ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম আমার

পর্ব 31

লেখক: আরজিনা খাতুন

# প্রেম আমার
# পর্ব - ৩১

অপরাহ্ণের ম্লান আলোকচ্ছটায় প্রকৃতি যখন ক্রমশ সায়াহ্নের নিবিড় আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল, তখন রহমান পরিবারের অন্দরমহলে নেমে এসেছিল এক অজ্ঞাত বিষণ্নতার ছায়া। বাহিরের পৃথিবী আপন নিয়মে কর্মচঞ্চল থাকলেও বাড়িটির অভ্যন্তরে যেন সমস্ত স্বাভাবিকতা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরিচিত আসবাবপত্র, সুপরিচ্ছন্ন বসার ঘর কিংবা জানালার ধারে সাজিয়ে রাখা বাহারি ফুলের টব—সবই ছিল পূর্বের ন্যায়; কেবল পরিচিত মানুষগুলোর মুখাবয়বে ফুটে উঠেছিল এক অনভিপ্রেত উৎকণ্ঠার প্রতিচ্ছবি।

ঈশিতা রহমান নিজের কক্ষের জানালার সম্মুখে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল। দৃষ্টিপথে বিস্তৃত বৃক্ষরাজির শ্যামলিমা কিংবা দূর আকাশে ভেসে চলা মেঘপুঞ্জ—কোনোটিই তার চিত্তকে আকৃষ্ট করতে পারছিল না। তার সমগ্র মনোজগৎ আচ্ছন্ন হয়ে ছিল একটি মাত্র চিন্তায়; পিতার অনিশ্চিত পরিস্থিতি এবং সেই পরিস্থিতির অভিঘাতে পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্ভূত নানাবিধ আশঙ্কা।

সাবির রহমান—যাঁর স্নেহচ্ছায়ায় ঈশিতার শৈশব থেকে কৈশোর অবধি প্রতিটি অধ্যায় নিরাপত্তার আবরণে আবৃত থেকেছে, যাঁর সামান্য আশ্বাসেই পৃথিবীর যাবতীয় দুশ্চিন্তা তার কাছে তুচ্ছ বলে প্রতিভাত হয়েছে—আজ সেই মানুষটির মুখেই সে প্রত্যক্ষ করেছে অনভ্যস্ত উদ্বেগের রেখা।

হাসপাতালসংক্রান্ত কিছু প্রশাসনিক ও আর্থিক জটিলতা তাঁকে সাম্প্রতিক সময়ে যথেষ্ট বিচলিত করে তুলেছে। সমস্যাগুলোর সমাধান এখনও অনিশ্চিত; উপরন্তু, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব তাঁর মানসিক প্রশান্তিকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। পরিবারের অন্য সদস্যদের সামনে তিনি স্বাভাবিক থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও ঈশিতার দৃষ্টিতে তাঁর সেই কৃত্রিম স্বাভাবিকতা অদৃশ্য থাকেনি।

পিতার চোখের কোণে জমে থাকা ক্লান্তির ছাপটুকু তার অন্তরে এমন এক বেদনাবোধের জন্ম দিয়েছিল, যার যথাযথ প্রকাশের জন্য কোনো ভাষাই যেন পর্যাপ্ত নয়।

মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন নিজের অসহায়ত্বের উপলব্ধিই সর্বাপেক্ষা যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে। প্রিয়জনের দুঃখ প্রত্যক্ষ করেও যখন তার উপশমের কোনো উপায় খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন হৃদয়ের অভ্যন্তরে একপ্রকার নীরব আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। ঈশিতাও আজ সেই নিঃশব্দ যন্ত্রণারই অধিকারিণী।

সে কি পারত না পিতার সমস্ত দুশ্চিন্তা নিজের মধ্যে ধারণ করতে? পারত না কি তাঁর কপালে জমে থাকা চিন্তার রেখাগুলো মুছে দিয়ে তাঁকে পুনরায় নিশ্চিন্ত হাসিতে উদ্ভাসিত করতে?

প্রশ্নগুলো তার মনের গভীরে বারবার উত্থিত হচ্ছিল, অথচ কোনো প্রশ্নেরই উত্তর তার জানা ছিল না।

চোখের কোণে সঞ্চিত অশ্রুবিন্দু আঙুলের অগ্রভাগে মুছে নিয়ে সে আপন মনেই বিড়বিড় করে উঠল,

— “ইয়া আল্লাহ, আমার আব্বুকে সমস্ত বিপদাপদ থেকে হেফাজত করুন। তাঁর সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর করে দিন। তাঁর মুখের হাসিটুকু যেন কখনো মলিন হয়ে না যায়।”

প্রার্থনাটুকু উচ্চারণের পর সে দীর্ঘক্ষণ নীরব রইল। তার বিশ্বাসের গভীরতম প্রদেশে আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার যে প্রদীপ প্রজ্বলিত ছিল, সেই ক্ষীণ আলোটুকুই যেন এই মুহূর্তে তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া থেকে রক্ষা করছিল।

ঠিক সেই সময় কক্ষের দ্বারে মৃদু করাঘাতের শব্দ শোনা গেল।

— “ঈশিতা, মা, ভেতরে আসতে পারি?”

মাতৃকণ্ঠের পরিচিত স্নিগ্ধতা শুনে ঈশিতা দ্রুত চোখ মুছে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল।

— “জি, আম্মু। এসো।”

ফাহিমা রহমান কক্ষে প্রবেশ করেই কন্যার মুখাবয়বের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। মাতৃহৃদয়ের অন্তর্দৃষ্টি অনেক সময় এমন কিছু অনুভব করতে সক্ষম হয়, যা শব্দের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। কন্যার বিষণ্ন মুখচ্ছবি, অবনত দৃষ্টি এবং স্বাভাবিকের তুলনায় নিস্তেজ আচরণ তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে গেল না।

তিনি ধীরপদে এগিয়ে এসে কন্যার শিরঃদেশে স্নেহস্পর্শ রাখলেন।

— “কী হয়েছে, মা? মন খারাপ করে আছিস কেন?”

ঈশিতা তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়ল।

— “কই, কিছু হয়নি তো, আম্মু।”

ফাহিমা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন।

— “মায়ের কাছে নিজের অনুভূতি গোপন করতে নেই, ঈশিতা। তোর মুখের দিকে তাকালেই আমি বুঝতে পারি, তোর মনের মধ্যে কী চলছে।”

মাতৃস্নেহের সেই অকৃত্রিম আশ্রয়ে ঈশিতার এতক্ষণ ধরে সংযত রাখা আবেগের বাঁধ যেন ক্রমশ শিথিল হয়ে এল। সে মাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে নতকণ্ঠে বলে উঠল,

— “আম্মু, আব্বুর যদি কিছু হয়ে যায়?”

প্রশ্নটি উচ্চারণ করেই সে যেন নিজের কথার ভয়াবহতা উপলব্ধি করল। তার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল অবিরত।

ফাহিমা কন্যাকে আরও নিবিড়ভাবে বুকে আগলে নিলেন।

— “ছিঃ মা, এমন কথা মুখে আনতে নেই। তোর আব্বু সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেছে। আমরা সবাই তাঁর পাশে আছি। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ।”

— “কিন্তু আম্মু, আব্বুকে কখনো এভাবে চিন্তিত দেখিনি। সব সময় আমাদের সাহস দিয়েছেন, আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছেন। আজ তাঁর মুখের দিকে তাকালেই আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে। মনে হয়, আমি যদি তাঁর জন্য কিছু করতে পারতাম!”

কন্যার আকুলতায় ফাহিমার হৃদয়ও আর্দ্র হয়ে উঠল। তিনি ঈশিতার কপালে সস্নেহ চুম্বন এঁকে বললেন,

— “সব দায়িত্ব একা নিজের কাঁধে তুলে নেওয়াই ভালোবাসার একমাত্র পরিচয় নয়, মা। কখনো কখনো প্রিয়জনের পাশে অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে থাকা, তাঁকে সাহস জোগানো এবং তাঁর জন্য আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করাই সবচেয়ে বড় কর্তব্য হয়ে ওঠে। তুই তোর আব্বুর পাশে থাক। তাঁকে অনুভব করতে দে যে, তাঁর পরিবার তাঁর সঙ্গেই আছে।”

ঈশিতা মায়ের বক্ষে মুখ লুকিয়ে রইল। তার মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত আশ্রয়ের মধ্যে মাতৃবক্ষের মতো নিরাপদ স্থান বোধ হয় আর কোথাও নেই।

কিন্তু মানুষের জীবনে এমন কিছু দুশ্চিন্তা থাকে, যেগুলো সাময়িক সান্ত্বনায় প্রশমিত হলেও সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয় না। ঈশিতার অন্তরেও সেই অনিশ্চয়তার ছায়া থেকে গেল।

---

রাত্রির প্রথম প্রহরে নিজের কক্ষে প্রত্যাবর্তন করে ঈশিতা বিছানার এক প্রান্তে বসে পড়ল। সম্মুখের টেবিলে পাঠ্যপুস্তকগুলো সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো থাকলেও অধ্যয়নের প্রতি তার মনোযোগ নিবদ্ধ করা সম্ভব হচ্ছিল না। অক্ষরগুলো চোখের সম্মুখে স্পষ্ট থাকলেও মস্তিষ্কে প্রবেশ করার পূর্বেই যেন অর্থহীন হয়ে পড়ছিল।

এমন সময় তার মুঠোফোনের পর্দায় একটি পরিচিত নাম উদ্ভাসিত হলো।

Jallad saheb 🫶🏻

নামটির প্রতি দৃষ্টিপাত করতেই তার বিষণ্ন মুখাবয়বে অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটুখানি স্নিগ্ধতার আভাস ফুটে উঠল।

নিহাদ চৌধুরী—তার জীবনের সেই মানুষটি, যার উপস্থিতি অস্থির চিত্তে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দিতে পারে; যার কণ্ঠস্বরের সামান্য কোমলতাও তার সমস্ত অভিমানকে মুহূর্তের মধ্যে গলিয়ে দিতে সক্ষম। অথচ আজ সেই মানুষটির সঙ্গেই নিজের মনের ভার ভাগ করে নেওয়ার সাহস সঞ্চয় করতে পারছিল না সে।

কয়েক মুহূর্ত দ্বিধান্বিত থাকার পর কলটি গ্রহণ করল।

— “আসসালামু আলাইকুম।”

ওপাশ থেকে নিহাদের পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল,

— “ওয়ালাইকুমুস সালাম, মেহু জান। কী করছ?

— “বিশেষ কিছু নয়। পড়তে বসেছিলাম।”

— “পড়াশোনায় কতখানি অগ্রগতি হয়েছে, নাকি বইয়ের পৃষ্ঠায় দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে অন্য কোনো চিন্তার রাজ্যে বিচরণ করছ?

নিহাদের কণ্ঠে প্রচ্ছন্ন কৌতুকের আভাস ছিল। অন্য কোনো দিন হলে ঈশিতা হয়তো কথাটির প্রত্যুত্তরে অভিমানের অভিনয় করত কিংবা মৃদু হাসিতে পরিবেশটিকে প্রাণবন্ত করে তুলত। কিন্তু আজ তার ঠোঁটে হাসি ফুটলেও হৃদয়ের ভার লাঘব হলো না।

নিহাদ বিষয়টি লক্ষ করল।

— “মেহু জান, কণ্ঠস্বর এমন শোনাচ্ছে কেন? শরীর খারাপ লাগছে?”

— “না, তেমন কিছু নয়।”

— “তাহলে কি মন খারাপ?”

ঈশিতা নীরব রইল।

নিহাদ এবার আর কৌতুক করল না। তার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠল অধিকতর গম্ভীর, অধিকতর স্নিগ্ধ।

— “ঈশিতা, তোমার সঙ্গে কথা বলার সময় আমি একটা বিষয় সব সময় লক্ষ করি। তুমি যখন সত্যিই ভালো থাকেন, তখন তোমার প্রতিটি কথার মধ্যে একধরনের প্রাণচাঞ্চল্য থাকে। আর যখন কোনো কিছু তোমাকে বিচলিত করে, তখন তুমি যতই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করুন না কেন, আপনার কণ্ঠের সেই পরিচিত সজীবতা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। আজও ঠিক তেমনটাই মনে হচ্ছে।”

ঈশিতার হৃদয় যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।

এত সহজে মানুষটি তার অন্তরের পরিবর্তন উপলব্ধি করতে পারে কীভাবে? সে কি সত্যিই এতখানি স্পষ্ট করে নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করে ফেলে?

অথচ বাবার সমস্যার কথা স্মরণ হতেই তার সমস্ত সাহস আবার স্তিমিত হয়ে এল।

— “আপনি অযথা চিন্তা করছেন, প্রেম পুরুষ আমি ঠিক আছি।”

— “সত্যিই?”

— “জি।”

ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা বিরাজ করল।

তারপর নিহাদ ধীরকণ্ঠে বলল,

— “আচ্ছা, তোমাকে জোর করব না। তবে একটা কথা বলতে চাই। মানুষ যখন কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়, তখন সব সময় সেই সমস্যার সমাধান চায় না। কখনো কখনো সে শুধু এমন একজন মানুষকে পাশে চায়, যার কাছে নির্দ্বিধায় নিজের দুর্বলতাগুলো প্রকাশ করা যায়। যে তার সমস্ত কথার উত্তর দিতে না পারলেও নীরবে কথাগুলো শুনবে।”

কথাগুলো ঈশিতার হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশে গিয়ে স্পর্শ করল।

সে চোখ বন্ধ করল। কী প্রবল ইচ্ছা হচ্ছিল সমস্ত দ্বিধা পরিত্যাগ করে নিহাদকে সবকিছু জানিয়ে দিতে! বলতে ইচ্ছা করছিল, তার হৃদয়ে আজ কতখানি ভয়, কতখানি অসহায়ত্ব আর কতখানি অনিশ্চয়তা জমে আছে।

কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, নিহাদের নিজেরও তো ভবিষ্যৎ রয়েছে। তার পড়াশোনা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং জীবনের নানাবিধ প্রত্যাশা রয়েছে। এই মুহূর্তে নিজের সমস্যার কথা জানিয়ে তাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তোলা কি সমীচীন হবে?

হয়তো এই দ্বিধাটিই তার ভালোবাসার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা—সে ভালোবাসতে জানে, নির্ভর করতে জানে; অথচ নিজের কষ্টের ভার প্রিয় মানুষের হাতে তুলে দেওয়ার সাহস এখনও অর্জন করতে পারেনি।

— “আপনি এত ভালো কেন, প্রেম পুরুষ”

প্রশ্নটি ঈশিতার কণ্ঠ থেকে অনিচ্ছাকৃতভাবেই বেরিয়ে এল।

নিহাদ মৃদু হেসে বলল,

— “ভালো মানুষ কি না, সে বিচার তোমার । তবে তোমার কাছে এমন একজন মানুষ হয়ে থাকতে চাই, যার উপস্থিতিতে তোমার নিজের অনুভূতিগুলো আড়াল করতে না হয়।”

ঈশিতার চোখের কোণে আবারও অশ্রু জমল।

নিহাদ পুনরায় বলল,

— “একটা কথা মনে রাখবে, মেহু জান। আমি তোমার  জীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান করে দিতে পারব, এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে চাই না। কিন্তু তোমার সমস্যার সময় তোমার  একা অনুভব করতে দিতে চাই না। তোমার  দুঃখের কারণটা বুঝতে চাই, তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই, আর সম্ভব হলে তোমার পাশে দাঁড়াতে চাই। তোমার  শুধু আমাকে সেই সুযোগটুকু দেবেন।”

ঈশিতা অধরদ্বয় পরস্পরের সঙ্গে চেপে ধরল। তার সমস্ত অনুভূতি যেন কণ্ঠনালির কাছে এসে জমাট বেঁধেছে।

তবু সে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করল না।

— “জি, প্রেম পুরুষ। আমি বুঝতে পেরেছি।”

কথোপকথন আরও কিছুক্ষণ চলল। নিহাদ তার পড়াশোনার খোঁজ নিল, যথাসময়ে আহার করার কথা স্মরণ করিয়ে দিল এবং নিজের যত্ন নেওয়ার উপদেশ দিল। ঈশিতাও যথাসাধ্য স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।

কিন্তু তাদের কথোপকথনের অন্তরালে যে অদৃশ্য ব্যবধানের সূচনা ঘটছিল, তা দুজনের কেউই সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে পারল না।

কল শেষ হওয়ার পূর্বে নিহাদ বলল,

— “নিজের খেয়াল রাখবেন মেহু জান। আর কোনো কিছু মনে কষ্ট দিলে আমাকে জানাবেন।”

— “জি, রাখব।”

কলটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

ঈশিতা কিছুক্ষণ মুঠোফোনটির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সেটিকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে ধীরকণ্ঠে বলল,

— “আপনাকে কীভাবে বলব, প্রেম পুরুষ আপনি তো আমার কষ্টের কারণ নন, বরং সেই মানুষ, যার সঙ্গে কথা বললে সমস্ত দুশ্চিন্তা কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভুলে থাকতে পারি। অথচ আজ সেই দুশ্চিন্তার কথাগুলোই আপনার কাছে প্রকাশ করতে পারলাম না।”

তার অশ্রুসিক্ত দৃষ্টি জানালার বাইরে নিবদ্ধ হলো।

ভালোবাসার মানুষকে কখনো কখনো মানুষ নিজের সবচেয়ে কাছের আশ্রয় বলে মনে করে। অথচ সেই আশ্রয়ের কাছেই নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে অজানা সংকোচে পিছিয়ে আসে। ঈশিতাও আজ সেই মানসিক দ্বন্দ্বের কাছে পরাজিত।

---

পরদিন প্রাতঃকালে ঈশান এ র সঙ্গে নাশতার টেবিলে দেখা হলো ঈশিতার। ভাইয়ের দৃষ্টি একবার তার মুখমণ্ডলের ওপর নিবদ্ধ হতেই সে বুঝতে পারল, গত রাতের মতো আজও নিজের বিষণ্নতা সম্পূর্ণরূপে আড়াল করা সম্ভব হয়নি।

ঈশান কিছুক্ষণ নীরবে পর্যবেক্ষণ করার পর প্রশ্ন করল,

— “কী হয়েছে তোর, ঈশিতা?”

— “কিছু হয়নি তো, ভাইয়া।”

— “কিছু হয়নি, অথচ মুখের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে সারারাত ঘুমাসনি। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়াও করছিস না। ব্যাপারটা কী?”

ঈশিতা দৃষ্টি অবনত করল।

— “এমনিই। একটু চিন্তা হচ্ছে।”

— “আব্বুকে নিয়ে?”

এবার আর অস্বীকার করল না সে। নীরবে মাথা নাড়ল।

ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বোনের পাশে এসে বসল।

— “দেখ, তুই একা নোস। আমি আছি, আম্মু আছে। আমরা সবাই আব্বুর পাশে আছি। সমস্যাটা সমাধান করার জন্য যতটুকু করা প্রয়োজন, আমরা করব। কিন্তু তুই যদি সারাক্ষণ এমনভাবে ভেঙে পড়ে থাকিস, তাহলে আব্বুরও কষ্ট হবে।”

— “আমি জানি, ভাইয়া। কিন্তু আব্বুকে এমন চিন্তিত দেখলে নিজেকে ঠিক রাখতে পারি না।”

ঈশান বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

— “আব্বুর প্রতি তোর ভালোবাসা আমি বুঝি। কিন্তু ভালোবাসা মানে সব সময় দুশ্চিন্তায় ডুবে থাকা নয়। কখনো কখনো সাহস ধরে রাখাটাও ভালোবাসারই অংশ।”

ঈশিতা ভাইকে জড়িয়ে ধরল।

— “তুমি সব সময় আমার পাশে থাকবে তো, ভাইয়া?”

ঈশান মৃদু হেসে বলল,

— “এই প্রশ্নটা আবার করতে হয় নাকি, পাগলি? তুই আমার বোন। তোর প্রয়োজনের সময় আমাকে পাশে পাবি না, এমনটা কখনো ভাবিস না।”

কথাগুলো ঈশিতার হৃদয়ে সামান্য প্রশান্তি এনে দিল। সে ভাইয়ের কাঁধে মাথা রেখে কিছুক্ষণ নীরব থাকল।

তবু তার মনের গভীরে জমে থাকা দুশ্চিন্তার মেঘগুলো সম্পূর্ণরূপে সরে গেল না।

---

দুপুর গড়িয়ে অপরাহ্ণের দিকে সময় অগ্রসর হলে নিহাদের ফোন এল।

ঈশিতা তখন পিতার জন্য চা প্রস্তুত করছিল। মুঠোফোনের পর্দায় নিহাদের নাম দেখে তার মুখে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।

— “আসসালামু আলাইকুম।”

— “ওয়ালাইকুমুস সালাম। কী করছ মেহু জান?”

— “আব্বুর জন্য চা নিয়ে যাচ্ছি।”

— “আচ্ছা। তোমার আব্বু কেমন আছে?”

প্রশ্নটি শুনে ঈশিতা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। গত রাতের কথোপকথনের পরেও নিহাদ তার পরিবারের খোঁজ নিচ্ছে—এই আন্তরিকতা তার হৃদয়কে স্পর্শ করল।

কিন্তু সে যথারীতি উত্তর দিল,

— “ভালো আছেন।”

নিহাদ এবার আর নীরব থাকতে পারল না।

— “ঈশিতা, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?”

— “জি, বলুন।”

— “তুমি কি ইচ্ছা করেই আমার কাছ থেকে কিছু আড়াল করছ?”

ঈশিতার আঙুলগুলো মুঠোফোনের ওপর স্থির হয়ে গেল।

— “কী আড়াল করব আমি?”

— “সেটাই তো জানতে চাইছি। কয়েক দিন ধরে   তোমার আচরণে একটা পরিবর্তন লক্ষ করছি।তুমি কথা বলছো ,  আমার খোঁজও নাউ ; কিন্তু মনে হচ্ছে, তোমার মনের কোনো একটা অংশ আমার কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে।”

ঈশিতা কোনো উত্তর দিতে পারল না।

নিহাদের কণ্ঠে এবার অভিমানের সূক্ষ্ম আভাস ফুটে উঠল।

— “আমি কি তোমার এতটাই অপরিচিত যে তোমার কষ্টের কারণটুকুও জানতে পারব না?”

কথাটি শুনে ঈশিতার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

— “আপনি এমন বলছেন কেন?”

— “কারণ আমি বুঝতে পারছি, তুমি ভালো নেই। অথচ বারবার জিজ্ঞাসা করার পরেও তুমি আমাকে একই কথা বলছ—কিছু হয়নি। তুমি কি সত্যিই মনে করো , তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কেবল হাসি-ঠাট্টা আর সুন্দর সুন্দর কথা বলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ?”

ঈশিতা তড়িঘড়ি করে বলল,

— “না, প্রেম পুরুষ! আমি কখনোই এমনটা ভাবিনি।”

— “তাহলে আমাকে এতটা দূরে রাখছ কেন?”

প্রশ্নটির উত্তর ঈশিতার জানা ছিল। কিন্তু সেই উত্তর উচ্চারণ করার মতো মানসিক দৃঢ়তা তার ছিল না।

সে বলতে চেয়েছিল, নিজের পরিবারকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে করতে সে নিজেই দিশাহারা হয়ে পড়েছে। সে বলতে চেয়েছিল, প্রিয় মানুষটির ওপর নতুন করে কোনো উদ্বেগের বোঝা চাপিয়ে দিতে তার মন সায় দিচ্ছে না।

অথচ তার নীরবতা নিহাদের কাছে অন্য অর্থ বহন করছিল।

অবশেষে নিহাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

— “আচ্ছা, তোমাকে আর কিছু জিজ্ঞাসা করব না। তুমি যখন মনে করবেন আমাকে বলার মতো কিছু আছে, তখন নিজে থেকেই বলবেন।”

তার কণ্ঠে অভিমান থাকলেও ঈশিতাকে কষ্ট দেওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না। সে শুধু চেয়েছিল, প্রিয় মানুষটি তার ওপর নির্ভর করতে শিখুক।

কিন্তু ঈশিতা সেই মুহূর্তে নিজের দ্বিধার বাইরে এসে বিষয়টি বুঝতে পারল না।

— “আপনি আমার ওপর রাগ করেছেন?”

— “না।”

— “তাহলে এমনভাবে কথা বলছেন কেন?”

— “কারণ কখনো কখনো খুব কাছের মানুষটির কাছেও নিজেকে অসহায় মনে হয়, ঈশিতা। বিশেষত, যখন বুঝতে পারি যে সে কষ্টে আছে, অথচ তার কষ্টের কারণটা জানার অধিকারটুকুও আমার নেই।”

কথাটি বলেই নিহাদ ফোন রেখে দিল।

ঈশিতা নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তার হাতে তখনও বাবার জন্য প্রস্তুত করা চায়ের কাপ। কিন্তু তার সমস্ত মনোযোগ আটকে আছে কয়েক মুহূর্ত আগের কথোপকথনে।

সে কি সত্যিই নিহাদকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?

নাকি নিজের কষ্ট আড়াল করতে গিয়েই অজান্তে মানুষটিকে কষ্ট দিয়ে ফেলছে?

প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে সে আরও বেশি অসহায় বোধ করল।

---

সন্ধ্যার আবছায়া যখন ধীরে ধীরে চারপাশকে গ্রাস করছিল, তখন ঈশিতা পিতার কক্ষে প্রবেশ করল। সাবির রহমান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে মনোযোগসহকারে কাজ করছিলেন।

ঈশিতা কে দেখে তিনি মুখ তুলে মৃদু হাসলেন।

— “কী ব্যাপার, মা? কিছু বলবি?”

ঈশিতা তাঁর পাশে বসে পড়ল।

— “আব্বু, তুমি নিজের যত্ন নিচ্ছ তো?”

— “নিশ্চয়ই, মা।”

— “ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করছ?”

সাবির রহমান হেসে উঠলেন।

— “তুই তো একেবারে তোর মায়ের মতো হয়ে গেছিস! সারাক্ষণ শুধু আমার খোঁজখবর।”

ঈশিতাও মৃদু হাসল। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে জমে থাকা বিষণ্নতা পিতার দৃষ্টি এড়াল না।

— “কী হয়েছে, মা? তোর মন খারাপ কেন?”

ঈশিতা মাথা নত করল।

— “তোমাকে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে, আব্বু।”

সাবির রহমান কন্যার হাত নিজের হাতের মধ্যে তুলে নিলেন।

— “জীবনে প্রতিকূলতা আসবেই, মা। প্রতিটি সমস্যার সমাধান সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না। তবে ধৈর্য, চেষ্টা আর আল্লাহর ওপর ভরসা থাকলে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়েও এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। তুই শুধু দোয়া করিস।”

ঈশিতা পিতার হাতের ওপর নিজের হাতটি আরও দৃঢ়ভাবে স্থাপন করল।

— “আমি প্রতিদিন দোয়া করি, আব্বু।”

— “আল্লাহ তোর দোয়া কবুল করুন, মা।”

পিতার কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে ঈশিতা নিজের ঘরে প্রবেশ করল। দরজা বন্ধ করে বিছানার পাশে বসে মুঠোফোনটি হাতে তুলে নিল।

নিহাদের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি তাকে বারবার ব্যথিত করছিল।

সে জানত, মানুষটি তার ওপর রাগ করে দীর্ঘক্ষণ থাকতে পারবে না। তবু আজকের অভিমানটি অন্য দিনের মতো সামান্য কথায় মিটে যাবে কি না, তা নিয়ে তার মনে সংশয় জন্মেছিল।

অনেকক্ষণ দ্বিধায় থাকার পর অবশেষে একটি বার্তা লিখল—

“প্রেম পুরুষ , আপনি আমার ওপর অভিমান করে থাকবেন না, প্লিজ।”

বার্তাটি পাঠিয়ে সে অধীর আগ্রহে উত্তরের অপেক্ষা করতে লাগল।

কয়েক মিনিট পর মুঠোফোনের পর্দায় উত্তর ভেসে উঠল।

“অভিমান তোমার  ওপর নয়, ঈশিতা। অভিমান এই অসহায়ত্বের ওপর—তুমি কষ্টে আছো  জেনেও তোমার পাশে দাঁড়ানোর সুযোগটুকু পাচ্ছি না।”

বার্তাটি পড়ে ঈশিতার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল।

কীভাবে বোঝাবে সে মানুষটিকে, যে তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়া তার উদ্দেশ্য নয়? কীভাবে জানাবে, নিজের প্রিয়জনদের নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে করতে সে এতটাই বিপর্যস্ত যে নিজের অনুভূতিগুলোও যথাযথভাবে প্রকাশ করতে পারছে না?

অবশেষে সে আরেকটি বার্তা লিখল—

“আমি আপনাকে দূরে সরিয়ে দিতে চাই না, প্রেম পুরুষ। শুধু কিছু বিষয় নিয়ে নিজেকে একটু সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছি।”

উত্তর আসতে সামান্য সময় লাগল।

“তাহলে নিজেকে সামলানোর সময়টুকুতে আমাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখবে না, মেহু জান। সব কথা বলতে না পারলেও অন্তত এটুকু জানাবে যে তুমি  মন ভালো নেই। তোমার  নীরবতার অর্থ অনুমান করতে করতে নিজেকে অসহায় মনে হয়।”

ঈশিতা মুঠোফোনটি বুকে চেপে ধরল।

তার চোখের অশ্রু আর বাধা মানল না।

সেই মুহূর্তে সে উপলব্ধি করল, ভালোবাসার সম্পর্কের মধ্যে নীরবতাও কখনো কখনো ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দেয়। যে নীরবতাকে সে প্রিয় মানুষটির দুশ্চিন্তা লাঘবের উপায় বলে মনে করেছিল, সেই নীরবতাই উল্টো নিহাদের হৃদয়ে অভিমানের জন্ম দিয়েছে।

জানালার বাইরে তখন রাত্রির নিবিড় অন্ধকার।

ঈশিতা নিঃশব্দে চোখ মুছে মুঠোফোনের পর্দায় শেষবারের মতো দৃষ্টিপাত করল। তার হৃদয়ে তখন এক অদ্ভুত উপলব্ধি জন্ম নিচ্ছিল—কাউকে ভালোবাসা যতটা গভীর অনুভূতির বিষয়, সেই ভালোবাসার কাছে নিজের দুর্বলতাগুলো প্রকাশ করাও ততটাই সাহসের ব্যাপার।

কিন্তু সেই সাহস অর্জন করতে না পারলে, ভালোবাসার মানুষটি পাশে থেকেও কখনো কখনো দূরবর্তী হয়ে ওঠে।

আর ঈশিতা?

সে এখনও নিজের কষ্টের সঙ্গে লড়াই করছে, নিজের পরিবারের জন্য প্রার্থনা করছে এবং একই সঙ্গে চেষ্টা করছে নিহাদের অভিমান ভাঙানোর।

তার অজান্তেই জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়ে গেছে—যেখানে ভালোবাসা কেবল হৃদয়ের আকর্ষণ নয়, বরং বিশ্বাস, নির্ভরতা এবং একে অপরের কাছে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত করে দেওয়ার কঠিন পরীক্ষাও।

চলবে ইনশাআল্লাহ
পর্ব -৩২

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 31 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন