ফন্ট সাইজ:
থিম:
নির্বাসিত চোখের কাজলছায়া

পর্ব 4

লেখক: নাজিফা বিনতে নাছির

উপন্যাস : অদৃশ্য টান

৩য় পর্ব : রিশার আগমন

​পার্কের গোবর-কাণ্ডের রোমাঞ্চকর অধ্যায় চুকিয়ে যখন সবাই বাড়ি ফেরার জন্য গাড়িতে ওঠার তোড়জোড় শুরু করলো, তখন শুরু হলো এক মহানাটক। কেউ আর আলাদা রিকশা বা ভ্যানগাড়িতে এক পাও নড়বে না—সবার একটাই জেদ, সবাই মিলে একটা বড়সড় গাড়িতে করেই একসঙ্গে বাড়ি ফিরবে!

​তখন নাহিয়ানের সেই বাঁকা স্বভাবের জাওরা বন্ধু পূর্ব—যাকে দেখলে মনে হয় আস্ত একটা সার্কাসের ম্যানেজার পালিয়ে এসেছে—সে তার কোমর বেঁধে আয়েশি ভঙ্গিতে একটা আস্ত টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার প্রাডো গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বসলো। পূর্ব স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে গ্যাংস্টার স্টাইলে চিল্লে উঠলো, "দোস্তরা! তোদের এই মেকআপ গলে যাওয়া মুখ আর গোবর মাখা শরীর শুদ্ধা আজকে আমার এই ভিআইপি রথে তুলবোই তুলবো! এক পাও হেঁটে যাওয়ার কোনো চান্স নাই!"

​গাড়ি তো দূরের কথা, ভেতরে উঠতেই শুরু হলো সিট দখলের এক আন্তর্জাতিক অলিম্পিক গেম! পেছনের সিটে সবাই এমনভাবে গাদাগাদি করে বসতে চাইলো যে মনে হলো ঢাকা কলেজের পোলাপান বাসে সিট পাওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দিয়েছে। রিশা তো হিল সামলাতে সামলাতে সবার আগে গিয়ে মাঝখানের সিটটা খপ করে দখল করে বসলো, যাতে তার গোবর মাখা জামার অরিজিনাল ফ্রেগ্রেন্স সবার নাকে ঠিকমতো পৌঁছে যায়! এদিকে তিথি আর তার তিন ডেঞ্জারাস জাঁদরেল বান্ধবী—মেরিনা, জান্নাত আর ইভা—পেছনের সিটে এমনভাবে চারজন মিলে গাদাগাদি করে বসলো যে দেখে মনে হলো রিকশার হুডের নিচে জ্যান্ত চারটা ব্যাঙ লাফালাফি করতেছে।

​আর ইতি? সে কোনোভাবেই এই ফাও জগাখিচুড়ি ভিড়ের মধ্যে পেছনের ওই নরকে পা রাখবে না। ইতি হলো এক্কেবারে মার্জিত একটা মেয়ে, ন্যাকামি তো দূরের কথা, একটু এদিক-সেদিক ফাজলামি দেখলে সে নিজেই খাপ্পা হয়ে যায়। সে গম্ভীর মুখে কড়া গলায় সাফ জানিয়ে দিল, "আমি জীবনেও ওই পাজিগুলার মাঝে চিপা হয়ে বসবো না, আমার দম বন্ধ হয়ে মরে যাওয়ার শখ নাই!"

​কিন্তু উপায় কী? গাড়িতে তো আর আস্ত একটা স্টেডিয়াম নাই! শেষ পর্যন্ত চরম এক লজিক্যাল ও গোছানো সমীকরণ মেলানো হলো—যেহেতু পেছনে তিল ধারণের জায়গা নাই, আর ড্রাইভ করতেছে স্বয়ং নাহিয়ান, তাই বাধ্য হয়েই পেছনের ওই যন্ত্রণাময় ভিড় থেকে ইতিকে বাঁচানোর জন্য নাহিয়ানের ঠিক পাশের ফ্রন্ট প্যাসেঞ্জার সিটটাই বরাদ্দ করা হলো। এছাড়া আর কোনো বিকল্প বুদ্ধিই ছিল না! ইতি মুখ গোমড়া করে চরম বিরক্ত হয়ে বাধ্য হয়ে আইসা বসলো নাহিয়ানের পাশের সিটে।

​গাড়ি চলতে শুরু করলো। পার্কের হিমেল বাতাসে ইতি আর তিথি দুই বোন মিলে আবার পার্কের গেট থেকেই চার-পাঁচটা করে বিশাল সাইজের কুলফি আইসক্রিম গিলে ফেলেছে! আর ফল যা হওয়ার সেটাই হলো—গাড়ির এসি আর আইসক্রিমের ধুম ধারাক্কা কম্বিনেশনে ইতির একেবারে বারোটা বেজে মারাত্মক লেভেলের সর্দি বসে গেল। নাক দিয়ে গলগল করে পানি পড়া শুরু হইছে।

​নাহিয়ান গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে হঠাৎ পাশ ফিরে ইতিকে কী একটা সিরিয়াস কথা জিজ্ঞেস করতে গেল, ঠিক সেই মুহূর্তেই ইতির নাক থেকে একটা মহাপ্রলয়ী হাঁচি বের হলো—"হা-আ-আ-চিইই! খামোশ!"

​আর সেই হাঁচির স্পিডে ইতির নাক থেকে সর্দির একটা আস্ত রাজকীয়, আঠালো ও চকচকে ফেনা সপাস করে শূন্যে রকেট গতিতে উড়ে গিয়ে সরাসরি গিয়ে পড়লো নাহিয়ানের ওই ব্র্যান্ডের দামী শার্টের ঠিক বুকের মাঝখানে!

​গাড়ির ভেতরে এক সেকেন্ডের জন্য একদম পিনপতন নীরবতা! সবাই হা করে তাকিয়ে রইল।

​নাহিয়ান তো ড্রাইভ করতে করতেই থমকে গেল, তারপর নিজের শার্টের ওই রাজকীয় দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে ভয়ে আর লজ্জায় কাঠ হয়ে গেল। সে একটু বাঁকা হেসে ইতিকে ক্ষেপানোর সুরে বললো, "কী রে ইতি? তুই তো দেখি সর্দির কারখানায় ডিরেক্ট প্রমোশন পেয়ে আস্ত একটা কেমিক্যাল অস্ত্র বানিয়ে ফেলেছিস! তোর এই রাজকীয় ফেনা তো দেখছি আমার এই ইমপোর্ট করা শার্টটাকে নিমেষেই একরঙা দুধ-সাদা বানিয়ে দিল! এখন কি এইটা দিয়ে লুডো খেলবো নাকি ফ্রেমবন্দী করে রাখবো?"

​ইতি তো এক ফোঁটাও ন্যাকা নয়! সে জীবনেও ন্যাকামি সহ্য করে না, কেঁদে বুক ভাসাবে এমন তো দূরের কথা, সে সর্দি দেখে উল্টো নিজেই চরম বিরক্ত হলো। সে একটুও না ঘাবড়ে, চোখের পলকে পকেট থেকে একটা ময়লা টিস্যু বের করে নিজের নাকটা এমন কায়দায় খসখস করে পরিষ্কার করলো যে চারপাশের সবাই হা! এরপর সেই টিস্যুটা দিয়েই নাহিয়ানের শার্টে লেগে থাকা ওই জিনিসটা পরম যত্নে একটুও দয়া না দেখিয়ে একদম বিচ্ছিরিভাবে ঘষে মেজে আরও বেশি করে ওই শার্টের কাপড়ের সাথে চিপকে বসিয়ে দিল!

​দিয়ে একদম ঠান্ডা মাথায় মুখের ওপর শুনিয়ে দিল, "বেশি ফাজলামি করবি না তো! তোর ওই শার্ট তো এমনিতেই ময়লা কাপড়ের ঝুড়ির মতো দেখতে, আমার সর্দি পেয়ে বরং শার্টটার ব্রাইটনেস একটু বাড়লো! ফালতু কথা কম কয়ে গাড়ি চালাও তো দেখি, নইলে তোর নাকের ডগায় আরেকটা রকেট মারবো!"

​ইতির এই চরম লেভেলের ডেঞ্জারাস ও আনন্যাকা রিয়্যাকশন দেখে গাড়ির পেছনের সিট থেকে সমস্বরে সবাই একসঙ্গে চিল্লে উঠলো!

​পূর্ব স্টিয়ারিংয়ে হাত চাপড়াতে চাপড়াতে গাড়িটা ডানে-বামে জিগজ্যাগ কাটাতে কাটাতে হো হো করে হেসে উঠে চিল্লিয়ে বললো, "ও ভাইসাব! দোস্ত নাহিয়ান! তুই জীবনে অনেক মাফিয়া দেখছিস, কিন্তু এমন আস্ত একটা সর্দি বোমা তোর গায়ে ফাটলো যে তুই এক মিনিটে কাদা হয়ে গেলি! ইতির ডিরেক্ট অ্যাটাক দেখে তো আমার নিজেরই গাড়ি সমেত পিত্তি জ্বলে গেছে!"

​রিশা গোবর মাখা জামাটা কোনোমতে সামলিয়ে নাক সিঁটকে ন্যাকা সুরে বললো, "উফ! এরা কেমন অসভ্য রে! আমার তো ড্রেস এমনিতেই গোবরে নষ্ট, আর এরা গাড়ির ভেতরে সর্দির কেমিস্ট্রি ল্যাব খুলে বসেছে!"

​তিথি পেটে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে সিটের ওপর গড়াগড়ি খেতে খেতে বললো, "আপু তোমারে স্যালুট! নাহিয়ান ভাইয়ের ওই ইমপোর্টেড শার্টের বারোটা তো তুমি এক সেকেন্ডেই বাজিয়ে দিলা! ভাইয়া এখন এই শার্ট পিন্ধে কার সামনে গিয়ে পোজ মারবে, বিয়ে বাড়িতে নাকি ছাগলের হাটে?"

​মেরিনা দাঁত কেলিয়ে বললো, "একদম ১০০% খাঁটি কথা! এইডারেই কয় সর্দির ওপর শর্ষের তেল! নাহিয়ান ভাইয়ের মুখটা দেইখ্যা মনে হইতেছে বেচারা আস্ত একটা লেবু চটকে খেয়ে ফেলছে!"

​জান্নাত আর ইভা তো হাসতে হাসতে সিটের নিচে পেটে কিল মারতে শুরু করে দিল, তাদের হাসির চোটে গাড়ির সিটের ফোম পর্যন্ত দেবে গেছে!

​আর নাহিয়ান? নাহিয়ান তখন হাঁ করা মুখে একবার নিজের শার্টের দিকে তাকায়, আর একবার ইতির দিকে তাকায়। তার কুল ব্র্যান্ডের মাফিয়া ভাবসাব এক সেকেন্ডে হাওয়া হয়ে গেছে! সে শুধু হা করে বিড়বিড় করে বললো, "আমি কোন বিপদে পড়লাম রে বাবা! জীবনে কত মেয়ের প্রেমে পড়ার কথা শুনছিলাম, কিন্তু এমন ডেঞ্জারাস সর্দি এক্সপার্ট ইতিকে দেখলে তো আমার নিজেরই গাড়ি থেকে চলন্ত অবস্থায় লাফ দিয়ে পালানোর রাস্তা খুঁজতে ইচ্ছা করতেছে!"

​সবার হাসির রোল আর পূর্বের জাওরা চিল্লানিতে ল্যান্ড ক্রুজার প্রাডো গাড়িটা তখন কাঁপতে কাঁপতে গ্রামের মেঠোপথের দিকে ধেয়ে চললো, আর পেছনের সিট থেকে সবাই মিলে ইতির এই ঐতিহাসিক সর্দি কাণ্ড নিয়ে একের পর এক ফানি কমেন্ট পাস করতেই লাগলো!

------------

নাহিয়ানের ওই কথা শোনার পর ইতি আর এক সেকেন্ডও চুপ রইল না। সে চোখের পলকে নিজের নাকের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে সরাসরি নাহিয়ানের দিকে এক ফালি ডেঞ্জারাস চাহনি দিল। তার সেই গাঢ় বাদামি চোখের গভীরতায় তখন বিরক্তির এমন এক চরম অভিব্যক্তি ফুট উঠল, যা দেখলে আস্ত একটা বাঘের বাচ্চাও লেগু গুটিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য।

​ইতি একটুও থতমত না খেয়ে, এক্কেবারে শান্ত ও বরফশীতল গলায় শুনিয়ে দিল, "চলন্ত গাড়ি থেকে লাফ দেওয়ার শখ থাকলে এখনই দরজা খুলে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারো, আমার কোনো আপত্তি নাই! তবে হ্যাঁ, গাড়ির নিচে পড়ার আগে তোমার ওই ধোলাই ছাড়া শার্টটা কিন্তু আমার সিট থেকে নামিয়ে দিয়ে যেও, নইলে আমার বমি চলে আসবে।"

​ইতির মুখের ওপর এমন নিখুঁত ও চরম মোক্ষম জবাব শুনে পেছনের সিট থেকে পূর্ব স্টিয়ারিংয়ে হাত চাপড়াতে চাপড়াতে এমন এক হেসেই উঠল যে মনে হলো গাড়িটার টায়ার পাংচার হয়ে যাবে! সে হিক তোলা হাসির মাঝে চেঁচিয়ে উঠল, "ও ভাইসাব! দোস্ত নাহিয়ান! তুই এতকাল গ্যাংস্টারগিরি আর মাফিয়া স্টাইলে মেয়েদের পটিয়ে বেড়াস, আর আজ তোর এই দশা! ইতির এক বাক্যের খাস্তা জবালেই তোর সব মাফিয়া গিরি কর্পূরের মতো উবে গেল রে!"

​রিশা তো গোবর মাখা জামা গায়ে জড়িয়েও মুখ না চালিয়ে থাকতে পারল না। সে নাক সিঁটকে ন্যাকা সুরে বলে উঠল, "উফ! আপু তুমি যা করলে না! আমার তো মনে হচ্ছে এই দৃশ্য দেখে আমার গোবর মাখা ড্রেসের দুঃখ নিমেষেই দূর হয়ে গেছে!"

​তিথি তখন পেটে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে সিটের ওপর প্রায় উপুড় হয়ে গেল। সে হেসেই খুন হতে হতে বললো, "আপু একদম ঠিক বলছিস! ভাইয়ার ওই মাফিয়া ভাবসাব আজ একদম মাটির সাথে মিশে গেছে। ভাইয়া, এখন বলো তো, সর্দি খাওয়া এই শার্টটা কি ফ্রেমে বাঁধিয়ে ঘরে টাঙিয়ে রাখবে নাকি আমাদের ছাগলটার গায়ে পরিয়ে দিবা?"

​মেরিনা, জান্নাত আর ইভা তো পেছনের সিটে একে অপরের গায়ে গড়িয়ে পড়ে হাসতে হাসতে এমন কাণ্ড শুরু করল যে গাড়ির ভেতরটা একটা আস্ত সার্কাসের তাঁবু বানিয়ে ফেলল।

​আর নাহিয়ান? সে তখন বেচারা দিশেহারা হয়ে একবার নিজের শার্টের সেই রাজকীয় সর্দির দাগটার দিকে তাকায়, আর একবার ইতির ওই বরফশীতল নির্ভীক মুখের দিকে তাকায়। তার সেই কুল, গম্ভীর আর মাফিয়া স্টাইলের ভাবসাব তখন সুদূর বঙ্গোপসাগরে গিয়ে ডুব দিয়েছে। সে আর কোনো কথা বাড়াল না, কারণ সে ভালোভাবেই বুঝে গেছে—এই মেয়ের সাথে লজিক কিংবা কথা কাটাকাটিতে পেরে ওঠা অসম্ভব এক ব্যাপার। সে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্টিয়ারিংয়ে মনোযোগ দিল, আর মনে মনে ভাবল—কোন বিপদে সে এই সর্দি এক্সপার্ট ডেঞ্জারাস সুন্দরীর প্রেমে বা প্যাঁচে পড়তে গেল!

​গাড়ি তখন সমস্ত হাসাহাসি আর হুলুস্থুল কাণ্ড পেছনে ফেলে সোজা গ্রামের মেঠোপথ ধরে বাড়ির দিকে উড়ে চলল।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 4 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন