উপন্যাস : নির্বাসিত চোখের কাজলছায়া
সকাল ৮টার দিকে গ্রামের আকাশটা কেমন যেন মেঘলা হয়ে আসছিল। বাতাসি বেগমের বাড়ির উঠানে তখনো গত রাতের সেই জানালার কানাঘুষা আর সকালের নিউটন-ওয়ালটন মার্কা লজিক্যাল তর্কের গরম হাওয়া উড়ছিল। দাদি বাতাসি বেগম পরনের সুতির শাড়িটা কোমরে শক্ত করে পেঁচিয়ে, এক হাতে ছয় ফুট লম্বা এক শলার ঝাড়ু বাগিয়ে ধরে তেজোদীপ্ত ভঙ্গিতে উঠান ঝাড়ু দিচ্ছিলেন। মুখে তাঁর অনবরত তসবির মতো গালমন্দের জপ—
"আইনাল্লাহ! এই গেরামের মানুশগুলার আক্কেলগুড়ুম অইয়া গ্যাছে! রাইতদুপুরে জানালার তলে আইয়া হুসফুসায়, আর মোর পোড়ারমুখী নাতনিডা টেস্ট পেপার থুইয়া অগো লগে লজিক ফলায়! খাড়া, আইজকা ঝাড়ু দিয়া সব ভুত ছাড়াইয়ামু!"
ঠিক তখনই—হঠাৎ যেন সিদলাই গ্রামের শান্ত বুক চিরে এক প্রলয়ংকরী সুনামি নেমে এল!
দূর মেঠোপথের শুকনো ধুলোবালি শূন্যে উড়িয়ে, বিকট ইঞ্জিনের গর্জনে প্রকম্পিত হয়ে উঠল পুরো এলাকা। একের পর এক কুচকুচে কালো বিলাসবহুল লিমোজিন ও প্রাডো কারের দীর্ঘ কনভয় এসে ঢুকল গ্রামের সরু গলিতে। গাড়িগুলোর কাচ এত ঘুটঘুটে কালো যে ভেতরটা বোঝার উপায় নেই। গাড়ির বহরের দুপাশে আর পেছনে সারিবদ্ধভাবে ছুটছে অন্তত দুই-তিনশো ব্লেজার পরা, শক্তপোক্ত চেহারার সশস্ত্র দেহরক্ষী।
মুহূর্তের মধ্যে পুরো গ্রামের আকাশ-বাতাস যেন এক হিমশীতল আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে গেল! আশপাশের ঘরের কপাট সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল, আর পাড়ার লোকাল মুরুব্বিরা বাঁশঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল।
কনভয়টি সোজা এসে বাতাসি বেগমের মাটির উঠানের মুখ ঘেষে বিকট ব্রেক কষে থামল। পেছনের সবচেয়ে দামি মার্সিডিজটির দরজা সশব্দে খুলে গেল। একে একে নেমে এল অন্তত পঞ্চাশ জন ভারী সুটপরা আন্তর্জাতিক সিকিউরিটি কমান্ডো। আর তাদের সুবিন্যস্ত পাহারার মাঝখান থেকে ধীর ও রাজকীয় পদক্ষেপে নেমে এল সেই ভয়ংকর সুন্দর মানব—আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র অধিপতি, "দ্য পাইথন"!
তার পরনে ধূলিহীন কালো ওভারকোট, সুচালো চোয়াল আর চোখের গহীনে সেই রহস্যময় জ্বলজ্বলে নীল আলো।
দাদি বাতাসি বেগম তো বটেই, দাদা হাবিব, চাচা-চাচি, তাসকিয়া বেগম, সুমাইয়া বেগম—এমনকি উঠানের মোড়ায় থাকা নাহিয়ান আর তিথিও থমকে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে গেল।
দাদি বাতাসি বেগম দুই চোখ কপালে তুলে, এক চুলও না পিছিয়ে, শলার ঝাড়ুটা উঁচিয়ে একদম উঠানের মাঝখানে এসে দাঁড়াইয়া চিৎকার করে উঠলেন, "আরে হাগ্নাকালের দল! এইডা কার জামাইর রাজত্ব পাইছিস তোরা? মোর মাটির উঠানে কালা গাড়ি তোলার পারমিশন কোনে পালি রে? বেরোও সব কইয়া দিলাম! নোয়ালি হোগার চামড়া তুল্যা লামামু!"
মাফিয়ার দুই বিশালদেহী ফরেন সিকিউরিটি কমান্ডো দাদিকে সরাতে এক পা এগিয়ে আসতেই ঘটল অঘটন! দাদি আর রাগ সামলাতে পারলেন না। তিনি হাতের সেই শলার ঝাড়ুটা শূন্যে ঘুরিয়ে সজোরে গার্ড দুটোর পায়ের নলে কড়া দুটি বারি বসিয়ে দিলেন!
"প্যালাক! প্যালাক!"
ঝাড়ুর রসে ভরা সোজা বাড়ি খেয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই দুর্ধর্ষ কমান্ডো দুজন এমন এক বিকট চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে উঠল, যেন ট্রাম্পোলাইনের ওপর স্প্রিং লেগেছে!
দাদা হাবিব লাঠি ঠুকে এক পা এগিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, "আক্ক্কেল গুড়ুম ব্যাপার স্যাপার! কি রে বাপু, তোরা কি সিভিল সার্জন নাকি ডাকাতের দল? মোদের বাড়ির কূল-মান সব এক রাতে ভাসাইয়া দেবা নাকি?"
এত হৈচৈ আর হট্টগোলের মধ্যেও ব্লু ভেনম নিজের গার্ডদের ওপর একবার নজরও দিল না। তার বরফশীতল আর দীর্ঘ পদক্ষেপ এগিয়ে গেল সোজা উঠানের কোণে টেস্ট পেপার হাতে থমকে দাঁড়িয়ে থাকা ইতির দিকে। হাজার মানুষের আতঙ্ক, দাদির ঝাড়ুর বাড়ি, পরিবারের সবার হাঁ হাঁ রব—কোনো কিছুই যেন তার জগতে বিদ্যমান নেই।
সে ইতির থেকে মাত্র দু-এক ইঞ্চি দূরত্বে এসে থামল। তার গম্ভীর, ভারী ও গভীর কণ্ঠস্বর যখন উঠানের বাতাসে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করল, তখন যেন চারপাশের পাখিদের কোলাহলও থেমে গেল। সে পরম আকুলতায় ইতির দিকে তাকিয়ে পরিষ্কার বাংলায় বললেও, ভালোবাসার তীব্রতা বোঝাতে মাঝখানে নিখুঁত শব্দমালা আর অল্প কিছু ইংরেজি জুড়ে দিয়ে কাব্যিক ভঙ্গিতে বলতে শুরু করল—
"তুমি ভেবেছিলে আমি রাতের অন্ধকারের কোনো অলীক গল্প, সুনয়না? ভেবেছিলে জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এই লোকটার গভীর আবেগগুলো তোমার ওই টেস্ট পেপারের কোনো সহজ লজিক দিয়ে উড়িয়ে দেবে? আন্ডারওয়ার্ল্ডের রাজত্বে হাজারটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাঝেও আমি কেবল একটা আলোর সন্ধান করেছি... আর সেই আলোটা জ্বলছে তোমার ওই কাজলটানা বিদ্রোহী চোখে। You think this is madness, Sunayana? But my whole world begins and ends with you."
ইতির বুকটা অদ্ভুত এক স্পন্দনে কেঁপে উঠলেও সে দাঁতে দাঁত চেপে নিজের বরফশীতল ভাব ধরে রাখল। সে সোজা মাফিয়াটার জ্বলজ্বলে নীল চোখের দিকে তাকিয়ে চাঁচাছোলা গলায় বলে উঠল, "নাটক বন্ধ করুন মিস্টার ব্লু ভেনম! গ্রাম জুড়ে তিনশো লোক আর কালা গাড়ির সার্কাস দেখালেই কি একটা মানুষের মানসিক স্যানিটি প্রমাণ হয়? আপনার আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিষাক্ত ক্ষমতা দিয়ে পুরো দেশ কাপাতে পারেন, কিন্তু আমার এই মাটির উঠানে দাঁড়িয়ে এই ফালতু আবেগের ওভারডোজিং আমার ওপর কাজ করবে না। Just stop this cheap melodrama and get out!"
মাফিয়াটার ঠোঁটে একটা বিষাদময় অথচ গভীর ভালোবাসার হাসি ফুটে উঠল। সে হাতটা হালকা বাড়িয়ে ইতির খুব কাছে এনে ব্যাকুল গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল, "Cheap melodrama? আমার এই পাথুরে হৃদয়ে হাজার বছর ধরে জমে থাকা বরফ গলিয়ে তুমি যে আগুন জ্বালিয়েছ, তাকে তুমি অবহেলা করতে পারো, আমার স্বর্ণলতা। কিন্তু এই ব্লু ভেনম কোনোদিন হাল ছাড়তে শেখে নাই। আমার এই ক্ষমতা, এই রক্তক্ষয়ী সাম্রাজ্য, জীবনের সমস্ত দাপট—সবকিছু একদম ধূলিসাৎ হয়ে যাবে যদি এই বুকে তোমার অধিকার না থাকে। Don't push me away, Zedi Moni... don't force me to burn everything down just to prove how much I love you."
ইতি এবার পুরোপুরি রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল। সে কোনো রকম রাখঢাক না রেখে, স্পষ্ট ও নির্মম ভাষায় মাফিয়াটার মুখের ওপর কটূ আক্রমণ ছুড়ে দিল—
"শুনুন জনাব সাইকোপ্যাথ মাফিয়া! আপনার ওই ভেনম ডাইনাস্ট্রি আর হাজার কোটির সাম্রাজ্য দিয়ে আমি এক কাপ চাও কিনব না! নিজেকে অন্ধকারের ভগবান মনে হতে পারে আপনার, কিন্তু আমার চোখে আপনি স্রেফ একটা সীমানাহীন অবসেসড লোক, যে একটা সাধারণ মেয়ের পড়ার টেবিলে এসে বিরক্ত করছে! আপনার এই জোর করে ভালোবাসা চাপিয়ে দেওয়ার শখকে আমি ঘৃণা করি। আপনার ক্ষমতা আর মিষ্টি কথার ওপর আমার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই। দয়া করে নিজের ধূলিমলিন চেহারা নিয়ে এখান থেকে সটকে পড়ুন, নাহলে সত্যি সত্যি এবার পুলিশ আর গ্রামের সবাইকে নিয়ে আপনার এই বহর গণধোলাই খাওয়াব!"
মাফিয়াটার নীল চোখ দুটো থমকে গেল। ক্ষণিকের জন্য তার সুচালো চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, যেন ভেতরের কোনো চরম যন্ত্রণা সে চেপে গেল। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইতির প্রতিটা অক্ষরের আঘাত সয়ে নিয়ে মৃদু গলায় বলল, "প্রত্যাখ্যান করার অধিকার তোমার আছে, সুনয়না... কিন্তু ভালোবাসার এই অধিকার কাড়ার সাধ্য এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কারও নেই। Remember this, I will return... and I will make you mine."
বলেই সে ধীর পায়ে পেছনে ফিরে গাড়ির দিকে হেঁটে গেল। তার একটা মাত্র আঙুলের সংকেতে শত শত সশস্ত্র গার্ড রাজকীয় ভঙ্গিতে প্রাডো আর লিমোজিনে গিয়ে বসল। মুহূর্তের মধ্যে ইঞ্জিনের গর্জনে গ্রামের মেঠোপথ ধুলোয় ঢেকে দিয়ে বহরটি অদৃশ্য হয়ে গেল।
কিন্তু গাড়ির বহর চলে গেলেও সিদলাই গ্রামে রেখে গেল এক মহাপ্রলয়ের পূর্বাভাস!
চাচা-চাচি ভয়ে হাত-পা কাঁপাতে কাঁপাতে ঘরে ঢুকে দরজায় খিল আঁটলেন। নাহিয়ান হাঁ করে তাকিয়ে থেকে তোতলাতে তোতলাতে বলল, "ইতি... ও... ওরে বাবা! লোকটার চোখ দুটো তো নীল ছিল রে! আর গার্ডগুলো কী বিশাল বিশাল! তোর প্রেমে কি আস্ত কোনো ইন্টারন্যাশনাল মাফিয়া পড়েছে নাকি রে?"
দাদা হাবিব লাঠি উঁচিয়ে গমগমে গলায় বলে উঠলেন, "আক্ক্কেল গুড়ুম কাণ্ড! মোর সোনার মফস্বলে এইডা কোন কেয়ামতের লক্ষণ রে বাপু! কালকেই মোদের মেম্বার-চেয়ারম্যান ডাইকা জরুরি বিচার বসাইতে অইব! পোড়ারমুখী নাতনি মোর কোন বিপদ ঢাইকা আনল!"
দাদি বাতাসি বেগম হাতের ঝাড়ুটা সশব্দে মাটিতে আছাড় দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, "কিসের বিচার রে বুড়া? ওই নীল চোখের ছাওড়া তো মোর নাতনিরে একবারে মন্ত্র পইড়া গ্যাছে! অহন তো সারা গেরামে তোলপাড় লাইগা যাইব!"
ইতি তখনো হাত দুটো শক্ত করে ধরে স্থির হয়ে উঠানে দাঁড়িয়ে রইল। তার কান দুটো গরম হয়ে উঠছিল, আর মনের কোনো এক গহীন কোণে সেই মাফিয়াটার আকুল ব্যাকুল কন্ঠের আত্মপক্ষ সমর্থন আর থমথমে ভালোবাসার বাণীটা বারবার প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করতে লাগল।
★★★★★★
দুপুর গড়াতেই সিদলাই গ্রামের আবহাওয়ায় যে বরফশীতল ও ভুতুড়ে নীরবতা নেমে এল, তা কোনো সাধারণ নিস্তব্ধতা ছিল না; এ ছিল সাক্ষাৎ এক চরম আতঙ্কের হিমশীতল চাদর। গতকাল সকালের ওই রাজকীয় লিমোজিন বহরের তান্ডব, দাদির ঝাড়ুর বাড়ি আর মাফিয়ার বেপরোয়া প্রেম নিবেদনের পর আজ বিকেলবেলা ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে বা মোড়ের কদমগাছের তলায় এক বিশাল শালিশ বসার কথা ছিল। এলাকার বাঘা বাঘা মাতবর, মেম্বার আর সালিশি বোর্ডের কর্তাব্যক্তিরা সকাল থেকেই গলাখাঁকানি দিয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে সাথেই পুরো গ্রামে এমন এক অলৌকিক ও থমথমে পিনপতন নীরবতা ছড়িয়ে পড়ল যে কুত্তাগুলোর পর্যন্ত টুঁ শব্দ করার সাহস রইল না! মোড়ের চায়ের দোকানগুলো ফাঁকা, মুরুব্বিরা সব ঘরের ভেতর কপাট সাঁটিয়ে এমনভাবে সেঁধিয়ে গেছেন যেন যমদূত দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে। কারো মুখে রা নেই, বিন্দুমাত্র ফিসফিসানিও নেই—যেন গতকালের সেই মহাকান্ড পৃথিবীর বুক থেকে অলৌকিকভাবে মুছে গেছে।
বাতাসি বেগমের বাড়ির অন্দরমহল এবং মাটির উঠানে তখন এক চরম অস্বস্তিকর থমথমে ভাব। দাদা হাবিব চৌধুরী বারান্দার মোড়ায় বসে নিজের রূপার নলের হুক্কাটা এক টানে প্রায় শেষ করে ফেললেন। জমিদারী আমলের মেজাজ আর গ্রামের সাবেক সরদার হিসেবে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতা বলছে—এই অস্বাভাবিক নীরবতা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; এর পেছনে ভয়াবহ কোনো গভীর ষড়যন্ত্র বা অজানা শক্তির কালো হাত কাজ করছে।
গ্রামের প্রভাবশালী সরদার হিসেবে হাবিব চৌধুরী নিজের ইগো আর ইজ্জত বিসর্জন দিতে নারাজ। তিনি আর ঘরে বসে থাকতে না পেরে নিজের বিশ্বস্ত দুই লাঠিয়াল ও গোপন ইনফর্মারদের ডেকে কড়া গলায় হুকুম দিলেন, "যা করis করবি, এই মূহূর্তে গিয়া খোঁজ নিয়া আয়। কোন হালায় মোগো বাড়ির সামনে এতবড় কান্ড ঘটানোর পরও হগলের জিভের তালু শুকায়ে ফালাইল? কোন শয়তানের বাচ্চা এই মুখ বন্ধ করাইলো রে?"
সন্ধ্যা নামার আগেই সেই ইনফর্মাররা ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে এসে যা জানাল, তা শুনে দাদা হাবিবের হাত থেকে হুক্কার নলটা ফসকে সশব্দে মাটিতে পড়ে গেল!
খবরটা কেবল রোমহর্ষক নয়, রীতিমতো মেরুদণ্ড হিম করে দেওয়ার মতো। গত রাতে মাফিয়াটার বিশেষ স্কোয়াড—'ভাইলর' আর 'শ্যাডো'-র লোকাল ক্যাডাররা গ্রামের প্রতিটি মোড়ের মাতবর, সালিশি বোর্ডের মাথা এবং প্রভাবশালী মোড়লদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে একেবারে নিঃশব্দে এক শীতল বার্তা দিয়ে এসেছে। কোনো বিশৃঙ্খলা বা কোন্দল নয়, সোজা টেবিলে একটা করে জীবন্ত কার্তুজ আর রক্তমাখা কালো খাম ফেলে অত্যন্ত শান্ত ও বরফঠান্ডা গলায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—“সিদলাই গ্রামের সীমানায় যদি এই ঘটনা বা ইতিকে নিয়ে বিন্দুমাত্র ফিসফিসানি বা শালিশ ডাকার ধৃষ্টতা কেউ দেখায়, তবে আগামী সূর্য ওঠার আগেই তার পুরো বংশের নামের সাথে এই ভিটেমাটি চিরকালের মতো মুছে যাবে। কার কত রক্তে জোর আছে, কাল সকালে সালিশে এসে মেপে জেসে নিয়েন।”
সরাসরি প্রাণের হুমকি আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র ক্ষমতার কাছে মুহূর্তের মধ্যে গ্রামের বাঘা বাঘা মাতবরদের সিংহপুরুষ ভাব বরফের মতো গলে পচে জল হয়ে গেছে! কার ঘাড় কটা কয়টা যে এই জল্লাদদের সাথে লড়বে? মাফিয়াটা এক ফুঁয়ে সিদলাই গ্রামের সমস্ত বিচারব্যবস্থা, সালিশি হুমকি আর মাতব্বরি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে—শুধু একটাই কারণে, ইতি বা ইতির পরিবারকে যেন আইনগত বা সামাজিকভাবে কোনো রকম আঁচড় বা ঝামেলার মুখোমুখি হতে না হয়। সে তার অদৃশ্য সাম্রাজ্যের কালো ছায়া দিয়ে ইতিকে এমন এক নিখুঁত সুরক্ষা বলয়ে মুড়ে দিয়েছে, যে বৃত্ত ভেদ করে বাইরের কেউ ছুঁতে তো দূরের কথা, কুৎসিত দৃষ্টিতে তাকানোরও সাহস পাবে না।
খবরটা শোনার পর উঠানে নেমে এল পিনপতন নীরবতা। চাচা-চাচি ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে ঘরের দরজায় ডাবল খিল এঁটে দিলেন। নাহিয়ান গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে ঢোক গিলতে গিলতে ফিসফিস করে বলে উঠল, "ওরে বাপ রে বাপ! এ তো আস্ত একটা সাইকোপ্যাথ ডিক্টেটর! আস্ত একটা গ্রামের বাঘা বাঘা মাতবরদের কুর্নিশ করাতে বাধ্য করল! এই লোক যদি একবার আমার সামনে পড়ে, আমার প্যান্ট এমনিতেই ভয়ে খুলে পড়ে যাবে!"
ঠিক তখনই বরফশীতল নীরবতা চিরে গর্জে উঠলেন দাদি বাতাসি বেগম। তিনি নিজের পরনের শাড়ির আঁচলটা কোমরে আরও শক্ত করে কষে বেঁধে, হাতে সেই ছয় ফুট লম্বা শলার ঝাড়ুটা নিয়ে সোজা উঠানের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর দুই চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। তিনি আঞ্চলিক বরিশাইল্যা ভাষায় বাপান্ত করে চেঁচিয়ে উঠলেন—
"হায় আল্লাহ গো! এই মাগিবিরার দল সব ডরপোকের বাচ্চা! হগলের কি গোয়াডা ফাইট্টা চৌচির অইয়া গ্যাছে নাকি রে? মোর পোড়ারমুখী নাতনির পিছনে ওই নীল চোখের শয়তানডা আইয়া আস্ত গেরামডা বন্দি কইরা ফালাইল, আর তোরা সব ভেড়ার পালের মতো গোয়ালে গিয়া হাইন্দ্লি! হালায় হগলে মরার ডরে জিভ গিল্যা ফালাইছে! মোরে একটু সামনে পাইলে ওই নীলছাওড়ার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার কইয়া চোদ্দো ভূবন ঘুরাইয়া আনতাম! এ তো কোনো আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাফিয়া না, এ তো সাক্ষাৎ যমদূত! মোর নাতনিটারে পাইয়া আস্ত দেশের বারোটা বাজাইয়া দিব এইডা!"
দাদা হাবিব লাঠি দিয়ে মাটিতে সজোরে বাড়ি দিয়ে রাগে থরথর করতে করতে বললেন, "আক্ক্কেল গুড়ুম কান্ড রে বাপু! মোর ইজ্জত আর ক্ষমতা এইডাই কি দেখানের দিন আছিল? ওই হারজাদা মাফিয়াডা আস্ত একটা এলাকার বিচারব্যবস্তা পকেটে পুর্যা বইয়া রইছে! মোরে সুদ্ধা পাত্তা দিল না! এইডা কেমুন পিরিত রে!"
ইতি তখন নিজের পড়ার টেবিলের সামনে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার সামনে খোলা পড়ে থাকা টেস্ট পেপারের সাদা পাতাগুলো যেন ঝাপসা হয়ে আসছে। তার ভেতরের বরফশীতল রক্ষণপ্রওয়ালটা এই চরম নিষ্ঠুর, একচ্ছত্র ও ভয়ংকর পজিসিভ ক্ষমতার হুংকারে প্রথমবার মড়মড় করে কেঁপে উঠল। সে হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারল—এই লোকটা শুধু মুখে কাব্যিক ডায়লগ বা ফাঁকা হুমকি দেয় না; সে আস্ত একটা সাম্রাজ্য পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারে কেবল তার এক পলক চোখের ইশারার দাম শোধ করতে!