উপন্যাস: নির্বাসিত চোখের কাজলছায়া
**★বিকালের সোনালী রোদ তখন গ্রামের বড় পুকুরঘাটটার ওপর তির্যকভাবে এসে পড়েছে। বাতাসি বেগমের বাড়ির অন্দরমহল থেকে শুরু করে পুকুরঘাট পর্যন্ত—পুরো এলাকাটাই যেন এক চিলতে হাসির জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে। তবে আজকের এই মহা কাণ্ডের পেছনে রয়েছে এক সুদীর্ঘ ষড়যন্ত্র এবং তারচেয়েও মারাত্মক সব লজিক্যাল কাউন্টার-অ্যাটাক!
সবকিছুর মূলে ছিল একটু আগের সেই ঘটনা। ইতি, তিথি, মেরিনা, জান্নাত আর ইভা মিলে দোতলার বারান্দায় বসে এমন এক কুখ্যাত সিক্রেট মিটিং করেছিল, যেটার লক্ষ্য ছিল একটাই—নাহিয়ানকে কীভাবে একেবারে নাস্তানাবুদ করে ছাড়া যায়। ইতি তার লাল এফএল (FL) প্লাস্টিক চেয়ারটার সিটের মাঝখানের গোল ছিদ্র দিয়ে নিচে থেকে সুপার গ্লু বা স্ট্রং আঠার এমন এক কারসাজি করার প্ল্যান এঁটেছিল, যাতে কেউ বসলেই সেটার সাথে একদম পাকাপোক্তভাবে সেঁটে যায়।
কিন্তু সমস্যা হলো, ঘরের ওই গোপনীয় মিটিংয়ের ভেন্টিলেটরের নিচে আড়ি পেতে বসা চালাকচতুর নাহিয়ান নিজেই যে সব ফন্দি-ফিকির শুনে ফেলেছে, তা ওই পাঁচ তরুণী ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি! নাহিয়ান যখন শুনল ইতি তার চেয়ারে গ্লু লাগানোর ফন্দি আঁটছে, তখন সে মনে মনে মুচকি হেসে ভেবেছিল—সে এত সহজে ফাঁদে পা দেওয়ার পাত্র নয়! সেই বুদ্ধি থেকেই সে এক মহা মাস্টারস্ট্রোক দিয়ে বসল—সে আজ এক প্যান্টের বদলে জোড়া লাগিয়ে একেবারে দুটো জিন্স প্যান্ট একসাথে করে মাঠে নেমে পড়ল! সে ভেবেছিল, ইতি যতই আঠা লাগাক না কেন, একটা প্যান্ট আঠার সাথে আটকে গেলে সে ওপরের প্যান্টটা খপ করে খুলে ফেলে হিরোর মতো সুকৌশলে কেটে পড়বে! কী মারাত্মক বুদ্ধি!
এদিকে ইতিও কম যায় নাকি? সে কেবল আঠার ওপর ভরসা করে বসে থাকেনি; সে আগের রাতেই তিথি আর বান্ধবীদের সাথে মিলে ওই লাল চেয়ারটার চারটা পায়ার নিচটা এমন নিখুঁতভাবে করাত দিয়ে আলগা করে রেখেছিল, যা দূর থেকে দেখলে আস্ত মনে হয়, কিন্তু একটু ওজন পড়লেই তা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ার পাকা বন্দোবস্ত করা ছিল।
সব পরিকল্পনা পাকাপোক্ত করে নাহিয়ান বুক ফুলিয়ে একেবারে কুল মাফিয়া স্টাইলে এসে পুকুরঘাটের সেই লাল রঙের প্লাস্টিক চেয়ারটার ওপর ধড়াস করে গিয়ে বসল। সে ভাবল, আজ দেখি ইতি তার কী বাঁকা বুদ্ধি খাটিয়েছে!
কিন্তু খেলার আসল টুইস্টটা তখনো বাকি ছিল! নাহিয়ান চেয়ারে বসার ঠিক এক সেকেন্ড পরই শুরু হলো সেই ঐতিহাসিক মোমেন্ট। নাহিয়ানের সেই বাঁকা স্বভাবের জাওরা বন্ধু পূর্ব—যাকে দেখলে মনে হয় আস্ত একটা সার্কাসের ম্যানেজার পালিয়ে এসেছে—সে অত্যন্ত সুকৌশলে বিড়ালের পায়ে হেঁটে সোজা নাহিয়ানের পিছন দিকটায় গিয়ে হাজির হলো। পূর্বের হাতে তখন একটা লম্বা কাঠি বা ঘাস জাতীয় কিছু ছিল। সে কাউকেই কিচ্ছু বুঝতে না দিয়ে অত্যন্ত সন্তর্পণে সেই এফএল চেয়ারের সিটের মাঝখানের গোল ছিদ্রটা দিয়ে কাঠিটা গলিয়ে দিল এবং সোজা নাহিয়ানের ঠিক পশ্চাতে এমন এক নিখুঁত, ধারালো ও আকস্মিক গুঁতো মারল যে মনে হলো আস্ত একটা বুনো বিষাক্ত বোলতা বা হুলওয়ালা হর্নেট এসে সোজা সেখানে কামড় বসিয়েছে!
"উহ্ মাগো! মরে গেলাম রে! আমার পাছা গেলো রে!! বাঁচাও!"
নাহিয়ান প্যান্টের পেছন দিকটা একহাতে খপ করে চেপে ধরে এক লাফে চেয়ার ছেড়ে সোজা শূন্যে দুই ফুট ওপরে লাফিয়ে উঠল! তার সেই রাজকীয় ভাবসাব, ভার্সিটির কুল এটিটিউড এক সেকেন্ডে কর্পূরের মতো উবে গেল। সে ব্যথায় কোঁকাতে কোঁকাতে লাফাতে লাগল আর চিৎকার করে চেঁচিয়ে উঠল, "ওরে বাপ রে! কে যেন আমার পাছায় কামড় না যে গুতা মারছে গো!! ও আব্বা গো!"
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই ইতির পেতে রাখা সেই গ্লু বা আঠার ম্যাজিক নিখুঁতভাবে কাজ করে বসল! নাহিয়ানের পরনের ওই ডাবল প্যান্টের নিচের জিন্সের পিছন দিকটা ওই লাল প্লাস্টিকের চেয়ারের সিটের সাথে আঠার চোটে একেবারে হুবহু সেঁটে গেছিল! ফলে সে যখন ব্যথায় লাফিয়ে উঠতে গেল, তখন চেয়ারটা মেঝের সাথে আলাদা না হয়ে সোজা নাহিয়ানের প্যান্টের সাথে ঝুলতে ঝুলতে আকাশে উঠে গেল! দেখতে মনে হলো নাহিয়ান আস্ত একটা লাল রঙের কচ্ছপের খোলস পিঠে বা গায়ে লাগিয়ে পেছনের দিকে উল্টে পড়ে গেছে!
আর তার ঠিক পরেই ঘটল দ্বিতীয় বিপর্যয়—চেয়ারের পায়াগুলো তো ইতি আগেই আলগা করে রেখেছিল! "ড়াৎ-চড়াৎ!" করে বিকট শব্দে চেয়ারের পায়াগুলো একসঙ্গে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। নাহিয়ান তখন মাটিতে শুয়ে শুয়েই হাঁটু গেড়ে কোনোমতে দুটো প্যান্টের জট ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। সে তক্ষুনি তার সেই মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী খপ করে ওপরের প্যান্টের বেল্টটা ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে খুলে ফেলার চেষ্টা করল, যাতে সে প্যান্টটা চেয়ারে রেখেই পলায়ন করতে পারে! কিন্তু দুটো প্যান্ট একসঙ্গে এত শক্তভাবে আঠায় আর ভাঙা প্লাস্টিকের খাঁজে আটকে গেছিল যে সে কোনোভাবেই প্যান্ট আলাদা করতে পারল না। শেষ পর্যন্ত ওই ভাঙা প্লাস্টিকের লাল চেয়ারের অবশিষ্টাংশ কোমরের সাথে ঝুলিয়ে, দুই হাত শূন্যে ছুড়ে নাহিয়ান সোজা পুকুরঘাটের ভেজা মাটিতে এমন এক বিশ্রী কায়দায় আছাড় খেল যে তার গায়ের সমস্ত মাফিয়া ভাবসাব চিরতরে মাটি হয়ে গেল!
পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে তখন ইতি, তিথি, মেরিনা, জান্নাত আর ইভা—সবার অবস্থা হাসতে হাসতে কাহিল! বিশেষ করে ইতির মুখে তখন বিজয়ের যে চওড়া হাসিটা ফুটে উঠেছিল, সেটা দেখলে মনে হতো সে আস্ত একটা যুদ্ধের ময়দান জয় করে ফেলেছে। সে একটুও ন্যাকামি না করে, বরফশীতল আর আত্মবিশ্বাসী গলায় পকেট থেকে হাত বের করে নিজের জামার কলার ঝাড়তে ঝাড়তে চেঁচিয়ে বলে উঠল, "কী রে মিস্টার মাফিয়া! ডাবল প্যান্ট পরেও তো মাটির আকর্ষণ কাটাতে পারলে না দেখছি! আইনস্টাইনের গ্র্যাভিটি তো দেখি তোমার এই ডাবল প্যান্টের থিওরির সামনে এক্কেবারে ফেল মেরে গেল!"
ইতির এই চরম লেভেলের মোক্ষম যুক্তিযুক্ত কথা শুনে চারপাশের সবাই তো হাসতে হাসতে পেটে কিল মারতে শুরু করে দিল।
কিন্তু মানুষের জীবনে অতি আনন্দই যে সর্বনাশের মূল—সেটা ইতি হয়তো তখন বুঝতে পারেনি! নাহিয়ানের ওই বেহাল দশা দেখে যখন ইতি নিজে হাসতে হাসতে পেটে হাত দিয়ে পাশের আরেকটি প্লাস্টিকের চেয়ারে ধড়াস করে বসতে গেল—ঠিক তখনই ঘটে গেল মহাপ্রলয়!
ওই চেয়ারটার পায়াগুলোও তো ইতি আর তিথি আগেই আলগা করে রেখেছিল! ইতি বসার সাথে সাথেই তার নিজের পাতার ফাঁদে সে নিজেই পা দিয়ে বসল! "চড়াস!" শব্দে সেই চেয়ারটাও ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেল, আর ইতি তার শালীন ও মার্জিত কামিজের সালোয়ার সামলানোরও সময় পেল না—সোজা ধপাস করে পুকুরঘাটের ভেজা মাটিতে গিয়ে এমন এক আলগোছে উপুড় হয়ে পড়ল যে তার কোমরে আর পিঠে বেশ ভালোমতোই একটা চোট লাগল!
"উফ মাগো! কোমরটা তো ভেঙে গেল!" ইতি দাঁত কিড়মিড় করে নিজের কোমরটা চেপে ধরে কোনোমতে উঠে দাঁড়াল। তার মেজাজ তখন সপ্তমে চড়া!
নাহিয়ান তখন মাটি থেকে কোনোমতে দুটো প্যান্টের জট ছাড়াতে ছাড়াতে খিকখিক করে হেসে উঠল এবং চিল্লে উঠল, "কী রে এসএসসি পরীক্ষার্থী জেনিয়াস ম্যাডাম? অন্যের গর্তে নিজে পড়ার ফিলিংসটা কেমন? একেই বলে কর্মফল!"
ইতি রেগে আগুন হয়ে গেল। সে এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে সোজা ঘরের ভেতরে গিয়ে হাজির হলো সরাসরি নাহিয়ানের মা ও ইতির নিজের চাচি—তাসকিয়া বেগমের সামনে। তিথি আর তার বাকি বান্ধবীরাও তার পেছনে পেছনে ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে মার্চ করতে করতে ঢুকল।
ইতি একদম গোছানো ও তেজোদীপ্ত গলায় নালিশ ঠুকল, "চাচি! আপনার এই গুণধর ছেলের পাকা কীর্তি একবার এসে দেখে যান! নিজে তো পুকুরঘাটে সার্কাস দেখাচ্ছেই, সাথে আমার এসএসসির পড়ার মনমানসিকতা একেবারে নষ্ট করে দিচ্ছে! সারাদিন খালি ফাজলামি আর ষড়যন্ত্র করা ছাড়া ওর অন্য কোনো কাজ নাই!"
তাসকিয়া বেগম তো ইতির এই অবস্থা আর কোমর ধরে দাঁড়ানো দেখে আঁতকে উঠে বললেন, "বলিস কী রে ইতি! কী করেছে ও আবার?"
ঠিক তখনই পেছন পেছন হাঁপাতে হাঁপাতে নাহিয়ানও ঘরে এসে হাজির হলো। সে নিজের দুটো প্যান্ট কোনোমতে টেনেটুনে ঠিক করতে করতে অভিযোগের সুরেই বলে উঠল, "মা, তুমি তোমার এই ডেঞ্জারাস ভাতিজিটাকে একটু জিজ্ঞেস করো তো! ও একা কিচ্ছু করে না! ও আগে থেকেই ঘরের ভেন্টিলেটরের নিচে বসে দলবল নিয়ে সিক্রেট মিটিং করে এই চেয়ার ভাঙার আর গ্লু লাগানোর মাস্টারপ্ল্যান করেছিল! আমি তো আগেই সব আড়ি পেতে শুনে ফেলেছিলাম বলেই না আজ দুটো প্যান্ট পরে জীবন বাঁচাতে গিয়েছিলাম!"
নাহিয়ানের মুখে এই 'সিক্রেট মিটিং' আর 'সবার শলা-পরামর্শের' কথা শুনে ঘরের ভেতরে উপস্থিত সবার চোখ কপালে উঠে গেল!
ঠিক তখনই অন্দরমহলের বারান্দা থেকে লাঠি ঠকঠক করতে করতে এন্ট্রি নিলেন হাবিব দাদা আর দাদি বাতাসি বেগম। তারা দুজনে এতক্ষণ বারান্দায় বসে পেয়ারা চিবুতে চিবুতে পুরো নাটকের লাইভ টেলিকাস্ট উপভোগ করছিলেন!
দাদি বাতাসি বেগম নিজের সাদা চাদরটা ঠিক করতে করতে দাঁত কেলিয়ে এমন এক হিকপাওয়ালা হাসি দিলেন যে তার গলার সোনার দুলগুলো পর্যন্ত কেঁপে উঠল। তিনি একেবারে পাকা বরিশালের টানে চেঁচিয়ে উঠলেন,
"ও মোগো হাবলু বুড়া গো! দেইখো কাণ্ডখানা! মোগো বাড়ির পোলাপানগুলা এহন আর পড়ালেখা করে না, আসমান-জমিন ফুঁড়ে আস্ত একটা গোয়েন্দা এজেন্সি খুইলা বইছে! মোর মেইয়া ইতিডা টেস্ট পেপার বাদ দিয়া এহন কারাতে ট্রেনিং সেন্টারের ওস্তাদ হইছে, আর নাহিয়ান পুতটা ডাবল প্যান্ট পিন্ধিয়া রকেটের গতিতে পুকুরে ল্যান্ডিং করছে! হা হা হা! মোরা তো মোদের পেটের ভাত সব হেসেই খুইলা ফালাইছি!"
হাবিব দাদা চশমাটা নাক থেকে খসে পড়তে ধরে খিকখিক করে হেসে বললেন, "ঠিক কইছিস বাতাসি! হেরা যে কান্ড ঘটাইছে, এই বুড়ো বয়সে এমন ফ্রি সার্কাস আর কোথাও পাওয়া যাইতো না! জেনারেশন জি-র পোলাপান আসলেই মারাত্মক ডেঞ্জারাস!"
দাদা-দাদির এই অকুণ্ঠ সমর্থন আর হাসাহাসি দেখে ইতির মা সুমাইয়া বেগম আর চাচি তাসকিয়া বেগম দুজনেই চোখ পাকিয়ে তিথি আর ইতিকে হালকা ধমক দেওয়ার চেষ্টা করলেন, "তোরা কি পড়াশোনা একদম ছেড়ে দিয়েছিস নাকি? সারাদিন এসব ফাজলামি বুদ্ধি কই পাও তোমরা?"
কিন্তু ইতি তো ন্যাকা কান্নাকাটি করার মেয়েই নয়! সে সোজা নিজের কোমর ধরে একদম স্ট্রং ও বরফশীতল যুক্তিতে মা ও চাচিকে শুনিয়ে দিল, "মা, নিজের ডিফেন্স করা কি অপরাধ? উনি যে আমাদের পেছনে সারাদিন গোয়েন্দাগিরি করে বেড়ান, সেটা কি খুব ভালো লক্ষণ? আমরা তো আমাদের মতো টেস্ট পেপার পড়ছিলাম, উনি নিজে এসে আমাদের ফ্রেমে ফেঁসেছেন!"
নাহিয়ান মুখ বাঁকিয়ে বলল, "হ্যাঁ রে হ্যাঁ! পূর্ব যে পিছন দিক থেকে আস্ত একটা ঘাসের কঞ্চি দিয়া গুতো দিল, সেইটার বিচার কে করবে?"
সবার এমন হুলুস্থুল চেঁচামেচি, দাদির খিলখিল হাসি আর ইতির সেই জেদি ও আত্মবিশ্বাসী চাউনিতে পুরো বাড়িটা তখন এক জ্যান্ত কমেডি স্টুডিওতে পরিণত হলো। ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা রিশা কেবল দূর থেকে নাহিয়ানের এই লেজেগোবরে দশা দেখে মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল—যে মানুষটার জন্য তার এত সুপ্ত মায়া, ভালোবাসা কেন?!! সেই নীল নয়নের অবয়বটি আমবাগানের অন্ধকার থেকে এই হাসির রোল দেখে এক অদ্ভুত মায়াবী দৃষ্টিতে কেবল ইতির হাসিমুখটার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে এক চিলতে মুচকি হাসল।
চলবে,,,,,