটাকে সে কীভাবে এত খারাপ কথা বলতে পারল?

নিজের কাছেই নিজেকে স্বার্থপর মনে হতে লাগল ঈশিতার।

নিহাদ তো তার কাছে ভালোবাসা চেয়েছিল। আর সে? রাগের মাথায় মানুষটাকে কত কথাই না শুনিয়ে দিয়েছে!

হয়তো নিহাদ সত্যিই কষ্ট পেয়েছে। হয়তো তার কথাগুলো নিহাদের মনে গভীরভাবে আঘাত করেছে।

এসব ভাবতে ভাবতেই ঈশিতার চোখ ভিজে উঠল।

হঠাৎই আর নিজেকে সামলাতে পারল না সে। মুখে হাত চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

অনেক দিন পর যেন নিজের মনের ভেতর জমে থাকা অনুভূতিগুলো একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

কিন্তু কেন এত খারাপ লাগছে তার?

নিহাদ কি শুধুই তার বন্ধু?

নাকি বন্ধুত্বের আড়ালে এমন কিছু অনুভূতি লুকিয়ে আছে, যার নাম সে নিজেও এখনো বুঝে উঠতে পারেনি?

প্রশ্নগুলো মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল।

কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো কেউ ছিল না।

---

এদিকে ঈশিতাদের বাড়িতে এসেছেন তার ফুফু রুমা রহমান ও ফুফাতো বোন সামিয়া।

মূলত ঈশিতার দাদিমার শরীর অসুস্থ থাকার কারণেই তাঁদের আসা। বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা বেড়েছে। আর পুজোর ছুটি থাকায় ঈশিতা ও সামিয়া—দুজনেরই পড়াশোনার চাপ তুলনামূলক কম। প্রায় দুই মাসের স্কুলের ছুটি থাকায় তারা এখন বেশ খানিকটা অবসর সময় পাচ্ছে।

রুমা রহমান ভাইয়ের বাড়িতে প্রবেশ করতেই তাঁর সঙ্গে দেখা হলো সাবির রহমানের।

রুমা হাসিমুখে সালাম দিলেন,

— আসসালামু আলাইকুম, ভাইজান! কেমন আছো?

সঙ্গে সঙ্গে সামিয়াও তার মামার দিকে এগিয়ে এসে সালাম দিল,

— আসসালামু আলাইকুম, মামা! কেমন আছো, মামা?

সাবির রহমান বোন ও ভাগনির সালামের উত্তর দিয়ে মৃদু হেসে বললেন,

— ওয়ালাইকুমুস সালাম। আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। তোমরা কেমন আছো?

রুমা রহমান উত্তর দিলেন,

— আলহামদুলিল্লাহ, আমরাও ভালো আছি।

সামিয়াও হাসিমুখে বলল,

— আমিও ভালো আছি, মামা।

সাবির রহমান স্নেহভরা চোখে বোন ও ভাগনির দিকে তাকালেন। দীর্ঘদিন পর বাড়িতে তাঁদের আগমনে তাঁর মুখেও আনন্দের ছাপ ফুটে উঠল।

বাড়ির পরিবেশটা যেন মুহূর্তেই আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।

তবে এই বাড়ির একটি ঘরে তখনও নীরবে বসে আছে ঈশিতা। তার ফোনের স্ক্রিনে এখনো কোনো নতুন মেসেজ আসেনি।

পাঁচ দিনের সেই নীরবতা তার মনকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, যে বাড়িতে নতুন অতিথি এসেছে—সেই আনন্দের মাঝেও তার মন বারবার ফিরে যাচ্ছে একটাই নামের কাছে।

নিহাদ চৌধুরী....

চলবে ইনশাল্লাহ
পর্ব -৩

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 2 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন