#তুমিই_আমার_হৃদয়হরণী পর্ব-১৬
#লেখিকা_আশু
পরদিন সকালের সুর্য উঠতেই ঢাকা এয়ারপোর্টের প্রিমিয়াম লাউঞ্জে শুরু হলো অন্যরকম এক গ্যাঞ্জাম। ইমা পরেছে একদম আরামদায়ক একটা ডেনিম জিন্স আর হোয়াইট টপস, ওপরে হালকা জ্যাকেট। চুলগুলো উঁচুতে পনিটেল করা।
ওদিকে শাওন আর হিয়া দুজন ম্যাচিং করে ফ্লোরাল প্রিন্টের এয়ারপোর্ট লুক নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শাওন চোখে একটা বিশাল কালারফুল সানগ্লাস লাগিয়ে ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে বলছিল, "ভাবি! এই দেখো আমার ট্রাভেল কিট। মালদ্বীপে গিয়ে ডুব দেব আর কচ্ছপের সাথে সেলফি তুলব! তবে আমার একটাই ভয়,
আরিমান ভাই যদি আবার ওই ডনের মতো মুখ করে ঘুরে বেড়ায়, তাহলে সমুদ্রের ঢেউও আতঙ্কে শুকিয়ে যাবে!"
আরিমান ব্ল্যাক ট্রাউজার আর কফি কালারের টি-শার্টে জাস্ট কোনো হলিউড স্টারদের মতো লাগছিল। ও এক হাতে দুটো পাসপোর্ট ধরে অন্যদিকে তাকাতেই ইমা আলতো করে ওর হাতের ওপর হাত রাখল।
আরিমান ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই ইমা মৃদু হেসে ফিসফিস করে বলল, "সবাই ছুটির মেজাজে আছে মিস্টার সিকদার। আপনার ওই কপালে তিনটে ভাঁজ কি এয়ারপোর্টেও জমা দিয়ে আসা যায় না?"
আরিমান ইমার ফর্সা মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। ইমার ছোঁয়াতেই ওর মেজাজের কড়াকড়ি যেন বরফের মতো গলতে শুরু করল। ও একটু নিচু হয়ে ইমার কানের কাছে বলল, "তোর ওই ভেঙচি কাটা হাসি থামলে তবে তো কপাল সোজা হবে, মিসেস সিকদার।"
ইমা গালে একটু টোল ফেলে হেসে ওখান থেকে সরে গেল।
ঘণ্টা পাঁচেক পর।
মালে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ওদের নিয়ে একটা বিলাসবহুল স্পিডবোট নীল সমুদ্রের বুক চিরে ছুটছিল প্রাইভেট আইল্যান্ড রিসোর্টের দিকে। চারদিকের স্ফটিকের মতো পরিষ্কার জল দেখে ইমা, হিমি আর হিয়া স্পিডবোটের একদম সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে হাওয়া উপভোগ করছিল।
ইমার এলোমেলো চুল বাতাসের তোড়ে উড়ছিল। পানির হালকা ছিটেফোঁটা এসে ওর মুখে-ঘাড়ে পড়তেই ও খিলখিল করে হেসে উঠল। পেছনে দাঁড়িয়ে শক্ত হাতে ইমার কোমর ধরে রেখেছিল আরিমান, যাতে ও পড়ে না যায়।
আরিমান ইমার ঘাড়ের কাছে ঠোঁট ছুঁইয়ে কড়া গলায় অথচ এক অদ্ভুত মায়ায় বলল, "পড়ে যাবি ইমা, ধরে দাঁড়া।"
"আপনি তো ধরে আছেনই!" ইমা না তাকিয়েই পেছনে আরিমানের বুকে পিঠ এলিয়ে দিল। আরিমানের বুকের ভেতর তখন ভালোবাসার এক বিশাল সমুদ্র তোলপাড় করছিল।
রিসোর্টে পৌঁছেই সবাই যে যার ভিলাতে চলে গেল।পথিমধ্যে আরিমানকে আটকে ইরফান বলল,,"আমার মেসেজটা চেক করে তারপর রুমে যাস।"
এদিকে আরিমান আর ইমার ভিলাটা ওয়াটার ভিলা সমুদ্রের জলের ওপরে তৈরি এক স্বপ্নের ঘর। কাচের ফ্লোরের নিচে সাঁতার কাটছে রঙিন মাছের দল।
ইমা খুশিতে লাফিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে বলল, "উফ! কী সুন্দর! আমার তো মনে হচ্ছে আর জীবনেও ঢাকায় ফেরত যাব না।"
আরিমান লাগেজ একপাশে রেখে টি-শার্টের হাতা গুটিয়ে ইমার দিকে হেঁটে এলো। ও ইমার ওপর ঝুঁকে পড়ে দুই পাশে হাত রেখে আটকে ফেলল।
"ঢাকায় না গেলে কোথায় যাবি? ইতালি?" আরিমানের চোখের চাউনি হঠাৎ করেই খুব গভীর হয়ে গেল।
ইমা হঠাৎ এই ঘনিষ্টতায় বুক কাঁপিয়ে বলল, "আপনি... আপনি এত কাছে আসছেন কেন?"
"কারণ চারটে বছর আমি তোর থেকে অনেক দূরে ছিলাম ইমু," আরিমান একহাতে ইমার গালের ওপর জমা চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিল। ওনার গরম শ্বাস ইমার গালে লাগছিল। "এখন আমি সুদে-আসলে হিসেব মেলাব।"
ইমা থমকে গেল। কিন্তু ঠিক সেই রোমান্টিক মুহূর্তটা বরবাদ করতে এক সেকেন্ডও দেরি করল না দরজায় সজোরে দেওয়া ধাক্কা!
"আরিমান ভাই! ইমু ভাবি! জলদি বের হও! আমাদের স্নোরকেলিং আর বিচ ভলিবল ম্যাচ শুরু হচ্ছে! হারলে কিন্তু ডিনারের বিল বিজয়ী দলকে দিতে হবে!" বাইরে থেকে শাওনের চিল চিৎকার ভেসে এলো।
ইমা এক ধাক্কায় আরিমানকে সরিয়ে দিয়ে ফিক করে হেসে দিল। "যান! আপনার প্রিয় ছোট ভাই ডাকছে। ডিনারের বিল বাঁচান গিয়ে!"
আরিমান মেঝের দিকে তাকিয়ে রাগে দাঁত চিবিয়ে বিড়বিড় করল, "এই শাওনটাকে আজ রাতে আমি সমুদ্রে না ছুড়ে ফেললে আমার নাম আরিমান সিকদার না!"
বিকেল গড়াতেই রিসোর্টের প্রাইভেট বিচে শুরু হলো চূড়ান্ত ফানি কাণ্ড।
একদিকে শাওন আর ইমা এক টিম, অন্যদিকে হিয়া আর ইরফান। আরিমান বিচারক হয়ে কাঠের চেয়ারে সানগ্লাস চোখে বসে ছিল। হিমি হাততালি দিচ্ছিল।
শাওন শর্টস আর গায়ে টি-শার্ট চড়িয়ে লাফাচ্ছিল, "ভাবি, বল এলেই উঁচিয়ে মারবা! আমাদের জিততেই হবে!"
ইমা পুরো জোশ নিয়ে বল মারতে গিয়ে ব্যালেন্স হারিয়ে ধপাস করে বালির ওপর পড়ে গেল। ওর মুখে-গাড়ে বালি লেগে একেবারে একাকার।
ইরফান আর হিয়া হেসে গড়ায়। ইমা মুখটা ফুলিয়ে বালিতে বসে রইল। আরিমান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও চেয়ার থেকে উঠে একছুটে ইমার কাছে চলে এলো। হাঁটু গেড়ে বসে খুব যত্ন করে ইমার মুখের বালিগুলো ওনার ধবধবে হাত দিয়ে পরিষ্কার করে দিতে লাগল।
"তুই কি কোনোদিন সাবধানে কিছু করতে পারবি না?" আরিমান ধমকের স্বরে বললেও ওর চোখের জলজল করা চিন্তাটা স্পষ্ট ছিল।
ইমা আরিমানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনি তো আছেন আমাকে তোলার জন্য।"
আরিমানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটল। ও ইমাকে কোল তুলে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিল।
পুরো সময়টা যখন হাসিখুশি আর ফানিনিতে কাটছিল, তখন বিচের শেষ সীমানায় কিছু দূর থেকে দুটো কালো সানগ্লাস পরা লোক বাইনোকুলার দিয়ে ওদের ওপর নজর রাখছিল।
লুসিয়ানো গ্যাংয়ের এক লোক ফোনে ইতালিতে কল করে ইতালিয়ান ভাষায় বলল, "বস, টার্গেট একদম পরিষ্কার। আরিমান সিকদার ওর বউ আর পুরো পরিবার নিয়ে সম্পূর্ণ আনগার্ডেড অবস্থায় এই দ্বীপে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আজ রাতেই আমরা আক্রমণ চালাতে পারি।"
কিন্তু সেই লোকটা জানত না, ঠিক ওর পেছনের গাছের আড়াল থেকে আরিমানের প্রধান সিকিউরিটি অফিসার মার্কো সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল তাক করে দাঁড়িয়ে ছিল।
মার্কো ফিসফিস করে বলল, "ভুল ইনফরমেশন, মাই ফ্রেন্ড। আরিমান সিকদার কখনো আনগার্ডেড থাকেন না।"
একটা হালকা শব্দ হলো, আর সেই গুপ্তচরটা মুহূর্তের মধ্যে ঢলে পড়ল বালির ওপর। মার্কো খুব ঠাণ্ডা মাথায় বডিটা সরিয়ে নিয়ে আরিমানকে সংকেত পাঠাল।
রাত ৯টা।
সৈকতের কাছে ওশেনিয়া রেস্টুরেন্টে ডিনার সাজানো হয়েছে। আলো-আঁধারির মাঝে সানাইয়ের মিউজিক বাজছে।
শাওন দুটো স্কুইডের স্টিক এক সাথে মুখে পুরে বলল, "ভাবি, সত্যি তোমার ওই সুগন্ধি পোলাওয়ের চেয়ে এই ইতালিয়ান সমুদ্রের মাছ অনেক ভালো! আজ অন্তত পেটে এসিড হচ্ছে না!"
ইমা টেবিলের নিচ দিয়ে শাওনের পায়ে এক লাথি মেরে বলল, "শাওন ভাইয়া! তোমার মাথায় কিন্তু আমি আরেকটা প্লাস্টার লাগিয়ে দেব!"
ইরফান আর হিমি হেসে ওঠে। হিয়া শাওনের প্লেট থেকে চিংড়ি কেড়ে নেয়। পুরো টেবিলে আনন্দের বন্যা বইছিল।
আরিমান ওয়াশরুমে যাওয়ার উসিলায় একটু দূরে গিয়ে মার্কোর সাথে দেখা করল।
"কী খবর মার্কো?" আরিমানের গলায় আবার সেই শান দেওয়া ছুরির মতো ধার।
"বস, লুসিয়ানোর তিনজন লোক দ্বীপে ঢোকার চেষ্টা করেছিল। দুজনকে খতম করা হয়েছে, একজন কাস্টডিতে। তবে মনে হচ্ছে ওদের ব্যাকআপ বোট কাল সকালে ট্রাই করবে।"
আরিমান ঠান্ডা মাথায় ওর শার্টের হাতা গুটিয়ে নিল। "কাল সকালে আমরা স্পিডবোটে করে ব্লু লেগুনে যাব। ওদের আসতে দাও। সমুদ্রে কোনো প্রমাণ থাকে না, মার্কো। লুসিয়ানোকে শেষ মেসেজটা কালই দেব।"
"ইয়েস, বস।"
ডিনার শেষে ইমা সমুদ্রের ওপর কাঠের ডেক ধরে একা হেঁটে ভিলার দিকে যাচ্ছিল। হালকা মিষ্টি হাওয়া ওর শাড়ির আঁচল উড়িয়ে দিচ্ছিল।
হঠাৎ পেছন থেকে আরিমান এসে ইমাকে জড়িয়ে ধরল। ইমা চমকে উঠলেও আরিমানের বুকের সেই চেনা সুবাস আর উষ্ণতা পেয়ে শান্ত হয়ে গেল।
"আজকের দিনটা কেমন কাটল, ইমু?" আরিমান ইমার ঘাড়ে মুখ গুঁজে ফিসফিস করল।
"খুব সুন্দর..." ইমা উল্টো ঘুরে আরিমানের গলায় হাত পেঁচিয়ে দিল। "আজ আপনাকে খুব শান্ত লাগছে। কোনো রাগ নেই, কোনো ধমক নেই।"
আরিমান ইমার কোমরটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, "কারণ আমার পুরো পৃথিবী এখন আমার বাহুডোরে।"
ইমা আরিমানের চোখের দিকে তাকাল। চাঁদের আলোয় আরিমানের ধারালো চেহারাটা আজ যেন অনেক বেশি আপন মনে হচ্ছিল। ইমা টিপটিপ পায়ে একটু উঁচু হয়ে আরিমানের থুতনিতে নিজের ঠোঁট দুটো আলতো করে ছুঁইয়ে দিল।
আরিমান এক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর আর কোনো কথা নয়, ইমাকে শূন্যে কোলে তুলে নিয়ে ভিলার দিকে হাঁটতে শুরু করল। ইমা লজ্জায় আরিমানের বুকে মুখ লুকাল।
চলছে.......