# প্রেম আমার
#পর্ব - ২৪
দিনটি ছিল অন্য দিনের তুলনায় কিছুটা স্বতন্ত্র। শীতের স্নিগ্ধ প্রভাত কুয়াশার কোমল আবরণে আচ্ছাদিত হয়ে ছিল। হিমেল বাতাসের শীতল পরশের মাঝেও সূর্যের মৃদু কিরণ প্রকৃতির বুকে ছড়িয়ে দিচ্ছিল এক অনির্বচনীয় মাধুর্য। চারপাশের পরিচিত দৃশ্যগুলোও যেন আজ নতুন রূপে সজ্জিত হয়েছে। মনে হচ্ছিল, শীতের এই সকালটি নিজের সমস্ত সৌন্দর্য উজাড় করে দিয়েই পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছে।
সহসা ঈশানের কণ্ঠস্বর রহমান বাড়ির নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করল। তার কণ্ঠের আকস্মিকতায় পরিবারের প্রত্যেক সদস্যই ঘুরে তাকালেন।
— আব্বু!
— জি, বলো।
— আব্বু, আজ আমাদের একটা জায়গায় যেতে হবে।
— কোথায়?
ঈশান বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে উত্তর দিল,
— নিহাদদের বাড়ি।
নিহাদের নামটি কর্ণগোচর হতেই ঈশিতার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। বুকের গভীরে সুপ্ত হয়ে থাকা অনুভূতিগুলো আচমকাই মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তবু নিজের মনের সেই আকস্মিক আলোড়ন সে নিপুণভাবে আড়াল করে রাখল। মুখে কোনো অভিব্যক্তি প্রকাশ না করে নীরব রইল।
ঈশান আবারও পিতার দৃষ্টি আকর্ষণ করল।
— আব্বু, তুমি কি যাবে?
রহমান সাহেব মৃদু স্বরে উত্তর দিলেন,
— না, আজ আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব হবে না।
— তাহলে আম্মু আর বনুকে নিয়ে যাই?
— হ্যাঁ, নিয়ে যেতে পারো।
পিতার সম্মতি পেয়ে ঈশানের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
— থ্যাংকস, আব্বু!
এতক্ষণ নীরব শ্রোতার ভূমিকা পালন করা ঈশিতা এবার আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। ভ্রু সামান্য কুঁচকে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গাত্মক স্বরে বলে উঠল,
— আব্বু, তোমার ছেলে তো নিজের সমস্ত জ্ঞানবুদ্ধি বিসর্জন দিয়েছে!
ঈশানের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সে ঈশিতার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন তার বোন এইমাত্র পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুতর অপরাধটি করে বসেছে।
— এই পুচকি! কী বললি তুই? আমার কোনো জ্ঞান নেই? তুই জানিস, আমার কত জ্ঞান? সেই জ্ঞান আছে বলেই তো এ বছর সায়েন্স নিতে পেরেছি! দেখা যাক, আগামী বছর তুই কোন সাবজেক্ট নিতে পারিস!
ঈশিতা ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি টেনে বলল,
— তুমি চুপ করো তো! হয়তো পরীক্ষার সময় টুকলি করেছিলে, নয়তো বন্ধুর খাতা দেখে লিখেছিলে। তা না হলে তোমার মতো মানুষের পক্ষে সায়েন্স নেওয়া কীভাবে সম্ভব?
ঈশান নিজের ঘাড়ে হাত বুলিয়ে এমন ভঙ্গিতে উত্তর দিল, যেন বোনের অভিযোগের মধ্যে যথেষ্ট সত্যতা রয়েছে।
— হ্যাঁ, কথাটা তুই কিছুটা ঠিকই বলেছিস। আমি নিহাদের খাতা দেখে লিখেছিলাম বলেই সায়েন্স নিতে পেরেছি। তবে এবারও আমরা দুজন একসঙ্গে বিদেশে যাব।
বিদেশ যাওয়ার প্রসঙ্গটি কানে আসতেই ঈশিতার সমস্ত মনোযোগ ভাইয়ের দিকে নিবদ্ধ হলো। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে মেয়েটি ভাইয়ের সঙ্গে খুনসুটিতে মেতে ছিল, তার মুখাবয়বে এবার ফুটে উঠল বিস্ময়।
— কী বললে? বিদেশ?
ঈশান যেন নিজের অসতর্কতার কথা তৎক্ষণাৎ উপলব্ধি করল। মুহূর্তের মধ্যেই মুখের অভিব্যক্তি বদলে ফেলে সে হেসে বলল,
— আরে না রে! এমনি মজা করছিলাম।
ঈশিতা বুঝতে পারল, তার ভাই ইচ্ছাকৃতভাবেই প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গেল। উত্তরের আড়ালে যেন আরও কিছু কথা লুকিয়ে রয়েছে, যা ঈশান এই মুহূর্তে প্রকাশ করতে চায় না। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন করল না সে। কিছু কিছু কথা না জেনেও নীরব থাকা যে কখনো কখনো শ্রেয়, তা সে বুঝতে পারছিল।
ঠিক তখনই ফাহিমা বিবির কণ্ঠে বিরক্তির আভাস শোনা গেল।
— এই, তোরা আবার থামবি? সকাল থেকে তোদের কথার বিরাম নেই!
মায়ের কণ্ঠের কঠোরতা দুই ভাইবোনের বাক্বিতণ্ডায় সাময়িক ছেদ টানল।
ফাহিমা বিবি এবার গম্ভীর স্বরে বললেন,
— তোরা দুজন আর একসঙ্গে থাকবি না। একসঙ্গে থাকলেই শুধু ঝগড়া!
মায়ের কথায় ঈশিতা বিনীতভাবে উত্তর দিল,
— জি, মা।
— যা, এবার দুজনে নিজের নিজের ঘরে যা।
ঈশান ঘুরে দাঁড়ানোর পূর্বমুহূর্তে বোনকে উদ্দেশ করে বলল,
— ঈশিতা!
— জি?
— তৈরি হয়ে থাকিস।
ঈশিতা সঙ্গে সঙ্গেই আপত্তি জানাল,
— আমি তোমার সঙ্গে যাব না।
ঈশান ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল।
— তোকে যেতেই হবে।
— সময় হোক, তখন দেখা যাবে।
কথাটি বলেই ঈশিতা নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছাতেই তার পদক্ষেপ থমকে গেল।
বিছানার ওপর রাখা জিনিসগুলো দেখে সে বিস্ময়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সেখানে যত্নসহকারে সাজিয়ে রাখা হয়েছে একজোড়া অপরূপ সালোয়ার-কামিজ, একজোড়া কানের দুল এবং মানানসই একজোড়া জুতো।
সালোয়ার-কামিজটির রং গাঢ় নীল। তার ওপর পাথরের সূক্ষ্ম কারুকার্য পোশাকটিকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র আভিজাত্য। নীলের গভীরতার সঙ্গে পাথরের মৃদু ঝিলিক মিলেমিশে এমন এক নান্দনিক সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে, যা থেকে চোখ ফেরানো কঠিন। পাশে রাখা কানের দুলটিও পোশাকটির সঙ্গে নিখুঁতভাবে মানানসই। সবকিছু যেন অত্যন্ত যত্ন ও রুচির সঙ্গে নির্বাচন করা হয়েছে।
ঈশিতা ধীরে ধীরে বিছানার কাছে এগিয়ে গেল। পোশাকটির ওপর হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে মনে মনে বলে উঠল,
‘দারুণ চয়েস!’
কিন্তু এই পোশাক এখানে এল কীভাবে? কে রেখেছে? প্রশ্নগুলো মনে জাগলেও উত্তরটি তার অজানা রইল না। হৃদয়ের গভীরে যে মানুষটির নাম নীরবে উচ্চারিত হয়, তার পছন্দের কথা মনে পড়তেই ঈশিতার অধরে লাজুক হাসির আভাস ফুটে উঠল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই মুঠোফোনে একটি বার্তা এসে তার চিন্তার সূত্র ছিন্ন করল।
বার্তাটি খুলতেই পর্দায় ভেসে উঠল নিহাদের পরিচিত নাম।
‘আজ তাড়াতাড়ি ব্লু সালোয়ার-কামিজটা পরে চলে এসো তোমার আসল ঠিকানায়।’
বার্তাটি পড়ে ঈশিতার গাল দুটো লজ্জার আভায় রাঙা হয়ে উঠল। ‘তোমার আসল ঠিকানা’—শব্দ কয়েকটি যেন তার মনের গভীরে গিয়ে বিশেষ কোনো অনুভূতির দুয়ার খুলে দিল।
সে আর দেরি না করে উত্তর লিখল,
‘জি, যাব।’
তারপর মুঠোফোনটি বিছানার ওপর রেখে আবারও পোশাকটির দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা হাসিটি এবার আর আড়াল করার চেষ্টা করল না সে।
---
সময় আপন গতিতে এগিয়ে চলল। ধীরে ধীরে সকাল গড়িয়ে বেলা বাড়ল। জানালার বাইরে শীতের কোমল রোদ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল, আর সেই সঙ্গে ঈশিতার মনেও যেন অদ্ভুত এক ব্যাকুলতা দানা বাঁধতে লাগল।
অবশেষে নিজের প্রিয় মানুষটির পছন্দ করে দেওয়া পোশাকটি পরিধান করে সে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল।
গাঢ় নীল সালোয়ার-কামিজটির সূক্ষ্ম পাথরের কাজ আলোয় মৃদু ঝিলিক দিচ্ছিল। সঙ্গে মানানসই কানের দুল এবং মাথায় সযত্নে জড়ানো শুভ্র হিজাব—সমগ্র সাজসজ্জার মধ্যে ছিল সংযত সৌন্দর্য ও স্নিগ্ধতার এক অপূর্ব সমন্বয়। পোশাকটির প্রতিটি খুঁটিনাটি যেন তার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানিয়ে গিয়েছিল।
আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ঈশিতার মনে হলো, আজ তাকে যেন অন্য রকম দেখাচ্ছে। অবশ্য এই পরিবর্তনের পেছনে পোশাকের সৌন্দর্যের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে একটি বিশেষ অনুভূতি—প্রিয় মানুষটির পছন্দের প্রতি তার নিঃশব্দ দুর্বলতা।
সে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলে উঠল,
— ইশ্! কী মিষ্টি লাগছে তোকে, ঈশিতা!
কথাটি বলেই সে হঠাৎ থেমে গেল। পরক্ষণেই নিজের আচরণে নিজেই বিব্রত হয়ে উঠল।
— এই পাগলি ঈশিতা, তুই কি সত্যিই পাগল হয়ে গিয়েছিস? কাকে এসব বলছিস? যার উদ্দেশে এত কথা বলছিস, সে তো তোর সামনে নেই!
নিজের কথায় নিজেই মৃদু হেসে ফেলল সে।
— ধুর! কী সব যে ভাবি আমি!
কথাগুলো উচ্চারণ করলেও মনের অন্তস্তলে যে মানুষটির উপস্থিতি সর্বক্ষণ অনুভব করে সে, তাকে কি এত সহজে ভাবনা থেকে সরিয়ে রাখা যায়?
ঠিক তখনই বাইরে থেকে ঈশানের কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
— ঈশিতা!
— জি, ভাইয়া!
— হলো তোর?
— জি, আসছি!
ঈশান এবার কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল,
— তাড়াতাড়ি আয়। নইলে আজ তোকে রেখেই চলে যাব!
— জি, এখুনি আসছি!
ভাইয়ের ধমক শুনে আর বিলম্ব করল না ঈশিতা। দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে এল সে। বাড়ির বাইরে গাড়ি অপেক্ষা করছিল। এক মুহূর্ত নষ্ট না করে গাড়িতে উঠে মায়ের পাশে বসে পড়ল।
মেয়েকে দেখে ফাহিমা বিবির মুখে স্নেহমিশ্রিত হাসি ফুটে উঠল।
— ঈশিতা!
— জি, আম্মু?
— মাশাআল্লাহ! আজ তোকে ভীষণ সুন্দর লাগছে।
মায়ের প্রশংসায় ঈশিতার গাল লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। সে নীরবে মাথা নিচু করে বসে রইল।
কিন্তু ফাহিমা বিবির মনে তখন অন্য একটি প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিল। মেয়ের পোশাকটির দিকে আরেকবার দৃষ্টি বুলিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন,
— তবে ঈশিতা, এই জামাটা কোথায় পেলি? আমি কিংবা তোর আব্বু তোকে তো এমন পোশাক কিনে দিইনি!
প্রশ্নটি শুনে ঈশিতা সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। এক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে সে উত্তর দিল,
— আসলে, আম্মু, আমি এটা অনেক দিন আগেই অর্ডার করেছিলাম। তোমাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম।
ফাহিমা বিবি মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু অনুযোগের সুরে বললেন,
— বেশ বড় হয়ে গেছিস দেখছি!
ঈশিতা মায়ের হাতের কাছে একটু সরে এসে আদুরে কণ্ঠে বলল,
— আহ্, মা! বকছ কেন?
ঈশানের এতক্ষণকার নীরবতা এবার ভাঙল। সে মায়ের উদ্দেশে বলল,
— দেখো না, মা! ও বড় হচ্ছে, নিজের পছন্দমতো একটা পোশাক কিনেছে। এতে বকাবকি করার কী আছে?
ঈশিতা সঙ্গে সঙ্গে ভাইয়ের কথায় সায় দিল।
— জি, ভাইয়া!
কিন্তু ঈশান বোনের দিকে তাকিয়ে ধমকের সুরে বলল,
— তুই চুপ কর!
ভাইয়ের এমন আচরণে ঈশিতা আর কথা বাড়াল না। মুখ গোমড়া করে নীরবে বসে রইল। গাড়ি ততক্ষণে আপন গতিতে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছে।
---
দীর্ঘ ত্রিশ মিনিটের পথ অতিক্রম করার পর গাড়িটি এসে থামল চৌধুরী পরিবারের সুবিশাল আবাসনের প্রবেশদ্বারে।
প্রথম দর্শনেই বাড়িটির বিশালতা ও আভিজাত্য দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো। সুউচ্চ প্রবেশদ্বার পেরিয়ে ভেতরে তাকালে মনে হয়, আধুনিক স্থাপত্যশৈলী আর রাজকীয় ঐশ্বর্যের মেলবন্ধনে নির্মিত কোনো প্রাসাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তারা। প্রবেশপথের পাশে স্থাপিত একটি নান্দনিক পাথরের ফলকে খোদাই করা রয়েছে—‘চৌধুরী ভিলা’।
বাড়ির সম্মুখভাগে বিস্তৃত সবুজ বাগান। বাগানের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে গেছে সুপরিসর একটি পথ, যা সরাসরি মূল ভবনের দিকে চলে গেছে। চারপাশের পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সুবিন্যস্ত উদ্যান এবং ভবনের আভিজাত্য মিলিয়ে পুরো প্রাঙ্গণটিতে এক রাজকীয় আবহ বিরাজ করছিল।
ঈশান ও ফাহিমা বিবি বেশ খানিকটা এগিয়ে চলেছিলেন। ঈশিতা তাদের পেছনে কিছুটা ব্যবধান রেখে হাঁটছিল। তার দৃষ্টি বারবার ঘুরে বেড়াচ্ছিল চারপাশে। সে কেবল একটি বাড়ি দেখছিল না; তার কাছে এই স্থানটির তাৎপর্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
নিহাদের বলা সেই কথাটি বারবার তার কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল—
‘তোমার আসল ঠিকানা।’
শব্দগুলো তার অন্তঃকরণে এক অদ্ভুত আলোড়ন সৃষ্টি করছিল। এই বিশাল বাড়ির সঙ্গে তার সম্পর্ক ঠিক কী, তা সে জানে না। তবু কেন যেন মনে হচ্ছিল, পরিচিত অথচ অদেখা কোনো জগতের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে সে।
হয়তো আজই প্রথমবার সে নিহাদের জীবনের এমন একটি অংশের মুখোমুখি হতে চলেছে, যা এত দিন তার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা ছিল।
---
সেদিন উপস্থিত সবার অগোচরেই চৌধুরী পরিবারের অন্তরঙ্গ পরিমণ্ডলে প্রবেশ করল ঈশিতা—এমন এক পরিমণ্ডল, যার সঙ্গে তার সম্পর্কের গভীরতা সে নিজেও তখনও সম্পূর্ণ উপলব্ধি করতে পারেনি।
দীর্ঘদিন পর ঈশিতাকে দেখে বাড়ির সদস্যদের মধ্যে আন্তরিক আনন্দের সঞ্চার হলো। সবার সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করে সে সালাম দিল।
— আসসালামু আলাইকুম।
উপস্থিত সকলে তার সালামের উত্তর দিলেন। পরিবেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল আন্তরিকতার উষ্ণতা।
ঈশিতা নিহাদের মায়ের দিকে তাকিয়ে বিনীতভাবে বলল,
— কেমন আছেন, আম্মু?
তিনি সস্নেহে উত্তর দিলেন,
— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
— জি, আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।
কথোপকথন চলতে থাকলেও ঈশিতার মন যেন সেখানে স্থির হয়ে থাকতে পারছিল না। তার দৃষ্টি বারবার ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। উপস্থিত মানুষগুলোর মধ্যে সে খুঁজছিল কেবল একজনকেই—নিহাদকে।
কিন্তু যার জন্য এত অপেক্ষা, তারই দেখা নেই।
মনের মধ্যে জমে ওঠা ব্যাকুলতা আর আড়াল করতে না পেরে সে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল,
‘কোথায় আপনি?’
তার অন্যমনস্কতা ঈশানের চোখ এড়াল না।
— কী দেখছিস, ঈশিতা?
প্রশ্ন শুনে সে চমকে উঠল।
— জি, ভাইয়া? কিছু না।
ঈশান সন্দেহভরা দৃষ্টিতে বোনের দিকে তাকাল।
— কিছু তো একটা দেখছিস!
— জি না।
ঈশিতা দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। নিজের মনের গোপন অভিপ্রায় প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কায় সে আর কোনো কথা বলল না।
এদিকে নিহাদের অনুপস্থিতি ঈশানেরও নজরে পড়েছিল। সে এবার নিহাদের মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
— আম্মি, নিহাদ কোথায়?
‘আম্মি’ সম্বোধনটি শুনে ঈশিতা বিস্ময়ে ভাইয়ের দিকে তাকাল। নিহাদের মাকে ঈশান এত আপন করে ‘আম্মি’ বলে ডাকছে কেন? বিস্ময়টি তার মনে প্রশ্নের জন্ম দিলেও সে মুখে কিছু প্রকাশ করল না। নিজের কৌতূহলকে সংযত করে নীরব রইল।
ঠিক তখনই সিঁড়ির দিক থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
— I’m here.
কণ্ঠস্বরটি শোনা মাত্রই ঘরে উপস্থিত সবার দৃষ্টি সেদিকে নিবদ্ধ হলো।
নিহাদ!
তার উপস্থিতি যেন মুহূর্তেই ঘরের পরিবেশে নতুন মাত্রা যোগ করল। সে এগিয়ে এসে উপস্থিত সবার উদ্দেশে সালাম জানাল।
— আসসালামু আলাইকুম।
উপস্থিত সকলে উত্তর দিলেন,
— ওয়ালাইকুমুস সালাম।
এরপর নিহাদ ঈশিতার মায়ের দিকে তাকিয়ে সৌজন্যপূর্ণ কণ্ঠে বলল,
— কেমন আছেন, আন্টি?
— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি, বাবা। তুমি কেমন আছো?
— I am fine.
ফাহিমা বিবি সস্নেহে জিজ্ঞাসা করলেন,
— এতক্ষণ কোথায় ছিলে, বাবা?
নিহাদ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
— আসলে, আন্টি, আমার একটা কাজ ছিল। সেই জন্যই ঘরে ছিলাম।
কথা শেষ করে সে এগিয়ে এসে ঈশিতার ঠিক পাশের সোফায় বসে পড়ল। তারপর সামান্য ঝুঁকে তার দিকে তাকাল। চোখেমুখে ফুটে উঠল সেই পরিচিত দুষ্টুমিমাখা প্রশান্তি, যা ঈশিতার সংযমকে বারবার দুর্বল করে দেয়।
নিম্নকণ্ঠে সে বলল,
— এই যে, ঈশিতা পরি! খুব সুন্দর লাগছে তোমাকে।
নিহাদের কণ্ঠে প্রশংসা শুনে ঈশিতা কোনো উত্তর দিতে পারল না। লজ্জায় মাথা নিচু করে নিজের আঙুলগুলো পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে কচলাতে লাগল।
নিহাদ তার নীরবতা লক্ষ করেও থামল না। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,
— আমি জানি, আমার ঈশিতা পরিকে সব সময়ই সুন্দর লাগে। But you look even more beautiful today. Like my wife.
শেষের কথাটি উচ্চারিত হতেই ঈশিতার অন্তরে যেন লজ্জার এক উষ্ণ স্রোত বয়ে গেল। সে মাথা আরও নিচু করে নিল। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসির আভাস ফুটে উঠলেও মুখে কোনো কথা এল না।
নিহাদ তার নীরবতাকে উপভোগ করছিল। আর ঈশিতা চেষ্টা করছিল নিজের অনুভূতিগুলোকে যথাসম্ভব গোপন রাখতে। চারপাশে পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও তাদের দুজনের মধ্যে যেন ক্ষণিকের জন্য এক স্বতন্ত্র, নিভৃত পরিসর সৃষ্টি হয়েছিল।
ঠিক সেই সময় নিহাদের বাবা তাকে ডাকলেন।
— নিহাদ!
— জি, আব্বু?
— ঈশিতা আর ঈশানকে তোমার ঘরে নিয়ে যাও।
নিহাদ সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিল,
— জি, আব্বু।
তারপর ঈশিতার দিকে তাকিয়ে বলল,
— ঈশিতা, চলো।
— জি।
ঈশিতা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। নিহাদ এগিয়ে চলল, আর সে নীরবে তার পিছু নিল।
---
নিহাদের ঘরের সামনে এসে ঈশান হঠাৎ থেমে গেল।
— নিহাদ, আমি একটু ওয়াশরুমে যাব।
নিহাদ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
— হ্যাঁ, যা।
ঈশান চলে যেতেই করিডরে সাময়িক নিস্তব্ধতা নেমে এল। সেই নীরব মুহূর্তে নিহাদ ঈশিতার দিকে ফিরে দাঁড়াল। তার চোখে তখন মৃদু দুষ্টুমি, অথচ আচরণে ছিল এক ধরনের স্নিগ্ধ কোমলতা।
সে আলতো করে ঈশিতার কোমরের পাশে হাত রেখে তাকে নিজের কাছাকাছি টেনে নিল।
আকস্মিক এই নৈকট্যে ঈশিতা সামান্য চমকে উঠল। তার দৃষ্টি মুহূর্তের জন্য নিহাদের চোখে আটকে গেল। কী বলবে, বুঝে উঠতে না পেরে সে নীরব হয়ে রইল।
নিহাদ তার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
— Come in, and welcome to your husband’s world.
কথাটির মধ্যে মিশে ছিল অধিকারবোধের কোমল ইঙ্গিত, ভালোবাসার নিঃশব্দ প্রকাশ এবং এক অদ্ভুত আন্তরিকতা।
ঈশিতা কেবল ক্ষীণ স্বরে উত্তর দিল,
— জি।
নিহাদ দরজা খুলে দিল।
---
জীবনে এই প্রথমবার নিহাদের ব্যক্তিগত কক্ষে প্রবেশ করল ঈশিতা। দরজার চৌকাঠ অতিক্রম করতেই তার দৃষ্টি ঘরের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যে নিবদ্ধ হলো। মুহূর্তের জন্য সে যেন নিজের চারপাশের সবকিছু ভুলে গেল।
ঘরজুড়ে গাঢ় নীল ও অফ-হোয়াইট রঙের এক মায়াবী সমন্বয়। দুটি রঙের সংযত মেলবন্ধন কক্ষটিকে দিয়েছে এক অনন্য আভিজাত্য। ছাদের স্নিগ্ধ আলোকসজ্জা এবং ঘরের কোণে রাখা ল্যাম্পের মৃদু হলুদ আভা সমগ্র পরিবেশে সৃষ্টি করেছে প্রশান্ত, অথচ গম্ভীর এক আবহ। কোথাও কোনো অতিরিক্ত জাঁকজমক নেই; বরং প্রতিটি উপকরণের বিন্যাসে ফুটে উঠেছে পরিমিতিবোধ ও রুচিশীলতার পরিচয়।
দেয়ালের এক পাশে স্থাপিত বিশাল আয়নাটি প্রথমেই ঈশিতার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। আয়নার সামনে সযত্নে সাজিয়ে রাখা কয়েকটি ক্ষুদ্র শো-পিস কক্ষের সৌন্দর্যে সংযোজন করেছে নান্দনিকতার সূক্ষ্ম পরশ। তার পাশেই সারিবদ্ধভাবে রাখা রয়েছে Piaget ব্র্যান্ডের পারফিউমের বোতল এবং বিভিন্ন নকশার হাতঘড়ির সংগ্রহ। প্রতিটি জিনিসের বিন্যাস এতটাই পরিপাটি যে বোঝা যায়, এগুলো কেবল বিলাসিতার নিদর্শন নয়; নিহাদের ব্যক্তিগত রুচি ও পছন্দেরও প্রতিফলন।
ঘরের মধ্যভাগে রাখা প্রশস্ত বিছানাটি ছিল কক্ষের অন্যতম আকর্ষণ। গাঢ় নীল বেডশিটের ওপর সাদা বালিশগুলো নিখুঁতভাবে সাজানো। নীল ও সাদার বৈপরীত্য বিছানাটিকে দিয়েছে এক প্রশান্ত সৌন্দর্য। বিছানার এক পাশে রাখা ছোট্ট সাইড টেবিলের ওপর রয়েছে একটি বই, হাতঘড়ি, মুঠোফোন এবং মৃদু আলো ছড়ানো একটি ল্যাম্প। সামান্য কয়েকটি প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়েই স্থানটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে সৌন্দর্য ও ব্যবহারিকতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।
জানালার পাশে স্থাপিত রাজকীয় দিওয়ানটি ঈশিতার দৃষ্টি কেড়ে নিল। দিওয়ানটির ওপর ছড়িয়ে রাখা নরম কুশনগুলো তার গাম্ভীর্যের মধ্যে এনে দিয়েছে আরামের কোমল পরশ। জানালার পর্দা সামান্য উন্মুক্ত থাকায় বাইরে দিনের আলো দৃশ্যমান হচ্ছিল। শীতের মৃদু বাতাসে পর্দাগুলো ধীর লয়ে দুলছিল, আর সেই দৃশ্য কক্ষের শান্ত পরিবেশকে করে তুলেছিল আরও স্নিগ্ধ।
ঘরের অন্য পাশে ছিল একটি বৃহৎ আধুনিক আলমারি। আলমারির কাচঘেরা অংশের ভেতর থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল রং ও ধরন অনুযায়ী সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো নীল শার্ট, পাঞ্জাবি এবং জ্যাকেট। পোশাকগুলোর পরিচ্ছন্ন বিন্যাসে নিহাদের শৃঙ্খলাপরায়ণ স্বভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। আলমারির নিচের অংশে সারিবদ্ধভাবে সাজানো জুতোগুলোও ছিল সমানভাবে পরিপাটি। প্রতিটি জিনিস যেন নিজের নির্দিষ্ট অবস্থানে স্থির থেকে ঘরের সামগ্রিক সৌন্দর্যকে পূর্ণতা দিয়েছে।
কক্ষের এক কোণে রাখা স্টাডি টেবিলটি ঘরের বাকি অংশের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন আবহ বহন করছিল। টেবিলের ওপর একটি ল্যাপটপ, কয়েকটি বই, কলম, নোটবুক এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো। কোথাও অযত্নের ছাপ নেই। টেবিলের পাশে রাখা ছোট্ট ইনডোর প্ল্যান্টটি ঘরের গম্ভীর পরিবেশে সঞ্চার করেছে একটুখানি সজীবতা। সবকিছু দেখে মনে হয়, এই স্থানটি কেবল কাজ করার জন্য নয়; বরং চিন্তা, অধ্যবসায় এবং নিভৃত সময় কাটানোরও একান্ত আশ্রয়।
দেয়ালে টাঙানো কয়েকটি মিনিমাল ফ্রেম কক্ষটির আধুনিক সৌন্দর্যকে আরও পরিশীলিত করেছে। তার পাশে স্থাপিত বৃহৎ ঘড়িটি সময়ের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল। ঘরের কোথাও অপ্রয়োজনীয় কোনো সামগ্রী চোখে পড়ল না। অথচ এত সংযত আয়োজনের পরও কক্ষটিকে একটুও শূন্য কিংবা নির্জীব মনে হচ্ছিল না। বরং প্রতিটি উপকরণ যেন নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে সামগ্রিক সৌন্দর্যের অংশ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে কক্ষটির পরিবেশে ছিল এক অদ্ভুত দ্বৈততা—একদিকে প্রশান্ত ও সুশৃঙ্খল, অন্যদিকে গভীর ও রহস্যময়। এই ঘরের প্রতিটি কোণ যেন তার অধিবাসীর ব্যক্তিত্বের কোনো না কোনো দিক নীরবে প্রকাশ করছিল। কোথাও দায়িত্ববোধের ছাপ, কোথাও রুচির পরিচয়, আবার কোথাও এমন এক নিভৃত সত্তার আভাস, যা সাধারণ পরিচয়ের আড়ালে সহজে ধরা পড়ে না।
ঈশিতা ধীর পদক্ষেপে ঘরের ভেতরে এগিয়ে গেল। তার দৃষ্টি একবার বিছানার ওপর, একবার জানালার পাশের দিওয়ানে, আবার কখনো স্টাডি টেবিলের ওপর রাখা বইগুলোর দিকে ঘুরে বেড়াতে লাগল।
এত দিন সে নিহাদকে চিনেছে একজন দায়িত্ববান, সংযত ও যত্নশীল মানুষ হিসেবে। তার কথাবার্তা, আচরণ এবং ঈশিতার প্রতি নিঃশব্দ মমতার মধ্য দিয়ে সে নিহাদের ব্যক্তিত্বের একটি পরিচিত রূপকে উপলব্ধি করেছে। কিন্তু আজ, এই প্রথমবার, সে যেন সেই পরিচিত মানুষটির অন্তর্জগতের আরও কাছাকাছি পৌঁছানোর সুযোগ পেল।
ঘরের প্রতিটি সাজানো উপকরণ, প্রতিটি পরিচ্ছন্ন বিন্যাস এবং প্রতিটি ক্ষুদ্র বিবরণ তার মনে নতুন নতুন উপলব্ধির জন্ম দিচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল, মানুষের ব্যক্তিত্ব কেবল তার উচ্চারিত শব্দ কিংবা দৃশ্যমান আচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; কখনো কখনো তার নিজস্ব পরিসরও নীরবে তার মনের পরিচয় বহন করে।
আর আজ সেই পরিসরের দরজা ঈশিতার সামনে উন্মুক্ত হয়েছে।
নিহাদের পৃথিবী—যে পৃথিবীর কথা সে এত দিন কেবল কল্পনায় অনুভব করেছে, আজ তারই একান্ত অংশের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে।
অজান্তেই ঈশিতার ঠোঁটের কোণে এক প্রশান্ত হাসি ফুটে উঠল।
হয়তো ভালোবাসার অর্থ কেবল কাউকে নিজের করে পাওয়া নয়; তার অচেনা দিকগুলোকে ধীরে ধীরে আবিষ্কার করাও ভালোবাসারই এক অনন্য অধ্যায়।
আর ঈশিতার কাছে আজকের এই মুহূর্তটি হয়ে রইল তেমনই এক অধ্যায়ের সূচনা—যেখানে নিহাদকে নতুন করে চেনার পাশাপাশি সে যেন তার নিজের অনুভূতির গভীরতাকেও নতুনভাবে আবিষ্কার করতে শুরু করল।