#তুমিই_আমার_হৃদয়হরণী পর্ব-১২
#লেখিকা_আশু
আরিমান যখন ইমাকে কোলে নিয়ে ছাদের লোহার দরজা পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল, তখন ভিলার ভেতরের কড়া এসি-র ঠান্ডা বাতাস এসে ওদের দুজনের ভেজা শরীরে লাগল। ইমা শীতের এক তীব্র কাঁপুনিতে আরিমানের বুকের সাথে আরও বেশি লেপ্টে গেল। আরিমান কোনো কথা না বলে, অত্যন্ত দৃঢ় পদক্ষেপে করিডোর পেরিয়ে সোজা নিজের মাস্টার বেডরুমে এসে ঢুকল। ও ইমাকে খুব আলতো করে বিছানার নরম তোশকের ওপর বসিয়ে দিল।
বিছানায় বসামাত্রই ইমা আবার শীতে গুটিয়ে গেল। ওর ভেজা শাড়ি আর চুল থেকে টপ টপ করে জল পড়ছিল। আরিমান এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ওয়াশরুম থেকে একটা বড় সাদা টাওয়েল নিয়ে এলো। ও কোনো দ্বিধা না রেখে ইমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। ওর কড়া, ধারালো চোখ দুটোতে তখন আর কোনো রাগ নেই, সেখানে আছে শুধু ইমাকে আগলে রাখার এক তীব্র ব্যাকুলতা। আরিমান আলতো করে টাওয়েলটা দিয়ে ইমার ভেজা চুলগুলো মুছতে লাগল। ওর শক্ত, কড়া হাত দুটো এখন এতটাই নরম যে ইমার মনে হচ্ছিল কোনো এক কাচের পুতুলকে ও আগলে রাখছে।
"চুলগুলো ভালো করে না মুছলে আবার জ্বর আসবে তোর," আরিমান অত্যন্ত নিচু, গম্ভীর কিন্তু এক অদ্ভুত মায়াবী গলায় বলল। '
ইমা চোখ তুলে আরিমানের দিকে তাকাল। আরিমানের কপাল বেয়েও তখন বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে, ওর ভেজা সাদা শার্টটা গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। ইমার এতক্ষণে খেয়াল হলো, ওর নিজের অবাধ্যতার কারণে আরিমানও পুরো ভিজে গেছে। ইমা কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, "আপনি... আপনিও তো পুরো ভিজে গেছেন। আগে নিজের শার্টটা চেঞ্জ করুন।"
আরিমান ইমার কথায় মনোযোগ না দিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করল, অত্যন্ত গম্ভীর ও তীক্ষ্ণ গলায় জিজ্ঞেস করল, "কেন নিরুপায় ছিলি ইমা? কী এমন হয়েছিল যে তুই নিরুপায় ছিলি? আমাকে বল।"
আরিমানের এই সরাসরি প্রশ্নে ইমা এক মুহূর্তের জন্য নিশ্চুপ হয়ে গেল। ওর চোখের পলক স্তব্ধ হয়ে রইল। ইমা খুব ভালো করেই জানে, ও যদি আজ একবার মুখ খোলে, তবে তৃষ্ণার পুরো জীবনটাই শেষ হয়ে যাবে। এমনিতেও বেচারির হাসব্যান্ড জুয়া খেলায় মত্ত, তার ওপর সারাক্ষণ অশান্তি। সব কথা চিন্তা করে ইমা মাঝপথেই থমকে গেল। ও মাথা নিচু করে রইল, কোনো উত্তর দিল না। ইমার এই নীরবতা দেখে আরিমান আর কিছু না বলে এক বুক গভীর দীর্ঘশ্বাস চেপে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
করিডোর পেরিয়ে আরিমান ওর নিজের অন্ধকার স্টাডি রুমে গিয়ে ঢুকল। ও একটা সিগারেট জ্বালিয়ে সোফায় হেলান দিয়ে বসল। সিগারেটের লালচে আলো আর ধোঁয়ার মাঝে ও গভীরভাবে ভাবছিল—কেন ইমা এমন করল? কী এমন কারণ ছিল যার জন্য ও নিজেকে নিরুপায় বলছে? কেন ও সত্যিটা আড়াল করছে?
ঠিক তখনই ঘরের দরজায় একটা টোকা দেওয়ার শব্দ হলো। আরিমান তখনো নিজের ভাবনায় ডুবে ছিল, ও একটু বিরক্ত হয়েই কিছুটা কড়া আর ধীর গলায় বলল, "আসার দরকার নেই। যেদিন সত্যি বলতে পারবি, সেদিন আমার সামনে আসবি।"
আরিমান খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিল যে দরজার ওপাশে ইমা দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ইমা এবার আরিমানের সেই কথার কোনো তোয়াক্কা করল না। ও সোজাসুজি ঘরের ভেতরে এসে পড়ল। ইমার পরনে এখন সালোয়ার কামিজ, ওড়নাটা গলায় ঝুলানো। চুলগুলো এখনো কিছুটা ভেজা, কোনো রকমে ও নিজেকে গুছিয়ে আরিমানের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে।
ইমা আরিমানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট গলায় বলল, "ভালোবাসলে বিশ্বাস করতে শিখুন।"
আরিমান হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা এক ঝটকায় অ্যাশট্রেতে ফেলে দিয়ে সোজা হয়ে বসল। ওর ঠোঁটে একটা কুৎসিত, তির্যক হাসি ফুটে উঠল। ও বলল, "আমি বিশ্বাস করতে চাই না ইমা... আমি জানতে চাই।"
ইমা একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওর বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত আবেগ যেন এক হয়ে ডানা মেলল। ও আরিমানের আরও এক কদম কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলল, "তাহলে জেনে নিন, আমি আপনাকে ভালোবাসি আরিমান সিকদারের। এর থেকে বড় কিছু জানার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।"
ইমার মুখে এই স্পষ্ট ভালোবাসার স্বীকারোক্তি শুনে আরিমান আবার সেই তির্যক হাসি হেসে বলল, "বাহ ইমা চৌধুরী বাহ! আপনি যখন বললেন আমি আপনার যোগ্য না, তখন আমায় রাস্তায় ফেলে সরে দাঁড়ালেন। আর এখন আপনি বলছেন ভালোবাসেন, কাছে টানছেন! সব কি আপনার ইচ্ছাতেই হবে নাকি?"
ইমা এবার একটুও দমে গেল না। ও আরিমানের একদম ক্লোজ বা কাছাকাছি চলে এলো। ওদের মাঝের দূরত্ব এখন শূন্যের কোঠায়। ও আরিমানের চোখের দিকে তাকিয়ে জেদি গলায় বলল, "হ্যাঁ, হবে। আমি যা বলব, তাই হবে।"
ইমাকে এত কাছে দেখে আরিমান নিজের ভেতরের অস্থিরতা লুকাতে কিছুটা দূরে সরে যেতে চাইল। কিন্তু ইমা ওকে সরার কোনো সুযোগই দিল না। ও এক ঝটকায় আরিমানের শার্টের কলারটা টেনে ধরে ওকে থামিয়ে দিল। ইমার চোখ দুটো তখন মায়ায় ছলছল করছে। ও খুব নিচু, অভিমানী গলায় বলল, "যেদিন আপনার এই ভুল ভাঙবে, সেদিন হয়তো আমি আর থাকব না। একটু ভালোবাসুন না আমায়... এত দূরে কেন রাখছেন?"
আরিমান নিষ্পলক চোখে ইমার দিকে তাকিয়ে রইল। ইমার এই রূপ ওর সম্পূর্ণ চেনা জগতের বাইরে। ইমা আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। ও ওর পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে একটু উঁচু হলো এবং আরিমানের শক্ত, কড়া গালের ওপর আলতো করে একটা গভীর চুমু এঁকে দিল।
চুমু দিয়েই ও এক ঝটকায় সরে গেল। আরিমান যতক্ষণ না বুঝতে পারল আসলে কী ঘটে গেল, ততক্ষণে ইমা দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেছে। এই প্রথম ইমা নিজে থেকে আরিমানের এত কাছাকাছি এসেছিল এবং নিজের অধিকার প্রকাশ করেছিল। আরিমান স্তব্ধ হয়ে সোফায় বসে রইল। ও নিজের গালে হাত দিয়ে ভাবছিল, বেচারি বউয়ের পেছনে ও এতদিন ছুটেছে, আর আজ ইমা নিজেই ওর ওপর এমন জাদুকরি প্রভাব খাটিয়ে দিয়ে চলে গেল! ও নিজের অনুভূতি সামলাতে পারছিল না। ওদিকে ইমা নিজের রুমে এসে নিজের এই পাগলামি বা কাণ্ডের কথা ভেবে লজ্জায় লাল হয়ে উঠছিল। ও নিজের গালে হাত দিয়ে ভাবছিল—কী করল ওটা ও! কেন ও এভাবে আরিমানের এত কাছে চলে গেল!
আরিমান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও ধীর পায়ে হেঁটে ইমার রুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ও যখন ইমার রুমের ভেতরে উঁকি দিল, তখন ওর নজরে এলো ইমার এই মিষ্টি পাগলামি। ইমা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মনেই ব্লাশ করছে বা লজ্জায় লাল হচ্ছে। ইমার এই নিষ্পাপ, মিষ্টি রূপটা দেখে আরিমানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে আলতো হাসি ফুটে উঠল। ও যেন এক মুহূর্তের জন্য ভুলে গেল বিগত তিন বছরের সমস্ত কষ্ট, সমস্ত বিরহ আর অন্ধকার জগত। আরিমান দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওর এই অপরূপা হৃদয়হরণীর দিকে।
পরদিন সকাল।
ভিলার থমথমে পরিবেশটা একটু হালকা হতেই একটা জরুরি খবর এলো। ইমার বড় ভাই ইরফানের বিয়ে ঠিক হয়েছে সামনের সপ্তাহে। আরিমান এই খবর শুনেই সাফ জানিয়ে দিল, ও এই বিয়েতে যাবে না। ও ওর এই অন্ধকার জগত আর ইমার নিরাপত্তা ছেড়ে কোথাও নড়তে রাজি নয়।
কিন্তু ইমা এই খবর জানার পর থেকেই আরিমানের পেছনে পেছনে ঘুরঘুর করতে লাগল। ওর একমাত্র বড় ভাইয়ের বিয়ে, আর আরিমান সেখানে যাবে না এটা ইমার পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব। ও আরিমানকে বোঝানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। আরিমান যেখানেই যাচ্ছে, ইমা ওর পেছনে ছায়ার মতো ঘুরছে। ইমার এই পিছু পিছু চলা আরিমান ঠিকই বুঝতে পারছিল, কিন্তু ও মুখে এক তীব্র কঠোরতা বজায় রেখে চলল।
খানিক বাদেই আরিমানের ফোনে একটা মেসেজ বা বার্তা এলো। মেসেজটা পাঠিয়েছে ইরফান। আরিমান ফোনটা অন করে দেখল সেখানে লেখা:
"বন্ধুত্বের প্রমাণ কেউ চায় কি না জানি না... তবে আমি চাইলাম তুই আর ইমা আমার বিয়েতে থাকবি। কালকে সকাল সকাল চলে আসবি, আশা রাখছি।"
ইরফানের এই আবেগঘন মেসেজটা দেখেও আরিমান কোনো প্রত্যুত্তর করল না। ও ফোনটা লক করে টেবিলের ওপর রেখে দিল। ইমা ডাইনিং রুমের কোণ থেকে আর করিডোর থেকে বেশ কয়েকবার আরিমানকে অনুরোধ করল, "প্লিজ চলুন না, ভাইয়ের বিয়েতে না গেলে কেমন দেখায়!" কিন্তু আরিমানের পাথুরে মনে কোনো লাভ হলো না। ও ইমার কোনো কথাই কানে তুলল না।
শেষে পেরে না উঠে বেচারি ইমা সকাল থেকে এক ফোঁটা খাবারও মুখে তুলল না। ও এক্কেবারে না খেয়ে অভিমান করে বসে রইল। কিন্তু পেটের খিদে আর কতক্ষণ সহ্য করা যায়? দেখতে দেখতে রাত গভীর হলো। ঘড়িতে যখন রাত ২টা বাজে, তখন পুরো ভিলা নিঝুম। ইমা আর সহ্য করতে না পেরে একদম চোরের মতো চুপিচুপি পা ফেলে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। এখন যদি ও কিছু না খায়, তবে নির্ঘাত খিদেতেই মরে যাবে! ওই শয়তান লোকটা একবারের জন্যও তো এসে বলল না যে কিছু খেয়ে নাও!
ইমা ফ্রিজটা খুলে কিছু ফলমূল বের করল। ও মনের সুখে আরিমানকে গালি দিতে দিতে আপেলের টুকরো মুখে পুরছিল আর আপনমনেই বিড়বিড় করে বলছিল, "মানুষ না খেয়ে কী করে থাকতে পারে? সেই সকাল থেকে না খেয়ে আছি, একবার খোঁজ নেওয়ারও কেউ নেই! একটা আস্ত হিটলার লোক! নিজে ঠিকই পেট পুরে গিলেছে, আর এদিকে বউ খেলো কি খেলো না, তার কোনো পরোয়াই নেই! যতসব..."
"বউ তো চুরি করে খেতে পারে, খোঁজ নিয়ে আর কী লাভ?"
হঠাৎ পেছন থেকে আরিমানের কড়া, গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। আচমকা এই আওয়াজ শুনে ইমার গলায় খাবারের টুকরো আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো। ও জোরে জোরে কাশতে লাগল। আরিমান কোনো কথা না বলে টেবিল থেকে জলের গ্লাসটা নিয়ে ইমার সামনে ধরল। ইমা ঢকঢক করে জল খেয়ে নিজেকে একটু সামলে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল, "না... মানে... ওই আর কী..."
ইমার কথার কোনো পাত্তা না দিয়ে আরিমান ওর সেই চিরচেনা গম্ভীর ও কড়া গলায় বলল, "কাল সকালে আমরা বাংলাদেশ যাচ্ছি। সকাল সকাল রেডি থাকিস।"
কথাটা বলেই আরিমান আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। ও যেমন গম্ভীর পায়ে এসেছিল, ঠিক তেমনি গটগট করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। ইমা তো এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাংলাদেশ যাচ্ছে! ভাইয়ের বিয়েতে যাচ্ছে! ইমার মনের ভেতর তখন আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। ওর খুশি যেন আর ধরে না! ও খুশিতে নাচতে নাচতে নিজের রুমের দিকে চলে এলো।
রুমে এসে ইমা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও খুশিতে পাগলদের মতো গোল গোল হয়ে নাচতে লাগল, ওর যেন বাতাসে উড়তে লাগল। ও যে নিজের দেশে ফিরে যাচ্ছে, নিজের চেনা মানুষদের কাছে যাচ্ছে, এই আনন্দ ও কোনোভাবেই চেপে রাখতে পারছিল না।
ঠিক তখনই আরিমান সকালের ফ্লাইটের সঠিক সময়টা বলার জন্য আবার ইমার রুমের দিকে আসছিল। ও যখন দরজার সামনে এসে দাঁড়াল, তখন ইমাকে ওভাবে পাগলের মতো নাচতে দেখে ও কিছুটা অবাক হলো। কিন্তু তার চেয়েও বেশি ওর মনের গভীরে এক অদ্ভুত ভালো লাগা ছুঁয়ে গেল। আরিমানের অজান্তেই ওর ঠোঁটের কোণে এক গভীর, মায়াবী হাসির রেখা দেখা দিল। আরিমান দরজায় হেলান দিয়ে, দুহাতে বুক বেঁধে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওর এই আনন্দিত, নিষ্পাপ হৃদয়হরণীর দিকে। ও বুঝতে পারল, এই মেয়ের খুশির জন্য ও পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যেতে রাজি।