#তুমিই_আমার_হৃদয়হরণী পর্ব-২
#লেখিকা_আশু
ফোনের ওপাশ থেকে লাইনটা কেটে গেল। ইমা স্তব্ধ হয়ে ফোনটা কানের কাছে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। ওর পুরো শরীর রাগে আর এক অজানা আশঙ্কায় কাঁপছে। আরিমান সিকদার ওকে 'ইমু' বলে ডেকেছে! এই নামে কেবল ওর বাড়ির মানুষ আর খুব কাছের বন্ধুরা ডাকে। অথচ ওই খিটখিটে, গম্ভীর মানুষটার মুখে এই ডাক যেন এক তীব্র অধিকারবোধের জানান দিয়ে গেল।
"দেয়াল হয়ে দাঁড়াব মানে কী? কী ভেবেছে ও নিজেকে?" ইমা দাঁতে দাঁত চেপে ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলল। রাগ আর অপমানে ওর চোখে জল চলে এল। ও তো শুধু একটা বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়েছিল, কোনো অপরাধ তো করেনি! তাহলে কেন আরিমান ওর জীবনের প্রতিটি কোণ এভাবে দখল করতে চাইছে?
পরদিন সকাল ঠিক আটটা বিশ।
ডিপার্টমেন্টের করিডোরে চটি জুতোর খটখট শব্দ তুলে হাঁটছিল ইমা। ইচ্ছা ছিল আজকে একদম লেট করে ক্লাসে ঢুকবে, কিন্তু আরিমানের ওই শেষ হুমকিটা—"সকাল সাড়ে আটটায় যেন করিডোরে দেখি"—ওর অবাধ্য মনকেও কেমন একটা অদ্ভুত ভয়ে আড়ষ্ট করে রেখেছিল। করিডোরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ও ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল, ঠিক তখনই ওপাশ থেকে লম্বা চওড়া একটা অবয়ব এগিয়ে আসতে দেখা গেল।
নেভি ব্লু শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো, চোখে সেই চেনা চশমা। আরিমানের হাতে কিছু অ্যাসাইনমেন্টের খাতা। ইমাকে করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ও নিজের হাঁটার গতি কিছুটা কমিয়ে দিল। ইমার ঠিক মুখোমুখি এসে দাঁড়াতেই ইমা চট করে চোখ নামিয়ে নিল।
আরিমান ওর সামনে এসে পকেট থেকে একটা চাবির রিং বের করল। ল্যাবের চাবি। সেটা ইমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে একদম পেশাদার গলায় বলল, "আজকে ফার্স্ট ইয়ারের একটা প্র্যাক্টিক্যাল আছে। ক্লাস শুরুর আগে ল্যাবের সব কটা মাইক্রোস্কোপ সেট করে রাখবে। একটাতেও যেন ধুলো না থাকে।"
ইমা চাবিটা হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে ফিসফিস করে বলল, "আমি আপনার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট নই, স্যার।"
আরিমান একটু ঝুঁকে এল। ওর শরীর থেকে আসা চেনা পারফিউমের কড়া সুবাস ইমার নাসিকায় ধাক্কা দিল। আরিমান নিচু কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল, "তুমি আমার কোর্সের স্টুডেন্ট, মিস ইমা। আর একজন অবাধ্য স্টুডেন্টকে কীভাবে লাইনে আনতে হয়, সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। কাজটা যেন পারফেক্ট হয়।"
বলেই ও আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে নিজের কেবিনের দিকে চলে গেল। ইমা চাবিটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে ল্যাবের দিকে রওনা দিল। ওর মনে হচ্ছিল, এই মানুষটার অহংকার কোনোভাবে যদি ও গুঁড়িয়ে দিতে পারত!
এদিকে দুপুরের দিকে ইউনিভার্সিটির ক্যাফেটেরিয়ায় বসেছিল তিশা আর ওর বোন তৃষ্ণা। তিশা এই ইউনিভার্সিটিরই অন্য ডিপার্টমেন্টের ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট। ওর সামনে রাখা কফির কাপে ও চামচ নাড়ছে ঠিকই, কিন্তু ওর মন পড়ে আছে অন্য কোথাও। গতকাল ড্রইংরুমের সেই দৃশ্যটা ও কিছুতেই ভুলতে পারছে না। আরিমান ইমাকে ধমকাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ধমকের পেছনে যে তীব্র মনোযোগ লুকিয়ে ছিল, তা তিশার মতো একতরফা ভালোবাসায় মগ্ন মেয়ের চোখ এড়ায়নি।
তৃষ্ণা একটা চিপসের প্যাকেট থেকে চিপস মুখে পুরতে পুরতে বলল, "কী রে আপু? তুই কাল রাত থেকে কেমন যেন গম্ভীর হয়ে আছিস। আরিমান ভাইয়া তোকে ওমন সুন্দর করে 'থ্যাংক ইউ' বলল, তুই তো খুশিতে নাচবি, তা না করে মুখ কালো করে আছিস কেন?"
তিশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "তোর আরিমান ভাইয়ার চোখ ইমার ওপর থেকে সরলে তো! ইমা ওনাকে রিজেক্ট করেছে, অথচ উনি সারাক্ষণ ইমার পেছনেই লেগে আছেন। আমার ভয় হয় তৃষ্ণা, আরিমান ভাইয়া ইমার ওপর রেগে আছেন নাকি এই রাগের আড়ালে অন্য কিছু আছে?"
তৃষ্ণা চোখ কপালে তুলল, "ধুর! তুই শুধু শুধু বেশি ভাবিস। আরিমান ভাইয়া কত কড়া মানুষ জানিস না? ইমা ওনার ইগোতে আঘাত করেছে, তাই হয়তো ক্লাসে একটু শাসন করছেন। তুই দেখিস, ইমা যখন এই সেমিস্টারে ওনার কাছে ফেল করবে না, তখন বুঝবি!"
তিশার মন অবশ্য এই সস্তা সান্ত্বনায় শান্ত হলো না। ও মনে মনে একটা জেদ চেপে বসল। আরিমানকে ও কোনোভাবেই ইমার হতে দেবে না। যে মানুষটার কদর ইমা বোঝে না, সেই মানুষকে পাওয়ার অধিকার শুধু তিশার।
বিকেলের দিকে ল্যাবের কাজ শেষ করে ইমা যখন ক্লান্ত শরীরে ব্যাগটা কাঁধে ঝোলাচ্ছিল, ঠিক তখনই ল্যাবের দরজায় নক হলো। ইমা ভেবেছিল আরিমান আবার কোনো নতুন শাস্তি নিয়ে এসেছে। ও বিরক্ত হয়ে তাকাল, কিন্তু দরজায় আরিমান নয়, দাঁড়িয়ে আছে ওর ভাই ইরফান!
"কী রে ইমু! কাজ শেষ হলো তোর?" ইরফান হাসিমুখে ভেতরে ঢুকল।
"ভাইয়া? তুমি এখানে?" ইমা অবাক হয়ে গেল।
"হ্যাঁ, এই দিকে একটা ক্লায়েন্ট মিটিং ছিল। ভাবলাম শেষ করে তোকে একবারে গাড়ি করে বাসায় নিয়ে যাই। আর তা ছাড়া আরিমানও তো ফ্রি আছে, ওকেও সাথে নিয়ে নেব।" ইরফানের মুখে আরিমানের নাম শুনেই ইমার মেজাজ আবার চটে গেল।
"আমি বাসে চলে যেতে পারব ভাইয়া, তুমি ওনাকে নিয়েই যাও," ইমা মুখ ঘুরিয়ে বলল।
"আরে পাগলী, চল না। একসাথে যাব। আরিমান ওর কেবিনে আছে, চল ওখান থেকে ওকে ডেকে আনি," ইরফান ইমার হাত ধরে টেনে করিডোর দিয়ে আরিমানের কেবিনের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। ইমা না চাইতেও ভাইয়ের টানে ওর সাথে যেতে বাধ্য হলো।
আরিমানের কেবিনের দরজাটা খোলাই ছিল। ইরফান দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকল, "কী রে দোস্ত! চল, তোকে ড্রপ করে দিই।"
আরিমান ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে তাকাল। ওর চোখ প্রথমে ইরফানের ওপর পড়লেও পরক্ষণেই তা গিয়ে স্থির হলো ইরফানের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ইমার ওপর। ইমার উসকোখুসকো চুল, ক্লান্ত মুখ আর রাগী চোখ জোড়া দেখে আরিমানের ঠোঁটের কোণে আবারও সেই চেনা, রহস্যময় হাসির রেখা ফুটে উঠল।
ও ল্যাপটপটা বন্ধ করতে করতে বলল, "চল। আজকে অবশ্য আমার নিজের গাড়িটা গ্যারেজে দেওয়া। তোর গাড়িতে ফিরলে ভালোই হবে।"
গাড়িতে ওঠার সময় ঘটলো আরেক বিপত্তি। ইরফান ড্রাইভিং সিটে বসল। ইমা পেছনের সিটে বসার জন্য দরজা খুলতে যাবে, ঠিক তখনই ইরফান বলল, "ইমু, তুই সামনে আয়। আরিমান পেছনে বসুক, ওর সাথে আমার কিছু বিজনেসের কথা আছে।"
ইমা মনে মনে ভাইয়াকে এক গাদা গালি দিল। ও বাধ্য হয়ে সামনের সিটে বসল। আর আরিমান এসে বসল ঠিক ইমার পেছনের সিটটায়।
গাড়ি চলতে শুরু করল। ইরফান আরিমানের সাথে নতুন প্রজেক্ট নিয়ে কথা বলায় ব্যস্ত। ইমা জানালার বাইরে তাকিয়ে ট্রাফিকের দিকে চোখ রাখল। হঠাৎ ও গাড়ির ভেতরের রিয়ার-ভিউ মিররের (আয়না) দিকে তাকাতেই ওর বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল।
পেছনের সিটে বসা আরিমান সোজা হয়ে বসে আয়নার মধ্য দিয়ে সরাসরি ইমার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে! ওর সেই চশমার আড়ালের চোখ দুটোতে কোনো খিটখিটে ভাব নেই, আছে এক গভীর, নেশাক্ত চাতুর্য। ও যেন আয়না দিয়েই ইমার পুরো সত্ত্বাকে গ্রাস করে নিচ্ছে।
ইমা অস্বস্তিতে ছটফট করে উঠে চট করে চোখ সরিয়ে নিল। কিন্তু ও স্পষ্ট টের পাচ্ছিল, পেছনের সিট থেকে আরিমানের উষ্ণ দৃষ্টি যেন ওর ঘাড়ের ওপর এসে পড়ছে।
ঠিক তখনই আরিমান শান্ত গলায় বলল, "ইরফান, তোর বোনকে বলিস আগামী সপ্তাহে সেল বায়োলজির একটা সারপ্রাইজ কুইজ আছে। ও যেন এবার অন্তত খাতায় ড্রইং না করে পড়াশোনায় মন দেয়। নয়তো এবার ল্যাবের টেস্ট টিউব ধুয়ে পার পাওয়া যাবে না।"
ইরফান হেসে উঠে বলল, "শুনলি ইমু? আরিমান কিন্তু খুব কড়া টিচার। ফাঁকি দিবি না একদম!"
ইমা আর সহ্য করতে পারল না। ও আয়নার দিকে তাকিয়ে আরিমানকে উদ্দেশ্য করে মনে মনে বলল, "দেখে নেব আমি আপনাকে, স্যার! আপনি আমাকে যতবার আটকাবেন, আমি ততবার আপনার এই জাল ছিঁড়ে বের হব।"
কিন্তু ইমা জানত না, আরিমান সিকদার সহজে শিকার হাতছাড়া করার মতো মানুষ নয়।
চলবে..
পর্ব তাড়াতাড়ি দিলাম,সবাই প্লিজ কমেন্টে জানাবেন কেমন লাগছে।