ফন্ট সাইজ:
থিম:
নির্বাসিত চোখের কাজলছায়া

পর্ব 6

লেখক: নাজিফা বিনতে নাছির

উপন্যাস : নির্বাসিত চোখের কাজলছায়া
​বিকেলে উঠানে সেই পন্ড-সাইড চেয়ার ভাঙা আর নাহিয়ানের "ডাবল প্যান্ট" কেলেঙ্কারির তুলকালাম কাণ্ড পেরিয়ে তখন রাত বেশ গভীর। বাতাসি বেগমের বাড়ির অন্দরমহলটা শান্ত। ইতির পড়ার টেবিলের ল্যাম্পের আলোটা জ্বলছে, আর সামনে এসএসসির টেস্ট পেপার আর গাইডের বিশাল স্তূপ। বিকেলবেলার ওই পাবলিক বেইজ্জতির ধকল সামলে নাহিয়ান হয়তো এতক্ষণে ঘরে বসে বরফ ঘষছে, আর ইতি সবেমাত্র একটু শান্তি পেয়েছিল।
​ঠিক তখনই ঘরের বাতাসটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। খোলা জানালার গ্রিল ভেদ করে ভেসে এল এক অচেনা, ভারী পুরুষালি সুবাস।
​মাথা তুলেই ইতি দেখল, জানালার অন্ধকার ফ্রেমের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে এক ভয়ংকর সুন্দর পুরুষ—চোখে যার অদ্ভুত, জ্বলজ্বলে এক নীল আলো। এই প্রথমবার সামনাসামনি দেখল ইতি লোকটাকে। বিকেলবেলার চেয়ার ভাঙা আর নাহিয়ানের প্যান্ট ছিঁড়ে ফেলার সব রাগ ও ক্লান্তি যেন এক মুহূর্তে গিয়ে পড়ল এই অদ্ভুত আগন্তুকের ওপর!
​ইতি এক সেকেন্ডও দেরি করল না। কলমটা সশব্দে টেবিলে রেখে সে সোজা দাঁড়িয়ে গেল। তার মুখে এক ইঞ্চিও ভয় নেই; বরং চোখে উপচে পড়ছে চরম বিরক্তি আর খ্যাকখ্যাক মেজাজ। সে কোমরে হাত দিয়ে সোজাসুজি তেড়ে উঠল, "কী ব্যাপার হে! তুমি কে বলো তো? বিকেলবেলাতেই ওই নাহিয়ান নামের বাঁদরটা আমার সাথে ফাজলামি করতে গিয়ে পুকুরপাড়ে আস্ত একটা চেয়ার ভেঙে একদম ডাবল প্যান্ট কেলেঙ্কারি ঘটিয়ে বসল, আর এখন রাতদুপুরে তুমি হঠাৎ জানালার গোড়ায় এসে হাজির হয়েছ কোন সাহসে? কোন গ্রামের কোন খাসির পাড়ার মাস্তান তুমি, শুনি? একটু সাহস থাকলে নিজের আসল পরিচয়টা মুখের ওপর বলে ফেলো তো দেখি!"
​লোকটা একটুও দমে না গিয়ে জানালার গ্রিলের ওপর ঝুঁকে এল। চাঁদের আলো তার সুচালো চোয়ালে পড়ে চকচক করে উঠল। তার সেই শীতল ও ভারী গলায় এক অদ্ভুত আচ্ছন্নতা ঝরে পড়ল—"পরিচয় জানতে চাও? আমার কোনো সাধারণ নাম বা পরিবার নেই, সুনয়না। এই দুনিয়া আমাকে ছায়া বলে চেনে, আর আন্ডারওয়ার্ল্ড জানে আমি কে... মানুষ আমাকে ভেনম ডাইনাস্ট্রি (Venom Dynasty)-র সুপ্রিম কমান্ড হিসেবে ভয় পায়, কেউ বলে ব্লু ভেনম (Blue Venom), আবার কেউ হাড় হিম করা ভয়ে ডাকে কোবাল্ট সার্পেন্ট (Cobalt Serpent)।"
​"থামো! থামো থামো!" ইতি হাত তুলে তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে কটূ গলায় বলে বসল, "আরে ভাই, তোমার এই ব্লু ভেনম আর কোবাল্ট সার্পেন্টের ডায়লগ শুনে তো আমার উগান্ডা থেকে ঘুরে আসতে বড্ড ইচ্ছে করছে। বিকেলবেলা উঠানে যে গুতোগুতি আর কাণ্ড হলো, তার ওপর তোমার এই ফিলোসফি শুনলে মাথা আস্ত ঘুরে যাবে। তোর ভালোবাসাবাসির এই ফালতু কথা পরীক্ষার খাতায় লিখলে জিরো দিয়ে খাতা ছিঁড়ে ফেলে দিবে! প্রমাণ ছাড়া যেমন ম্যাথ মিলে না, তেমনি তোর এই মাফিগিরিও আমি এক পয়সাও বিশ্বাস করি না!"
​লোকটা মৃদু হেসে খুব শান্ত গলায় বলল, "ভালোবাসা কখনো খাতা-কলমের হিসেব নয়, সুনয়না। বিকেলবেলা কে চেয়ার ভাঙল বা কে ডাবল প্যান্ট পরে লজিক হারিয়ে ফেলল, তাতে আমার কিছু যায় আসে না,কিন্তু তুমি যে ব্যাথা পেলে তা আমি সহ্য করতে পারিনি, তাই তো ছুটে এসেছি।জানো?! যখনই তোমার ওই কাজলছায়া চোখের দিকে তাকাই, মনে হয় আমার এই বরফ জমে যাওয়া নিষ্ঠুর দুনিয়াটাও আলোয় ভরে যায়। তুমি আমার সেই তীব্রানী, আমার স্বর্ণলতা, যাকে এই হৃদয়ের গভীরে বন্দি করে রেখে আমার বন্য সুইটবার্ড বানাতে ইচ্ছে করে।"
​ইতির কান পর্যন্ত গরম হয়ে উঠল। সে দাঁত কিড়মিড় করে চেঁচিয়ে উঠল, "খবরদার! ওই ফালতু কাব্যিক নামগুলো আবার মুখে এনেছিস তো এই টিউবওয়েলের হ্যান্ডেল দিয়ে তোর পাছা ফাটাইয়া দিবো আর নয়তো তোর ওই নীল চোখ দুটো এপিঠ-ওপিঠ করে সালাদ বানিয়ে দেবো! মুখে মুখে আস্ত আন্ডারওয়ার্ল্ড তো ভালোই মুখস্ত করেছিস আর কাজের বেলায় জিরো! এতই যদি ভেনম ডাইনাস্ট্রির সুপ্রিম লিডার হোস, তো প্রমাণ দে দেখি!শালা!আমাকে কি তোর বেক্কল মনে হয় রে যে তোর এই বালের ডায়লগ শুনে তোর এসব থিওরি বিশ্বাস করবো?"
​ইতির এই চরম টিটকারি আর চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েও লোকটার ঠোঁটের কোণে একটা থমথমে ও ভয়ংকর হাসি ঝুলে রইল। সে খুব আস্তে করে ফিসফিস করে বলল, "প্রমাণ যদি দেখতেই চাও, সুনয়না... খুব শীঘ্রই এই গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে পুরো দেশের মাটি কাঁপিয়ে সেই প্রমাণ আমি তোমার চোখের সামনে এনে দাঁড় করাবো। তখন বুঝবে এই ব্লু ভেনম ঠিক কতদূর যেতে পারে।"
​ঠিক সেই মুহূর্তেই—উঠানের ওপাশ থেকে বিকট আওয়াজে গ্রামের একটা দেশি কুত্তা ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে এল, আর সাথেসাথেই অন্ধকারে কার যেন টর্চের ফ্লাশলাইটের আলো জানালার দিকে এস পড়ল! নাহিয়ানের গলা শোনা গেল, "কে রে ওই জানালার নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাতদুপুরে বকবক করছিস? চোর নাকি নাটকের দল?"
​মাফিয়ার সেই গম্ভীর ভাবসাব এক সেকেন্ডে মাটি হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো! কুকুরটা তাকে দেখে তেড়ে আসতে গেলো সে এক পলক ইতির দিকে তাকিয়ে বরফঠান্ডা গলায় বিড়বিড় করে বলে উঠল, "মনে রেখো, আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। খুব শীঘ্রই আসছি তোমায় পুরোপুরি আমার করে নিতে।"
​বলেই সে রাতের অন্ধকারের সাথে এমনভাবে মিশে গেল, যেন সেখানে কেউ ছিলই না।
​ইতি জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে খিকখিক করে হেসে উঠল এবং বিড়বিড় করে বলল, "পাগল একটা! আস্ত একটা সাইকোপ্যাথ জুটছে কপালে!"—বলেই সে আবার টেস্ট পেপারে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু মনের কোণে সেই অদ্ভুত লোকটার প্রথম দেখা আর তার ওই খতরনাক নামের রেশটা ঠিকই রয়ে গেল।

------★★★★-----

​পরের দিন সকালবেলা। বাতাসি বেগমের বাড়ির উঠানটা তখনো বিকেলবেলার সেই পন্ড-সাইড চেয়ার ভাঙা আর "ডাবল প্যান্ট" কেলেঙ্কারির রেশ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। গ্রামের চিরচেনা রোদের মধ্যে নাহিয়ান এসে হাজির হলো একদম গোমড়ামুখো এক ভঙ্গি নিয়ে। তার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত সন্দেহ আর চুলকানি ভাব—গত রাতে ইতির জানালার নিচ থেকে ভেসে আসা সেই ভারী পুরুষালি গলা আর ফিসফিসানি তার মনের ভেতর খচখচ করে কাটছে।
​নাহিয়ান দুই হাত কোমরে গুঁজে, অত্যন্ত গম্ভীর ও বাঁকা গলায় ইতির সামনে এসে দাঁড়াল। সে একটু বাঁকা হেসে কড়া গলায় বলে উঠল, "কিরে ইতি? ব্যাপার কী বল তো? আজকাল রাতদুপুরে তোর ঘরের জানালার নিচে কানাঘুষা কার কণ্ঠ শোনা যায় শুনি? তুই কি ইদানীং পড়াশোনা বাদ দিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে কোনো রোমান্টিক সিনক্রিয়েট করছিস নাকি রে? সারাদিন টেস্ট পেপারের বয়লার গিলে রাতে আবার কার সাথে প্রেম করতে নামলি?"
​ইতি তখন বারান্দার মোড়ায় বসে এসএসসির কেমিস্ট্রি বইয়ের পাতায় মনোযোগ দেওয়ার ভান করছিল। নাহিয়ানের এই আজেবাজে সন্দেহ আর গায়ে পড়ে তেরছা কথা শুনে সে এক সেকেন্ডের জন্যও ঘাবড়াল না। উল্টো তার বরফশীতল ও ধারালো চোখ দুটো নাহিয়ানের ওপর বুলিয়ে এক চিল্লে ভেংচি কেটে বলে উঠল, "প্রেম? তোমার মতো প্যান্ট ছিঁড়ে পুকুরপাড়ে আস্ত একটা চেয়ারের সাথে ধ্রুপদী নৃত্য করার সৌভাগ্য তো আমার হয়নি যে মাঝরাতে এসে জানালার নিচে কেউ বিরহের গান গাইবে! যত্তসব ফালতু সন্দেহ! সারাদিন তোদের এই ডাবল প্যান্টের সার্কাস সামলাতে সামলাতে আমার টেস্ট পেপারের মাথা আস্ত বিগড়ে গেছে। ফাইজলামি বাদ দিয়ে নিজের পড়ার দিকে মন দাও তো মিস্টার!"
​নাহিয়ান দাঁত কিড়মিড় করে বলল, "আমাকে জ্ঞান দিবি না! পড়াশোনা করিস তো ভালো কথা, মুখে তো সারাক্ষণ শুধু পড়াশোনা আর লজিক শুনি। এতই যদি ব্রিলিয়ান্ট হোস, তা তোকে একটা জেনারেল নলেজ বা সাইন্সের কঠিন প্রশ্ন ধরি দেখি তোর লজিক কতদূর দৌড়ায়!"
​সে একটু থেমে তাচ্ছিল্যের সুরে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, "আচ্ছা বল তো, এই যে আমাদের ঘরের কোণের ফ্রিজ বা হোম অ্যাপ্লায়েন্সের বিখ্যাত ব্র্যান্ড 'ওয়ালটন' (Walton)—এই নামটার উৎপত্তি বা উৎপত্তিগত ইতিহাসটা কীভাবে হলো? দেখি তোর টেস্ট পেপারের জ্ঞানের বহর!"
​ইতি একটুও খাইল না। সে কেমিস্ট্রি বইটা ঠায় বন্ধ করে একটা দার্শনিক বা বৈজ্ঞানিক ভাব ধরে গম্ভীর গলায় বলতে শুরু করল, "আহা! ওয়ালটনের উৎপত্তি জানিস না? এটা তো একদম বেসিক লজিক্যাল ফিজিক্স আর বিবর্তনের ইতিহাস! শোন তবে কান খুলে—"
​১. নিউটন (Newton): আজ থেকে বহু বছর আগে বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন আপেল গাছের নিচে বসে একটা আপেল মাথার ওপর পড়ার পর মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কার করলেন। সেই থেকে ফিজিক্সের দুনিয়ায় শুরু হলো "টন" (Ton) শব্দের রাজত্ব।
​২. ওয়াশিংটন (Washington): নিউটনের সেই বিখ্যাত আবিষ্কারের সূত্র ধরে আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন যখন প্রথম নদী পার হচ্ছিলেন, তখন তার মাথায় হঠাৎ বুদ্ধি এল—বিজ্ঞানের সাথে আমেরিকার রাজনীতি মিশিয়ে একটা ব্র্যান্ডের নাম দেওয়া দরকার। সেখান থেকেই আসল "ওয়াশিংটন"!
​৩. টনটন (Tonton): ওয়াশিংটনের সেই রাজনৈতিক চিন্তাধারা যখন সুদূর বাংলায় এসে পৌঁছাল, তখন গ্রামের মুরুব্বিরা টেনশনে পড়ে মাথার চুল ছিঁড়তে লাগলেন। টেনশন করতে করতে সবার মুখ দিয়েই খসে পড়ল ডাবল "টনটন" শব্দটা!
​৪. রিংটন (Rington): এরপরে যখন বিবর্তনের হাত ধরে মফস্বলে প্রথম নোকিয়া ফোন এল, আর তাতে টুংটাং করে গান বাজতে শুরু করল, তখন মানুষ বুঝল যে শব্দ ছাড়া টেকনোলজি অচল। সেখান থেকেই চলে এল "রিংটন"!
​৫. ওয়ালটন (Walton): আর সবশেষে—এই সমস্ত বিজ্ঞানী, প্রেসিডেন্ট, টেনশন আর ফোনের রিংটোন একসাথে ব্লেন্ডার মেশিনে মিক্স করে যখন দেয়ালে সেঁটে দেওয়া হলো, তখন আবিষ্কৃত হলো নিখাদ দেশীয় ব্র্যান্ড—'ওয়ালটন'!
তাহলে লজিকটা কি দাড়ালো?
নিউটন‌‌>ওয়াশিংটন>টনটন>রিংটন>ওয়ালটন"

​ইতি একদম সিরিয়াস মুখে এমন এক আজব ও ফানি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দাঁড় করাল যে শুনে নাহিয়ানের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! সে দুই কানে আঙুল দিয়ে কিছুক্ষণ শূন্যে তাকিয়ে থেকে চেঁচিয়ে উঠল, "থাম! থাম বলছি! তোর এই ফালতু নিউটন-ওয়াশিংটন মার্কা স্ট্রেন্জ বানোয়াট সাইন্টিফিক প্যাঁচাল শুনলে আমার মাথার ভেতরের নাটবল্টুগুলো সব ঢিলে হয়ে খসে পড়বে! তুই হলি নিউটনের নাতনি আস্ত একটা 'বালটোন'! কত্তো বড় ব্রিলিয়ান্ট তুই রে বাবা!"

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 6 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন