ফন্ট সাইজ:
থিম:
The boy who loves like poison

পর্ব 1

লেখক: urmi

​পর্ব - ১
​রাত তখন পৌনে দুটো। দেয়ালঘড়ির একঘেয়ে টিকটিক শব্দ ছাড়া পুরো ঘরের ভেতরে আর কোনো শব্দ নেই। নিহা তার স্টাডি টেবিলে বসে ল্যাপটপের উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ঘরের বাকি অংশটা একেবারে অন্ধকারে ডুব দেওয়া, কেবল টেবিল ল্যাম্পের আবছা হলুদ আলোটা তার খোলা খাতা, বেশ কিছু সাজানো বই, হাইলাইটার পেন আর কলমদানির ওপর এসে পড়েছে। আগামী সপ্তাহে তার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা শুরু, তাই শেষ মুহূর্তের রিভিশন দিচ্ছে সে। নিহার চোখ দুটো ক্লান্তিতে ভারী হয়ে আসছে, টানা চার-পাঁচ ঘণ্টা পড়ার কারণে মাথার রগগুলোও যেন রিফরিফ করছে, তবে মনের ভেতর ভালো ফলাফল করার যে একগুঁয়ে তাগিদ, সেটাই তাকে জোর করে জাগিয়ে রেখেছে। সে টেবিলের এক পাশে রাখা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফির কাপটা থেকে শেষ এক চুমুক দিয়ে ল্যাপটপের পিডিএফ ফাইলটা নিচের দিকে স্ক্রোল করতে লাগল।

​পড়াশোনার এই তীব্র চাপের মধ্যে হঠাৎ করেই তার মনটা অতীতের দিকে চলে গেল। এই অ্যাপার্টমেন্টে সে একা থাকতে শুরু করেছে খুব বেশি দিন হয়নি। মা-বাবা থাকেন গ্রামের বাড়িতে, আর পড়ার সুবিধার জন্য শহরের এই ছোট ফ্ল্যাটটা ভাড়া নেওয়া। শুরুতে একা থাকতে কিছুটা ভয় লাগলেও সময়ের সাথে সাথে এই নিরবতা তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আজকের রাতের এই অদ্ভুত একঘেয়েমি আর নিস্তব্ধতা যেন তাকে অনভ্যস্ত এক ভয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার স্ক্রিনের পড়াগুলোতে মনোযোগ দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করল।
​ঠিক তখনই, রাতের এই থমথমে নীরবতা চিরে টেবিলের ওপর রাখা নিহার মোবাইল ফোনটি হঠাৎ তীব্র আলোয় জ্বলে উঠল। একই সাথে ভাইব্রেশনের এক তীব্র থরথর শব্দ শিউরে দিল ঘরের থমথমে বাতাসকে। নিহা খানিকটা বিরক্তি আর ভ্রু কুঁচকে ফোনের দিকে তাকাল। রাত দুটো বাজতে চলল, এত রাতে তাকে মেসেজ দেওয়ার মতো তো কেউ নেই। কোনো জরুরি বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটিশ নাকি কোনো মার্কেটিং কোম্পানির কাজ—এই ভেবে কৌতূহল আর সামান্য অস্বস্তি নিয়ে সে হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলে নিল। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল, কোনো অচেনা আনসেভড নম্বর থেকে একটি নতুন বার্তা এসে জমা হয়ে আছে।
​মেসেজ অ্যাপ্লিকেশনটি খুলতেই নিহার বুকের ভেতরটা হঠাৎ যেন ছ্যাঁৎ করে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য তার হৃদস্পন্দন থেমে গেল, আর শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে গেল এক হিমশীতল আতঙ্কের স্রোত। মেসেজে পরিষ্কার বাংলায় লেখা—
​"কালো কালারের এই থার্ড-পিসটায় তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে নিহা। তবে চুলটা খোপায় না বেঁধে ছেড়ে দিলে হয়তো আরও একটু বেশি ভালো দেখাত।"

​নিহার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। তার বুকের ভেতরটা এমনভাবে ধড়ফড় করতে লাগল যেন হৃদপিণ্ডটা বুকের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসবে। চোখ দুটি বড় বড় করে সে নিজের পোশাকের দিকে তাকাল—সত্যিই তো! সে একটা কালো রঙের থার্ড-পিস পরেই পড়তে বসেছে, আর তার লম্বা চুলগুলো মাথার ওপর সুন্দর করে খোপা দিয়ে পেঁচানো! কিন্তু ঘরের মূল লাইট নেভানো, ভারী পর্দার আড়ালে কেবল একটা ছোট ল্যাম্প জ্বলছে। বাইরে থেকে ঘরের ভেতরের কাউকে এভাবে স্পষ্ট দেখা তো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তবে কি কেউ তাকে খুব কাছ থেকে বা এই ঘরের ভেতরেই কোথাও থেকে সরাসরি লক্ষ্য করছে?

​তীব্র এক অজানা আতঙ্কে নিহা দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ভয়ে ভয়ে চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিয়ে সে প্রায় ছুটে গেল জানালার দিকে। তাড়াহুড়ো করে ঘরের ভারী পর্দাগুলো দুই হাতে টেনে দিল সে, যেন বাইরের সব আলো আর অশুভ নজর আটকানো যায়। তারপর কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে বারান্দার স্লাইডিং ডোরটা হালকা একটু ফাঁক করে গ্রিল দিয়ে নিচে নির্জন রাস্তার দিকে তাকাল।

​রাস্তা পুরোপুরি নিঝুম ও জনমানবহীন। স্ট্রিট লাইটের বিবর্ণ হলুদ আলোর নিচে একটা পথকুকুর কুঁকড়ে শুয়ে ঝিমোচ্ছে। দূরে বহুতল কোনো ভবনের একটি-দুটি ঘরের আবছা আলো দেখা যাচ্ছে। রাতের বাতাস সোঁদা আর ভার হয়ে আছে, চারপাশ ঘিরে থমথমে এক গা ছমছমে পরিবেশ। নিচে কোনো মানুষ তো দূরের কথা, একটা ছায়াও দৃশ্যমান নয়। নিহা আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে দ্রুত ঘরে ফিরে এসে বারান্দার কাচের দরজাটা শক্ত করে আটকে দিয়ে লক করে দিল।

​বুকের তীব্র ধকধকানি তখনও সে সামলে উঠতে পারেনি। হাঁপাতে হাঁপাতে কাঁপা কাঁপা আঙুলে ফোনটা তুলে নিয়ে সে মেসেজের রিপ্লাই টাইপ করতে শুরু করল,
"কে আপনি? আমার ওপর নজর রাখছেন কেন? সাহস থাকলে সামনে এসে কথা বলুন!"
​উত্তর আসার জন্য নিহাকে একদমই অপেক্ষা করতে হলো না। ঠিক পাঁচ সেকেন্ডের মাথায় ফোনটা আবারও কেঁপে উঠল।
"নজর নয় সোনা, এটাকে ভালোবাসা বলে।
আমি তোমাকে আজ বা কাল থেকে নয়, গত দুই বছর ধরে প্রতিটা মুহূর্তে দেখছি। তোমার প্রতিটা নিশ্বাস, তোমার মিষ্টি হাসি, তোমার খামখেয়ালি রাগ—সব আমার একদম মুখস্থ। এখন আর বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকো না, বাইরে ঠান্ডা বাতাস বইছে, শরীর খারাপ করবে। একদম চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়ো।"
​মেসেজটা পড়া মাত্রই নিহার গা গুলিয়ে উঠল। তীব্র ভয়ে আর হতাশায় সে ফোনটা খাটের তোশকের ওপর ছুঁড়ে ফেলল। তার চোখ দিয়ে প্রায় জল বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। কে হতে পারে এই লোকটা? দুই বছর ধরে তাকে কেউ এভাবে নজরদারি করছে, অথচ সে বিন্দুমাত্র টের পেল না?

​তার মাথায় একের পর এক বিচিত্র আর ভীষণ ভীতিকর সব প্রশ্ন ঘনীভূত হতে লাগল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই নতুন ছেলেটা? যে গত কয়েকদিন ধরে ক্যাফেটেরিয়ায় কিংবা লাইব্রেরির সামনে তাকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে খেয়াল করছিল?
নাকি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই অজস্র ভুয়া আইডি থেকে তাকে পাঠানো সেই অদ্ভুত ও বিকৃত বার্তাগুলোর পেছনের কোনো মানসিক রোগী?

নাকি তার একদম চেনা পরিচিত কেউ, যে বন্ধু সেজে তার খুব কাছেই ঘুরে বেড়ায় প্রতিদিন?
​নিজের শোবার ঘরের প্রতিটা কোণকে এখন নিহার চরম অচেনা আর বিপজ্জনক মনে হতে লাগল। সে আতঙ্কিত চোখে খাট, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল আর পড়ার টেবিলের আশপাশটা দেখতে লাগল, যেন অন্ধকারের ছায়াগুলোই কোনো একটা জীবন্ত দানব হয়ে তাকে গিলে খেতে আসছে। ঘরের সামান্যতম কোনো ধাতব শব্দেও সে শিউরে উঠছে। মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করল সে—কাল সকালে সূর্য উঠলেই সে সবার আগে তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু অয়নকে সব বিস্তারিত বলবে। অয়ন সবসময় সব বিপদে তাকে পথ দেখায়, সে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো একটা ব্যবস্থা বের করতে পারবে; প্রয়োজনে পুলিশের সাহায্য নেবে।

​অয়নের কথা ভেবে নিহার উন্মাদ মনটা কিছুটা হলেও থিতু হলো। অয়ন অন্তত তাকে বিশ্বাস করবে এবং পুরো ব্যাপারটা গুরুত্ব দিয়ে দেখবে—এই আশ্বাসে নিজেকে কিছুটা স্থির করে নিহা সুইচবোর্ডের দিকে এগিয়ে গেল। ঘরের মূল লাইট আর ল্যাম্প সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে অন্ধকারেই দ্রুত তোশকের ওপর শুয়ে পড়ল। টানা পড়ার ক্লান্তি আর তীব্র মানসিক ধকলের কারণে তার চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে আসছিল, কিন্তু বুকের ভেতরের হিমশীতল আতঙ্কটা কিছুতেই কাটছিল না। অবশেষে অনেক ধড়ফড়ানি আর দোটানার পর নিহা চোখ দুটি শক্ত করে বুজে ফেলল।
​কিন্তু নিহা ঘুণাক্ষরেও টের পেল না, তার শোবার ঘরের এই আপাত নিরাপদ ও শান্ত নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিভীষিকাময় ট্র্যাজেডির ফাঁদ।

​তার ঘরের এসি ডাক্টের একদম নিখুঁত আঁধারে, ধাতব গ্রিলের ভেতরে লুকানো খাঁজে বসানো রয়েছে একটি অতি ক্ষুদ্র, উচ্চপ্রযুক্তির স্পাই ক্যামেরা। ইনফ্রারেড নাইট-ভিশন লেন্সযুক্ত সেই নাইট-ক্যামেরাটি অন্ধকারের মধ্যেও নিহার প্রতিটা নিশ্বাস, তার সামান্যতম নড়াচড়া আর ভয়ে জমে ওঠা ঘামের প্রতিটা ফোঁটাও নিখুঁতভাবে রেকর্ড করে চলেছে। আর সেই লাইভ ভিডিও ফুটেজ সরাসরি ইন্টারনেট স্ট্রিমিং হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে শহরের অন্য প্রান্তের এক অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে ঘরের ভেতরে।
​সেই ঘরটির একমাত্র আলোর উৎস একটি বিশাল আকৃতির কম্পিউটারের মনিটর স্ক্রিন। স্ক্রিনের তীব্র রক্তিম আলো এসে পড়েছে একজোড়া কোটরগত, রক্তবর্ণ ও বিকৃত চোখের ওপর। লোকটির অবিন্যস্ত চুল, উস্কোখুস্কো দাড়ি আর শুকনো ঠোঁট বলে দেয় সে বহু ঘণ্টা বা দিন ধরে এই স্ক্রিনের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ঘরের কোণে ছড়ানো-ছিটানো অসংখ্য টেকনোলজি গ্যাজেট, তারের জটলা আর ডায়েরির পাতা।
​তার কাঠের নোংরা টেবিলে রাখা অর্ধেক খালি কফির কাপ থেকে তখনও হালকা ধোঁয়া উঠছিল। মনিটরের স্ক্রিনে নিহার চোখ বোজা, নিষ্পাপ ও ঘুমন্ত মুখটি ফুটে উঠতেই ঘরটার দীর্ঘ নিস্তব্ধতা চিরে লোকটার ঠোঁটের কোণে খেলে গেল এক ভয়ানক, শিহরণ জাগানো ক্রূর হাসি।

​তার লম্বা, কুৎসিত ও শুকনো আঙুলগুলো মনিটরের কাচে নিহার গালের ফুটে থাকা ছবির ওপর ধীরে ধীরে বোলাতে লাগল—ঠিক যেন সে নিহার রক্ত-মাংসের শরীরকেই নিজের হাতে স্পর্শ করছে।
​তারপর এক গভীর, দীর্ঘশ্বাস টেনে নিয়ে একদম নিচু, খসখসে গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল—
"শুভরাত্রি, আমার মিষ্টি নিহা। আসল খেলা তো মাত্র শুরু হলো... মূল নাটক আর রোমাঞ্চকর দৃশ্যগুলো দেখতে তো এখনো অনেক বাকি। তুমি ধারণাও করতে পারবে না, কতগুলো বছর ধরে আমি শুধু এই সুন্দর মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করছি!"

​কথাটা শেষ করেই লোকটা এক বিকট, উন্মাদ ও কর্কশ হাসিতে ফেটে পড়ল। সে হাসির বিকট শব্দ অন্ধকার ঘরের চারদেওয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে এক মারাত্মক ও ভয়ঙ্কর।
​

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন