উপন্যাস : "নির্বাসিত চোখের কাজলছায়া"
৩য় পর্ব *
সকালের রোদটা তখনও গ্রামের উঠানে পুরোপুরি এসে পড়ে নি। বাতাসে একটা ভেজা মাটির ঘ্রাণ। পুকুরের পাড়ে হাঁসগুলো প্যাক প্যাক করে ডাকছে। দূরে কোথাও একটা মোরগ ডেকে উঠলো। এমন সময় গ্রামের মেঠোপথে একটা রিকশা এসে থামলো। রিকশার শব্দ শুনে বাড়ির সবাই উঠানের দিকে তাকালো।
রিকশা থেকে প্রথমে নামলেন সুপ্তি বেগম—ইতি ও তিথির ফুফু। পরনে পরিপাটি শাড়ি, মুখে শান্ত এক মায়ার হাসি আর হাতে ছোট ব্যাগ। তিনি নামার সাথে সাথেই বললেন, "আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছো সবাই?"
দাদি বাতাসি বেগম বরিশালের আউয়াল টানে জিভ দিয়ে খিকখিক করে চেঁচিয়ে উঠলেন, "ও মোগো মনু, তুই এহন আইছো কতদিন পর? মোরে তো হাভাত পাইয়া ভুলেই গেছিলি পোয়াড়ি!"
সুপ্তি বেগম হেসে বললেন, "দাদি গো, ভুলবো কেন? আপনাদের দেখতে আসতেই তো হয়।"
তখন রিকশা থেকে নামলো রিশা। বয়স ১৮। পরনে মডার্ন ড্রেস, চোখে সানগ্লাস, হাতে ছোট ব্যাগ আর পায়ে চিকন হিল জুতা। সে নামার সাথে সাথেই নিজের জুতার ধুলা ঝেড়ে ন্যাকা সুরে কেঁদে ওঠার মতো করে বললো, "উফফফ মা! গ্রামে আসলে মনে হয় আস্ত একটা বালুর চরে এসেছি! আমার জুতাটা নষ্ট হয়ে গেল, ড্রেসে ধুলো উঠে গেল!"ওহহ! অসহ্য!!!
সুপ্তি বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "আরে সোনা, গ্রামে তো একটু ধুলাবালি থাকবেই, মন খারাপ করো না তো।"
এই কথা শুনে তিথি পেছন থেকে ফিসফিস করে ইতিকে বললো, "দেখছিস আপু, ভাবখানা এমন যেন ড্রেসটা একদম ডায়মন্ড দিয়ে বাঁধানো!"
ইতি তিথির মাথায় একটা খাসা গাট্টা মারলো। তিথি মাথা ডলতে ডলতে বললো, "আহ আপু! মারলি কেন?" ইতি চোখ পাকিয়ে বললো, "বেশি বকবক করিস তো তাই।"
এদিকে দাদি বাতাসি বেগম রিশাকে দেখে চোখ কপালে তুলে বরিশালের টানে যা বললেন, সেটা শুনে আশপাশের কাকগুলোও ভড়কে গিয়ে পালিয়ে গেল! দাদি বললেন, "ও মোগো রানীর পুত! তুই এগিন কি পিন্দা আইছো মা? এগিন দিয়া তো আমাগো গোয়ালে গরু বান্ধনের দড়িও মোটা হয়! তোর এই কাপড় দেখে তো আমার ছাগলটাও শরম পাইয়া গোয়ালে লুকাইছে!"
রিশা নাক সিঁটকে বললো, "দাদি, এটা ফ্যাশন! আপনারা ব্যাকডেটেড, তাই এসব বুঝবেন না।"
দাদি কোমরে হাত দিয়ে দাঁত কেলিয়ে বললেন, "ফ্যাশন? হেইডা আবার কোন বালাই রে মেইয়া? মুই তো মনে করছি তুই আধা পিন্ধা বাকি আধা রাইখা আইছো লগে!"
দাদি আর নাতনির এই ক্যাঁচাল দেখে বাড়ির সবাই হাসতে হাসতে শেষ। ঠিক তখনি উঠানের কোণ থেকে গামছা কাঁধে নিয়ে আসলো নাহিয়ান—ইতি আর তিথির সেই কুল কাজিন। নাহিয়ানের পরনে একটা কালো কার্গো প্যান্ট, ফিটেড টি-শার্ট, আর তার ওপর বোতাম খোলা একটা স্টাইলিশ চেক শার্ট। মুখে একটা চোরা হাসি। সে এসে একদম ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে ইতিকে টিপ্পনী কেটে বললো, "কী রে ইতি, তুই এখানে পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন রে? ভেতরে যাবি না?"
ইতি তো আকাশ থেকে পড়লো! সে অবাক হয়ে আমতা আমতা করে বললো, "তুই? আমাকে তুই করে বলতেছেন?"
নাহিয়ান চোখ টিপে একটা মারাত্মক স্মাইল দিয়ে বললো, "হুম, তুই করেই তো বলবো। এখন থেকে ঘরের ছোটদের সবাইকে তুই বলব—তুই, তিথি, রিশা, সবাইকে।"
তিথি সুযোগ পেয়ে কোমর দুলিয়ে বললো, "কেন ভাইয়া? হঠাৎ এই মহান স্বাধীনতা ঘোষণা করলা কোন আক্কেলে?"
নাহিয়ান গম্ভীর হওয়ার ভান করে বললো, "আমার মর্জি! খামোখাই ইচ্ছা হইছে!"
আর ঠিক তখনি ইতির দিকে চোখ পড়লো সবার। ইতি আর তিথি দুজনেই পরেছে কালো রঙের পরিপাটি বোরকা আর তার সাথে মানানসই কালো নিকাব। কিন্তু কাপড়ের সমস্ত শালীনতা ভেদ করেও ইতির চোখ দুটো যেন কথা বলছিল! ইতির চোখের মণিগুলো গাঢ় বাদামি থেকে একেবারে কালোর গভীরতায় মেশা—যেন কুয়াশাঘেরা কোনো এক থমথমে হ্রদের অতল জলরাশি, যেখানে একবার তাকালে মানুষ খেই হারিয়ে ফেলে ডুবে যেতে বাধ্য। চোখের পাতাগুলো অসম্ভব ঘন ও দীর্ঘ, আর দৃষ্টিতে এমন এক অপার্থিব মায়াবী টান লুকিয়ে আছে, যা যেকোনো কঠিন পাথরের বুকও নিমেষেই গলে পানি করে দিতে পারে। সে ধার্মিক, পর্দা করে, কোরআন পড়ে, অথচ মনের দিক দিয়ে আবার দারুণ মজার একটা মানুষ।
--------------------
পরের দিন প্ল্যান হলো সবাই মিলে একটু হাওয়া বদলাতে যাবে। কুমিল্লার কোটবাড়ির সেই বিখ্যাত 'ময়নামতি ডিআরসি পার্ক' বা শালবন বিহারের পাশের ছায়াঘেরা এক মনোরম পার্কে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। পার্কের চারদিকে সারি সারি মেহগনি আর দেবদারু গাছের ছায়া, মাঝখানে একটা টলটলে শান্ত পুকুর—সব মিলিয়ে দারুণ একটা পোটেনশিয়াল ডেস্টিনেশন!
সবার আউটফিট ছিল দেখার মতো। সুপ্তি বেগম পরেছেন একটা চমৎকার জামদানি শাড়ি। রিশা পরেছে তার সেই বিখ্যাত ফ্রেঞ্চকাট মডার্ন গাউন আর সেই সাথে সেই বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের মতো বিপদজনক চিকন হিল! ইতি আর তিথি পরেছে সম্পূর্ণ কালো বোরকা-নিকাব, যার ভেতর থেকে ইতির ওই মায়াবী চোখ দুটো ঠিকরে বের হচ্ছিল। রিশার জেদের চোটে শেষ পর্যন্ত দাদি বাতাসি বেগমকে নিয়ে ঘরে রীতিমতো এক আন্তর্জাতিক বিউটি পার্লার সেশন বসলো! রিশা একদম কোমর বেঁধে ঘোষণা দিল, "দাদি, আজ তোমাকে গ্লোবাল মেকআপ গুরু বানাবোই!"
যেমন কথা তেমনি কাজ। রিশা তার বিশাল মেকআপ বক্স থেকে একে একে যা বের করলো, তাতে আস্ত একটা কসমেটিকসের দোকান বসে যায়! একে একে সামনে আসলো—হুডা বিউটির ম্যাট লিপস্টিক, ল্যাকমে আইকনিক কাজল, মেবলিনের ফিট মি ফাউন্ডেশন ও কনসিলার, কেট্রিসের লিকুইড হাইলাইটার, রেভলনের ব্লাশঅন, ম্যাকের স্ট্রোব ক্রিম, অ্যানাস্টাসিয়া বেভারলি হিলসের ব্রো পমেড, নাইকস প্রফেশনাল মেকআপ সেটিং স্প্রে, টার্ট শেপ টেপ, বেনিফিটের টিন্ট, আর লোরিয়ালের ল্যাশ প্যারাডাইজ মাসকারা!
শুরু হলো মেকআপের মহাযুদ্ধ। প্রথমে দাদির কুঁচকে যাওয়া মুখের ওপর মেবলিনের ফাউন্ডেশন আর কনসিলার দিয়ে এমন এক চটচটে আস্তর ফেলা হলো যে চামড়া একদম মার্বেল পাথরের মতো টানটান হয়ে গেল। এরপর অ্যানাস্টাসিয়া ব্রো পমেড দিয়ে দাদির মুখের স্বাভাবিক হালকা দুটো পশমকে টেনেটুনে পুরো আধা ইঞ্চি চওড়া একেকটা বিশাল ব্রাশের মতো কালো ব্রু বানিয়ে দেওয়া হলো, যা দেখে মনে হচ্ছিল দুটো জোঁক গালে এসে সেঁটে বসেছে! চোখে ল্যাকমে আইকনিক কাজল আর লোরিয়াল মাসকারার তিন-চার স্তর চাপিয়ে এমন এক ভয়ঙ্কর খ্যাপা চাউনি দেওয়া হলো যে তাকালেই বুক কেঁপে ওঠে। গালে রেভলনের ব্লাশঅন আর কেট্রিসের হাইলাইটার ঘষে এমন লাল টকটকে আর তেলচিটে চকচকে করা হলো যে রোদ পড়লে ওখান থেকে প্রতিফলিত আলোয় ঘরের ছাদ দেখা যায়! ঠোঁটে হুডা বিউটির গাঢ় মেরুন ম্যাট লিপস্টিক এমনভাবে কোণাকোণি আঁকা হলো, যেন মনে হয় জ্যান্ত একটা আস্ত রুই মাছ গিলেছেন!
আর সবশেষে আসল সেই মেকআপের মহা চমক—দাদির মাথার পাকা চুলগুলোকে টেনেটুনে একদম আকাশের দিকে উঁচু করে একটা বিশাল টাওয়ারের মতো খোপা বা বান বানিয়ে দেওয়া হলো, আর সেই খোপার ঠিক মাঝখানে গোঁজা হলো একটা বিশাল প্লাস্টিকের কৃত্রিম লাল গোলাপ ফুল আর দুটো ময়ূরের পালক! আর পায়ে পরিয়ে দেওয়া হলো সেই বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের চেয়েও মারাত্মক এক জোড়া চিকন হিল!
দাদি ওই উঁচু করে বাঁধা টাওয়ার খোপা আর হিল পায়ে দিয়ে যখন খাটের ওপর থেকে নামতে গেলেন, তক্ষুনি ফ্লোরে একটা বিচ্ছিরি কায়দায় স্লিপ খেয়ে তিনি এমন এক জিমন্যাস্টিক পোজ দিলেন যে বাড়ির সবাই ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো!
দাদি তখন চুল আর হিল সামলাতে সামলাতে দুই হাত শূন্যে ছুড়ে বরিশালের টানে চিৎকার করে উঠলেন, "ও মোগো বাপরে! এইড কি জুতা পিন্দাইলি রে মেইয়া? আর মুখে এইডা কি মাজন মাইর দিছিস, মনে লয় আস্ত একটা আঠার বস্তা চিপড়াইয়া আমার চামড়ার লগে সেঁটে দিছে! আর মাথার ওপর এইডা কি বাঁশঝাড় গজাইছিস? মনে লয় একটা আস্ত কচুরিপানার জট পাকায়ে আমার খুলির ওপর বসাইয়া দিছে! আমার তো মনে লয় এই ফাউন্ডেশন আর হাইলাইটার মাখা মুখ দেইখা রাইতে আর ভূতেও আমার কাছে আইব না, উলটা জিনের বাদশারাও ডর পাইয়া পলাইব! মোগো হাবলু বুড়ার আক্কেল হইলো না যে এই শয়তানি কারবার দেইখা একটা লাঠি নিয়া আগাইয়া আইবো!"
হাবিব দাদা পাশ থেকে চশমাটা নাক বরাবর ঠিক করে খিকখিক করে হেসে বললেন, "বাতাসি, তোর ওই উঁচু চুল, জোঁকের মতো ব্রু আর তেলচিটে মুখ দেইখা তো মোগো ঘরের ছাগলটাও গতর কাইন্দা এক দৌড়ে গোয়াল ছাইড়া পালাইছে! তোরে তো এহন আস্ত একটা ভিনগ্রহের ভিনদেশি তালগাছ মনে হইতেছে!"
দাদি তখন চোখ রাঙিয়ে দাঁত কেলিয়ে বললেন, "তুই চুপ থাক হাবলু আবলুস! তোর তো জোয়ান বয়সেও বুদ্ধিশুদ্ধি আছিল না গোবর কুড়ানির মতো, এহন বুড়া বয়সে আমার গ্লোবাল ফ্যাশনে ভেটো দেস ক্যা রে বেটা?"
দাদির এই কথা শুনে তিথি তো পেটে হাত দিয়ে খাটের ওপর গড়াগড়ি খেতে খেতে হেসেই খুন! সে হাসি থামিয়ে কোনোমতে বললো, "দাদি, তোমাকে এখন দেখতে পুরো ওই যে চায়নিজ কার্টুনের কুংফু পাডার মতো লাগতেছে, মাথার ওই ফুলটা বাতাসে খালি পতপত করে উড়তেছে, আর গাল দিয়া মনে হয় শর্ষের তেল ঝরতেছে!"
রিশা অবশ্য এক্কেবারে মুগ্ধ চোখে হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠলো, "ওয়াও দাদি! ইউ আর সো গর্জিয়াস! একদম ইন্টারন্যাশনাল টিকটক ট্রেন্ডিং কুইন! তোমার গ্লো পোরলেস লাগতেছে!"
দাদি নাক সিঁটকে মেকি ধমক দিয়ে বললেন, "পোরলেস না কি কোন চুনোপুটি কন, ওই মেকআপের কৌটাগুলো দিয়ে কি আলু ভর্তা মাখে নাকি শুঁটকি ভাজে? মুখে কি যেন ফাউন্ডেশন-কনসিলার ঢেলে দিছিস, মনে লয় আঠা লাগাইয়া রাখছে! খালি ফাইজলামি করো ক্যা মোরে নিয়া?"
আর সুপ্তি বেগম তো মেয়ের এই কান্ড দেখে লজ্জায় হাসতে হাসতে দেওয়াল ধরে ফেললেন। নাহিয়ান দূরে দাঁড়িয়ে পকেটে হাত গুঁজে মুচকি হেসে পেটে কিল মেরে খিকখিক করে হাসতে লাগলো। ইতি আর তিথি তো হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেল তাদের, দুজনে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ফিকফিক করে হাসছে আর ভাবছে—দাদির এই রূপ দেখলে এই জনমে আর কোনো টেনশনই থাকে না! সবার এমন হাসাহাসির রোল দেখে দাদি নিজেও শেষ পর্যন্ত নিজের চেহারা আয়নায় দেখে দাঁত কেলিয়ে একটা হিকপাওয়ালা হাসি দিয়ে ফেললেন!
অতঃপর, জেদের বশে এই বেশেই বাতাসি বেগম বেড়াতে চললেন
----------
পার্কে ঢুকেই শুরু হলো হুলুস্থুল কান্ড। দাদি আর রিশা দুজনই হিল পিন্দে এমনভাবে হাঁটছে, মনে হয় যেন কাঁচা কাদায় আড়াই মণ ওজনের দুইটা ক্রেন ডান্স করার চেষ্টা করছে! একবার ডানে হেলে তো আরেকবার বামে টলে পড়ে যাওয়ার উপক্রম!
তিথি পেটে হাত দিয়ে খিকখিক করে হাসতে হাসতে বললো, "দাদি, তোমাকে দেখে তো মনে হইতেছে কোনো পোলার আইসক্রিমের বরফ গলা পিচ্ছিল রাস্তায় হাঁটন্ত একটা পেঙ্গুইন, কখন সপাটে আছাড় খেয়ে হাড়গোড় ভাঙবা তার কোনো গ্যারান্টি নাই!"
দাদি হিল সামলাতে সামলাতে জিভ কেটে বরিশালের টানে চেঁচিয়ে উঠলেন, "আরে মোগো মনু! এই শয়তানি জুতা তো মোরে আস্তো চিবাইয়া খাইতাছে রে! মুই আর এক পাও সামনে আগাইতে পারুম না, আমার আত্মা খাঁচা ছাইড়া পালাইবার চায়!"
হাবিব দাদা পাশ থেকে চশমাটা নাক বরাবর ঠিক করে চিল্লিয়ে উঠলেন, "বাতাসি! তুই এই প্রেতাত্মার জুতা পিন্দা কোন নরকে যাবি রে? বুড়ো বয়সে তোর একটা হাড্ডিও আস্তো থাকবো না, সোজা ইজতেমা মাঠে খাটিয়া তোলার বন্দোবস্ত করা লাগবো!"
দাদি চোখ রাঙিয়ে গর্জন করে উঠলেন, "তুই চুপ থাক হাবলু বুড়া! তোর তো আক্কেল হইলো না বুড়ো বয়সেও, তুই আবার আমার ফিজিক্যাল ফ্যাশনে ভেটো দেস ক্যা রে?"
সবাই তখন হাসিতে ফেটে পড়লো। তিথি তো হাসতে হাসতে গাছের সাথে বাড়ি খাওয়ার জোগাড়।
হঠাৎ একটা আস্ত পাথরে খানাখন্দে হোঁচট খেয়ে দাদি ধাস করে সোজা গড়ের বাজনার মতো বসে পড়লেন মাটিতে! পায়ে একটু মুচকি ব্যথা পেলেন। সবাই আঁতকে উঠে চিৎকার করে দৌড়ে গেল, "দাদি! ও দাদিগো! কোমর কি আস্তো আছে নাকি পামুংচার হয়ে গেছে?"
আর ঠিক ওই সেকেন্ডে, দাদিকে তুলতে গিয়ে রিশা নিজেই নিজের হিলে পেঁচিয়ে এক মহাজাগতিক কায়দায় সোজা গিয়ে ডাইভিং মারলো পার্কের একটা কচি গোবরের গাদায়! ছপাস! আস্ত একটা শব্দ হলো! রিশার মুখ, চুল, মাথা, ওই দামি ফ্রেঞ্চ মডার্ন ড্রেস—সবকিছু এক মিলি সেকেন্ডে খাঁটি গোবরের সুবাসে মাখামাখি!
গোটা পার্ক এক মুহূর্তের জন্য একেবারে থমথমে নীরব। দাদি তো নিজেই ব্যথা পেয়ে থমকে গেছেন নাতনির এই বিশ্বমানের গোবর-ডাইভিং দশা দেখে। কিন্তু তিথি আর তার তিন সাগরেদ—মেরিনা, জান্নাত, ইভা—আর নিজেদের কন্ট্রোল ধরে রাখতে পারলো না। চারজন একসাথে খিকখিক, হিকহিক করে এমন জঘন্য হাসিতে ফেটে পড়লো যে পার্কের কবুতরগুলো পর্যন্ত হার্ট অ্যাটাক করে উড়ে পালালো।
তিথি পেট চেপে ধরে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললো, "ও মাগো রে! রিশা এইটা তুই কী করিলি রে ভাই! তুই তো এক লাফে ফ্রান্সের ফ্যাশন উইক ছেড়ে একেবারে বাংলার 'ন্যাচারাল অর্গানিক গোবর ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি'র ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হয়ে গেলি!"
মেরিনা দাঁত কেলিয়ে সার্টিফিকেট দিয়ে বললো, "একদম ১০০% খাঁটি কথা! পার্লারের লাখ টাকা দামি ফেসিয়াল বা সিরামিক মেকাপের চেয়ে এই কচি গোবরের প্যাক তোর তৈলাক্ত স্কিনের জন্য একশো গুণ বেশি উপকারী!"
জান্নাত টিপ্পনী কেটে কোমর দুলিয়ে বললো, "রিশা সোনা, তোরে এখন হুবহু একটা ফ্রেঞ্চকাট দেশি ছাগলের খামারের রাজরানি লাগতেছে! কী ফ্রেগ্রেন্স রে বাবা!"
ইভা নাকে দুই আঙুল চেপে ধরে ব্যঙ্গ করে বললো, "উফ, এই সুবাস তো একেবারে নাক ভেদ করে সোজা ব্রেইনের কোষে কোষে মাইর দিতেছে!"
আর ইতি? সে তো হাসতে হাসতে ঢলে পড়ছে যেন!
রিশা তখন গোবর মাখা মুখে ফোঁপাতে ফোঁপাতে কান্নাকাটি শুরু করে দিলো, একেবারে ন্যাকা সুরে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলো, "মাআআ! আমার আভাটার ব্র্যান্ডের ফ্রেঞ্চ ড্রেসটা চিরতরে বরবাদ হয়ে গেল! আমার ওয়াটারপ্রুফ মেকাপ গলে চুইয়ে পড়তেছে! আমি এখন কোন মুখে কার সামনে দাঁড়াবো!"
সুপ্তি বেগম তাড়াতাড়ি দৌড়ে এসে মায়ার সাগর উপচে রিশাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, "আরে সোনা আমার, আর কেঁদো না তো কলিজা! বাড়ি চলো, ভালো করে হুইল পাউডার আর ডেটল সাবান দিয়ে তোমারে গোসল করিয়ে দেবো নে। তোর কিচ্ছু হবে না আমার মা!" সুপ্তি বেগম তো সবসময় রিশাকে মাথার মণি বানিয়ে রাখেন, কারণ সে তাদের একমাত্র রাজকন্যা।
-----------------------
এদিকে, এই সমস্ত হুলুস্থুল কান্ডকারখানা আর হাসাহাসির আবহাওয়ার মাঝেই উদ্যানের ঠিক বিপরীত প্রান্তে, ঘন মেহগনি গাছের অতল ছায়ার আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল এক রহস্যময় ব্যক্তি। তার পরনে একদম এ টু জেভ গভীর কালো রঙের ওভারকোট আর ইম্পোর্টেড গ্যাবার্ডিন প্যান্ট; মুখমণ্ডল ঢাকা একটি গাঢ় কালো মাস্কে, যার ওপর দিয়ে দৃশ্যমান রয়েছে কেবল তার একজোড়া চোখ—শীতের রাতের হিমেল আকাশের মতো বরফশীতল গভীর নীল চোখ!
তার অবয়বটা হঠাৎ করেই যেন কোনো অদৃশ্য কুয়াশার চাদরে ঘেরা—চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই লোকটার দীর্ঘ ছায়াটা বাতাসে কেমন যেন বাষ্পের মতো মিলিয়ে গেল! কেউ টেরই পেল না সে কখন এসেছিল, আর কখন বা অতল ছায়ার ফাঁক গলে হাওয়ায় মিশে গেল!
তবে সে চোখের পলক না ফেলে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল কেবল একজনের দিকে—ইতি।
ইতির সেই মায়াবী চোখ দুটো যখনই হাসি আর বিস্ময়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিল, তখন আশপাশের সমস্ত কোলাহল যেন নিমেষেই স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছিল। সে তখনো ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে, এই উন্মাদ হাসাহাসি আর গোবরের মহাকাব্যের মাঝেও সুদূর অন্ধকারের কোনো এক গভীর দৃষ্টি তার ওপর স্থির হয়ে আছে। ইতি নিজের অজান্তেই তার মনের নিভৃতে এক অসম্ভব মিষ্টি আর রহস্যময় গল্পের বুনন শুরু করে দিয়েছে, যার পরিণতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা কেবল সময়ই বলে দেবে।