# প্রেম আমার
# পর্ব - ১৫
রাতটা অদ্ভুত নীরব ছিল। জানালার পাশে বসে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ছিল নিহাদ। চারপাশে সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও তার চোখে তখনও ঘুমের কোনো চিহ্ন নেই। মাথার ভেতর নানা রকম চিন্তা ঘুরছিল।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ইশানের নাম দেখে নিহাদ দ্রুত ফোনটা ধরল।
— হ্যালো, ইশান?
ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ কোনো কথা শোনা গেল না। তারপর ইশানের ভারী গলা ভেসে এল—
— নিহাদ... একটা খারাপ খবর আছে।
নিহাদের বুকটা কেমন যেন ধক করে উঠল।
— কী হয়েছে?
ইশান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আমাদের দাদিমা... মারা গেছেন।
কথাটা শুনেই নিহাদ যেন কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর খুব নিচু গলায় বলল,
— ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন...
কিছুক্ষণ দুজনের কেউই কথা বলল না।
_ ঈশিতা কে সামলাতে পারছি না
কথাটা শুনে নিহাদ এর বুক টা স্তব্ধ হয়ে গেলো কিছু মুহূর্তের জন্য
নিহাদ শুধু বলল,
— আমি আসছি।
ফোনটা রেখে সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।
---
ঈশিতাদের বাড়িতে পৌঁছাতেই নিহাদ বুঝতে পারল, বাড়িটার চেনা পরিবেশটা আজ কতটা বদলে গেছে। যে বাড়িতে সবসময় মানুষের কথাবার্তা, হাসি আর ব্যস্ততায় ভরা থাকত, সেখানে আজ যেন শুধু কান্নার শব্দ।
ঈশিতার আব্বু একপেশে চুপ করে দাঁড়িয়ে হয়তো এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না তার মা আর নেই
।ছোট বেলায় বাবা কে হারিয়ে মাকে নিজের দুনিয়া মনে করত সাবির রহমান বড় হয়ে নিজের সর্ব চেষ্টা করে নিজের মাকে সুখী রেখেছিল আজ সেই মানুষ টা আর নেই ।
ঈশিতা এক কোণে বসে ছিল। চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। পাশে পরিবারের কয়েকজন তাকে ধরে রেখেছিল।
নিহাদকে দেখতেই ঈশিতা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
— আপনি এসেছেন?
নিহাদ মাথা নেড়ে বলল,
— হ্যাঁ। তুমি কেমন আছ?
ঈশিতা কোনো উত্তর দিতে পারল না। চোখের পানি আবার গড়িয়ে পড়ল।
— দাদিমা আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন...
নিহাদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— কাঁদতে ইচ্ছে করলে কাঁদো। মনটা আটকে রেখো না। আল্লাহ যেন উনাকে মাফ করে দেন এবং রহমত করেন।
ঈশিতা আর নিহাদ কিছু ক্ষণ একে অপরের সাথে কথা বলল মূলত সবার ব্যস্ততার মাঝে কাও লক্ষ্য করি নি তাদের তবে সামিয়ার চোখ প্রতিবেরের মত ওই দুটো মুখ কে লক্ষ্য করছে ।
সামিয়া কখনও ভাবতো পরি নি যে মানুষ তাকে সে ৫ বছর ভালোবাসছে সেই মানুষ টা এখন অন্য কারোর ।
ঈশিতা চোখ মুছে মাথা নিচু করে রইল।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে পরিচিত একটা কণ্ঠ শোনা গেল।
— ঈশিতা!
ঈশিতা তাকিয়ে দেখল, রুহি এসেছে।
রুহি দ্রুত তার কাছে এসে বসে পড়ল। ঈশিতার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,
— আমি খবরটা পেয়েই চলে এলাম। তুই একা একা সব সামলাবি না।
ঈশিতা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। রুহিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।
— রুহি... দাদিমা আমাকে কত ভালোবাসতেন জানিস?
রুহির চোখেও পানি এসে গেল।
— জানি রে। তুই উনার কথা কত বলতিস, সেটাও জানি।
ঈশিতা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— আমার খুব ভয় করছে। মনে হচ্ছে সবকিছু হঠাৎ বদলে গেল।
রুহি তার মাথায় হাত রেখে বলল,
— সবকিছু একদিনে ঠিক হবে না। কিন্তু তুই একা থাকবি না। আমি আছি।
কিছুক্ষণ পর রুহি চোখ তুলে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইশানকে দেখল।
— ইশান ভাইয়া...
ইশান এগিয়ে এসে বলল,
— হুম?
— ঈশিতার পাশে একটু থাকবেন? ও খুব ভেঙে পড়েছে।
ইশান শান্ত গলায় বলল,
— থাকব। তুইও ওর সঙ্গে থাক।
রুহি মাথা নেড়ে বলল,
— আমি আজ রাতে ওর কাছেই থাকব, ইশান ভাইয়া।
ইশান শুধু বলল,
— ঠিক আছে।
দুজনের চোখাচোখি হলো এক মুহূর্তের জন্য। কিন্তু সেই দৃষ্টির অর্থ কেউ বুঝল না। তাদের নিজেদের ছোট্ট গোপন সম্পর্কের কথা তারা কাউকেই জানাতে চায় না।
---
এরপর বাড়ির পরিবেশ আরও ভারী হয়ে উঠল।
পরিবারের বড়রা দাদিমার গোসল ও কাফনের ব্যবস্থা করতে গেলেন। বাড়ির অন্যরা কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়ার মধ্যে ছিলেন।
ঈশিতা চুপচাপ বসে সবকিছু দেখছিল। মাঝে মাঝে তার চোখ চলে যাচ্ছিল সেই ঘরের দিকে, যেখানে কিছুক্ষণ আগেও দাদিমা ছিলেন।
নিহাদ দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। সে বুঝতে পারছিল, এই মুহূর্তে ঈশিতার পাশে থাকার চেয়ে বড় কোনো কাজ তার নেই।
কিছুক্ষণ পর ঈশিতা ধীরে ধীরে তার কাছে এসে বলল,
— আপনি কি একটু থাকবেন?
নিহাদ শান্তভাবে বলল,
— যতটা পারি, পাশে থাকব।
ঈশিতা আর কিছু বলল না। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
রুহি পাশে এসে আবার তার হাতটা ধরে বলল,
— ঈশিতা, চল। একটু বস।
— তুই যাবি না তো?
— না। আমি কোথাও যাচ্ছি না।
এই ছোট্ট কথাটাই যেন ঈশিতাকে একটু শান্ত করল।
---
পরদিন জানাজার সময় সবাই মসজিদের দিকে গেল। চারপাশে ছিল নীরবতা। ইমামের নেতৃত্বে জানাজার নামাজ আদায় করা হলো।
নিহাদও সবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে দোয়া করল—
— আল্লাহ, উনাকে মাফ করে দিন। উনার কবরকে প্রশস্ত করুন। উনার প্রতি রহমত করুন এবং জান্নাত নসিব করুন।
দাফনের সময় ঈশিতা দূর থেকে চোখের পানি মুছছিল। রুহি তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
রুহি আস্তে করে বলল,
— আল্লাহর কাছে দোয়া কর। উনার জন্য দোয়া করলেই সবচেয়ে বেশি উপকার হবে।
ঈশিতা চোখ বন্ধ করে দুহাত তুলল।
— আল্লাহ... আমার দাদিমাকে মাফ করে দিন। উনার ওপর রহম করুন।
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নিহাদও নীরবে দোয়া করছিল।
সবশেষে যখন সবাই ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে ফিরছিল, ঈশিতা একবার আকাশের দিকে তাকাল।
তার মনে হলো, মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাদের ভালোবাসা থেকে যায়।
দাদিমা আর কখনো তাকে ডাকবেন না, মাথায় হাত বুলিয়ে দেবেন না। কিন্তু তার দেওয়া ভালোবাসা ঈশিতার মনে সারাজীবন বেঁচে থাকবে।
রুহি তার হাতটা শক্ত করে ধরে হাঁটছিল।
আর একটু দূরে নিহাদ নীরবে তাদের পেছনে হাঁটছিল।
আজ কোনো বড় কথা বলার প্রয়োজন ছিল না।
কিছু সম্পর্ক শুধু কথায় নয়—কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়িও য়েই নিজেদের সত্যি প্রমাণ করে।
চলবে ইনশাল্লাহ
পর্ব -১৬