# প্রেম আমার
# পর্ব - ১৪
নতুন বছরের প্রথম দিনের রেশ তখনও কাটেনি।
পরের সকালটা ছিল বেশ ঠান্ডা। জানালার কাঁচে জমে থাকা শিশিরের ফোঁটাগুলো সকালের আলোয় চিকচিক করছিল। ঈশিতা স্কুলের পোশাক পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলটা ঠিক করছিল।
হঠাৎ ফোনে মেসেজ এল।
রুহি:
“তাড়াতাড়ি বেরো। আজ কিন্তু স্কুলে প্রথম দিন। দেরি করলে কিন্তু তোকে ছাড়ব না!”
ঈশিতা হেসে ফোনটা ব্যাগে রেখে দিল।
কিছুক্ষণ পর স্কুলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল সে।
স্কুলের গেটের কাছে পৌঁছাতেই দূর থেকে রুহিকে দেখা গেল। তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল সাদিয়া।
ঈশিতাকে দেখেই রুহি হাত নাড়ল।
—এই যে! অবশেষে এলি!
ঈশিতা হেসে বলল,
—এত চিৎকার করছিস কেন?
সাদিয়া মুচকি হেসে বলল,
—ওর তোকে ছাড়া সকাল শুরুই হয় না।
রুহি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—চুপ কর!
ঈশিতা দুজনের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল—
—সকাল সকাল এত হাসাহাসি কিসের?
ঈশিতা ঘুরে তাকাতেই নিহাদকে দেখতে পেল।
তার পাশে তাহসিন।
নিহাদ আজও স্কুলের পোশাকেই ছিল। কাঁধে ব্যাগ, মুখে সেই পরিচিত শান্ত ভাব।
ঈশিতা একটু থেমে বলল,
—আপনি আজ এত তাড়াতাড়ি?
নিহাদ হেসে বলল,
—আমি তো প্রতিদিনই সময়মতো আসি। তুমি আজ একটু দেরি করেছ।
রুহি সঙ্গে সঙ্গে ঈশিতার কানে কানে বলল,
—ওহ্! শুরু হয়ে গেল!
ঈশিতা রুহির দিকে তাকিয়ে চোখ বড় করল।
—চুপ কর!
সাদিয়া হাসি আটকাতে পারল না।
তাহসিন তখন সাদিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তোমরা মেয়েরা কি সবসময় এত কথা বলো?
সাদিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
—কেন? সমস্যা?
তাহসিন মাথা নাড়ল।
—না, আমার তো ভালোই লাগে।
সাদিয়া একটু লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে তাকাল।
রুহি ফিসফিস করে ঈশিতাকে বলল,
—দেখেছিস? ওদের আবার শুরু হয়েছে।
ঈশিতা হেসে ফেলল।
চারজন একসঙ্গে স্কুলের ভেতরে ঢুকে গেল।
প্রথম পিরিয়ডটা বেশ শান্তভাবেই কেটে গেল। কিন্তু দ্বিতীয় পিরিয়ডে শিক্ষক না আসায় পুরো ক্লাসে একটু হইচই শুরু হলো।
ঈশিতা নিজের খাতা খুলে বসেছিল।
হঠাৎ তার টেবিলের ওপর একটা ছোট্ট কাগজ এসে পড়ল।
সে অবাক হয়ে কাগজটা খুলল।
সেখানে লেখা—
“গতকাল ডায়েরিতে কী লিখেছিলে?”
ঈশিতা ধীরে ধীরে সামনে তাকাল।
কয়েক বেঞ্চ দূরে বসে নিহাদ তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
ঈশিতা কাগজের নিচে লিখল—
“বলব না।”
কাগজটা ভাঁজ করে আবার পাঠিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ পর কাগজটা ফিরে এল।
“কেন?”
ঈশিতা লিখল—
“কারণ এটা আমার ব্যক্তিগত।”
নিহাদ আবার লিখল—
“তাহলে আমার নতুন বছরের ইচ্ছেটাও ব্যক্তিগত।”
ঈশিতা একটু থেমে গেল।
তারপর লিখল—
“আপনি তো বলেছিলেন একদিন বলবেন।”
নিহাদ কাগজটা পড়ে মুচকি হাসল।
উত্তর এল—
“মনে আছে তোমার?”
ঈশিতা লিখল—
“হ্যাঁ।”
আর কোনো উত্তর এল না।
ঈশিতা অবাক হয়ে সামনে তাকাল।
নিহাদ তখন তাদের ক্লাসএর বাইরে এমন করে আছে যেন কিছুই হয়নি।
পেছন থেকে রুহি আস্তে করে বলল,
—কী লিখছে?
ঈশিতা তাড়াতাড়ি কাগজটা খাতার মধ্যে ঢুকিয়ে বলল,
—কিছু না।
রুহি চোখ ছোট করে তাকাল।
—তোর “কিছু না” মানেই কিছু একটা।
ঈশিতা হাসল।
____________
টিফিনের সময় পাঁচজন স্কুলের পেছনের ছোট্ট বাগানের পাশে গিয়ে বসল।
তাহসিন সবার জন্য কিছু খাবার নিয়ে এসেছিল।
সাদিয়া -
—তুমি আবার এত কিছু কেন এনেছ?
তাহসিন হেসে আউওরালো
—তোমার জন্য এনেছি।
রুহি সঙ্গে সঙ্গে মন খারাপের সুরে বলে উঠল
—আমাদের জন্য না?
তাহসিন ফের আউওরালো
—তোমাদের জন্যও আছে।
রুহি মুখ বাঁকিয়ে আউওরালো,
—আচ্ছা, এবার মাফ করা হলো।
সবাই হেসে উঠল।
ঈশিতা একটু দূরে বসে ছিল। নিহাদ তার পাশে । শীতের দুপুরে দুই ফুল একসাথে
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
স্কুলের মাঠে তখন কয়েকজন ছাত্রছাত্রী খেলছিল। বাতাসে শীতের হালকা গন্ধ।
নিহাদ ধীরে বলল,
—আজ কেমন লাগছে?
ঈশিতা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—ভালো। তবে নতুন বছরের পর স্কুলটা একটু অন্যরকম লাগছে।
—কেন?
—জানি না। মনে হচ্ছে সবাই যেন নতুন কিছু নিয়ে এসেছে।
নিহাদ মৃদু হেসে বলল,
—তুমি কী নিয়ে এসেছ?
ঈশিতা একটু ভেবে বলল,
—একটা নতুন ডায়েরি।
—আর কিছু?
ঈশিতা মাথা নাড়ল।
—না।
নিহাদ কিছু না বলে হাসল।
ঠিক তখন রুহি এসে বলল,
—এই তোমরা দুজন এত চুপচাপ কী করছ?
ঈশিতা বলল,
—কিছু না।
রুহি বলল,
—আবার সেই “কিছু না”!
সাদিয়া আর তাহসিনও এসে দাঁড়াল।
তাহসিন বলল,
—চলো, মাঠের ওদিকে যাই। আজ স্কুল ছুটির আগে একটু ঘুরে আসা যাক।
সবাই রাজি হয়ে গেল।
চারজন মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটতে লাগল।
রুহি আর সাদিয়া সামনে, তাহসিন তাদের সঙ্গে। একটু পিছনে হাঁটছিল ঈশিতা আর নিহাদ।
হঠাৎ ঈশিতার ব্যাগের চেইন খুলেকয়েকটা কলম নিচে পড়ে গেল।
নিহাদ সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে কলমগুলো তুলে দিল।
—তোমার ব্যাগটা ঠিকমতো বন্ধ করো।
ঈশিতা কলমগুলো নিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—ধন্যবাদ আপনাকে।
নিহাদ বলল,
—এতবার ধন্যবাদ দিতে হবে না।
—কেন?
—ভালোবাসার মধ্যে এত আনুষ্ঠানিকতা ভালো লাগে না।
ঈশিতা একটু চুপ করে থেকে বলল,
—তবুও আপনি তো আপনি।
নিহাদ হেসে বলল,
—আর তুমি তুমি।
ঈশিতাও হেসে ফেলল।
স্কুল ছুটির ঘণ্টা বেজে উঠল।
সবাই গেটের দিকে এগিয়ে গেল।
বিদায় নেওয়ার আগে সাদিয়া তাহসিনকে বলল,
—কাল কিন্তু আমাকে অপেক্ষা করাবে না।
তাহসিন হেসে বলল,
—ঠিক আছে।
রুহি ঈশিতাকে টেনে বলল,
—চল, আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে।
ঈশিতা যাওয়ার আগে একবার নিহাদের দিকে তাকাল।
নিহাদও তাকিয়ে ছিল।
কোনো কথা হলো না।
শুধু দুজনের চোখে যেন একটা নীরব বোঝাপড়া তৈরি হয়ে গেল।
ঈশিতা চলে যাওয়ার পর নিহাদ কিছুক্ষণ স্কুলের গেটের দিকে তাকিয়ে রইল।
তাহসিন পাশে এসে বলল,
—কী হলো?
নিহাদ চোখ সরিয়ে বলল,
—কিছু না।
তাহসিন হেসে বলল,
—তোর এই “কিছু না” কথাটাও আজকাল বেশ সন্দেহজনক।
নিহাদ কিছু বলল না।
শুধু মুখের সেই শান্ত ভাব নিয়ে ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল।
নতুন বছরের দ্বিতীয় দিনটাও শেষ হলো।
কিন্তু দুজনের মাঝের সেই ভালোবাসার গল্পটা যেন আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
চলবে ইনশাল্লাহ
পর্ব - ১৫