#তুমিই_আমার_হৃদয়হরণী পর্ব-১১
#লেখিকা_আশু
রাত ১০টায় আরিমান যখন বাড়ি ফিরল, তখন পুরো বাড়ি অন্ধকার। প্রতিদিন ইমা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকত বা টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখত, কিন্তু আজ নিচে কেউ নেই। আরিমানের খিটখিটে মেজাজটা আরও চড়ে গেল। ও গটগট করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে ইমার রুমের দরজাটা এক ধাক্কায় খুলল।
"কী রে ইমা? আজ খুব দেমাগ বেড়েছে দেখছি? নিচে খাবার দাবার না সাজিয়ে এখানে আরামসে ঘুমানো হচ্ছে?" আরিমান কড়া গলায় ধমক দিয়ে ঘরের লাইটটা জ্বলাল।
কিন্তু ইমার কোনো সাড়াশব্দ নেই। ও শুধু কম্বলের ভেতর কুঁকড়ে আছে আর ওর মুখ দিয়ে একটা গোঙানির আওয়াজ বের হচ্ছে। আরিমান ভ্রু কুঁচকে বিছানার কাছে এগিয়ে গেল। ওর সেই ধারালো চোখ দুটো দিয়ে ইমার লাল হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকাল। আরিমান ইমার কপালে হাত রাখতেই চমকে গেল।
আরিমানের ভেতরের সেই কড়া রূপটা ইমার এই তপ্ত শরীরের স্পর্শে এক সেকেন্ডে হাওয়া হয়ে গেল। ওর ভেতরের সেই পুরনো কেয়ারিং প্রফেসর যেন হুট করে জেগে উঠল।আরিমান এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ওয়াশরুম থেকে ঠাণ্ডা জল আর একটা তোয়ালে নিয়ে এলো। ও ইমার মাথার নিচে একটা বালিশ দিয়ে নিজেই বিছানার পাশে বসল। পরম যত্নে তোয়ালেটা ভিজিয়ে ও ইমার কপালে জলপট্টি দিতে লাগল।
জ্বরের ঘোরে ইমা বিড়বিড় করছিল, "স্যার... প্লিজ আমাকে ছেড়ে যাবেন না... আমি আপনাকে ছাড়া বাঁচব না... ওরা আমাকে বাধ্য করেছিল..."
ইমার এই ভাঙা ভাঙা আকুতি শুনে আরিমানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। উনি ইমার একটা হাত নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় নিলেন। ইমার হাতটা তখনো কাঁপছিল। আরিমান সারারাত এক ফোঁটা চোখের ঘুম না ঘুমিয়ে ইমার কপালে জলপট্টি দিয়ে গেল, মাঝে মাঝে ওর নিজের রুমাল দিয়ে ইমার পুরো মুখ আর গলা মুছিয়ে দিতে লাগল। ভোরের দিকে যখন ইমার গায়ের উত্তাপ একটু কমল, তখন আরিমান এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইমার কপালে নিজের ঠোঁটটা আলতো করে ছুঁইয়ে দিয়ে বিদায় নিল। যেন ওর অবস্থান ইমার আশেপাশেও ছিল না।
মিলানের দুপুরের আকাশটা যেন কোনো এক বিষাদের চাদরে ঢাকা। ভিলার পেছনের বিস্তীর্ণ বাগানে কড়া পাইন আর ওক গাছের ছায়া এসে পড়েছে সবুজ ঘাসের ওপর। ইমা একটা জলপাই রঙের শাড়ি পরে বাগানের পাথুরে বেঞ্চে এসে বসেছিল। গত দিনের কড়া জ্বরটা আজ সকালে একটু কমেছে, তবে ফ্যাকাশে মুখে এখনো ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ। বাতাস এসে ওর কানের পাশের অবাধ্য চুলগুলোকে বারবার মুখের ওপর উড়িয়ে দিচ্ছিল। ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ফর্সা দুহাতে জড়িয়ে থাকা চাদরটা আরও ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিল। এই বিশাল ভিলা, এই বন্দিজীবন ওর চেনা জগতের বাইরে এক অন্য গ্রহ।
ঠিক তখনই ভিলার পেছনের ছোট গেট দিয়ে দুজন নতুন ইতালিয়ান গার্ড হেঁটে আসছিল।ওদের মধ্যে একজনের চোখে এক আদিম, পাশবিক লালসা। দূর থেকে শাড়ি পরা এই বাঙালি মেয়েটিকে দেখেই ওর চোখ দুটো চকচক করে উঠল। ইতালির উগ্র ও আধুনিক নারীদের দেখে অভ্যস্ত ওই গুন্ডাটার কাছে ইমার এই স্নিগ্ধ, অসহায় এবং ফ্যাকাশে রূপটা এক অদ্ভুত বুনো নেশা তৈরি করল। ও ওর সঙ্গীকে কনুই দিয়ে ঠেলা মেরে কুৎসিত ইতালিয়ান ভাষায় একটা নোংরা মন্তব্য ছুড়ল।
ইমা ওদের উপস্থিতি টের পেয়ে ভয়ার্ত চোখে তাকাল। ওই লোকটার চোখের চাউনি এতটাই নগ্ন আর কামুক ছিল যে ইমার শিরদাঁড়া বেয়ে এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। লোকটা পকেটে হাত দিয়ে শিস দিতে দিতে ইমার দিকে এগোতে লাগল। ওর প্রতিটা পদক্ষেপে ছিল ইমাকে গ্রাস করার এক নোংরা মানসিকতা। ও যখন ইমার থেকে মাত্র পাঁচ কদম দূরে, ঠিক তখনই ভিলার বারান্দা থেকে নেমে এলো এক জীবন্ত যমদূত।
আরিমান সিকদার।
আরিমানের পরনে কড়া ব্ল্যাক কালারের ফরমাল ট্রাউজার্স আর সাদা শার্ট, যার ওপরের দুটো বোতাম খোলা। চোখে ওর সেই চিরচেনা ডেডলি ডার্ক চশমা। আরিমান বারান্দা থেকেই লোকটার ওই লালসাভরা দৃষ্টি নোটিশ করেছিল। আরিমানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, ওর হাতের আঙুলগুলো নিজের অজান্তেই পকেটের কড়া মেটালের রিভলভারটার ওপর চেপে বসল। আরিমানের জীবনে একটাই নিয়ম যে জিনিস আরিমান সিকদারের, তার দিকে অন্য কেউ চোখ তুলে তাকালে সেই চোখের দুনিয়াটাই শেষ হয়ে যায়।
"স্টপ!" আরিমানের কড়া গম্ভীর কণ্ঠস্বর পুরো বাগানের নিস্তব্ধতা চিরে দিল।
লোকটা চমকে উঠে আরিমানের দিকে তাকাতেই দেখল, আরিমান ওর পকেট থেকে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে রিভলভারটা বের করে সোজা ওর কপাল বরাবর তাক করেছে। আরিমানের চোখের চশমার আড়ালে তখন হিংস্র পশুর মতো আগুন জ্বলছিল। কোনো সর্তকতা নয়, কোনো সংলাপ নয়। একটা তীব্র বধির করে দেওয়া গুলির শব্দে পুরো বাগান কেঁপে উঠল। লোকটার কপালে ঠিক দুই চোখের মাঝখানে একটা নিখুঁত গর্ত তৈরি হলো। এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে ওর চোখ দুটো উল্টে গেল এবং ওর নিথর, রক্তাক্ত দেহটা ভারী বস্তার মতো ইমার পায়ের ঠিক এক ইঞ্চি দূরে ঘাসের ওপর আছড়ে পড়ল। তাজা, গরম রক্তটাকে এসে পড়ল ইমার ফ্যাকাশে গালের এক পাশে আর ওর জলপাই রঙের শাড়ির আঁচলে।
ইমা নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেল। চোখের সামনে একটা জলজ্যান্ত মানুষকে এভাবে পশুর মতো মরে যেতে দেখে ওর ভেতরের সমস্ত শক্তি যেন নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। ও নিজের কান দুটো দুহাতে চেপে ধরে এক তীব্র চিৎকার দিতে চাইল, কিন্তু ওর গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হলো না। ওর মাথাটা বনবন করে ঘুরে উঠল, চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে এলো। ও এক মুহূর্তের মধ্যে জ্ঞান হারিয়ে সেই পাথুরে ফ্লোরে ঢলে পড়ল।
আরিমান হাতের রিভলভারটা পকেটে গুঁজে এক লাফে এগিয়ে এলো। ওর সেই খুনে রূপটা ইমাকে মাটিতে পড়তে দেখেই এক লহমায় উধাও হয়ে গেল। আরিমান হাঁটু গেড়ে বসে ইমাকে নিজের দুই বাহুর শক্ত বাঁধনে তুলে নিল। ওর কড়া বুকটা তখনো রাগে আর এক অজানা আশঙ্কায় ধকধক করে কাঁপছিল।
যখন ইমার জ্ঞান ফিরল, তখন ঘরের চারপাশটা আবছা অন্ধকার। জানালার ভারী পর্দাগুলো টানা, শুধু বেডসাইড ল্যাম্পের একটা মৃদু সোনালী আলো ঘরের দেয়ালে অদ্ভুত সব মায়া তৈরি করেছে। ইমা আস্তে আস্তে চোখ খুলল। ওর সারা শরীর তখনো অবশ, মাথার ভেতরটা এক তীব্র যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। ও বুঝতে পারল ও নিজের বিছানায় শুয়ে আছে আর ওর গায়ের ওপর একটা ভারী কড়া কম্বল জড়ানো।
ও একটু নড়ে উঠতেই দেখল, বিছানার ঠিক পাশেই একটা কাঠের চেয়ারে বসে আছে আরিমান। ওর চোখে এখন চশমাটা নেই। ওর সেই ধারালো, কড়া চোখ দুটো সরাসরি আটকে আছে ইমার মুখের ওপর। ওর ডানহাতের আঙুলে একটা জ্বলন্ত সিগারেট, যার ধোঁয়া ঘরের মৃদু আলোয় অলসভাবে ভাসছিল।
আরিমানকে দেখেই ইমার মগজে বিকেলের সেই রক্তাক্ত দৃশ্যটা সিনেমার মতো ভেসে উঠল। সেই পিশাচি চোখ, সেই তীব্র গুলির শব্দ, আর ওর শাড়িতে লেগে থাকা সেই গরম রক্ত! ইমা আতঙ্কে শিউরে উঠল। ও এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে বিছানার ওপর কম্বলটা নিজের শরীরে আরও শক্ত করে মুড়িয়ে নিয়ে আরিমানের থেকে যতটা সম্ভব দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। ও বিছানার একদম শেষ প্রান্তে, দেয়ালের সাথে গিয়ে নিজের শরীরটাকে কুঁকড়ে রাখল। ওর ঠোঁট দুটো ভয়ে কাঁপছিল, চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়ছিল।
ইমার এই দূরে সরে যাওয়াটা আরিমানের অহংকারে আর ওর ভেতরের এক তীব্র আঘাত করল। আরিমান ওর ঠোঁটের সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে এক ঝটকায় বিছানায় উঠে এলো। ওর দীর্ঘ, চওড়া শরীরটা ইমার ওপর এক বিশাল ছায়ার মতো এসে পড়ল। আরিমান ওর শক্ত, কড়া হাত দিয়ে ইমার শরীরের সেই ভারী কম্বলটা এক টানে নিজের দিকে টেনে নিল। ইমা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরিমান ওর দুই কাঁধ শক্ত মুঠোয় ধরে নিজের বুকের এক্কেবারে কাছে টেনে নিল। ওদের দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির।
"পালাচ্ছিস কেন?" আরিমান ওর কড়া, ঠান্ডা আর চিবিয়ে চিবিয়ে বলা গলায় জিজ্ঞেস করল। ওর নিঃশ্বাসের গরম বাতাস ইমার ফ্যাকাশে গালে গিয়ে বিঁধছিল। "তোর পালানোর কোনো পথ নেই ইমা। তুই বন্দি, আমার এই ভিলার, আমার এই সাম্রাজ্যের আর আমার এই অন্ধকার জীবনের একমাত্র ‘বন্দিনী’। তুই কি ভেবেছিস তুই আমার থেকে দূরে চলে যাবি?"
ইমা ওর বুকের ভেতর ছটফট করতে করতে বলল, "আমাকে ছেড়ে দিন........."
আরিমানের চোয়াল আরও শক্ত হয়ে গেল। ওর চোখ দুটো অন্ধকার হয়ে এলো। "কোথায় যাবি? কোন বাড়ি?? তোর দিকে কেউ ওভাবে তাকাবে, আর আমি সেটা কীভাবে সহ্য করব? ওর চোখ উপড়ে ফেলা উচিত ছিল আমার। তবে তোকে... তোকে আমি মারছি না ইমা। এই রক্তপাত, এই মাফিয়াগিরি, এই ক্ষমতার লোভে ভরা নরক কঙ্কালের মতো জীবনে আমার তীব্র বিতৃষ্ণা চলে এসেছে। এই নরকে বেঁচে থাকার জন্য, আমার ভেতরের এই জ্বলন্ত আগুনের একটু তৃষ্ণা মেটাতে শুধু তোকে লাগবে আমার। তুই বাঁচবি, আমার সামনেই বাঁচবি। সো ডোন্ট ফেয়ার, ফা*কিং বি*চ!"
একটা কড়া, নোংরা গালি আরিমানের মুখ থেকে ছিটকে বের হয়ে গেল। ওর গলার সেই তীব্র উগ্রতা আর অপমানের ভাষা ইমার কানে তীরের মতো বিঁধল। আরিমান ইমাকে এক ঝটকায় বিছানায় ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ওর শরীরের সমস্ত রাগ যেন ওই একটা গালির মাধ্যমে প্রকাশ পেয়ে গেল। আরিমান আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। ওর বুটের কড়া শব্দ তুলে ও গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, আর দড়াম করে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
ইমা বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। আরিমানের এই রূপ ও কোনোদিন দেখেনি। ওর সেই প্রিয় প্রফেসর, যিনি ক্লাসে এত শান্ত আর গম্ভীর গলায় কথা বলতেন, তিনি আজ এত নিষ্ঠুর, এত নোংরাভাবে ওকে গালি দিতে পারল? ওর অবলা মনটা এই অপমানে আর ভয়ে আরও বেশি গুটিয়ে গেল।
এই ঘটনার পর কেটে গেল দীর্ঘ তিনটি দিন।
ইমা এক্কেবারে ঘরের কোণে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল। ও প্রতিজ্ঞা করল, ও আর কোনোদিন এই জল্লাদটার সামনে যাবে না। আরিমান যখন সকালে ভিলা থেকে বের হতো বা রাতে ফিরত, ইমা কোনো না কোনো বাহানায় ওর ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখত। ডাইনিং টেবিলে ও আরিমানের সামনে আসত না। পরিচারিকা দিয়ে ওর খাবার ওপরে পাঠিয়ে দিত। তিন দিন ও আরিমানের সামনে এক সেকেন্ডের জন্যও পড়ল না। ওর সেই তীব্র কড়া ডেডলি চোখের চাহনি থেকে ও নিজেকে সম্পূর্ণ আড়াল করে রাখল।
আরিমান সিকদার এই তিন দিনে পুরো ভিলার পরিবেশকে এক জীবন্ত নরক বানিয়ে তুলল। ওর বিজনেস পার্টনার থেকে শুরু করে বডিগার্ড অ্যান্থনি পর্যন্ত ওর মেজাজ দেখে ভয়ে কাঁপত। আরিমান খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিল যে ইমা ওকে এড়িয়ে চলছে। ওর সেই তীক্ষ্ণ বুদ্ধি খুব সহজেই ধরে ফেলেছিল যে মেয়েটা ভয়ে আর অভিমানে ঘরের কোণে মুখ লুকিয়ে আছে।
কিন্তু আরিমানের এই কড়া, নিষ্ঠুর অবলা মনটা যেন কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না। সারাদিন ওর মাথায় হাজারটা ড্রিল, কোটি টাকার ডিল চলত, কিন্তু রাত হলেই ওর পুরো অস্তিত্ব জুড়ে শুধু ওই একটা ফ্যাকাশে চেহারার মেয়ে রাজত্ব করত। রাত হলে, পুরো ভিলা যখন নিঝুম হয়ে যেত, তখন একবার ওই ভীতুমাখা, নিষ্পাপ মুখটা নিজের চোখে না দেখলে আরিমান যেন কিছুতেই শান্তি পেত না। ওর ভেতরের সেই উগ্রতা প্রতি রাতে ইমার ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত, শুধু ওর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনার জন্য।
সেদিন রাতেও মিলানের বুকে এক ভয়ংকর রূপ নিয়ে ঝুম বৃষ্টি নামল। আকাশ চিরে বারবার কড়া বিজলি চমকাচ্ছিল, আর বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটাগুলো ভিলার কাচের জানালায় এসে তীরের মতো আছড়ে পড়ছিল। ঠাণ্ডা হাওয়া পুরো ভিলার করিডোরগুলোকে আরও বেশি থমথমে করে তুলেছে।
রাত তখন প্রায় দেড়টা। আরিমান ওর স্টাডি রুমে বসে একটা ইম্পর্টেন্ট শিপিং লাইন নিয়ে ফোনে কারোর সাথে খুব কড়া গলায় কথা বলছিল। ওর এক হাতে কফির কাপ, অন্য হাতে ফোন। কথা বলতে বলতে ও ঘর থেকে করিডোর দিয়ে নিজের বেডরুমের দিকে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই ওর চোখ গেল ইমার ঘরের দিকে।
আরিমান থমকে দাঁড়াল। এত রাতে ইমার ঘরের দরজাটা হা হয়ে খোলা!
ওর বুকের ভেতরটা হঠাৎ এক তীব্র অজানা আশঙ্কায় ‘খচ’ করে উঠল। আরিমান হাতের ফোনটা এক ঝটকায় পকেটে রেখে ধীর পায়ে ইমার রুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ও ঘরের ভেতরে উঁকি মারল।
বিছানাটা একদম ফাঁকা। কম্বলটা এক পাশে দুমড়েমুচড়ে পড়ে আছে। ওয়াশরুমের দরজাও খোলা, সেখানেও কেউ নেই। পুরো ঘরটা এক্কেবারে শূন্য, শুধু জানালার পর্দাগুলো বাতাসের তীব্র ঝাপটায় ডানা কাটা পাখির মতো উড়ছিল।
"ইমা!" আরিমানের গলার স্বর করিডোরে প্রতিধ্বনিত হলো।
কোনো সাড়াশব্দ নেই। আরিমানের মাথার ভেতরটা এক সেকেন্ডে পাগলপ্রায় হয়ে গেল। আরিমান ওর কড়া প্রফেশনাল রূপটা হারিয়ে এক পাগলের মতো পুরো ভিলাময় চিৎকার করতে লাগল।
"ইমা! কোথায় তুই? অ্যান্থনি! গার্ডস!" ওর গগনবিদারী চিৎকারে ভিলার বডিগার্ডরা মুহূর্তের মধ্যে পজিশন নিল। "পুরো বাড়ি খোঁজ! ইমু কোথায়? আমি যদি তোকে পাই ইমা, আজ আমি তোকে আস্ত আগুনে পুড়ব! বের হয়ে আয় বলছি!"
বডিগার্ডরা পুরো নিচতলা, গার্ডেন, কিচেন সব খুঁজে ফেলল, কিন্তু কোথাও ইমার কোনো চিহ্ন নেই। আরিমান তখন রাগে আর আতঙ্কে কাঁপছিল। ওর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছিল। ওর মনে হচ্ছিল ইমাকে না পেলে ওর এই পুরো জীবনটাই নিজের হাতে জ্বালিয়ে দেবে।
হঠাৎ ওর চোখ গেল ওপরের দিকে যাওয়ার কড়া লোহার সিঁড়িটার দিকে যা সোজা ভিলার বিশাল ছাদের দিকে চলে গেছে। আরিমান আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে অত্যন্ত দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদের দিকে এগিয়ে গেল। ওর বুকের ভেতর তখন এক তীব্র ঝড় বইছে। ও ছাদের ভারী লোহার দরজাটা এক ধাক্কায় খুলল।
দরজা খুলতেই আরিমান স্তব্ধ হয়ে গেল। ওর হাতের মুঠোটা শক্ত হয়ে গেল।
ছাদের মাঝখানে, এই তীব্র ঝড়-বৃষ্টির মাঝে একলা বসে আছে ইমা। ও একটা পাতলা শাড়ি পরে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদছে। আকাশের কড়া বৃষ্টি ওর পুরো শরীরকে ভিজিয়ে একাকার করে দিয়েছে। ওর লম্বা কালো চুলগুলো পিঠ বেয়ে নিচে নেমে গেছে। ওর শাড়ির আঁচলটা বৃষ্টির জলে ভারী হয়ে ছাদের এক পাশ দিয়ে লম্বা হয়ে পড়ে আছে। বৃষ্টির জলের ঝাপটায় ওর শাড়ির পেছনের অংশটা সরে গিয়ে ওর উন্মুক্ত ফর্সা পিঠটা পুরোপুরি নজরে আসছিল। সেই উন্মুক্ত পিঠে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ে গড়িয়ে যাচ্ছিল নিচের দিকে।
এই দৃশ্যটা আরিমানের ভেতরের সমস্ত রাগ আর কামুক সত্ত্বাকে এক তীব্র কামড়ের মতো বিঁধল। ওর হৃদয়হরণীর এই রূপ ওকে এক লহমায় স্তব্ধ করে দিল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি রাগ হলো ওর এই চরম বোকামি দেখে।
আরিমান এক ঝটকায় ওর পা বাড়িয়ে ইমার দিকে এগিয়ে গেল। ওর বুটের নিচে ছাদের জল ছিটকে উঠছিল। ও ইমার খুব কাছে গিয়ে ওর শক্ত হাত দিয়ে এক ঝটকায় ওকে নিচ থেকে ওপরে তুলে দাঁড় করাল। ইমা চমকে উঠে আরিমানের চোখের দিকে তাকাতেই—
ঠাস!
একটা কড়া থাপ্পড় ইমার ফ্যাকাশে গালে এসে পড়ল। থাপ্পড়ের তীব্রতায় ইমার মাথাটা একদিকে হেলে গেল, ওর ঠোঁটের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ল।
"জ্বর গেল দুদিন আগে, এখনো শিক্ষা হয়নি তোর? মরতে চাস তুই?" আরিমান ইমার দুই হাত নিজের এক হাতে মুচড়ে ধরে ওর কড়া, রাগী গলায় চিৎকার করে উঠল। ওর নিজের শরীরও বৃষ্টিতে ভিজতে শুরু করেছে। "এখানে এই বৃষ্টির মধ্যে নিউমোনিয়া হয়ে মরার নাটক করছিস কেন? আমার থেকে বাচার জন্য এই চাল?"
ঠিক তখনই আকাশ চিরে এক বিকট শব্দে বাজ পড়ল
পুরো মিলান শহর যেন সেই বাজের শব্দে কেঁপে উঠল। ইমা ছোটবেলা থেকেই বাজের শব্দে ভীষণ ভয় পেত। এই তীব্র শব্দের ধাক্কায় ও নিজের সমস্ত অভিমান, রাগ আর ভয় ভুলে এক সেকেন্ডের মধ্যে আরিমানের ভেতর ওর ভেজা, চওড়া বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। ইমা ওর শার্টের ভেজা কাপড়টা ওর বুকের মাঝখানে নিজের দুহাতে শক্ত করে খামচে ধরল আর আরিমানের বুকের মধ্যে নিজের মুখটা লুকিয়ে ফেলল। ওর পুরো শরীরটা তখনো আতঙ্কে কাঁপছিল।
আরিমানও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ওর ভেতরের সেই সমস্ত কড়া প্রলেপ,ইমার এই আকস্মিক স্পর্শে এক সেকেন্ডে গলে জল হয়ে গেল। আরিমান ওর দুটো দীর্ঘ, শক্ত বাহু দিয়ে ইমার ভেজা শরীরটাকে নিজের বুকের সাথে এক্কেবারে আগলে নিল। ওর এক হাত ইমার ভেজা পিঠের ওপর কড়া বাঁধন তৈরি করল, অন্য হাতটা ওর ভেজা চুলে রাখল। আরিমান নিজের মুখটা ইমার ভেজা চুলের মাঝে ডুবিয়ে দিল। এই তপ্ত বৃষ্টির মাঝেও ওদের দুজনের শরীরের উত্তাপ যেন এক অদ্ভুত তৃষ্ণার জন্ম দিচ্ছিল।
আরিমানের বুকের ধকধকানিটা ইমার কানে ড্রামের মতো বাজছিল। ও আস্তে আস্তে, খুব সাবধানে আরিমানের বুক থেকে নিজের মুখটা তুলল। ওর চোখ দুটো তখন জলে আর বৃষ্টির জলে একাকার।ইমা ওর সেই কড়া, ব্যাকুল চোখের দিকে তাকিয়ে আরিমানকে বলল,
"আমাকে... আমাকে কি ক্ষমা করা যাবে না ?" ইমার ভাঙা, ভেজা কণ্ঠস্বর বৃষ্টির শব্দের মাঝেই আরিমানের কানে এসে পৌঁছাল। ওর চোখে তখন এক তীব্র আকুতি, এক অদ্ভুত মায়া। "আমি ইচ্ছে করে আপনাকে ছেড়ে যাইনি... আমি সত্যিই খুব নিরুপায় ছিলাম..."
আরিমান এক ব্যাকুল, তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে ওর এই হৃদয়হরণীর দিকে তাকিয়ে রইল। ওর সেই ধারালো চোখ দুটোতে তখন আর কোনো রাগ নেই, কোনো হিংস্রতা নেই; সেখানে আছে শুধু এক গভীর, গহীন ভালোবাসা আর অধিকারবোধ। কীভাবে এত মায়ার নজর এড়াবে সে? এই মেয়ের চোখের এক ফোঁটা জলের কাছে যে আরিমান সিকদারের পুরো সাম্রাজ্যও তুচ্ছ!
আরিমান কোনো কথা বলল না। ওর কড়া ঠোঁট দুটো শক্ত হয়ে রইল। ও এক ঝটকায় ইমার ভেজা শরীরটাকে নিজের কোলের ওপর তুলে নিল। ইমার শাড়ির ভেজা আঁচলটা বাতাসে উড়তে লাগল।
আরিমান ইমাকে নিজের কোলে নিয়ে ছাদের দরজা দিয়ে এক পা, এক পা করে ভেতরের অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। ওদের ওপর তখনো মিলানের কড়া বৃষ্টি ঝরছিল।