ফন্ট সাইজ:
থিম:
অসমাপ্ত স্মৃতি

পর্ব 3

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস জুলি

ধরণীতে আজ ভালই শীত পড়েছে। ডিসেম্বরের শেষের দিকে একটু বেশি শীত পড়ে। রাতের আকাশে জল জল করছে তাঁরা । কিন্তু চাঁদের হদিস নেই। চারিদিকে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা গ্রাস করে যাচ্ছে ধরনীকে। মাঝে মাঝে ঝিঁঝি পোকার ডাক। অদ্ভুত এক ভয়ানক সুন্দর আজকের রাতটা। ছাদের এক কোনায় সিড়ির পাশে বসে সেই সৌন্দর্য উপভোগ করছে সুধা। তার মনটা আজ বেশ খারাপ। তাই এখানে বসে বসে কান্না করার চেষ্টা করছে। কিন্তু তার চোখ দিয়ে যেন পানি আসছে না। চিন্তা করছে এটা বুঝি তার সাথে হওয়ারই ছিল। সেদিন স্কুল থেকে বাড়ি আসার পরে বেশ বকা শুনে ছিল বাবার কাছে। ও নাকি রিপ্তর সাথে বেয়াদবি করেছে।
কিন্তু ও তো ইচ্ছা করে এসব বলতে চাইনি। ব্যথা পেয়েছিল বলে, মুখ দিয়ে গালি বেরিয়ে গেছে। আর ওই রাতের ভাই টা ওকে বেশ করে বকা শুনিয়ে নিল। মনে মনে বুদ্ধি এটা নিল, সে রিপ্তকে আচ্ছা একটা শিক্ষা দিবে। ও মন খারাপ করে রুমে চলে গেল। রাতে আর খেলো না। সুধার মা অবশ্যই ডেকেছিল কিন্তু সে খাবে না বলে দরজায় খোলেনি।

সময় চলছে তার নিজস্ব গতিতে। রাতের ক্লাস শুরু হয়ে গেছে ‌দুদিন হলো। কিন্তু ওরা যায়নি স্কুলে। প্রথম প্রথম নাকি স্কুলে ক্লাস হয় না সেই অজুহাতেই দুজন স্কুলে গেল না। কিন্তু আজ ।।ভাইয়ের বকা শুনে তাকে স্কুলে যেতে হবে। তাইতো ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও রেডি হয়ে গিয়েছে। এখন শুধু নাস্তা করা বাকি ‌। এমন সময় সুধা আসলো বাড়িতে। সুধাকে দেখে রাফিয়া সিকদার তো খুব খুশি। কতদিন পরে এসেছে সুধা তাদের বাসায়। তাইতো রাফিয়া সিকদার তাকে ডাইনিং টেবিলে বসিয়া গেছে। এখনো কেউ টেবিল আসেনি। নাস্তা ইতোমধ্যে টেবিলে সাজিয়ে গেছেন রাফিয়া সিকদার। সুধার ডান পাশের চেয়ারে বসবে রাত আর বাম পাশে চেয়ারে রিপ্ত বসে। এই সুযোগ কোন ভাবে হাতছাড়া করবে না সুধা। তাইতো দ্রুত করে একটা আস্ত কাঁচা মরিচ রিপ্তর প্লেটে রাখা কলার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। আর মিটিমিটি হাসতে থাকে আজ তো সে রিপ্তকে আচ্ছা শিক্ষা দিবে।

সবাই চলে এসেছে ডাইনিং টেবিলে। রিপ্তর আজ বেশ তাড়া আছে। সে তার নতুন বিজনেস শুরু করেছে ভীষণ ব্যস্ততায় দিন কাটছে তার। সবাই নাস্তা শুরু করেছে। সুধাকে মিটিমিটি হাসতে দেখে একটু সন্দেহ হলো তার। তবে তেমন একটা গুরুত্ব দিলো না সে। পাউরুটি খাওয়ার পরে কলা হাতে নিয়ে সে খেতে শুরু করল। প্রথম কামড় বসাতেই তার মুখ বিকৃত হয়ে গেল। মিষ্টির ভেতরে হঠাৎ ঝাল স্বাদ পেতেই চোখ মুখ জ্বলে উঠলো তার। কিন্তু সবার সামনে কিছু বলতে পারল না। রাগ টুকু সংবরণ করে সে স্থান ত্যাগ করল। যাওয়ার সময় রাগী চোখে তাকালো সুধার দিকে। সুধাকে আর পাই কে, সে তো মহা খুশি। খুব কষ্টে হাসিটা চেপে রেখেছিল সে। রিপ্ত যাওয়ার সাথে সাথে সে উচ্চস্বরে হেসে ফেলল। পাশ থেকে রাত সুধাকে খোঁচা মেরে বলল,

__কিরে এভাবে হাসছিস কেন?

__হাসবো না তো কি করব। দেখলি না তোর ভাই কেমন জ্বলতে জ্বলতে চলে গেল।

__মানে? তুই কি কিছু করেছিস। সুধা?

__বেশি কিছু করিনি রে, তোর ভাই আমাকে বাবার কাছে বকা শুনিয়েছিলো। তাই আমি একটু তোর ভাইয়ের আমার নিপুন হাতের কারুকার্য করেছি মাত্র।

__কি বলছিস কি তুই! কি করেছিস তুই। হ্যাঁ? ভাইয়া যদি জানতে পারে, আগেরবার তো শুধু বকা খাইয়েছে। এইবার তোকে মার খাইয়ে ছাড়বে।

__আরে যা তো! তোর ভাইকে আমি ভয় পাই নাকি। এমন লজ্জার কথা তোর ভাই কাউকে বলবেনা। আমি তো শুধু একটা মরিচ মিশিয়ে ছিলাম। আর তো কিছু করিনি ‌।

__কি বলছিস কি তুই! মরিস মিশিয়েছিস? ভাইয়া একদম মরিচ খেতে পারে না। কোনভাবে যদি জানতে পারে ,এই কাজ তুই করেছিস তাহলে তোর খবর করে ছাড়বে।

__বাদ দে তো চল দেরি হয়ে যাচ্ছে।

দুজন চলে গেল স্কুলের উদ্দেশ্যে। ক্লাস শেষ হলো প্রায় ই দুইটার সময়। বাড়ি ফেরার পথে রাস্তায় তাদের দু'বছরের সিনিয়র একটা ছেলের সাথে দেখা হয়। রাত ও সুধা তাকে সালাম দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। ছেলেটার নাম শুভ্র । শুভ্র রাতকে ডেকে বলল,

__তুমি এই বছরে আমাদের স্কুলে সেরা ছাত্রী হয়েছো না?

__সেরা ছাত্রী না ঠিক। আমি এ বছরে হায়েস্ট নাম্বার পেয়েছি।

__সে যাই হোক‌‌। দুটোই তো একই ব্যাপার। আমার একটা কথা বলার ছিল সেটাই বলতে এসেছি।

__কি কথা ভাইয়া? যে রাস্তার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে বলতে হল আপনার ভাইয়া?

__আসলে আমি তোমাকে আমার অনেক ভালো লাগে।

__তা লাগতেই পারে! কিন্তু এভাবে বলার কি আছে ভাইয়া।

__আসলে আমি তোমাকে ভালোবাসি।

রাত এবার বেশ রেগে গেল এবং শুভ্র কে বলল,

__ কি বলছেন আপনি এসব । আমরা আপনাকে সিনিয়র ভাইয়া হিসেবে জানি। আপনার এমন একটা কথা বলা ঠিক হয়নি একদম। রাস্তায় দাঁড়িয়ে এভাবে সিনক্রিয়েট করছেন কেন আপনি? এটা কেমন ব্যবহার রাস্তার মাঝখানে। আপনি এখান থেকে চলে যান প্লিজ রাস্তার মানুষ দেখছে আমাদের?

__প্লিজ রাত আমাকে ফিরিয়ে দিও না। দরকার হলে তুমি সময় নিয়ে ভেবে দেখো। আমি তোমাকে আসলেই অনেক ভালবাসি।

রাতের রাগ এবার আকাশ ছুঁয়েছে। কি বলছে এসব এই ছেলেটা। সে আবার বিরক্তি নিয়ে বলল,

__আপনি কিসের ভালবাসার কথা বলছেন? আমি তো আপনাকে ভালোবাসি না তাহলে এখানে সময় নেওয়ার কি আছে। আপনি প্লিজ এখান থেকে চলে যান। না হলে কিন্তু আমি ভাইয়াকে বলতে বাধ্য হব।

__সে তুমি যাকেই বলো, আমি আসলেই তোমাকে অনেক ভালোবাসি।

সুধা এবার শুভ্রোর কথা শুনে অনেক রেগে গেল রাস্তার মাঝখানে এভাবে একটা মেয়েকে হ্যারাস করছে। ছেলেটা ভীষণ বেয়াদব। এতদিন তাকে ভালো মনে করেছিল সবাই। কিন্তু ও রাস্তার মাঝখানে মেয়েদের এভাবেই বিরক্ত করে। একদিন সোজা তাকে একটা মেয়ের সাথে দেখেছিল শুভ্র মেয়েটিকে চিট করেছে। এবং তার সাথে কিছু ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করেছে। এটা অনেকে ই জানে। সেই মেয়ে পরে সুইসাইড করেছিল। সুধা এবার শুভ্র কে বলল,

__আপনি ভাবলেন কিভাবে আপনার মত একটা প্লেবয়ের সাথে রাতের মত একটা ব্রিলিয়ান ছাত্রী আপনার সাথে রিলেশন করে নিজের ক্যারিয়ার নষ্ট করবে। লোকজনকে ডাকি তার আগেই আপনি এখান থেকে চলে যান না হলে পরিণতি খুব খারাপ হবে।

সুধার কথা শুনে শুভ্র বেশ ঘাবড়ে গেল। সে মিন মিন করে কিছু বলতে যাবে তার আগে সুধা দেখল রিপ্ত ওখান দিয়ে যাচ্ছে। সে রিপ্তকে ডাক দিতেই ছেলেটি ওখান থেকে হনহন করে চলে গেল। সুধার ডাক শুনে রিপ্ত তার কাছে এসে জিজ্ঞাস করল,

__কি হয়েছে ডাকছিস কেন এভাবে?

__ভাইয়া রাস্তায় একটা ছেলে রাতকে বিরক্ত করছিল। তোমাকে দেখেই সে চলে গেল।

__কি? রাতকে বিরক্ত করছিলো এত বড় সাহস ছেলেটার নাম কি?

__শুভ্র নাম ছেলেটার। আমাদের দু বছরের সিনিয়র।....

আর কিছু বলবে তার আগেই রিপ্ত কঠিন স্বরে বলল,

__তোরা এখান থেকে যা। সোজা বাসায় যাবি। কোন জায়গায় থামলে তোদের হার্টবিট থেমে যাবে।

রিপ্তর কঠিন কন্ঠে ওরা দুজন ওখান থেকে দ্রুত বাসায় চলে যায়। বাসায় গিয়ে রাত ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। মিমিকে ও আজ আর আদর করেনি। তার মেজাজটা আজ ভালো নেই। এমনিই ছেলেটা কি সব আজেবাজে বলছিল। আবার ভাইয়ের বকা তো আছে। ঘুম থেকে উঠলো আসরের আজান এর একটু আগে। ঘুম থেকে উঠে অজু করে নামাজ পড়ে সে মিমিকে নিয়ে ছাদে চলে গেল। ছাদে তার বেশ কয়েকটি ফুলের টব ছিল এগুলোতেই আজ পানি দিয়েছে রাত। রাতের কবুতর পোষার শখ আছে। তার বারোটি কবুতর আছে। যার মধ্যে তার সবচেয়ে প্রিয় একটি সাদা কবুতর টির কেউ যেন গলা কেটে রেখে গেছে। দৃশ্যটা দেখে রাত চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। রাতের চিৎকার শুনে রিপ্ত দৌড়ে আসে ছাদে এসে দেখে রাত অজ্ঞান হয়ে নিচে পড়ে আছে ।পাশেই গলাকাটা কবুতরটা পড়ে আছে। সে আর কিছু না দেখেই রাতকে কোলে করে নিয়ে নিচে নেমে আসে। হসপিটালে যাওয়ার কথা বলছিলেন আসলাম সিকদার। কিন্তু রিপ্ত বাড়িতেই ডাক্তার এনেছিল ততক্ষণে। ডাক্তার রাতকে চেকআপ করে বললেন,

__আপনারা কি জানতেন না মেয়েটির রক্তে ফোবিয়া আছে। রক্ত দেখলেই প্যানিক অ্যাটাক হয়। তাহলে ওকে রক্ত দেখিয়েছিলেন কেন। মেয়েটির রক্ত দেখে ওর সেন্সলেস হয়ে গেছে।

আসলাম সিকদার বললেন,

__আসলে আমরা জানতাম ওর রক্ত ফোবিয়া আছ।বুঝতে পারছি না ও কোথায় রক্ত দেখেছে। তাই এমন অজ্ঞান হয়েছে। ওর জন্য তো আমরা বাসায় মাংস তেমন খাই না। মাসের মাথায় একবার কি দুবার মাংস আনি। তাও লুকিয়ে রেখেই খায় ও যদি দেখে ফেলে আর প্যানিক অ্যাটাক হয় সেজন্য।

__আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু ওকে রক্ত থেকে প্লিজ একটু দূরে রাখবেন।

ডক্টর রাতে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে যাওয়ার সময় বলেছিল তাকে বিরক্ত না করতে। সে বারো ঘন্টা ঘুমাবে। যাতে ভয়ের প্রভাবটা তার ভিতর থেকে কেটে যায়। বলে তিনি চলে গেলেন। রিপ্ত ওনার ফ্রিজ দিয়ে তাকে বাসার বাইরে পর্যন্ত এগিয়ে দিলো। বাসায় এসে ছাদে গিয়ে কবুতরটিকে দেখলো ভালোভাবে ভাবলো, এতগুলো কবুতর রেখে রাতের প্রিয় কবুতরটির কেন গলাকাটা হলো। ছোট একটি বাচ্চা মেয়ের কে এমন শত্রু হতে পারে যে তার প্রিয় কবুতরটিকে মারবে। কথাটি ভাবতে ভাবতে সে দোকানে গিয়ে একই রকম দেখতে আরেকটি কবুতর নিয়ে বাসায় আসলো। এবং সেই কবুতরটির টবে রেখে দিল। রিপ্ত জানতো রাত বুঝে ফেলবে যে ওটা তার কবুতর নয়। তাও সে একই রকম দেখতে একটি কবুতর আনলো। তবে বিষয়টি রিপ্তর কাছে বেশ সন্দেহজনক লাগলো। কেউ কি তার বোনের দিকে টার্গেট করেছে। কিন্তু সে কে?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 3 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন