উপন্যাস : আদ্রিয়নের অর্ধাঙ্গিনী 🌹🫀
লেখিকা জয়নব মাশা
পর্ব ২
পুষ্প বাড়ি ফিরে এলো
পুষ্প ছিল ওই গ্রামের জমিদার পরিবারের বড় ভাইয়ের একমাত্র মেয়ে। ছোটবেলায় তার জীবনটা এক ভয়ংকর দুর্ঘটনায় বদলে গিয়েছিল। তখন তার বয়স মাত্র ছয় বছর। খেলতে খেলতে একদিন রেললাইনের ধারে গিয়ে তার পা আটকে যায়। মেয়েকে বাঁচাতে মা-বাবা দুজনেই ছুটে গিয়েছিলেন। পুষ্প প্রাণে বেঁচে গেলেও, দ্রুতগতিতে ছুটে আসা ট্রেনের নিচে পড়ে সেখানেই প্রাণ হারান তাঁরা।
সেই থেকে পুষ্পকে নিজের সন্তানের মতো করে মানুষ করেছেন তার ছোট বাবা। ছোট মা-ও কখনো তাকে নিজের মেয়ের চেয়ে কম ভালোবাসেননি। আদর-যত্নে বড় হয়ে উঠেছে পুষ্প—তবু তার স্বভাবে বিন্দুমাত্র বদল আসেনি। ছোট থেকেই সে ভীষণ চঞ্চল। গ্রামের মানুষের হাসি-ঠাট্টা, দুষ্টুমি আর খুনসুটির মধ্যেই যেন তার পুরো পৃথিবী।
এবার মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে কলেজের প্রথম বর্ষে উঠেছে সে। জমিদার পরিবারের মেয়ে হলেও তার মধ্যে নেই কোনো অহংকার, নেই বিলাসিতার লোভ। খুব সাধারণ জামাকাপড় পরেই সারাদিন এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়। কখনো কোনো কাকাকে বানিয়ে বানিয়ে বিরক্ত করে, কখনো গাছে উঠে তেঁতুল খায়, কখনো পুকুরে নেমে গোসল করে। আবার কখনো ধান কিংবা গমের খেতে গিয়ে চাষিদের সঙ্গে হাত লাগিয়ে কাজও করে।
নিজেকে সে গ্রামের আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতোই ভাবে। শুধু চেহারায় সে আলাদা—গায়ের রং খুব ফর্সা, মুখখানা মায়াবী আর চুলগুলো লম্বা, ঘন, কমলা রঙের। গ্রামের লোকজন বলে, এই অদ্ভুত সুন্দর চুলের রং নাকি সে তার মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছে।
বাড়ি ফিরে পুষ্প প্রথমে গোসল সেরে নিল। তারপর সোজা চলে গেল তার রাইতা আপুর ঘরে।
ঘরে ঢুকেই দেখল, রাইতা আপু বসে একটা চিঠি লিখছে। পুষ্পকে দেখতে পেয়েই রাইতা তাড়াতাড়ি চিঠিটা লুকিয়ে ফেলল। তবে পুষ্পের সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। সে এক লাফে গিয়ে বসল টেবিলের ওপর।
“আপু, তোমার কি মন খারাপ? কী হইছে তোমার? সারাদিন তো আমার লগে একটা কথাও কইলা না!”
রাইতা মুচকি হেসে পুষ্পের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
“না রে, বোনু। আমার কিছু হয় নাই। তবে তুই সবসময় বাড়ির খেয়াল রাখবি, বুঝলি?”
রাইতার কথায় পুষ্পের কপাল কুঁচকে গেল। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ক্যান আপু? আমি বাড়ির খেয়াল রাখব মানে? তুমি কি জানো না, এই বাড়ি আমার উপরেই কত অসন্তুষ্ট? আমি যেই রকম পাগলামি করি, তাতে তোমার কি মনে হয়—আমি এই বাড়ি শান্তিতে রাখতে পারমু?”
পুষ্পের কথা শুনে রাইতার ঠোঁটে আবারও একটু হাসি ফুটল। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই নিচ থেকে কারও চিৎকার ভেসে এল—
“পুষ্প! ও পুষ্প! পুষ্পরে দেখতে যা আলিম চাচার একটা ছোট ছাগল ছানা হইছে আমি যাইতাছি তুই কি যাবি পুষ্প কণ্ঠটা শুনে বুঝতে পারলে, এটা জান্নাতের কন্ঠ তাই সে রাইতা আপু জানলা দিয়ে মুখ বের করে দিয়ে বলল এ জান না তুই দাঁড়া আইতেছি আমি এরপর পুষ্প ব্যস্ত পায়ে রায়িতা আপুর ঘর থেকে বের হয়ে যায় এবং বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়
শেষমেশ আলিম চাচার বাড়ির দিকে রওনা দিল। পুষ্পের হাঁটার গতি দেখে জান্নাতের মনে হচ্ছিল, ছাগলের বাচ্চা দেখতে যাচ্ছে না—যেন কোনো রাজকীয় অনুষ্ঠান শুরু হতে যাচ্ছে!
“আস্তে হাঁট, পুষ্প! ছাগলের বাচ্চা তো আর পালায়া যাইতেছে না!” জান্নাত হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
পুষ্প পেছন ফিরে তাকাল।
“তুই জানস না, ছোট বাচ্চারা কত দুষ্টু হয়? চোখের পলকে কোথায় গিয়া লুকায়, খুঁজেও পাওয়া যায় না!”
“ছাগলের বাচ্চা আবার কোথায় লুকাইব?”
“তোর মতো বুদ্ধি কম হইলে লুকাইতেই পারে!”
জান্নাত মুখ বাঁকিয়ে বলল, “তোরে নিয়া বের হইলেই আমারে কথা শুনতে হয়!”
“কথা শুনতে হয় না, জ্ঞান বাড়ে!” পুষ্প গম্ভীর গলায় বলল। “আমার লগে থাকলে তুই একদিন অনেক বড় মানুষ হবি।”
“কী হমু?”
“ছাগলের বাচ্চার খালা!”
জান্নাত হেসে পুষ্পের হাত ঝাঁকিয়ে দিল। পুষ্প টাল সামলাতে সামলাতে বলল, “এই! আমারে ফালাইয়া দিস না! আমি পড়লে তুই ছাগলছানার খালা না, ছাগলছানার মা হইয়া যাবি!”
দুজনের খুনসুটি করতে করতেই তারা আলিম চাচার বাড়িতে পৌঁছে গেল। গোয়ালঘরের পাশে আলিম চাচা বসে ছোট্ট ছাগলছানাটাকে দেখছিলেন। পুষ্প আর জান্নাত দৌড়ে কাছে যেতেই পুষ্প উঁকি দিয়ে বলল,
“আলিম চাচা! কই? কই বাচ্চা?”
আলিম চাচা আঙুল দিয়ে দেখালেন।
“এই যে, তোর সামনেই তো!”
পুষ্প ছাগলছানাটাকে দেখে দুহাত গালে দিয়ে বলল,
“আহা! কী সুন্দর! একেবারে তুলার পুতুল!”
আলিম চাচা হেসে বললেন,
“হ, তোর মতোই তো। তুই যেমন সাদা, এইডাও তেমন সাদা!”
পুষ্পের মুখ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল।
“হ! তোমরা তো আমারে ছাগলই কইবা! আমি কি মানুষ না?”
“মানুষ তো বটেই,” আলিম চাচা বললেন, “তবে তোর দুষ্টুমি দেইখা মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়!”
জান্নাত হেসে কুটিকুটি। পুষ্প তার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকাল।
“তুই হাসিস ক্যান? তোরে নিয়াই তো আগে সন্দেহ করা উচিত!”
“আমারে ক্যান?”
“তুই আমারে হাসাইতেছস!”
আলিম চাচা এবার আর হাসি আটকাতে পারলেন না। পুষ্প কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“হাসেন, হাসেন! আজকে হাসেন। যেদিন বিয়া কইরা এই গ্রাম ছাইড়া চইলা যামু, সেদিন বুঝবেন—এই পুষ্প কী জিনিস আছিল!”
আলিম চাচা মাথা নাড়লেন।
“তোরে বিয়া দিলে এই গ্রামেই বিয়া দিমু। তোরে ছাড়া এই গ্রাম চলব কেমনে?”
পুষ্প ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“ক্যান? আমি কি গ্রামের রাস্তা?”
“রাস্তা না, তুই গ্রামের বিনা বেতনের বিনোদন!”
জান্নাত এমন জোরে হেসে উঠল যে পুষ্পের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেল।
“মানে? আমারে বিয়া দিতেছেন গ্রামের মানুষজনরে হাসানোর লাইগা?”
“আর কী! তুই না থাকলে গ্রামের মানুষজনের দিন কাটব কেমনে?”
পুষ্প দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“বুঝছি। এই গ্রামে আমার সম্মান বলতে কিছু নাই!”
তারপরই ছাগলছানাটার দিকে তাকিয়ে তার রাগ উধাও হয়ে গেল।
“চাচা, দাও দেখি। একটু কোলে লই। এতক্ষণে আসল কাজের কথা কইলেন!”
আলিম চাচা সাবধানে ছাগলছানাটাকে তার কোলে তুলে দিলেন। পুষ্প খুব আলতো করে বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে ধরল, তারপর আদর করতে করতে বলল,
“আহারে, আমার ছোট্ট বাবু! তুই কাঁদিস না। তোরে আমি গ্রাম ঘুরাইয়া দেখামু!”
আলিম চাচা অবাক হয়ে বললেন,
“বাবু? এইডা আবার তোর ছেলে হইল কবে?”
পুষ্প একদম স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিল,
“এখন থেইকা হইল। আপনে আবার আপত্তি করেন ক্যান?”
“না, না! আমার আপত্তি নাই। তবে ওর মায়ের দুধ খাওনের সময় হইলে আমারে ফেরত দিস।”
পুষ্প ছাগলছানাটার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“শুনছস, বাবু? তোর দাদু কিন্তু খুব কড়া মানুষ। সময়মতো বাড়ি ফিরতে হইব!”
আলিম চাচা চোখ বড় বড় করে বললেন,
“দাদু কেডা?”
“আপনেই তো!”
“আমি তোর ছাগলছানার দাদু?”
“তাহলে কী? নানু হইবেন?”
জান্নাত আবার হেসে উঠল। আলিম চাচাও হাসতে হাসতে মাথা নাড়লেন।
“তোর মুখের সঙ্গে পারা মুশকিল!”
পুষ্প এবার ছাগলছানাটার কানে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“দ্যাখছস, বাবু? এই গ্রামে আমার কোনো সম্মান নাই। তোর দাদু পর্যন্ত আমারে নিয়ে হাসে!”
ছাগলছানাটা ছোট্ট করে “ম্যা” বলে উঠল।
পুষ্প সঙ্গে সঙ্গে উজ্জ্বল মুখে বলল,
“দ্যাখছেন? আমার কথায় সায় দিছে!”
জান্নাত বলল,
“ও তোর কথায় সায় দেয় নাই। ওর মায়ের কাছে যাইতে চাইতেছে!”
“চুপ কর! বাচ্চাদের কথা বড়রা বুঝে না!”
পুষ্প এবার আলিম চাচার দিকে তাকিয়ে বলল,
“চাচা, আমি আরেকটু গ্রামটা ঘুরাইয়া আনি? ওরে দেখাই—আমাগো মেঠো পথের গ্রামটা কত সুন্দর!”
আলিম চাচা মুচকি হেসে বললেন,
“আচ্ছা, যা। কিন্তু বেশি দেরি করিস না। ওরে মায়ের বুকের দুধ দেওয়া লাগব।”
“ঠিক আছে। সময়মতো ফিরায়া দিমু!”
“তুই সময়মতো ফিরবি তো?”
“চাচা, আপনে আমারে বিশ্বাস করেন না?”
আলিম চাচা জান্নাতের দিকে তাকালেন।
“তুই বরং ওর দিকে খেয়াল রাখিস।”
জান্নাত মাথা নেড়ে বলল,
“চাচা, আমি তো ওরেই খেয়াল রাখি। পুষ্পরে কে খেয়াল রাখব?”
পুষ্প মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“আমারে খেয়াল রাখার দরকার নাই। আমি একদম শান্ত মেয়ে!”
আলিম চাচা আর জান্নাত একসঙ্গে হেসে উঠল।
“কী হইল? সত্যি কথা কইলাম, আর তোমরা হাসো!” পুষ্প বিরক্ত হয়ে বলল। তারপর ছাগলছানাটাকে কোলে নিয়ে জান্নাতের সঙ্গে গ্রামের মেঠো পথ ধরে হাঁটা শুরু করল।
পুষ্প গ্রামের প্রতিটি গাছ, প্রতিটি পুকুর, প্রতিটি পথ এমনভাবে চিনত, যেন সবকিছু তার নিজের হাতে বানানো। ছাগলছানাটাকে সে একটার পর একটা জায়গা দেখিয়ে নিয়ে চলেছে—যেন ওটা ছাগলের বাচ্চা নয়, একেবারে মানুষের বাচ্চা!
“ঐই দেখ, ওইটা আমগাছ। আর এইডা তেঁতুলগাছ—আমি ওইখানে উঠি তেঁতুল খাইতে। আর পাশে দ্যাখ, আমাগো ছোট্ট পুকুর। তুই বড় হইলে এখানে গোসল করবি!”
জান্নাত অবাক হয়ে বলল,
“তুই ছাগলছানারে গ্রাম চিনাইতেছস, নাকি মানুষ বানাইতেছস?”
“সবই শিখাইতেছি। বড় হইয়া যেন কেউ ওরে বোকা বানাইতে না পারে!”
“ও তো ছাগল!”
“ছাগল হইলে কী হইছে? ছাগলদেরও শিক্ষা দরকার!”
দুজনের হাসি-ঠাট্টার মধ্যেই তারা মেঠো পথ ধরে এগিয়ে চলল। ঠিক তখনই দূর থেকে একটা গাড়ি দ্রুতগতিতে ছুটে আসতে দেখা গেল।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে পুষ্প কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছাগলছানাটা তার কোল থেকে এক লাফে নেমে রাস্তার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল।
পুষ্প ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
পরমুহূর্তেই ক্যাঁচ করে ব্রেক কষে গাড়িটা থেমে গেল। ছাগলছানাটা অল্পের জন্য বেঁচে গেল।
পুষ্পের বুক তখনও ধকধক করছে। সে দ্রুত ছাগলছানাটাকে কোলে তুলে নিল। তারপর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
গাড়ি থেকে নেমে এল এক অচেনা যুবক। বেশ লম্বা, ফর্সা গায়ের রং, এলোমেলো চুল—তবু পোশাক-আশাকে ভীষণ পরিপাটি। তাকে দেখেই বোঝা যায়, সে এ গ্রামের ছেলে নয়।
পুষ্প একবার ছেলেটাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে নিল। তারপর রাগে গজগজ করতে করতে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“আপনার কি আল্লাহতালা চোখ দেন নাই? এইভাবে পাগলের মতো গাড়ি চালাইতেছেন ক্যান? এইডা আমাগো গ্রামের রাস্তা! কোনো ক্ষতি হইলে কি আপনার টাকা দিয়া সব ঠিক করা যাইব? আর সেইডাও বড় কথা না—এত দ্রুত গাড়ি চালাইতেছেন ক্যান? এখন যদি আমার এই ছোট্ট ছাগলটার কিছু হইয়া যাইত, আমি আপনাকে ছাড়তাম না!”
পুষ্পের কথা শুনে ছেলেটার মুখ বিরক্তিতে কুঁচকে গেল। সে রাগী গলায় বলে উঠল,
“স্টপ! অনেক বেশি বলছ তুমি। তোমাদের ভাষা এমন কেন? কোনো কালচার নেই? আর তুমি তো ভীষণ বেয়াদব মেয়ে! চেনো না, জানো না—একজনকে হুট করে এসব বলছ কেন? তোমার ছাগল তুমি রাস্তার মাঝখানে ছেড়ে রেখেছ কেন? আজব মেয়ে একটা!”
পুষ্প মুখ ভেংচি কাটল।
“আপনে খুবই ভদ্রলোক, তাই না? নিজের ব্যবহারই ভালো না, আবার আমারে বেয়াদব বলেন!”
কথাটা শুনে ছেলেটার রাগ যেন আরও বেড়ে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে শুধু বলল,
“স্টুপিড একটা মেয়ে!”
তারপর আর কোনো কথা না বাড়িয়ে নিজের গাড়িতে উঠে বসল। দরজা বন্ধ করে গাড়ি স্টার্ট দিল, আর মুহূর্তের মধ্যেই আবারও তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে রওনা হয়ে গেল।
চলবে...