ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমিই আমার হৃদয়হরণী

১৫তম পর্ব

লেখক: আশু

#তুমিই_আমার_হৃদয়হরণী পর্ব-১৫

#লেখিকা_আশু

তৃষা কয়েক সেকেন্ডের জন্য পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। করিডোরের আবছা আলো-ছায়ার খেলায় আরিমান সিকদারের অবয়বটাকে ক্রোধের মূর্তির মতো দেখাচ্ছিল। তৃষার কপাল বেয়ে ঠাণ্ডা ঘাম গড়িয়ে পড়ল, হাতের জলের গ্লাসটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। ও খুব ভালো করেই জানে, আরিমান সিকদার কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

মিলানের আন্ডারওয়ার্ল্ডের যার নামে বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খায়, তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মিথ্যা বলা আর জ্যান্ত সিংহের খাঁচায় হাত ঢোকানো একই কথা।

তবুও, নিজের পিঠ বাঁচাতে তৃষা শেষবারের মতো ওর ভেতরের সমস্ত ধূর্ততা এক জায়গায় জড়ো করল। ও কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে একটা শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল, "এ... এসব আপনি কী বলছেন আরিমান ভাই? ইমা আপনাকে রিজেক্ট করেছে চার বছর আগে, আর তার দায় আপনি আমার ওপর চাপাচ্ছেন? আমি কেন ওসব করতে যাব? ও নিজেই তো আপনার ওই রুক্ষ, রাশভারী স্বভাব পছন্দ করত না। নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে এখন আমার নামে বানিয়ে বানিয়ে অপবাদ দিচ্ছেন কেন?"

তৃষার এই অনড় মিথ্যাচার আর মুখের ওপর সাফ অস্বীকার করা দেখে আরিমানের ঠোঁটের কোণে এক কুৎসিত, প্রলয়ঙ্করী হাসি ফুটে উঠল। তৃষা ভয়ে পেছনের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিল।

আরিমান ওর ডানহাতের তর্জনীটা তৃষার নাকের ডগার সামনে তুলে একদম ফিসফিসানি, কিন্তু এক হাড় কাঁপানো বরফশীতল গলায় বলল, "মিথ্যে অভিনয়টা বড্ড কাঁচা হয়ে গেল, মিসেস তৃষা রায়হান। মনে রাখবেন, আরিমান সিকদার বাতাসে ওড়া ধুলোবালি দেখেও বলে দিতে পারে ঝড় কোন দিক থেকে আসছে। ইমা নিজের মুখে কিচ্ছু বলেনি ঠিকই, কিন্তু কাল রাতে ওর চোখের জল আর আজ আপনার এই ভয়ার্ত চেহারাটাই আমার জন্য স্পষ্ট প্রমাণ। তবুও আপনি যখন অস্বীকার করছেন, তখন আমার এই শেষ কথাটা খুব ভালো করে মাথায় মগজে ঢুকিয়ে নিন..."

আরিমান একটু ঝুঁকে তৃষার কানের কাছে নিজের ঠোঁট জোড়া এনে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল:

"আমি যদি কোনোভাবে, কোনো একটা সূত্র ধরে প্রমাণ পেয়ে যাই যে আপনার কোনো নোংরা চালের কারণে ইমা আমার থেকে এই চারটে বছর দূরে সরে ছিল, তবে সেদিনই হবে এই দুনিয়ায় আপনার শেষ দিন, মিসেস তৃষা রায়হান! আপনার ওই জুয়াড়ি আর নেশাখোর বরসহ আপনাকে কোন ড্রেনে বা কোন অতল গহ্বরে গায়েব করব, তা আপনার চেনা পৃথিবীর কোনো পুলিশ বা আদালত খুঁজে পাবে না। সো, জাস্ট স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম মাই ওয়াইফ!"

কথাটা শেষ করেই আরিমান আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। ও গটগট করে নিজের লম্বা কদমে করিডোর পেরিয়ে সোজা ইমার রুমের দিকে চলে গেল। ওদিকে তৃষা দেয়াল ধরে ওখানেই ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। ওর হাত-পা তখন শীতে কাঁপার মতো কাঁপছিল। ও বুঝতে পারল, আরিমান সিকদার সবটা না জানলেও সত্যের একদম দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।

____

বিয়ের পরদিন দুপুর মানেই নতুন বউয়ের রান্নাঘরে প্রথম প্রবেশের নিয়ম, যেটাকে বাঙালি সমাজে চলতি ভাষায় 'বউ ভাত' বা 'মিষ্টি মুখ' করানোর প্রথা বলা হয়। নতুন ভাবি হিমি রান্নাঘরে গিয়ে ঘামতে ঘামতে পোলাও আর কোরমা রাঁধছিল। ইমা আর হিয়া বান্ধবী দুজনে মিলে কোমর বেঁধে ভাবিকে সাহায্য করতে রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছে।

ইমা একটা সুতির অ্যাপ্রন জড়িয়ে নিয়ে খুব ভাব ধরে হিমিকে বলল, "ভাবি, তুমি একদম টেনশন করো না! পোলাওয়ের চাল কীভাবে ঝরঝরে করতে হয়, সেই সিক্রেট রেসিপি আমার ঠোঁটস্থ। আজ এই বাড়ি কেন, পুরো এলাকার মানুষ আমার হাতের জাদুতে কুপোকাত হবে!"

হিয়া পাশ থেকে আলু কাটতে কাটতে ফোড়ন কাটল, "রেখে দাও তোমার জাদুর কাঠি, ইমু! মিলানে গিয়ে তো জল্লাদ ভাইয়ের ভয়ে শুধু ওভেনে পাস্তা গরম করে খেয়েছ। আজ এখানে এসে মাস্টারশেফ হওয়ার ভং ধোরো না তো!"

"আরে দেখিস না কী করি!" ইমা একটা বড় চামচ নিয়ে পাতিলের পোলাও নাড়তে নাড়তে জিদ দেখাল। ও মনে মনে ভাবল, আজ এমন রান্না করবে যে টেবিলে বসে ওই হিটলার লোকটা আঙুল চাটতে বাধ্য হবে।

ইমা নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে পোলাওয়ের সুগন্ধ বাড়ানোর জন্য এক গাদা কেওড়া জল, গোলাপ জল আর শাহী জিরা একসাথে ঢেলে দিল। ও ভাবল, যত বেশি সুগন্ধি, তত বেশি প্রশংসা!

দুপুর আড়াইটা। ডাইনিং টেবিলে রাজকীয় আয়োজন। ইরফানের বাবা-মা, নতুন বর-বউ, শাওন, হিয়া এবং সবার শেষে সাদা পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে গম্ভীর মুখে এসে বসল আরিমান। ও টেবিলে বসতেই চারপাশের পরিবেশটা কেমন যেন একটু থমথমে হয়ে গেল।

শাওন কপালে বরফ দেওয়ার পর এখন একটা ছোট প্লাস্টার লাগিয়ে চামচ হাতে রেডি ছিল। ও আরিমানকে দেখে নিচু স্বরে বলল, "বস, দুপুরের মেন্যু কিন্তু ডেঞ্জারাস। আমাদের ভাবি আজ রান্নাঘরে ঢুকেছিল। কোনো লাইভ এক্সপেরিমেন্ট বা বিষক্রিয়া হলে কিন্তু আমি আগেভাগেই এম্বুলেন্স ডাকব!"

আরিমান চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে ঠান্ডা গলায় বলল, "বিষ দেওয়ার সাহস ওর হবে না। তবে রান্না কেমন হয়েছে, সেটা মুখে দিলেই বোঝা যাবে।"

ইমা খুব গর্বের সাথে বাটি ভরে পোলাও আর খাসির মাংস এনে আরিমানের প্লেটের সামনে রাখল। ও আরিমানের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে বিজয়ী হাসি দিয়ে বলল, "নিন মিস্টার সিকদার, খেয়ে দেখুন। একদম স্পেশাল রেসিপি!"

আরিমান ইমার দিকে একবার আড়চোখে তাকাল। লাল পাড়ের সুতি শাড়িতে মেয়েটার কপালে তখনো রান্নার হালকা ঘামবিন্দু চকচক করছে, যেটা ওকে আরও মায়াবী করে তুলেছে। কিন্তু আরিমান তো আরিমানই! ও মুখে কোনো ভাবান্তর না এনে চামচ দিয়ে এক লোকমা পোলাও মুখে পুরল।

পুরো ডাইনিং টেবিল তখন নিস্তব্ধ। ইমা বুক দুলিয়ে আরিমানের রিভিউর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল।

আরিমান পোলাওটা মুখে দিয়ে দুবার চিবোলো। তারপর ওর কপালে সেই চেনা তিনটা কড়া ভাঁজ পড়ল। ও চিবানো বন্ধ করে গ্লাস থেকে ঢকঢক করে জল খেল। এরপর প্লেটের দিকে অত্যন্ত করুণ চোখে তাকিয়ে ইমার দিকে তাকাল।

"কী হলো? কথা বলছেন না কেন?" ইমা একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল।

আরিমান অত্যন্ত গম্ভীর ও কড়া গলায়, কিন্তু এক অদ্ভুত ফানি টোনে রিভিউ দেওয়া শুরু করল, "ইমা, তুই কি এটা পোলাও রেঁধেছিস নাকি কোনো সুগন্ধি পারফিউমের ফ্যাক্টরি প্লেটে উপুড় করে দিয়েছিস? এটা মুখে দেওয়ার পর আমার মনে হচ্ছে আমি বিরিয়ানি খাচ্ছি না, আস্ত একটা ল্যাভেন্ডার সাবান চিবোচ্ছি! চালগুলো এতটাই ঝরঝরে হয়েছে যে একেকটা চাল একেক দিকে যুদ্ধ ঘোষণা করে ছুটে পালাচ্ছে। আর নুন? নুন মনে হয় তুই চামচ দিয়ে দিসনি, বস্তা থেকে সরাসরি এয়ার ড্রপ করেছিস!"

"কীহ্!" ইমা আকাশ থেকে পড়ল। "আপনি বানিয়ে বলছেন! ভাবি, দেখো ওনার কথা!"

শাওন এবার সাহস করে এক চামচ মুখে দিয়ে চোখ দুটো গোল গোল করে বলল, "ওরে বাবারে! আরিমান ভাই একদম খাঁটি কথা বলেছে। ভাবি আপনি কি পোলাওতে গোলাপ জলের বদলে আতর ঢেলেছেন নাকি ? আমার তো মনে হচ্ছে ফুসফুস পর্যন্ত সুগন্ধে ভরে গেল। খোদার কসম, দেয়ালে ধাক্কা খাওয়ার পর আমার যে স্মৃতিশক্তি একটু কমেছিল, এই নুনের চোটে সেটা এক সেকেন্ডে ফেরত চলে এসেছে!"

পুরো টেবিলের মানুষ হাসিতে ফেটে পড়ল। ইরফান নিজের মুখ চেপে হাসতে লাগলেন। হিমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, "আসলে ইমা তো পোলাওটা..."

"ভাবি, তুমি ওর ডিফেন্স করো না," আরিমান খাসির মাংসের বাটিটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলল,

"মাংসের গ্রেভিটা দেখে মনে হচ্ছে কোনো কয়লার খনি থেকে তুলে আনা হয়েছে। কালো কুচকুচে! তুই কি মাংস সেদ্ধ করেছিস নাকি ওটাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে কয়লা বানিয়েছিস, ইমা?"

ইমা রাগে, অপমানে এক্কেবারে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। এত কষ্ট করে রাঁধল, আর এই লোকটা সবার সামনে ওর রান্নার বারোটা বাজিয়ে দিল! ও দুই হাত কোমরে দিয়ে আরিমানের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জেদি গলায় বলল, "আপনার যদি এতই সমস্যা, তবে খাবেন না! যান, উঠে যান টেবিল থেকে! আপনার ওই ইতালির শেফকে এনে রান্না করিয়ে খান। আমার হাতের সাবান-পোলাও আর কয়লা-মাংস আপনাকে আর ছুঁতেও হবে না!"

ইমা এক ঝটকায় আরিমানের সামনে থেকে ওনার জলের গ্লাসটা কেড়ে নিয়ে হনহন করে ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। ও যাওয়ার সময় রাগে জোরে পা ফেলছিল, যেন মেঝেটাই ভেঙে ফেলবে।

আরিমান ইমার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই একটা আলতো মায়াবী হাসি হাসল। ও চামচটা রেখে বাকি সবাইকে বলল, "রাগ দেখেছিস? রান্না খারাপ করবে, আবার ধমকও দেবে।"

শাওন এবার ফিসফিস করে বলল, "তা তো বুঝলাম বস, কিন্তু আপনি যে এই কড়া রিভিউ দিলেন, আজ রাতে বাসর ঘরের দরজা লক হলে আপনার কপালে কিন্তু নির্ঘাত ওই কয়লা-মাংসেরই মার আছে!"

আরিমান শাওনকে একটা কড়া ধমক দিয়ে বলল, "চুপ কর! নিজের প্লেটে মন দে।" যদিও ও মনে মনে ভাবছিল, রাগী ইমাকে রাগানোর মাঝেও এক অদ্ভুত আনন্দ আছে, যা মিলানের বিষণ্ণতায় ও বড্ড মিস করেছিল।

বিকেলের পর্ব শেষ হতে না হতেই ড্রয়িংরুমে আবার এক নতুন সভার ডাক পড়ল। এবার আলোচনার মূল বিষয় হলো নতুন বর-বউয়ের হানিমুন!

ইরফানের মা সোফায় বসে বেশ আয়েশ করে পান চিবোতে চিবোতে বললেন, "তা ইরফান বাবা, বউমাকে নিয়ে হানিমুনে কোথায় যাচ্ছিস শুনি? আমাদের সময় তো তোদের বাবা সোজা কক্সবাজার নিয়ে গেছিল। এখন তো দিনকাল বদলেছে।"

ইরফান একটু লজ্জা পেয়ে হিমির দিকে তাকালো। হিমি মাথা নিচু করে মৃদু হাসছিল। ইরফান বলল, "মা, আমি ভাবছিলাম হিমির যেহেতু পাহাড়ি এলাকা পছন্দ, আমরা সাজেক বা বান্দরবানের দিকে একটা রিসোর্ট বুক করব।"

ঠিক তখনই ওপাশ থেকে কফি কাপ হাতে নিয়ে শাওন ফোড়ন কাটল, "আরে দূর ইরফান ভাই! এই ডিজিটাল যুগে এসে সাজেক ভ্যালি? না না, এটা হতে দেওয়া যায় না। আমি আর হিয়া মিলে অলরেডি একটা মাস্টার প্ল্যান করে ফেলেছি!"

আরিমান তখন এক কোণে সোফায় বসে ল্যাপটপে মিলানের কিছু বিজনেস মেল চেক করছিল। ও শাওনের কথা শুনে মাথা না তুলেই কড়া গলায় বলল, "তোর ওই মাস্টার প্ল্যানে নিশ্চয়ই কোনো ফালতু আইডিয়া ছাড়া কিছু থাকবে না, শাওন।"

"আরে না আরিমান ভাই, এবার একদম সলিড আইডিয়া!" শাওন সোফার ওপর একটু এগিয়ে এসে বলল, "আমরা ঠিক করেছি এবার ডাবল বা ট্রিপল ডেট হানিমুন হবে! ইরফান ভাই আর নতুন ভাবি তো যাবেই, সাথে আপনি আর ইমু ভাবিও যাবেন। আর যেহেতু এই পুরো ট্যুরের গাইড আর এন্টারটেইনমেন্ট পার্টনার আমি আর হিয়া, তাই আমরাও আপনাদের সাথে ফ্রি-তে যাব! ডেস্টিনেশন হলো—মালদ্বীপ!"

"কীহ্!" ল্যাপটপ থেকে এক ঝটকায় চোখ তুলে আরিমান শাওনের দিকে এমন একটা চাউনি দিল যেন ও শাওনকে এখনই জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে।

"শাওন, তোর কি মাথাটা আসলেও খারাপ হয়ে গেছে? হানিমুন কোনো ফ্যামিলি পিকনিক যে সবাই মিলে বস্তা বেঁধে চলে যাবি?"

ইমা এতক্ষণ এক পাশে বসে হিয়ার সাথে ফিসফিস করছিল। মালদ্বীপের নাম শুনে ওর চোখ দুটো চকচক করে উঠল। মিলানের সেই বদ্ধ ভিলার পর ও অনেকদিন ধরে সমুদ্রের নীল জল দেখার স্বপ্ন দেখছিল। ও এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে আরিমানের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল, "কেন যাবেন না? বাড়ির সবাই যখন বলছে, তখন সবার যাওয়া উচিত। তাছাড়া ইরফান ভাই আর হিমিরও একা একা বোরিং লাগবে। আমরা সবাই একসাথে গেলে কত মজা হবে! হিয়া, তুই বল না!"

হিয়াও সুযোগ বুঝে ইরফানের মায়ের হাত ধরে ওকালতি শুরু করল, "হ্যাঁ কাকিমা, আপনিই বলুন না। আরিমান ভাই তো সারাক্ষণ ইমুকে ঘরে বন্দি করে রাখে। এই উসিলায় ওরাও একটু ঘুরে আসুক। আর শাওন তো সব ব্যবস্থা করেই রেখেছে।"

ইরফানের মা-ও এবার আরিমানের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় হুকুমের সুরে বললেন, "আরিমান, ছোটরা যখন এত করে বলছে, আর ইমা মা-টারও যখন যাওয়ার ইচ্ছে, তখন তুই আর না করিস না। ব্যবসায়িক কাজ তো সারাজীবনই থাকবে। তোরা চারজন আর সাথে এই দুই বাঁদর শাওন আর হিয়াও একসাথেই যা। আমি বলে দিলাম, ব্যস!"

বাড়ির বড়দের জোরাজোরি আর ইমার ওই জ্বলজ্বল করতে থাকা আশাবাদী চোখের দিকে তাকিয়ে আরিমান আর না করতে পারল না। ও এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ল্যাপটপটা বন্ধ করে বলল, "ওকে। কিন্তু মালদ্বীপে গিয়ে শাওন যদি কোনো ফালতু কাণ্ড করেছিস, তবে তোকে ওখানকার সমুদ্রের হাঙরের মুখে ফেলে দিয়ে আসব, এটা মাথায় রাখিস।"

শাওন নিজের কপালে হাত দিয়ে বলল, "উফ! ডন ভাইয়ের মুখে সবসময় শুধু খুনখারাপির কথা! ভাবি, একটু সামলান আপনার বরকে!" ইমা আরিমানের দিকে তাকিয়ে একটা ভেঙচি কাটল, আর আরিমান রাগে নিজের দাঁত কিড়মিড় করতে লাগল।

ট্যুর ফাইনাল হওয়ার পর রাতেই আরিমান নিজের রুমে বসে ইতালির সিকিউরিটি টিমের সাথে ফোনে কথা বলছিল। ওনার গলার স্বর হঠাৎ করেই ভীষণ গম্ভীর আর ধারালো হয়ে উঠল। ও জানালার কাচ দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ছিল।

ওপাশ থেকে ওর প্রধান সিকিউরিটি অফিসার মার্কো বলছিল, "বস, মিলান আর নেপলসের বর্ডারে আমাদের একটা বড় কনসাইনমেন্টে মালের চালান হামলা হয়েছে। সন্দেহ করা হচ্ছে, আমাদের পুরনো শত্রু 'লুসিয়ানো গ্যাং' আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। ওরা খবর পেয়েছে আপনি এখন ইতালিতে নেই, তাই এই সুযোগে ওরা আপনার ব্যবসার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে।"

আরিমানের চোখ দুটো এক মুহূর্তে অন্ধকার হয়ে গেল। ওর ভেতরের সেই ভয়ংকর মাফিয়া ডনটা জেগে উঠল। ও ঠান্ডা, নিরেট গলায় বলল, "মার্কো, লুসিয়ানোকে পরিষ্কার মেসেজ দিয়ে দাও আরিমান সিকদার দেশ ছেড়েছে, তার ক্ষমতা নয়। যারা আমার কাজে হাত দিয়েছে, তাদের একেকটার হাত কেটে নেপলসের নদীতে ভাসিয়ে দাও। আর মালদ্বীপের ট্যুরে আমার চারপাশে যেন থ্রি-লেয়ার হাই সিকিউরিটি থাকে। ইমার ওপর যেন একটা আঁচও না আসে।"

ফোনটা রাখতেই আরিমান দেখল ইমা দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। ওর হাতে এক গ্লাস দুধ। আরিমানের এই রূপটা ইমাকে আবার সেই মিলানের দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিল। ও কিছুটা থমকে গিয়ে বলল, "কী হয়েছে? আবার কোনো ঝামেলা?"

আরিমান নিজের মুখের সেই কড়া ভাবটা এক নিমেষে লুকিয়ে ফেলে একটা হালকা হাসি দেওয়ার চেষ্টা করল। ও এগিয়ে এসে ইমার হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে বলল, "কিচ্ছু না। বিজনেসের একটু ঝামেলা। তুই এত রাতে এখানে কী করছিস?"

ইমা একটু ইতস্তত করে বলল, "আসলে... মালদ্বীপের টিকিট কি সত্যিই কাটা হয়ে গেছে? আপনি রাগ করছেন না তো?"

আরিমান থেমে বলে,,রাগ কীসের জন্য হবে?

ইমা বলল,,'এই যে জোরাজোরিতে রাজি করানো তে!!"

হুট করে আরিমান দাঁড়িয়ে ইমার কপালে টোকা মেরে বলল,,'আপনি ঘুমান মিসেস সিকদার আর কালকের জন্য প্রস্তুত হোন। গুড নাইট"

ইমা একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে আরিমানের দিকে তাকিয়ে বলল,,"গুড নাইট "

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন