# প্রেম আমার
# পর্ব - ২৫
— পিয়াজেট ব্র্যান্ডটা কি এতটাই পছন্দের আপনার?
ঈশিতার প্রশ্ন শুনে নিহাদ তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে শান্ত কণ্ঠে আওড়াল,
— Yes, one of my most favourite brands.
ঈশিতা অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— সত্যি?
নিহাদ আর কোনো উত্তর দিল না। মুহূর্তের মধ্যেই সে ঈশিতার ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁটে আঁকড়ে ধরল।
— আহ্! ছাড়ুন!
ঈশিতার আপত্তির মধ্যেও মুহূর্তটা দীর্ঘ হয়ে উঠল। প্রায় চার মিনিট পর নিজের প্রেয়সীর অস্থিরতা লক্ষ করে নিহাদ অবশেষে নিজেকে থামাল। ঈশিতার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সামান্য তরল অংশ আঙুল দিয়ে মুছে দিয়ে দুষ্টুমিভরা কণ্ঠে বলল,
— Like this chocolate!
ঈশিতা কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল নিহাদের মুখের ওপর। যেন মুহূর্তের জন্য সমস্ত কথা হারিয়ে ফেলেছে সে।
নিহাদ মৃদু স্বরে ডাকল,
— ঈশিতা পরি!
কোনো উত্তর নেই।
— ঈশিতা!
এবারও নীরবতা।
নিহাদ একটু গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
— এবারও কি শাস্তিটা পেতে চাচ্ছ?
শাস্তির কথা শুনেই ঈশিতা চমকে উঠল।
— কিসের শাস্তি?
নিহাদ ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসি ফুটিয়ে বলল,
— Just wait and watch!
নিহাদ আর ঈশিতার মাঝখানে তখন সামান্য দূরত্ব। নিহাদ তার কাছে এগিয়ে আসতেই ঈশিতা নিজেকে সামলাতে গিয়ে সটান বিছানার ওপর পড়ে গেল। তার সঙ্গে ভারসাম্য হারিয়ে নিহাদও পড়ে গেল ঈশিতার ওপর। মুহূর্তের মধ্যে দুজনের মধ্যকার দূরত্বটুকু যেন উধাও হয়ে গেল।
ঈশিতা ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল,
— আহ্! উঠুন! আমি তো চাপা পড়ে গেলাম!
নিহাদ নিজেও কিছু বুঝে উঠতে পারল না। হঠাৎ এমন পরিস্থিতিতে দুজনেই কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। অপ্রত্যাশিত ঘটনাটা যেন তাদের স্মৃতির পাতায় এক অদ্ভুত মুহূর্ত হয়ে রইল।
ঈশিতা আবারও বলে উঠল,
— এই যে, উঠুন! চাপা পড়ে যাচ্ছি আমি! আহ্!
ঈশিতার আর্তস্বরে নিহাদ সম্বিত ফিরে পেল। দ্রুত নিজেকে সামলে তার কাছ থেকে সরে দাঁড়াল।
— সরি, ঈশিতা!
ঈশিতা নিজেকে সামলাতে সামলাতে বলল,
— কোনো ব্যাপার না। দোষটা আমারই ছিল, প্রেমপুরুষ!
কথাটা শুনে নিহাদের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
— ঈশিতা!
— জি?
— কী অবস্থা হয়েছে তোমার?
ঈশিতা নিজের পোশাক ঠিক করতে করতে অবাক হয়ে বলল,
— কেন? কী হয়েছে? সব তো ঠিকই আছে!
নিহাদ আর কিছু না বলে ঈশিতার হাত ধরে তাকে ঘরের ফুল-লেন্থ আয়নার সামনে নিয়ে গেল।
— জি, ম্যাডাম! এবার দেখুন।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকাতেই ঈশিতার চোখ বড় হয়ে গেল। তার হিজাবটা পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে গেছে।
অভিমানী দৃষ্টিতে নিহাদের দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠল,
— ইস্! কী অবস্থা করেছেন আপনি আমার!
নিহাদ মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল,
— এই যে, ঈশিতা পরি! আমার ওপর অভিমান হয়েছে?
ঈশিতা মুখ ভার করে উত্তর দিল,
— জি, অনেক!
— তাহলে দাঁড়াও। আজ এই অভিমানকে ভালোবাসায় পরিণত করতে আমি রাজি, মেহু!
কথাটা বলেই নিহাদ ঈশিতার মাথার হিজাবটা খুলে বিছানার এক কোণে যত্ন করে রেখে দিল। এরপর ধীরে ধীরে তার ক্যাপটাও খুলতে সাহায্য করল। ক্যাপের সঙ্গে চুলের কিছুটা অংশ জড়িয়ে থাকায় ঈশিতার চুলের বাঁধন আলগা হয়ে গেল। মুহূর্তেই তার কোমর ছাপিয়ে নামা ঘন কালো কেশরাশি পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়ল।
নিহাদ একবার তাকিয়েই থমকে গেল।
তার প্রেয়সীর ঘন কালো চুলগুলো যেন মুহূর্তের জন্য তার দৃষ্টি আটকে দিল। তবে সে মুখে কিছু বলল না। বরং নিজের সমস্ত মনোযোগ দিয়ে ঈশিতাকে আবারও সুন্দর করে হিজাব পরিয়ে দেওয়ার কাজে মন দিল।
ঈশিতা বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
একজন ছেলে কীভাবে এত নিখুঁতভাবে হিজাব পরাতে পারে, তা যেন তার কল্পনারও বাইরে ছিল।
প্রায় দশ মিনিটের যত্ন আর ধৈর্যের পর নিহাদ ঈশিতাকে আবারও সেই ফুল-লেন্থ আয়নার সামনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাল।
তারপর মৃদু হাসি নিয়ে বলল,
— মিসেস নিহাদ চৌধুরী!
ঈশিতা আয়নায় নিহাদের মুখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,
— জি, মিস্টার নিহাদ চৌধুরী!
নিহাদ এবার জানতে চাইল,
— দেখুন তো, আপনার অভিমানটা ভালোবাসায় পরিণত করতে পেরেছি?
ঈশিতা নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আমি এখনো গণনা করছি।
নিহাদ হেসে উত্তর দিল,
— আপনার যদি কেয়ামত অবধিও সময় লাগে, তবুও আমি আপনার গণনার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে রাজি।
ঈশিতা খুব সূক্ষ্মভাবে নিজেকে পরখ করতে লাগল। হিজাবের প্রতিটি ভাঁজ যেন নিখুঁতভাবে সাজানো। কোথাও কোনো অগোছালো ভাব নেই।
হঠাৎই ঈশিতা বলে উঠল,
— আজ আপনি প্রমাণ করেছেন, ছেলেরা শুধু দায়িত্ববান হয় না, যত্নশীলও হয়।
নিহাদ তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
সত্যিই, আজ ঈশিতা অবাক। একজন ছেলে এত নিখুঁতভাবে তার হিজাব পরিয়ে দিতে পারে, তা সে ভাবতেও পারেনি।
ঈশিতা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— আচ্ছা, আপনি কীভাবে এত সুন্দর করে হিজাব বাঁধতে পারেন?
নিহাদ আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
— It's my talent!
ঈশিতা ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
— Oh, really?
নিহাদ হেসে বলল,
— Of course!
দুজনের ঠোঁটেই তখন হাসি।
ঠিক সেই মুহূর্তে—
ঠক! ঠক! ঠক!
দরজায় ধাক্কার শব্দে ঈশিতা চমকে উঠল।
নিহাদ দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,
— ভিতরে আয়, ইশান!
দরজা খুলে ঘরে ঢুকল ইশান। নিজের শার্টের হাতা গুটিয়ে নিতে নিতে সে বলল,
— আর বলিস না, একটা ইম্পর্ট্যান্ট কল এসেছিল।
নিহাদ সংক্ষিপ্তভাবে উত্তর দিল,
— গুড।
ঈশিতা এবার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ডাকল,
— ভাইয়া!
ইশান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— জি, বল।
ঈশিতা মৃদু হেসে বলল,
— তোমরা থাকো, আমি আসি।
নিহাদ উত্তর দিল,
— জি, তুই যা।
ঈশিতা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
---
দুই পরিবারের ভালোবাসা
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই ঈশিতার চোখে পড়ল এক মনোরম দৃশ্য। বসার ঘরে দুই পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বসে গল্প করছেন। চারদিকে হাসি, আন্তরিকতা আর আপনজনদের উষ্ণতা।
দৃশ্যটা দেখে ঈশিতার মনটা ভরে গেল। মনে মনে সে আল্লাহর কাছে দোয়া করল,
‘আল্লাহজি, আমাদের দুই পরিবারকে চিরতরে এক করে দাও। আমাদের সবার মধ্যে যেন এই ভালোবাসা আর আন্তরিকতা সারাজীবন বজায় থাকে। আমিন।’
— ঈশিতা!
নিহাদের মায়ের ডাকে ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে এল সে।
ঈশিতা এগিয়ে গিয়ে বলল,
— জি, আন্টি।
মেহরাবা চৌধুরী স্নেহভরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— কেমন লাগছে আম্মু, আমাদের বাড়িতে?
ঈশিতা মিষ্টি হেসে উত্তর দিল,
— জি, আন্টি, অনেক ভালো।
— আসো এখানে বসো।
— জি।
ঈশিতা গিয়ে নিহাদের মায়ের পাশে বসল।
মেহরাবা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
— আচ্ছা, ঈশিতা!
— জি, আন্টি?
— আজ থেকে যাও না আমাদের বাড়িতে।
ঈশিতা একটু ইতস্তত করে উত্তর দিল,
— জি না, আন্টি। আজ নয়, অন্য একদিন থাকব।
মেহরাবা মৃদু হেসে বললেন,
— আচ্ছা, ঠিক আছে, আম্মু।
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে কারও নিচে নামার শব্দ শোনা গেল। ঈশিতা তাকিয়ে দেখল, নিহাদ আর ইশান নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে নিচে নেমে আসছে।
নিচে এসে নিহাদ মায়ের দিকে তাকিয়ে ডাকল,
— আম্মু!
মেহরাবা উত্তর দিলেন,
— জি, বলো।
নিহাদ বলল,
— আমরা একটু আসছি।
মেহরাবা জানতে চাইলেন,
— কোথায় যাচ্ছ, নিহাদ?
নিহাদ শান্তভাবে উত্তর দিল,
— আসলে, আম্মু, একটু বাইরের দিকে যাচ্ছি।
মেহরাবা বললেন,
— আচ্ছা, যাও।
নিহাদ আর ইশান বাইরে চলে গেল।
প্রায় এক ঘণ্টা আগে রহমান পরিবারের সদস্যরা চৌধুরী বাড়িতে এসেছিলেন। এখন সবাই নিজেদের মধ্যে গল্প করতে ব্যস্ত। হাসি-আড্ডায় সময় কেটে যাচ্ছিল আপন গতিতে।
তবে এত মানুষের ভিড়েও দুটো চোখ বারবার নিজেদের খুঁজে নিচ্ছিল।
কখনো ঈশিতা আড়চোখে তাকাচ্ছে নিহাদের দিকে, আবার কখনো নিহাদ চুপিসারে তাকিয়ে নিচ্ছে তার প্রেয়সীর দিকে।
বিষয়টা ইশানের চোখ এড়াল না।
সে নিহাদের দিকে একটু ঝুঁকে মুচকি হেসে বলল,
— এই যে, স্যার! আপনার দৃষ্টিটা আবার অন্যদিকে দিন না। নইলে কিন্তু আপনার নামে মামলা করতে বাধ্য হব!
নিহাদ একটুও বিচলিত হলো না। বরং ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে উত্তর দিল,
— আমি সিদরাতুল ঈশিতা রহমানের জন্য হাজারো মামলা লড়তে রাজি আছি, মিস্টার শালা সাহেব। আপনি মামলার ব্যবস্থা করুন!
ইশান হেসে বলল,
— বাহ্! প্রেমের জন্য এত কিছু!
নিহাদ শান্তভাবে উত্তর দিল,
— সবকিছু!
ইশান মাথা নেড়ে বলল,
— ঠিক আছে, ঠিক আছে। আপনার প্রেমের মামলা আপনি নিজেই সামলান!
নিহাদ মৃদু হেসে অন্যদিকে তাকাল। তবে তার দৃষ্টি যে আবারও ঈশিতাকে খুঁজে নিল, তা ইশানের চোখ এড়াল না
সময় গড়িয়ে গেল। এবার রহমান পরিবারের সদস্যদের বাড়ি ফেরার সময় হয়ে এল।
ফাহিমা রহমান উঠে দাঁড়িয়ে মেহরাবা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
— আপা, আসছি।
মেহরাবা আন্তরিকভাবে উত্তর দিলেন,
— জি, আপা। আবার আসবেন।
ফাহিমা রহমান মৃদু হেসে বললেন,
— আল্লাহ রাজি থাকলে নিশ্চয়ই।
এরপর ঈশিতা মেহরাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আন্টি, আসছি।
মেহরাবা স্নেহভরে উত্তর দিলেন,
— জি, আম্মু। যাও।
— জি, আন্টি।
নিহাদ তখন ঈশিতাদের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। ঈশিতা ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল।
তারপর মৃদু স্বরে বলল,
— নিহাদ ভাইয়া, আসছি।
নিহাদ তার দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল,
— জি, সাবধানে যেয়ো।
ঈশিতা মৃদু মাথা নাড়ল। এরপর গাড়িতে উঠে বসল।
রহমান পরিবারের সদস্যরা চৌধুরী পরিবারের সবাইকে বিদায় জানিয়ে নিজেদের গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দিলেন।
গাড়িটি ধীরে ধীরে বাড়ির ফটক পেরিয়ে দূরে চলে গেল।
নিহাদ কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে তখনও ঈশিতার বিদায়বেলার সেই মিষ্টি মুখটা ভাসছে।
অন্যদিকে গাড়িতে বসে ঈশিতাও একবার পেছন ফিরে তাকাল।
দূরত্ব বাড়ছিল, কিন্তু কিছু অনুভূতি যেন রয়ে যাচ্ছিল একই জায়গায়।
শরতের আকাশে তখন সন্ধ্যার রং আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। আর সেই সন্ধ্যার নীরবতায় দুটো মন নিজেদের অজান্তেই একে অপরকে খুঁজে ফিরছিল।
চলবে ইনশাল্লাহ
পর্ব -২৬