ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমিই আমার হৃদয়হরণী

১ম পর্ব

লেখক: আশু

ভার্সিটির লেকচারার হিসেবে নিজের ভাইয়ের বন্ধুকে দেখে ভয়ে কেঁপে উঠল ইমা। এ কেমন বিচার, যার থেকে পালাই পালাই করে জীবন পারি দিচ্ছে, সে যেন আরও তার জীবনের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে।

এইতো মাসখানেক আগের কথা। বিয়ের জন্য যখন আরিমান সিকদারের পরিবার ইমাদের বাসায় প্রস্তাব জানালো সবাই রাজি। তবে ব্যাঘাত ঘটলো ইমার বেলায়। সে রাজি নয়। তার কারণ বলতে আরিমান সিকদার অনেক স্ট্রিক আর খিটখিটে মেজাজের। তার সাথে বিয়ে হলে স্নেহা শেষ হয়ে যাবে, সে জীবনে কোনো আনন্দ করতে পারবে না।

তখনই ক্লাসে আরিমান ডাস্টারটা হাতে নিয়ে শান্ত গলায় বলল, "গুড মর্নিং এভরিওয়ান। আমি আরিমান সিকদার। এই সেমিস্টারে আপনাদের 'সেল বায়োলজি'র লেকচারার হিসেবে থাকছি।"

আরিমানের কণ্ঠস্বর শুনেই ইমার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠল। এরপর

রোল নাম্বার টোয়েন্টি থ্রি... ইমা রহমান?"

আরিমানের গম্ভীর ডাক শুনে ইমা বাস্তবে ফিরে এল। পুরো ক্লাসের চোখ এখন ইমার দিকে। ইমা কোনোমতে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল, "ইয়েস স্যার..."

আরিমান চশমার ওপর দিয়ে ইমার দিকে তাকালো, সে যেন আগে থেকেই জানত ইমা এই ক্লাসেইই আছে। আরিমান ডেস্কে বসে লেকচার দেওয়ার মাঝেও যাতবার ইমার দিকে চোখ যাচ্ছিল ততবার তার মনে পড়ছিল ইমা ওকে না করে দিয়েছে! ও নাকি বড্ড খিটখিটে!

আরিমান লেকচার দেওয়ার সময় খেয়াল করলো ইমা বেখেয়ালি কিসব আঁকিবুঁকি করছেতার খাতায়। আরিমান ইমার সামনে গিয়ে ধমকের সুরে বলল,,

"মিস ইমা রহমান, ক্লাসের পড়া বাদ দিয়ে এই চাইল্ডিশ ড্রয়িং করার জন্য আপনার খাতাটা এখন থেকে আমার কাছে বাজেয়াপ্ত থাকবে। আর আগামী তিন দিন ল্যাবের যত টেস্ট টিউব আর মাইক্রোস্কোপ আছে, সব ক্লাস শেষে আপনি একাকী পরিষ্কার করে তারপর বাড়ি ফিরবেন।"

ইমা মাথা তুলে তাকাল। ওর চোখ দুটো রাগে জ্বলজ্বল করছে। ও স্পষ্ট বুঝতে পারছে, এটা স্রেফ ওই অপমানের শোধ নেওয়া হচ্ছে! ও দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "স্যার, বাকিদের তো এই শাস্তি দেওয়া হয় না।"

"বাকিরা ক্লাসে মন দেয়, আপনার মতো অবাধ্য নয়," আরিমান একদম পাথরের মতো শক্ত গলায় বলল।

ক্লাস শেষ হওয়ার পর সবাই চলে গেল। ইমা ল্যাবের সিঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে একটার পর একটা কাঁচের স্লাইড ধুয়ে যাচ্ছে আর মনে মনে আরিমানের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করছে। ঠিক তখনই ল্যাবের দরজা ঠেলে আরিমান ভেতরে ঢুকল। ওর একহাতে দামি ল্যাপটপ ব্যাগ, আর অন্যহাতে একটা ওআরএস গোলানো পানির বোতল।

আরিমান বোতলটা ইমার ঠিক পাশের টেবিলে রাখল। গলাটা একটুও নরম না করে বলল, "দুপুর থেকে এক ফোঁটা পানিও খাওনি। গরমে ল্যাবে কাজ করতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়লে ল্যাবের কাঁচের জিনিসগুলো ভাঙবে, যা আমি অ্যালাউ করব না। এটা শেষ করে তারপর বাকি কাজ করবে।"

ইমা মুখ ফুলিয়ে বলল, "আমার পানির দরকার নেই। আমি আপনার কোনো দয়া চাই না।"

"এটা দয়া নয়, অর্ডার। আর অবাধ্যতা আমি দুচোখে দেখতে পারি না, সেটা তুমি ভালো করেই জানো," আরিমান একটু ঝুঁকে ইমার খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। ওর চোখ দুটোতে অদ্ভুত এক জেদি চাহনি। ও চায় ইমা ওর কাছে নতি স্বীকার করুক, ওর নিয়মে চলুক।

ইমা রাগ করে বোতলটা তুলে এক চুমুকে অর্ধেকটা শেষ করে ওখানেই ধপাস করে রেখে দিল। আরিমান ঠোঁটের কোণে একটা তৃপ্তির হাসি লুকিয়ে ল্যাব থেকে বেরিয়ে গেল।

ইমারা বেশ বড় যৌথ পরিবারে থাকে। ইমার বাবা আর বড় চাচা একসাথেই থাকেন, সব মিলিয়ে ভরপুর সংসার। ইমার বড় ভাই ইরফান একজন সফল বিজনেসম্যান এবং আরিমানের কাছের বন্ধু। এই সুবাদেই আরিমানের ইমাদের বাড়িতে অবাধ যাতায়াত। আর এই একসাথেই থাকে বড় চাচার দুই মেয়ে তিশা আর তৃষ্ণা। তিশা বড়, শান্ত স্বভাবের, কিন্তু মনে মনে সে আরিমানকে প্রচণ্ড পছন্দ করে। আরিমানের বিয়ের প্রস্তাব যখন ইমার জন্য আসে, তখন তিশার বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যখন ইমা না করে দিল, তখন তিশার মনে আবার সুপ্ত আশা জেগে উঠেছে, যা বাড়ির কেউ জানে না।

শুক্রবার ইমাদের ড্রইংরুমে তখন চাঁদের হাট। বড় চাচা সোফায় বসে পত্রিকা পড়ছেন, আর ইরফান আরিমানকে জড়িয়ে ধরে হা হা করে হাসছে। তিশা রান্নাঘর থেকে একটা প্লেটে করে আরিমানের প্রিয় নলেন গুড়ের সন্দেশ আর লেবুর শরবত নিয়ে এল। ও খুব আলতো করে প্লেটটা আরিমানের সামনে রেখে নিচু গলায় বলল, "আরিমান ভাইয়া, এটা বিশেষ করে তোমার জন্য মা বানিয়েছিল। শরবতে চিনি কম দিয়েছি, তোমার যেমন পছন্দ।"

আরিমান সন্দেশে একটা কামড় দিয়ে বলল, "দারুণ হয়েছে তিশা। থ্যাংক ইউ।"

তিশার ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে গেল। ও সোফার এক কোণায় বসে ওড়নার খুঁট আঙুলে জড়াতে জড়াতে আড়চোখে আরিমানকে দেখতে লাগল। আরিমানের এই ধারালো চেহারা, এই গম্ভীর ব্যক্তিত্ব তিশার মনের গভীরে একদম গেঁথে গেছে। ও মনে মনে ভাবছে, "ইমা কত বড় বোকা! এমন একটা মানুষকে কেউ ফিরিয়ে দেয়?"

ঠিক তখনই ইমা হন্তদন্ত হয়ে ড্রইংরুম পার হতে যাচ্ছিল, উদ্দেশ্য ওপরের ঘরে গিয়ে একা একা নিজের মতো গল্প পড়বে। কিন্তু আরিমান ওকে দেখামাত্রই ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলল, "তোর বোনকে একটু চোখে চোখে রাখিস। ল্যাবে যেভাবে ও অমনোযোগী থাকে, যেকোনো দিন বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে বসবে। আজকেও তো ল্যাবে একটা স্লাইড প্রায় ভেঙেই ফেলেছিল।"

বড় চাচা চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন, "কী বলিস আরিমান? ইমা, তুই পড়াশোনায় এত অবহেলা করছিস কেন? আরিমান যখন বলছে, তখন নিশ্চয়ই তুই ভুল করছিস!"

ইমা অপমানে আর ক্ষোভে ফেটে পড়ার মতো অবস্থা হলো। বাড়ির সবার সামনে আরিমান delicacies তৈরি করার বদলে ওকে সারাক্ষণ একটা অপদার্থ প্রমাণ করার মিশনে নেমেছে। ও তিশার দিকে তাকাল। তিশা তখন বেশ একটা বিজয়ী হাসিমুখে আরিমানের দিকে তাকিয়ে আছে। আরিমানের চোখে ইমার জন্য যে রাগমিশ্রিত তীব্র নজরদারি, সেটা তিশার চোখ এড়াল না। তিশার বুকের ভেতরটা ঈর্ষায় মোচড় দিয়ে উঠল।

এদিকে আরিমানের কথা ইমা আর সহ্য করতে পারল না। ও সোজা নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।

রাত তখন সাড়ে এগারোটা। ইমা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসছিল। ও ঠিক করেছে, কালই ও এই কোর্স ড্রপ করবে। ও এই মানুষের মুখোমুখি আর হবেই না।

হঠাৎ ওর ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। কোনো মেসেজ নয়, সরাসরি আরিমানের কল। ইমা প্রথমে কাটতে গিয়েও কী ভেবে রিসিভ করল।

"কী চান আপনি? বাসায় এসে আমার নামে কথা বলার মানে কী?" ইমা প্রায় চিৎকার করে উঠল।

ফোনের ওপাশ থেকে আরিমানের সেই চেনা, ঠান্ডা আর ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "মিথ্যা বলিনি। তোমার মন যে ল্যাবে ছিল না, সেটা তো সত্যি। পুরোটা সময় তোমার চোখ আমার দিকে ছিল, আর মনে মনে আমাকে গালি দিছিলি, তাই না?"

"আপনি একটা..."

"উঁহু, শিক্ষকের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে নেই ইমু," আরিমান ওর কথা কেড়ে নিল। ওর গলায় এবার এক অদ্ভুত টান, "তুমি আমার থেকে যত দূরে যাওয়ার রাস্তা খুঁজবে, আমি ঠিক ততবার তোমার সামনে এসে দেয়াল হয়ে দাঁড়াব। তুমি আমার প্রস্তাব ফিরিয়েছ, কিন্তু আমার নজর থেকে নিজেকে ফেরাতে পারবে না। কাল সকাল ঠিক সাড়ে আটটায় ডিপার্টমেন্টের করিডোরে যেন তোমাকে দেখি।

#তুমিই_আমার_হৃদয়হরণী

#লেখিকা_আশু

সূচনা পর্ব

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন