ফন্ট সাইজ:
থিম:
অসমাপ্ত স্মৃতি

পর্ব 2

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস জুলি

ধরণীতে আজ সুন্দর ঝলমলে রোদ উঠেছে। তবে সেই ভ্যাপসা গরমটা আজ নেই। রাফিয়া সিকদার আজ ছাদে গেলো। ছাদে কিছু আচারের বয়াম রাখা সেগুলোই আনতে গেছেন তিনি। গিয়ে দেখেন একটা বয়াম উধাও। বুঝতে পারলেন না বয়াম টি কোথায় গেছে। ছাদের এদিক-ওদিক তাকিয়ে খুঁজতে লাগলেন। দেখলেন ছাদের চিলেকোঠার ছোট্ট ঘরটাতে রাত আর সুধা বসে বসে আচার চিবুচ্ছে। বেশ রাগ লাগলো তার। প্রতিবারই তিনি এভাবে আচার শুকাতে দেন আর এই দুই পাজি তা তৈরি হওয়ার আগে খেয়ে ফেলে। তিনি এগিয়ে গেলেন সেদিকে আস্তে করে রাতের হাত থেকে আচারের বয়ামটা নিয়ে নিলেন। অবশ্য তিনি এই কাজটা করতেন না। কেননা গতরাতে রাতের খুব জ্বর ছিল। সারারাত নিশ্বাস নিতে পারছিল না। আর এখন কিনা বসে বসে এই তেঁতুলের টক আচার খাচ্ছে। ইচ্ছে তো করলো বেশ কড়া কথা শুনিয়ে দিতে। কিন্তু পারলেন না। রাত মায়া ভরা চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। রাফিয়া সিকদার মেয়ের মায়া ভরা দৃষ্টিতে দেখে যেন সব রাগ পানি হয়ে গেল। এবং তিনি মেয়েকে বিরক্তি গলায় বললেন,

__তোর না গত রাতে জ্বর এসেছে। আর আজ তুই আচার খেতে বসে গেছিস রাতে আরেকবার ডাকিস আমায় তখন তোর মজা দেখাবো।

__একটু খেলে কিছু হবে না গো মা। আমি খেয়ে আবার আগের জায়গায় রেখে দিব। দাওনা।

মা মেয়ের কথোপকথন শুনে সুধা বলে উঠলো,

__না গো মামনি তুমি নিয়ে যাও অনেকক্ষণ ধরে খাচ্ছে ও।

__তুই বন্ধু নাকি শত্রু আমার সাথে সব সময় শয়তানি করিস কেন।

__কিরে তুই সুধা কে এমন করে বলছিস কেন। ও তো ঠিক কথাই বলছে। বদমাশ কোথাকার। দাঁড়া তোর একটা পানিশমেন্ট দরকার আমি তোর ভাইয়াকে কল করে বলবো তুই কি বার বেড়েছিস। বড় মানুষদের কথা শুনিস না।

কথা বলার মাঝে ই রিপ্তর কল আসে। মায়ের মোবাইলের স্ক্রিনে ভাইয়ের নাম দেখে পালাতে যাবে তার আগেই ফোনের ওপাশ থেকে রিপ্তর কঠিন কণ্ঠস্বর ভেসে আসে,

__কিরে রাত তুই নাকি মায়ের কথা শুনিস না। খুব দুষ্ট হয়ে গেছিস নাকি। আর ভাইয়াকে কি মিস করিস না কথা তো তেমন বলিস না আমার সাথে।

রাত তোতলাতে তোতলাতে বলল,

__কিকি যে বলো ভাইয়া। আসলে সামনে তো পরীক্ষা তাই একটু পড়ার চাপ বেশি তাই কথা বলতে পারিনা এই আর কি।

__শেখাচ্ছিস আমায় পড়ালেখা কি আর আমরা করিনি। পড়ার জন্য আবার কথা বলার সময় পায়না মানুষ। বোকা পেয়েছিস আমায় তুই।

__না আসলে আমি তা বলতে চাইনি। তুমি যখন কল কর তখন আমি ফোনের পাশে থাকি না। এছাড়া আর কিছু নয়।

__যাই বলিস তোর বাঁদরামি কিন্তু হাই লেভেলে
চলে গেছে। মা বলছিল তুই নাকি এখন আবার স্কুল ফাঁকি দিস। ভালো হয়ে যা বলে দিচ্ছি। ভালো হতে পয়সা লাগে না।

__ আচ্ছা ঠিক আছে ভাইয়া কাল থেকে আর কোন ফাঁকি দেবো না।

রাত কথা বলা শেষ করে ফোনটা মায়ের কাছে দিয়ে চলে গেল। মনে মনে তো খুব করে বকে দিল মা এবং ভাইকে মীরজাফর সবাই রাতের একটু খুশি দেখতে পাই না। রাত কিছু না বলেই
হান হান করে চলে গেল। উদ্দেশ্য এখন তাদের ঘরের পিছনের পুকুরপাড় ওখানে গিয়েই বসবে সে এখন। সুধা পেছন থেকে ডাকলো,

__কিরে কোথায় যাচ্ছিস তুই আমাকে তো নিয়ে যা।

__তুই আমার সাথে কথা বলবি না। তুই শালী আই লেভেলের মীরজাফর।

কথাগুলো বলেই আপন মনে বকবক করতে করতে চলে গেল পুকুর পাড়ে। সুধা ও নিজের বাড়ি চলে গেল। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। রাত পুকুরপাড় থেকে বাসায় ফিরে এলো। রাতের খাবার আর খেলো না রাত। তার যেন আরেকজন বড় বন্ধু এই রাতের আঁধার। যেখানে মনের কত শত অভিযোগ রোজ তুলে ধরে। আকাশে দেখলো চাঁদকে বিশাল এক মেঘ ঢেকে দিচ্ছে। তা দেখে মনে মনে বিড়বিড় করল, মানুষের মনের কষ্টগুলোকেও হাসি দ্বারা এভাবেই লুকানো যায়। যা কেউ ধরতেও পারে না।
এটা কৃত্রিম হাসি নাকি সত্যি ই মন খোলা হাসি।

দেখতে দেখতে কিছুদিন পেরিয়ে গেল রাতের পরীক্ষা আর মাত্র এক মাস পরে। এবার সে নবম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণীতে উঠবে। রোজগার মতোই আজও সে কোচিং থেকে ফেরার পথে সুধাকে বলল,

__চলা আজ এক জায়গা থেকে ঘুরে আসি আসি।

__ কোথায় যাবি!

__যাবি কিনা তাই বল। না হলে আমি একাই চলে যাব।

__আহা!রেগে যাচ্ছিস কেনো যাব বললাম তো।

তারা দুজন হাঁটতে হাঁটতে একটা নির্জন শুনশান জায়গায় গিয়ে পৌঁছালো ।যেখানে একটা বিশাল বড় মাঠ। কিন্তু বর্ষাকাল থাকায় এখানে এখন ধান চাষ করা হয়েছে । দেখতে বেশ অপূর্ব লাগলো দৃশ্যটা সুধার কাছে। চারিদিকে কেমন নিরবতা । সুন্দর সবুজ ধান গাছগুলোতে এখনো ধান আসেনি মনে হয় দু-এক মাস হয়েছে এগুলো লাগানো হয়েছে। পাশে একটা ছোট্ট পুকুর ছিল। পুকুরের পাশে একটা নারিকেল গাছ পুকুরের উপর দিয়ে হেলে গিয়েছে। সেখানেই গাছটার উপরে বসে পুকুরের পানিতে পা ডুবিয়ে বসে আছে রাত। সুধাও তার দেখা দেখি ওখানে গিয়ে বসলো। সুধা এবার রাতকে প্রশ্ন করল,

__এখানে নিয়ে এলি যে!

__কেন জায়গাটা তোর পছন্দ হচ্ছে না।

__না না তা নয় কিন্তু তুই তো এখানে তেমন একটা আসিস না।

__আসলে এই জায়গাটা আমার খুবই পছন্দ। জায়গাটার অদ্ভুত একটা সৌন্দর্য আছে। তাই এখানে নিয়ে আসলাম তোকে দেখাতে।

সুধা আর কোন প্রশ্ন করল না। সে জানে এই মেয়েটিকে। সব সময় হাসি খুশি থাকলেও ওর মনে কোথাও একটা বিষন্নতা আছে। সুধা একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল সে মাঝে মাঝে কেমন চুপ হয়ে যায় কেন? কিন্তু কখনোই রাত এর জবাব দিত না। কেমন চুপ হয়েছে যেতো। রাত বলেছিল সময় আসলে সে বলবে । কিন্তু সুধা জানেনা, কোন দিন সেই সময় আসবে । এত প্রিয় বান্ধবী হওয়া সত্বেও কোন গোপন সত্য তার থেকে সে লুকাচ্ছে। আজও বোধহয় মেয়েটার মনে সেই বিষন্নতা কাজ করছে। প্রায় ঘন্টাখানেক পর তারা সেখান থেকে চলে গেল। যে যার বাড়ি ফিরে গেল।

ধরণীতে এখন শীতের আভা ছড়িয়ে পড়েছে। নভেম্বরের প্রথম দিকে এ বছরে বেশ পড়েছে। পরীক্ষার আর মাত্র সপ্তাহখানেক বাকি। রাতের পড়ার চাপ বেশ বেড়েছে। এখন আর তারা স্কুলে যায় না বাড়িতেই পড়ালেখা করে দুজনে। তবে তারা একসাথে পড়েনা। এমনি সময় প্রিয় বন্ধু হলেও পড়ালেখার বিষয় যেন তারা দুজন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বি।রিপ্ত রাতকে বলেছে, এবার যদি সে পরীক্ষায় ফার্স্ট হয় তাহলে তাকে সে বাড়ি ফিরে স্মার্টফোন কিনে দেবে। রাতকে আর পাই কে । ফোনের লোভে, বেশ পড়ালেখা করছে মেয়েটা। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে আসেনা সারাক্ষণ রুমে থাকে সে। আর তার সাথে আছে তো মিমি। মিমিকে টেবিলে বসিয়ে সে ওখানে বসে পড়ালেখা করে। মাঝে মাঝে বিরক্ত হলে মিমির সাথেই খেলা করে সে।

দেখতে দেখতে পরীক্ষার দিন চলে এলো। দুই বান্ধবী এখন পরীক্ষা দিতে যাবে । রাত যাওয়ার সময় বাবার কাছ থেকে ৫০ টাকা নিয়েছে কি করবে সেটা ঠিক বলে নি। তার বাবা জিজ্ঞাসা করেননি। কারণ তিনি জানেন এই টাকা সে এখন যাওয়ার পথে পাশে একটা মসজিদে দিয়ে যাবে। তার সন্তান কি না! দুষ্টু হলেও বেশ সভ্য মেয়ে রাত। মনটাও বেশ পরিষ্কার। দয়া মায়ার যেন কোন অভাব নেই তার ভিতরে। তবে আজ যাওয়ার পথে সে মসজিদে টাকা দেয়নি। মসজিদের পাশে দেখল একটা বাচ্চা ছেলে একটা ঠেলাগাড়িতে কিছু মাল বহন করছে। ছেলেটাকে দেখে বেশ ক্লান্ত মনে হলো রাতের। সে টাকাটা তাকেই দিয়ে দিল বলল কিছু কিনে খেতে। ছেলেটাও খুশি মনে তা গ্রহণ করল। তারা দুজন আবার পরীক্ষার হলে প্রবেশ করল। প্রতিবারের মতোই এবারও তাদের সিট পড়েছে অন্য রুমে। এটা তাদের বেশ সুবিধাই হয়েছে কারণ কেউ কারো লেখার গতি অথবা কে কতগুলো লুস নিচ্ছে তা বোঝা যায় না। পরীক্ষা শেষে দুজনেই বেরিয়ে আসলো। সুধা বলল,

__পরীক্ষা কেমন হয়েছে তোর?

__ভালোই হয়েছে। তোর কেমন হয়েছে?

__আমারও বেশ ভালো হয়েছে। কিন্তু ম্যাথ গুলো বেশ হাড ছিল।

দুজন পরীক্ষার আলোচনা করতে করতে যে যার বাড়ি চলে গেল। দেখতে দেখতে তাদের পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। আর এক মাস বাদে তাদের পরীক্ষার রেজাল্ট দিবে। সাথে তার বড় ভাইও আসবে কিছুদিনের মধ্যেই। রাত শুধু প্রার্থনা করছে যেন ভাইয়া রেজাল্টের পরেই আসে। রাতদের আর্থিক অবস্থা এখন বেশ ভালো। তাই
রিপ্ত এবার একেবারেই দেশে চলে আসবে। দেশে এসে ছোটখাটো একটা বিজনেস স্টার্ট করবে।

দেখতে দেখতে সেই কাঙ্খিত দিন এসে গেল। আজ রাতের রেজাল্ট দেওয়ার দিন। রাত রেডি হয়ে সুধাকে ডাকতে গেল। তাকে ডেকে নিয়েই একসাথে দুজন যাবে রেজাল্ট আনতে। যাওয়ার পথে দেখা হয়ে গেল তাদের এক ক্লাসমেট সাদিয়ার সাথে। সাদিয়া মেয়েটি ছিল বরাবরই একটু হিংসুটে স্বভাবের। সে বলল,

__আজ দেখিস আমি ফার্স্ট হবো।

সুধা বলল,

__সে না হয় দেখা যাবে। কিন্তু ওভার কনফিডেন্স ভালো নয়।

__এত জ্বলছিস কেন দেখিস আমি ফাস্ট হবো। এবার আমি খুব ভালোভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছিলাম।

__আচ্ছা সে না হয় স্কুলে যাওয়ার পরেই বোঝা যাবে কে ফার্স্ট হয় আর কে...

কথা শেষ করতে দিল না রাত সুধাকে বলল,

__ফালতু বকবক না করে দ্রুত চল দেরি হয়ে যাবে এর পরে না হয়। আমরা বরং আসি সাদিয়া আজ।

বলে হনহান করে দুজন চলে গেল। সাদিয়াকে কিছু বলার সুযোগ দিল না। তারা জানে এই মেয়ের সাথে কথা বললেই ঝগড়া হবে। কারণ মেয়েটা গা জ্বলা কথা বলে। রেজাল্টের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে প্রথমে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শুরু হল রেজাল্ট দেওয়া। ষষ্ঠ,সপ্তম, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত রেজাল্ট দেওয়া হয়ে গেছে এখন বাকি নবম এবং দশম একজন শিক্ষক রেজাল্ট প্রকাশ করছেন তিনি এবার নবম শ্রেণীর উদ্দেশ্যে বললেন,

__এবছরের নবম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন,

বলে কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করলেন তিনি আবারও বলতে শুরু করলেন,

__রাধিতা ইয়াসমিন রাত। দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে... সাবিনা সুলতানা সুধা। এবং তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে... সাদিয়া আক্তার মিম।

ক্রমান্বয়ে সকল রোল বলে দেওয়ার পর আবারো ঘোষণা করলেন,

__এবছরের আমাদের স্কুলের সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে অল স্কুল ফার্স্ট হয়েছে...রাধিতা ইয়াসমিন রাত।

ছাত্রীরা যে যার পুরস্কার নিয়ে চলে যাচ্ছে। এমন সময় সাদিয়া রাতের সামনে এসে বলল,

__এবার না হয় তুমি ফার্স্ট হয়েছো পরের বছরে তোমাকে আমি দেখে নিব।

__তুমিতো প্রতিবছরই একথাই বলো কিন্তু সেই ক্লাস সিক্স থেকে আমি ফার্স্ট হয়ে আসছি। তোমাকে আমি ওপেন চ্যালেঞ্জ করলাম পারলে আমার জায়গা নয় সুধার জায়গা নিয়ে দেখিও। চল সুধা বাসায় যাই।

বলে দুজন চলে যেতে লাগলো যাওয়ার পথে গেট থেকে বেরোনোর সময় সুধা একটা ছেলের সাথে ধাক্কা খায়। বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে নেয়। বেশ কয়েকটা গালি ছাড়ে দেয়। সে বলল,

__কে রে বজ্জাত কোথাকার! চোখে দেখিস না নাকি? উফ! নাকটা আমার ভেঙ্গে গেল।

আর কিছু বলবে তার আগেই রাত বলে উঠলো,

__আরে ভাইয়া তুমি কখন আসলে।

রাতের কথা শুনে সুধা তড়িৎ বেগে মাথা তুলল। সে আহাম্মক বনে যাওয়ার মত তাকিয়ে আছে। বলিষ্ঠ দেহি পুরুষের দিকে থতমত খেয়ে মিনমিন করে বলল,

__রি,রিপ্ত ভাইয়া তুমি এখানে কিকি করছো।
I am sorry. আমি আসলে বুঝতে পারিনি। আমি মনে করেছিলাম অন্য কেউ হবে হয়তো।

__সে তো ঠিক আছে। কিন্তু এতগুলো গালি দিলি কেন। কোথা থেকে শিখেছিস এইসব। দাঁড়া আজ আমি আঙ্কেলকে কল করে বলবো, আপনার মেয়ে খুব গালি শিখেছে!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 2 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন