নিহার পুরো শরীর ততক্ষণে শিউরে উঠে অবশ হয়ে এসেছে। হাতের মুঠোয় ধরা মোবাইল ফোনের ঠান্ডা স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, ওপাশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার নিঃশব্দ ধ্বনিটাই যেন কোনো এক আসন্ন বিপদের অন্ধকার অমঙ্গল বার্তা।
লকার রুমের করিডোরের দিকে তাকালে চারপাশের সবকিছুকে কেমন অচেনা, থমথমে আর পরাবাস্তব মনে হতে থাকে। বাতাসে তাজা গোলাপের তীব্র আর মিষ্টি সুবাস জড়িয়ে রয়েছে, যা লকারের গায়ে লাল টেপ দিয়ে আটকানো সেই রক্তাক্ত রক্তিম ফুলটার কাছ থেকেই আসছে। কিন্তু এই চেনা মিষ্টি সুবাসই এখন নিহার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত, শ্বাসরুদ্ধকর গন্ধ বলে মনে হচ্ছে। বুকের ভেতরের প্রতিটি হৃদস্পন্দন যেন নিজের কানকেও ছাড়িয়ে করিডোরের নির্জন দেয়ালে আছড়ে পড়ছে। মাথাটা তীব্র যন্ত্রণায় ঝিমঝিম করে উঠল তার। অয়নের ফোন বন্ধ হওয়ার অর্থ কী? সে কি কোনো বিপদে পড়ল? নাকি ওই অচেনা পৈশাচিক শিকারির শিকার হতে চলেছে সে?
মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকা তার ভারী বইগুলোর দিকে তাকানোর মতো শারীরিক শক্তি বা মানসিক চেতনাটুকুও যেন সে হারিয়ে ফেলেছে। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে চিঠির শেষ কটা নিষ্ঠুর শব্দ—"তুমি যাকে তোমার হাত ধরতে দিয়েছ, সেই অয়নকে আজ রাতে একটা সারপ্রাইজ দেব... তাকে পৃথিবী থেকে মুছে দেব।"
পাগলের মতো আবার কাঁপাকাঁপা আঙুলে ডায়াল প্যাডে অয়নের নম্বরটা তুলে কল করল নিহা। কিন্তু সেই একই মেকানিক্যাল, অনুভূতিহীন কৃত্রিম নারী কণ্ঠ ভেসে এলো—"আপনার ডায়াল করা নম্বরটিতে এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।" ফোনের এই একঘেয়ে বার্তা যেন তার বুকের ভেতর ভয়ের তীব্র পারদ শতগুণ বাড়িয়ে দিল। অয়ন তো মাত্র কয়েক মিনিট আগেই ক্যাফেটেরিয়ায় তার মুখোমুখি বসেছিল। অয়নই তো তার হাত দুটো শক্ত করে ধরে আশ্বাস দিয়েছিল যে আজ সারাদিন সে তার সাথে থাকবে, খেয়াল রাখবে। তাহলে হঠাৎ করে তার ফোনটা বন্ধ হয়ে গেল কেন? সে কি নিহাকে না জানিয়ে ক্যাফেটেরিয়া ছেড়ে অন্য কোথাও গেল? নাকি... নাকি এই হুমকি ভরা চিঠিটা লকারে সাঁটানোর আগেই সেই অদৃশ্য ছায়াওয়ালার বিষাক্ত নজর অয়নের ওপর গিয়ে পড়েছিল?
আর এক মুহূর্তও দেরি করার সাহস পেল না নিহা। গায়ের সমস্ত শক্তি জড়ো করে সে ছিটকে লকার রুম থেকে বের হয়ে এলো। উন্মত্তের মতো দৌড় লাগাল ক্যাফেটেরিয়ার দিকে। করিডোরে পথচলতি কত সহপাঠীর সঙ্গে গায়ের ধাক্কা লাগলো, অনেকের অবাক আর বিরক্তিভরা চাহনি সে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গেল। তার মাথায় এখন কেবল এক অচেনা, ভয়ঙ্কর আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে।
ক্যাফেটেরিয়ায় গিয়ে পৌঁছাতেই নিহা দেখল, যে কোনায় বসে কিছুক্ষণ আগে তারা দুজন কথা বলছিল, সেই টেবিলটা এখন সম্পূর্ণ ফাঁকা। টেবিলের ওপর অয়নের অর্ধেক শেষ করা ঠান্ডা কফির কাপটা তখনও আগের মতোই পড়ে রয়েছে। চারপাশের জনাকীর্ণ ক্যাফেটেরিয়ায় চোখ বুলাতেই নিহার নজর গেল পরিচিত ওয়েটার রাহুলের দিকে।
নিহা প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে রাহুলের কাছে গিয়ে তার হাতটা চেপে ধরল। "রাহুল ভাই, অয়ন কোথায়? ও কি এখান থেকে কোথাও গেছে?"
রাহুল খানিকটা অবাক আর উদ্বিগ্ন হয়ে নিহার রক্তশূন্য, ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকাল। "অয়ন ভাই তো মিনিট দশেকের মতো হলো বের হয়ে গেল, নিহা। ওনার মোবাইলে একটা ফোন এসেছিল। ফোনটা কানে নিয়েই বেশ চিন্তিত আর উদ্বিগ্ন মুখে পেছনের পার্কিং স্পটের দিকে হাঁটছিলেন।"
"কাউকে কি দেখেছেন ওর সাথে? কেউ কি এসেছিল ওনাকে ডাকতে?" নিহার কণ্ঠ ভয়ে ভীষণভাবে কেঁপে উঠল।
"না, সেরকম তো কাউকে আমি দেখিনি। তবে উনি যেন খুব তাড়াহুড়ো করছিলেন," রাহুল জবাব দিল।
কথাটা শুনে নিহার পা দুটো যেন একদম সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তি হারিয়ে ফেলল। পার্কিং স্পট! বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একদম পেছনে থাকা ওই এলাকাটা এমনিতেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের অভাবে বেশ নির্জন থাকে। তার ওপর ইদানীং ওখানে নতুন বিল্ডিং তৈরির কাজ চলায় বড় বড় পুরনো কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়ায় জায়গাটা সবসময়ই থমথমে আর অন্ধকার হয়ে থাকে। নিহা আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে ক্যাম্পাসের পেছনের সেই নির্জন পার্কিং স্পটের দিকে ছুটতে লাগল।
বিকেলের হালকা রোদ ম্লান হয়ে এসে ক্যাম্পাসের ওপর একধরনের মেটে বিষণ্ন ছায়া ফেলে দিয়েছে। গাছপালা থেকে একটা দুটো শুষ্ক পাতা খসে পড়ছে। পার্কিং স্পটে পৌঁছাতেই নিহা দেখতে পেল অয়নের বাইকটা ঠিকই এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু আশেপাশে অয়নের কোনো চিহ্নমাত্র নেই।
"অয়ন! অয়ন! তুই কোথায়?"
নিহা গলার সমস্ত জোর দিয়ে চিৎকার করে ডাকল, কিন্তু ফাঁকা পার্কিং স্পটে কেবল নিজের নির্জন কণ্ঠের করুণ প্রতিধ্বনি ছাড়া আর কোনো সাড়াশব্দ ফিরে এলো না। চারপাশটা যেন এক অদ্ভুত, থমথমে নিস্তব্ধতায় ঢাকা। ঠিক তখনই নিহার চোখ আটকে গেল অয়নের বাইকের হ্যান্ডেলের দিকে। বাইকের চাবির রিংয়ের সাথে ছোট একটা সাদা কাগজ ভাঁজ করে পেঁচিয়ে রাখা হয়েছে।
বুকের ভেতরের ধুকপুকানি মুহূর্তের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে গেল। নিহা ভয়ে ভয়ে, ধীর পায়ে বাইকের দিকে এগোলো। কাঁপাকাঁপা হাতে চিরকুটটা খুলে পড়তে শুরু করতেই তার হাতের তালু আর পায়ের তলা ঠাণ্ডা হয়ে বরফ হয়ে গেল। সেখানে তাজা লাল কালিতে লেখা রয়েছে:
"বড্ড তাড়াহুড়ো করছো নিহা। অয়নকে খুঁজতে এভাবে একা একা এখানে আসার কোনো দরকার ছিল না। ও এখন আমার ব্যক্তিগত মেহমান। তুমি যত বেশি ওকে বাঁচানোর জন্য ছটফট করবে, ওর ওপর কষ্টের মাত্রা তত বেশি বাড়বে। এখন সোজা কোনো চালাকি না করে নিজের রুমে ফিরে যাও। রাত ঠিক আটটায় একটা বার্তা পাবে। সেখানে একাই আসবে। যদি অন্য কাউকে জানানোর চেষ্টা করো বা পুলিশকে খবর দাও, তবে অয়নের নিথর মরদেহটা হয়তো কাল সকালে রূপসা নদীর ধারে খুঁজে পাবে।"
চিঠিটার প্রতিটি শব্দ পড়ার পর নিহার চোখের কোণ দিয়ে তপ্ত জলের ধারা গড়িয়ে পড়ল। হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে সে স্যাঁতসেঁতে মাটিতে বসে পড়ল। তার শান্ত, স্বাভাবিক জীবনটা এত অল্প সময়ে কীভাবে এমন এক বিভীষিকাময় নারকীয় রূপ নিল? কে এই ছায়াবৃত হিংস্র মানুষটা? কীভাবে সে নিহার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি চিন্তা এত নিখুঁতভাবে খেয়াল রাখছে? ক্যাফেটেরিয়া থেকে লকার রুম, আর লকার রুম থেকে এই পার্কিং স্পট—সব জায়গায় কীভাবে তার বিষাক্ত নজর আগে থেকেই পৌঁছে যাচ্ছে?
নিহা স্পষ্ট বুঝতে পারল, সে এক সুবিশাল ও পৈশাচিক জালের একদম কেন্দ্রে আটকা পড়েছে। নিজের অজান্তেই সে শিকারির টার্গেটে পরিণত হয়েছে। এখন পুলিশে ফোন দেওয়ার কথা মনে আসতেই চিরকুটের সেই শেষ মারাত্মক হুমকিটা তার মাথার ভেতর ঘণ্টা বাজিয়ে উঠতে লাগল—"কাউকে জানালে অয়নের মরদেহ পাবে।" পুলিশকে জানালে তারা হয়তো তদন্ত শুরু করবে, কিন্তু ততক্ষণে এই উন্মাদ লোকটা অয়নের ক্ষতি করে ফেলবে না—তার নিশ্চয়তা কে দেবে? এই বিশাল ঝুঁকি সে কীভাবে নেয়? অয়ন তো কেবল একজন ভালো বন্ধু হিসেবে তার পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিল, তার ভয় দূর করতে চেয়েছিল! আজ কেবল নিহার সাথে বন্ধুত্ব রাখার অপরাধেই অয়নের তাজা জীবন চরম সংকটের মুখে।
চোখের জল এক হাতে মুছে ধীরে ধীরে মাটি থেকে উঠে দাঁড়াল নিহা। ভয়ের পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানসিকতাকে এখন জোর করে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। অয়নকে যেকোনো মূল্যে বাঁচাতে হবে তাকে। সে ধীর পায়ে নিজের হলের ঘরের দিকে হাঁটতে লাগল। প্রতিটা কদম ফেলার সময় তার মনে হতে লাগল, আশেপাশের প্রতিটি দীর্ঘ গাছের আড়াল থেকে, ভবনের কোণ থেকে আর হাজারো অচেনা মানুষের ভিড়ের পেছন থেকে কেউ একজন তার দিকে একজোড়া বিষাক্ত চোখে তাকিয়ে অট্টহাসি হাসছে।
নিজের হলে পৌঁছে ঘরের ভেতর ঢুকে দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে ড্রয়ারের ভারী চাবি দিয়ে তিনবার লক করে দিল সে। পুরো ঘরটা যেন হঠাৎ খুব অন্ধকার, নিঃসঙ্গ আর ভীতিপ্রদ মনে হতে লাগল। ঘরের জানালার ভারী পর্দাগুলো সব টেনে বন্ধ করে দিল সে, যাতে বাইরের কোনো আলো বা ছায়া ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।
লকারের গোপন চিঠি থেকে শুরু করে পার্কিং স্পটের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ—সবকিছু একদম পরিষ্কার করে দিচ্ছে যে এই সাইকো উত্যক্তকারী নিহার ভীষণ কাছাকাছি থাকে। নিহার পরিচিত পরিমণ্ডলেই তার বাস। অত্যন্ত সন্দেহ নিয়ে ঘরের প্রতিটি কোণ খুঁটিয়ে চেক করল সে। কোনো টেবিলের নিচে কি হিডেন ক্যামেরা লাগানো? দেওয়ালে বা ঘড়িতে কোনো গোপন মাইক্রোফোন?
পরীক্ষা শেষ করে নিহা ঘরের মেঝেতে বসে দেয়ালে ঝুলতে থাকা ঘড়িটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকাল। ঘড়ির কাঁটা বলছে এখন বিকেল পৌনে ছয়টা। আর মাত্র দুই ঘণ্টা পনেরো মিনিট সময় বাকি। রাত আটটা বাজতে আর খুব বেশি সময় নেই। মোবাইল ফোনটা হাতের তালুতে শক্ত করে ধরে রাখল সে, স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল এক কালান্তক বার্তার অপেক্ষায়। ঘরের ভেতরের শান্ত পরিবেশে ঘড়ির 'টিক টিক' শব্দটাও যেন একেকটা ধারালো সুরের মতো তার বুকে এসে বিধছে। প্রতিটা সেকেন্ড যেন একেকটা দীর্ঘ যুগের মতো কষ্টদায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিহার চোখের সামনে এখন কেবল দুটো স্পষ্ট ও ভয়ঙ্কর পথ—হয় এই অদৃশ্য পৈশাচিক শত্রুর কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে দেওয়া, না হয় এই ঘন অন্ধকারের ভেতরেই নিজের জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক ও অনিশ্চিত খেলায় নিঃসঙ্গভাবে পা বাড়ানো।