#প্রেম আমার
#পর্ব - ৩০
প্রভাতের স্নিগ্ধ আলোকচ্ছটায় ধীরে ধীরে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে নতুন একটি দিন। নিশীথের নিবিড় অন্ধকার অপসারিত করে পূর্বদিগন্তে সূর্যের আবির্ভাব প্রকৃতির বুকে ছড়িয়ে দিয়েছে এক অনির্বচনীয় সজীবতা। বৃক্ষশাখায় পাখিদের কলতান, জানালার পর্দা ভেদ করে কক্ষে প্রবেশ করা কোমল রৌদ্রকিরণ আর চারপাশের পরিচিত কর্মব্যস্ততা—সব মিলিয়ে দিনের সূচনালগ্নে পরিবেশটি যেন আপন মহিমায় সুশোভিত হয়ে উঠেছে।
রহমান পরিবারের বাড়িতেও তখন প্রাত্যহিক ব্যস্ততার সূচনা ঘটেছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে সকালের নাশতা প্রস্তুতের শব্দ, আর বাড়ির বিভিন্ন প্রান্তে শোনা যাচ্ছে পরিবারের সদস্যদের টুকরো টুকরো কথোপকথন।
নিজের কক্ষে বিছানার ওপর উপবিষ্ট ঈশিতা জানালার বাইরে দৃষ্টিপাত করে কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইল। গতকালের স্মৃতিগুলো তার মনোজগতে তখনও সতেজ। শাপলা-পুকুরের শান্ত জলরাশি, বাতাসে দুলতে থাকা শাপলাপাতা, আর নিহাদের সঙ্গে কাটানো একান্ত মুহূর্তগুলো তার চিন্তার অলিন্দে বারবার ফিরে আসছিল।
স্মৃতির সেই মায়াবী আবেশে তার অধরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি।
সহসাই বিছানার পাশে রাখা মুঠোফোনটির পর্দা আলোকিত হয়ে উঠল। পরিচিত নামটি দৃষ্টিগোচর হতেই ঈশিতার চোখেমুখে আনন্দের আভা ছড়িয়ে পড়ল।
নিহাদ চৌধুরী।
বার্তাটি খুলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল কয়েকটি শব্দ—
‘ঘুম থেকে উঠেছ, মেহু জান?’
ঈশিতা মৃদু হেসে উত্তর লিখল—
‘জি, উঠেছি। আপনি কী করছেন?’
কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানেই প্রত্যুত্তর এল—
‘তোমার মেসেজের অপেক্ষা করছিলাম।’
কথাটি পড়ে ঈশিতা ভ্রু কুঁচকে ফেলল। লোকটা যে কখনো কখনো অতি সাধারণ কথার মধ্যেও তাকে অপ্রস্তুত করে দিতে পারে, সে বিষয়ে তার কোনো সন্দেহ নেই।
সে লিখল—
‘সকালে উঠেই মিথ্যা বলা শুরু করেছেন?’
নিহাদের উত্তর আসতে দেরি হলো না।
‘তুমি কীভাবে বুঝলে যে মিথ্যা বলেছি?’
‘আপনি আর আমার মেসেজের অপেক্ষা করছেন! আপনার তো পড়াশোনা ছাড়া আর কিছু মনেই থাকে না।’
‘বাহ্! তাহলে এত দিন ধরে তুমি আমাকে কী ভাবো, সেটা আজ বুঝতে পারলাম।’
ঈশিতা হাসি সংবরণ করতে পারল না। কথোপকথনের এই পরিচিত ছন্দ তার সকালের সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দিল।
‘আচ্ছা, হয়েছে। এখন রাখি। স্কুলে যেতে হবে।’
‘ঠিক আছে। সাবধানে যেয়ো।’
‘আপনিও।’
বার্তালাপের সমাপ্তি ঘটলেও ঈশিতার মুখে হাসির রেশ রয়ে গেল। সে মুঠোফোনটি পাশে রেখে বিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করল।
অন্যদিকে, চৌধুরী পরিবারের বাড়িতে নিহাদ তখন নিজের প্রয়োজনীয় বইপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিল। দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী হিসেবে আসন্ন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার গুরুত্ব সে যথেষ্ট উপলব্ধি করে। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে, আর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য নিয়মিত অধ্যবসায়কে সে অপরিহার্য বলে মনে করে।
তবুও জীবনের সমস্ত দায়িত্ব ও ব্যস্ততার মধ্যেও ঈশিতার জন্য তার মনে নির্ধারিত স্থানটুকু স্বতন্ত্র।
ব্যাগের চেইন বন্ধ করে সে একবার মুঠোফোনের পর্দার দিকে তাকাল। ঈশিতার শেষ বার্তাটি তখনও সেখানে দৃশ্যমান।
অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
— ভাইয়া, নাশতা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে! কতক্ষণ লাগবে?
বাইরে থেকে ভেসে আসা পরিচিত কণ্ঠস্বরে নিহাদের চিন্তায় ছেদ পড়ল। সে দ্রুত ব্যাগটি কাঁধে তুলে নিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এল।
এভাবেই পৃথক দুটি বাড়িতে, দুটি ভিন্ন সকালের ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে শুরু হলো তাদের নতুন দিন।
তারা তখনও জানত না, বিদ্যালয়ের পরিচিত প্রাঙ্গণে আজকের দিনটি তাদের জন্য কী বার্তা বহন করে নিয়ে আসছে।
সময়ের প্রবহমান স্রোতে প্রতিটি দিনই নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। কোনো দিন আসে নিছক আনন্দের উপলক্ষ হয়ে, কোনো দিন আবার অজান্তেই জমিয়ে রাখে এমন কিছু মুহূর্ত, যাদের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে সময়ের প্রয়োজন হয়।
আর নিহাদ ও ঈশিতার জীবনেও সেই অদৃশ্য সময় যেন ধীরে ধীরে বুনে চলেছে এক নতুন অধ্যায়ের সূক্ষ্ম বুনন।
বিদ্যালয়ের বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণে তখন সকালবেলার কর্মচাঞ্চল্য ক্রমশ তীব্রতর হয়ে উঠেছে। করিডোরের উভয় পার্শ্বে অবস্থিত শ্রেণিকক্ষগুলো থেকে ভেসে আসছে শিক্ষার্থীদের কথোপকথন, কোথাও বইয়ের পাতা ওলটানোর মৃদু শব্দ, আবার কোথাও বন্ধুবান্ধবের পুনর্মিলনজনিত উচ্ছ্বাস। গ্রীষ্মের কোমল রৌদ্র বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ অতিক্রম করে দীর্ঘ করিডোরের মেঝেতে ছায়া-আলোর বিচিত্র নকশা অঙ্কন করেছে।
ঈশিতা বান্ধবীদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল। তার মুখাবয়বে সকালের সেই স্নিগ্ধ হাসির রেশ তখনও অমলিন। গত দিনের স্মৃতিগুলো যেন তার অন্তরের গোপন কোনো প্রকোষ্ঠে সযত্নে সঞ্চিত রয়েছে। তবে নিজের অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রে সে বরাবরই সংযত; তাই বান্ধবীদের সামনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টায় তার কোনো ত্রুটি ছিল না।
কিন্তু মানুষের অন্তর্লোকের অনুভূতি কি আর এত সহজে গোপন রাখা যায়?
— কী ব্যাপার, আজ তোকে বেশ হাসিখুশি লাগছে!
পাশ থেকে সাদিয়ার কণ্ঠ ভেসে আসতেই ঈশিতা তার দিকে তাকাল।
— কেন? আমি কি সব সময় মন খারাপ করে থাকি?
— তা না। কিন্তু আজকের হাসিটা একটু বেশিই রহস্যময় মনে হচ্ছে।
ঈশিতা চোখ ছোট করে তাকাল।
— তুই সকাল সকাল গোয়েন্দাগিরি শুরু করেছিস কেন?
— কারণ, আমার প্রিয় বান্ধবী কিছু একটা লুকাচ্ছে।
— তোর মাথায় যতসব অদ্ভুত চিন্তা!
কথাটি বলেই ঈশিতা দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু তার মুখের হাসি দেখে সাদিয়া যে বিষয়টি সহজে ছেড়ে দেবে না, তা সে বেশ ভালোভাবেই জানত।
দুজন যখন শ্রেণিকক্ষের কাছাকাছি পৌঁছাল, ঠিক তখনই ঈশিতার দৃষ্টি অনিচ্ছাকৃতভাবে করিডোরের অপর প্রান্তে গিয়ে স্থির হলো।
নিহাদ।
বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সে শ্রেণিকক্ষের দিকে এগিয়ে আসছিল। পরনে পরিপাটি পোশাক, কাঁধে বইভর্তি ব্যাগ, আর মুখাবয়বে সেই চিরপরিচিত গাম্ভীর্য। চারপাশের কোলাহলের মধ্যেও তার ব্যক্তিত্বে এমন এক স্থিরতা ছিল, যা সহজেই দৃষ্টিকে আকর্ষণ করে।
ঈশিতাকে দেখতে পেয়ে নিহাদের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। ঈশিতাও দৃষ্টির ভাষায় তার প্রত্যুত্তর জানাল।
কিন্তু তাদের এই নীরব অভিবাদন সাদিয়ার দৃষ্টি এড়াল না।
— ওহ্! এবার বুঝেছি।
ঈশিতা চমকে তাকাল।
— কী বুঝেছিস?
— কিছু না। তুই নিজেই বুঝে নে।
— সাদিয়া!
— আচ্ছা বাবা, আর কিছু বলছি না।
সাদিয়ার হাসি দেখে ঈশিতা আর কথা বাড়াল না। সে দ্রুত নিজের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করল। তবে দরজার কাছে পৌঁছানোর আগে একবার পেছন ফিরে তাকাতে ভুলল না।
নিহাদ তখনও করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিল। ঈশিতার দৃষ্টি নিজের দিকে নিবদ্ধ হতে দেখে সে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে মাথা নাড়ল।
সেই সামান্য মুহূর্তটুকুই ঈশিতার সকালটিকে আরও সুন্দর করে তুলল।
---
অন্যদিকে, দ্বাদশ শ্রেণির শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে নিহাদ নিজের নির্ধারিত আসনে বসে পড়ল। ব্যাগ থেকে বইপত্র বের করে টেবিলের ওপর সুবিন্যস্তভাবে রাখছিল সে, এমন সময় ইশান এসে পাশের আসনে বসে পড়ল।
কয়েক মুহূর্ত বন্ধুর দিকে তাকিয়ে থাকার পর ইশান হঠাৎ বলে উঠল,
— কী রে, আজ এত হাসছিস কেন?
নিহাদ নির্বিকার ভঙ্গিতে বই খুলল।
— হাসতে গেলেও এখন তোকে কৈফিয়ত দিতে হবে?
— আমাকে দিতে হবে না। তবে তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে, সকালটা বেশ ভালো কেটেছে।
— তোর এসব অপ্রয়োজনীয় চিন্তা বাদ দিয়ে পড়াশোনা কর।
ইশান হেসে উঠল।
— ঠিক আছে, পড়াশোনা করব। কিন্তু একটা কথা বল, ঈশিতার সঙ্গে আজ দেখা হয়েছে?
নিহাদ এবার বন্ধুর দিকে তাকাল।
— তুই কি আমার প্রতিটি কাজের হিসাব রাখিস?
— না। কিন্তু তোদের দুজনকে দেখলে মাঝে মাঝে মনে হয়, তোরা নিজেদের কথা না বলেও অনেক কিছু বুঝে যাস।
নিহাদ মৃদু হেসে বইয়ের পাতায় দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল।
— সবকিছু বুঝতে হয় না, ইশান। কিছু বিষয় অনুভব করলেই চলে।
ইশান কয়েক মুহূর্ত বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মাথা নেড়ে বলল,
— বাহ্! প্রেমে পড়ে তুই তো বেশ দার্শনিক হয়ে গেছিস!
— আর একটা কথা বললে তোর বইটা জানালা দিয়ে ফেলে দেব।
— আচ্ছা, আচ্ছা! চুপ করলাম।
দুজনের কথোপকথনের মধ্যেই শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের আগমন ঘটল। মুহূর্তের মধ্যে হাস্যকৌতুকের অবসান ঘটিয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের আসনে মনোযোগী হয়ে বসল।
নিহাদও বইয়ের পাতায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। সামনে দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর, আর সেই বছরকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর সংকল্প তার দৃঢ়।
তবুও কখনো কখনো পাঠের ফাঁকে তার মনে পড়ে যাচ্ছিল করিডোরে দেখা ঈশিতার হাসিমাখা মুখটি।
---
সময়ের প্রবাহে একের পর এক শ্রেণি অতিবাহিত হতে লাগল। শিক্ষকদের পাঠদান, সহপাঠীদের সঙ্গে কথোপকথন এবং বিদ্যালয়ের নিত্যদিনের ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল সকাল।
টিফিনের ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে করিডোরে আবারও প্রাণচাঞ্চল্যের সঞ্চার হলো। শিক্ষার্থীরা কেউ খাবারের বাক্স খুলে বসেছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠেছে, আবার কেউ বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে বেরিয়ে পড়েছে।
ঈশিতা সাদিয়ার সঙ্গে শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে বারান্দার এক নিরিবিলি অংশে এসে দাঁড়াল। সাদিয়া তখনও আগের বিষয়টি নিয়ে তাকে খোঁচাতে ছাড়ল না।
— আচ্ছা, এবার সত্যি করে বল। গতকাল কোথায় গিয়েছিলি?
ঈশিতা এবার কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
— কেন? কোথাও গেলে তোকে জানিয়ে যেতে হবে নাকি?
— আমাকে না জানালেও চলবে। কিন্তু তোর মুখের হাসিটা দেখে মনে হচ্ছে, গতকাল বেশ ভালো সময় কাটিয়েছিস।
ঈশিতা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে মৃদু স্বরে বলল,
— শাপলা-পুকুরে গিয়েছিলাম।
সাদিয়ার চোখ বড় হয়ে গেল।
— সত্যি? কার সঙ্গে?
ঈশিতা তার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন উত্তরটি না জানার কোনো কারণই নেই।
সাদিয়া এবার হেসে ফেলল।
— আচ্ছা, বুঝেছি! আর কিছু বলতে হবে না।
— তুই একদম অসহ্য!
— জানি। কিন্তু তুই আমাকে ভালোবাসিস।
— কে বলেছে?
— তোর মুখটাই বলে দিচ্ছে।
ঈশিতা আর উত্তর দিল না। সে বারান্দার রেলিংয়ের ওপারে দৃষ্টিপাত করল। দূরের গাছগুলোর পাতায় বাতাসের মৃদু আন্দোলন, আকাশজুড়ে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘ আর রৌদ্রের উজ্জ্বলতা তার মনকে কিছুক্ষণের জন্য প্রশান্ত করে তুলল।
ঠিক সেই সময় করিডোরের অপর প্রান্ত থেকে পরিচিত একটি কণ্ঠ ভেসে এল।
— ঈশিতা!
কণ্ঠস্বর শুনেই সে ফিরে তাকাল।
নিহাদ কয়েক পা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মুখে স্বাভাবিক গাম্ভীর্য থাকলেও চোখেমুখে মৃদু হাসির আভাস স্পষ্ট।
ঈশিতা সাদিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তুই একটু দাঁড়া। আমি আসছি।
তারপর ধীর পদক্ষেপে নিহাদের দিকে এগিয়ে গেল।
— কী হয়েছে?
নিহাদ তার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
— কিছু হয়নি। শুধু তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।
— কী কথা?
নিহাদ কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে মৃদু হেসে বলল,
— গতকালকের জন্য ধন্যবাদ।
ঈশিতা বিস্মিত হয়ে তাকাল।
— ধন্যবাদ কেন?
— অনেক দিন পর এত সুন্দর একটা বিকেল কাটালাম। সব সময় তো পড়াশোনা আর ব্যস্ততা নিয়েই থাকতে হয়। গতকাল তোমার সঙ্গে সময় কাটিয়ে সত্যিই ভালো লেগেছে।
কথাগুলো শুনে ঈশিতার মুখের হাসি ধীরে ধীরে কোমল হয়ে উঠল।
— আমারও খুব ভালো লেগেছে।
নিহাদ মাথা নাড়ল।
— তাহলে ঠিক আছে। আবার কোনো একদিন যাব।
ঈশিতা মৃদু হেসে বলল,
— সত্যি বলছেন তো?
— আমি কি তোমার সঙ্গে মিথ্যা বলি?
— মাঝে মাঝে বলেন।
— আচ্ছা, এবার থেকে সাবধান থাকব।
ঈশিতা হেসে ফেলল। নিহাদও তার হাসিতে মৃদু হাসল।
কিছুক্ষণ পর শ্রেণিকক্ষে ফেরার ঘণ্টা বেজে উঠল। দুজনেই নিজ নিজ শ্রেণিকক্ষের দিকে এগিয়ে গেল।
তাদের এই সামান্য কথোপকথন হয়তো অন্য কারও কাছে ছিল নিতান্তই সাধারণ। অথচ তাদের কাছে এর মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক অনুচ্চারিত আন্তরিকতা—যেখানে দীর্ঘ প্রতিশ্রুতির চেয়ে ছোট ছোট মুহূর্তের মূল্য অনেক বেশি।
জীবনের প্রতিটি দিন যে নতুন কোনো ঘটনার জন্ম দেবে, এমন নয়। কোনো কোনো দিন কেবল পরিচিত মানুষটির মুখে একটুখানি হাসি দেখার জন্যই স্মরণীয় হয়ে ওঠে।
আর ঈশিতা ও নিহাদের জীবনে সেই সাধারণ মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে রচনা করে চলেছে তাদের ভালোবাসার দীর্ঘ উপাখ্যান।
দুপুরের সূর্য তখন মধ্যগগন অতিক্রম করে ক্রমশ পশ্চিমাকাশের দিকে হেলে পড়েছে। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষগুলোতে পাঠদানের একঘেয়েমি ভেদ করে কোথাও কোথাও ভেসে আসছে শিক্ষকদের ব্যাখ্যামূলক কণ্ঠস্বর, আর জানালার বাইরে বৃক্ষশাখায় বসে থাকা পাখিরা নিজেদের মতো করে মুখরিত করে রেখেছে চারপাশের পরিবেশ। সময়ের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহে অবশেষে সমাগত হলো সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত—বিদ্যালয়ের ছুটির ঘণ্টাধ্বনি।
ঘণ্টার শব্দ প্রতিধ্বনিত হতেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃষ্টি হলো ব্যস্ততার এক নতুন সঞ্চার। কেউ দ্রুত বইপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে, কেউ আবার দিনের অসমাপ্ত কথোপকথন শেষ করতে ব্যস্ত। শ্রেণিকক্ষের পরিচিত পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যেই কোলাহলমুখর হয়ে উঠল।
ঈশিতাও নিজের বইখাতা ব্যাগে গুছিয়ে নিয়ে সাদিয়ার সঙ্গে শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে এল। করিডোর অতিক্রম করার সময় তার দৃষ্টি একবার অনিচ্ছাকৃতভাবেই দ্বাদশ শ্রেণির কক্ষটির দিকে চলে গেল। কিন্তু নিহাদকে সেখানে দেখতে না পেয়ে সে আর দাঁড়াল না।
— কী রে, কাউকে খুঁজছিস?
সাদিয়ার প্রশ্নে ঈশিতা দ্রুত তার দিকে তাকাল।
— না তো! চল, বাড়ি যাই।
— আচ্ছা, বুঝলাম। আমি কিছুই বুঝি না!
— সাদিয়া, আর একটা কথাও বলবি না!
ঈশিতার অভিমানমিশ্রিত কণ্ঠ শুনে সাদিয়া হেসে ফেলল। দুজনেই বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের দিকে এগিয়ে গেল।
ফটকের বাইরে এসে ঈশিতা একবার চারপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে নিল। প্রতিদিনের মতোই শিক্ষার্থীদের ভিড়, অভিভাবকদের অপেক্ষা আর যানবাহনের অবিরাম চলাচলে মুখরিত হয়ে উঠেছে বিদ্যালয়ের সম্মুখভাগ। পরিচিত দৃশ্যের মধ্যেও তার মনে কোথাও যেন একটি ক্ষীণ প্রত্যাশা অবশিষ্ট রয়ে গেল।
কিন্তু সেই প্রত্যাশার কারণ সে নিজেকেও স্পষ্ট করে বলতে পারল না।
---
অন্যদিকে, বিদ্যালয়ের অপর প্রান্তে ইশানের সঙ্গে বেরিয়ে এল নিহাদ। কাঁধে ব্যাগ, মুখে দিনের ক্লান্তির আভাস—তবুও তার চলনে ছিল স্বাভাবিক স্থিরতা।
ইশান একবার বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলল,
— আজ বাড়ি যাবি, নাকি কোথাও যাবি?
— বাড়ি যাব। পড়াশোনা আছে।
— তোর জীবনটা সত্যিই বই আর পড়াশোনার মধ্যে আটকে আছে।
নিহাদ মৃদু হেসে উত্তর দিল,
— আর তোর জীবনটা শুধু অন্যের খবর নেওয়ার মধ্যে আটকে আছে।
— বাহ্! আমাকে অপমান করছিস?
— সত্যি কথাকে অপমান বলে না।
ইশান হেসে উঠল। দুজন কথা বলতে বলতে বিদ্যালয়ের ফটক অতিক্রম করল। কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর ইশান নিজের গন্তব্যের দিকে রওনা দিল, আর নিহাদ বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করল।
পথের দুপাশে সারিবদ্ধ বৃক্ষরাজির পাতায় তখন দুপুরের রৌদ্র চিকচিক করছে। ব্যস্ত সড়কের যানবাহন, পথচারীদের পদচারণা আর দূর থেকে ভেসে আসা মানুষের কণ্ঠস্বরের মধ্যে দিয়ে নিহাদ এগিয়ে চলল আপন গন্তব্যের দিকে।
তবুও তার মনে বারবার ফিরে আসছিল সকালের সেই কথোপকথন।
ঈশিতার হাসি, তার অভিমান করার ভঙ্গি আর গতকালের বিকেল সম্পর্কে বলা কয়েকটি সহজ কথা—সবকিছুই যেন দিনের অন্যান্য ব্যস্ততার মধ্যেও তার মনে এক প্রশান্তির আবেশ ছড়িয়ে রেখেছিল।
---
বাড়িতে ফিরে প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পন্ন করে ঈশিতা নিজের কক্ষে এসে বসল। জানালার পাশে রাখা পর্দাটি বাতাসে মৃদু দুলছিল। বাইরে দুপুরের আলো ক্রমশ কোমল হয়ে এসেছে, আর ঘরের ভেতর নেমে এসেছে এক শান্ত নির্জনতা।
ঈশিতা ব্যাগ থেকে বইখাতা বের করে পড়ার টেবিলে রাখল। আগামী দিনের পড়াগুলো একবার দেখে নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বই খুলে বসার পরও তার মন সম্পূর্ণভাবে পাঠে নিবিষ্ট হতে পারল না।
হঠাৎ তার মনে পড়ল, নিহাদ সকালে বলেছিল আবার কোনো একদিন তারা শাপলা-পুকুরে যাবে।
কথাটি স্মরণ হতেই তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
সে মুঠোফোনটি হাতে নিয়ে নিহাদের কথোপকথনের পরিসর খুলল। কিছুক্ষণ বার্তার দিকে তাকিয়ে থাকার পর লিখল—
‘বাসায় পৌঁছেছেন?’
বার্তাটি পাঠানোর কয়েক মিনিট পরেই উত্তর এল—
‘হ্যাঁ, পৌঁছেছি। তুমি?’
ঈশিতা লিখল—
‘আমিও। আচ্ছা, আজকে কি পড়তে বসেছেন?’
নিহাদের উত্তর এল—
‘না, তোমার সঙ্গে কথা বলছি।’
ঈশিতা হেসে ফেলল।
‘বাহ্! আজকাল তো বেশ কথা বলতে শিখেছেন!’
‘তোমার কাছ থেকেই শিখছি।’
‘আমি কি আপনাকে এত কথা বলা শিখিয়েছি?’
‘হ্যাঁ। এখন আবার অস্বীকার করো না।’
ঈশিতা মৃদু হেসে ফোনটি বুকে চেপে ধরল না; বরং টেবিলের ওপর রেখে আবার বইয়ের দিকে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করল। তার জানা ছিল, নিহাদও নিজের পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। তাই দীর্ঘ কথোপকথনে সময় নষ্ট না করে সে বার্তাটি পাঠাল—
‘আচ্ছা, এখন পড়তে বসুন। আমিও পড়ব। পরে কথা হবে।’
নিহাদ উত্তর দিল—
‘ঠিক আছে, মেহু জান। মন দিয়ে পড়বে।’
বার্তাটি পড়ে ঈশিতা মৃদু স্বরে বলল,
— আপনিও পড়বেন, প্রেম পুরুষ।
তারপর সে বই খুলে পড়তে শুরু করল।
জানালার বাইরে সময়ের স্রোত অবিরাম বয়ে চলল। দিনের আলো ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে লাগল, আর দুটি পৃথক কক্ষে বসে দুজন মানুষ নিজেদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অজান্তেই সযত্নে আগলে রাখল একে অপরের জন্য নির্ধারিত অনুভূতিগুলো।
কারণ, ভালোবাসা মানেই প্রতিটি মুহূর্তে পাশাপাশি থাকা নয়; কখনো কখনো দূরে থেকেও প্রিয় মানুষটির খোঁজ নেওয়া, তার পড়াশোনার কথা মনে করিয়ে দেওয়া কিংবা দিনের শেষে সামান্য কয়েকটি বার্তায় নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়াই সম্পর্ককে গভীর করে তোলে।
আর সেই গভীরতার মধ্য দিয়েই নিহাদ ও ঈশিতার পরিচিত দিনগুলো ক্রমশ হয়ে উঠছিল আরও অর্থবহ, আরও আপন।
চলবে ইনশাআল্লাহ
পর্ব -৩১