#তুমিই_আমার_হৃদয়হরণী পর্ব-১৭
#লেখিকা_আশু
কাঠের ভিলার বন্ধ দরজার ওপাশে তখন বাহিরের সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের গর্জন ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল দুজনের হৃদস্পন্দনের তোড়ে। চাঁদের স্নিগ্ধ রূপালী আলো কাচের ফ্লোর চিরে ঘরের ভেতর এসে ছড়িয়ে পড়েছিল। আরিমান ধীর পায়ে ইমাকে বিছানার ওপর নামিয়ে দিল। ইমার চোখের পলক তখন লজ্জায় অবনত, গাল দুটো রাঙা আপেলের মতো লাল।
আরিমান ঝুঁকে পড়ে ইমার ভেজা ভেজা ঠোঁটের ওপর নিজের বুভুক্ষু ঠোঁট জোড়া ডুবিয়ে দিল। চার বছরের বিরহ, জমে থাকা অভিমান আর তীব্র ভালোবাসার এক উত্তাল আগ্নেয়গিরি যেন এক মুহূর্তে ফেটে পড়ল। ইমাও আর নিজেকে সামলাতে পারল না, ও শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল আরিমানের শক্ত চওড়া পিঠ।
আরিমানের হাতের চওড়া বাঁধনে ইমা অনুভব করছিল এক পরম আশ্রয়। মিলানের সেই ভয়ংকর ডন আজ ইমার ভালোবাসার কাছে সম্পূর্ণ নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছে। ভালোবাসার সেই মিষ্টি ও গভীর ঘোরের মাঝে কখন যে রাত গড়িয়ে শেষ প্রহরে পৌঁছাল, তা দুজনের কেউই টের পেল না।
ভোরের আলো ফোটার ঠিক পরপরই আরিমানের ফোনের ভাইব্রেশন মোড অন হয়ে টেবিলের ওপর একটানা কাঁপতে শুরু করল।
আরিমানের চোখ খুলতেই ও দেখল ইমা ওর বুকের ওপর মাথা রেখে পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। ওর ডানা মেলা পরি যেন একদম নিষ্পাপ ভঙ্গিতে নিঃশ্বাস ফেলছে। আরিমান অত্যন্ত সাবধানে, ইমার ঘুমে যেন ব্যাঘাত না ঘটে, সেভাবে ইমার মাথাটা বালিশে রেখে বেড থেকে উঠল। ও টি-শার্টটা গায়ে জড়িয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে ফোনটা কানে তুলল।
"বল মার্কো," আরিমানের কণ্ঠ এক নিমেষে সেই
বরফশীতল মাফিয়া ডনের রূপ নিল।
ওপাশ থেকে মার্কোর তাড়াঘোড়া গলার আওয়াজ এলো, "বস! লুসিয়ানোর ব্যাকআপ টিম অলরেডি নীল লেগুনের প্রাইভেট চ্যানেল অতিক্রম করেছে। ওদের সাথে তিনটি সশস্ত্র স্পিডবোট আর একটা মাঝারি সাইজের স্পিড-ইটের বোট আছে। ওরা অত্যন্ত ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এগোচ্ছে। তবে আরও একটা জরুরি খবর আছে বস আজ কাল ইরফান স্যার আপনাকে যে মেসেজটা চেক করতে বলেছিলেন, সেটা তদন্ত করেছি স্যার ।"
আরিমানের চোখের চাউনি কড়া হয়ে উঠল, "কী মনে হলো ?"
"বস, চার বছর আগে ইমা ম্যাম আপনাকে কেন রিজেক্ট করেছিলেন এবং তৃষা রায়হান কীভাবে ইমা ম্যামকে ব্ল্যাকমেইল করেছিল, তার সমস্ত কল রেকর্ড, ফেক অডিও ফাইল । সবাটাই কালেক্ট করেছি
বিষ খেয়ে আত্নহত্যার করার ব্লাকমেইল করেছিল তৃষা রায়হান।ঐ পার্টিতে ম্যাম যাওয়ার আগে বার বার ফোনে হুমকি দিচ্ছিল তৃষা রায়হান৷ আমি বপনাকে অডিও রেকর্ড পাঠিয়েছি "
আরিমান এক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। নিজের
ফাইলের প্রতিটা অডিও ক্লিপ আর নথি দেখার সাথে সাথে আরিমানের চোখের মনি দুটো রক্তবর্ণ ধারণ করল। চার বছর আগে তৃষা রায়হান ইমাকে ভয় দেখিয়ে ইমাকে বাধ্য করেছিল আরিমানকে ছেড়ে যেতে! ইমা তৃষাকে রক্ষা করতেই নিজের ভালোবাসাকে বিসর্জন দিয়েছিল!
আরিমানের হাতের মুঠি এত শক্ত হয়ে বন্ধ হলো যে ফোনের কাচ প্রায় ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ও দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল, "তৃষা রায়হান... তুই আমার ইমার জীবন থেকে চারটে বছর কেড়ে নিয়েছিস! তোকে কী সাজা দেব, তা আমি ঢাকা ফিরে হাড়হাড় বুঝিয়ে দেব।"
কিন্তু এই মুহূর্তে ওর সামনে ডাবল চ্যালেঞ্জ। তৃষার হিসাব পরে হবে, আগে আজ এই দ্বীপে ও নীল লেগুনে ওত পেতে থাকা ইতালিয়ান শকুনের দলকে সমূলে উপড়ে ফেলতে হবে।
আরিমান ঘরে ফিরে এসে দেখল ইমা চোখ ডলে সোজা হয়ে বসছে। ইমার চুলগুলো চারপাশে উস্কোখুস্কো, চেহারায় এক অপরূপ স্নিগ্ধতা।
আরিমান নিজের ভেতরের রাগ আর উত্তেজনার পারদটা এক নিমেষে লুকিয়ে ফেলে মুখে এক চিলতে বিজয়ী হাসি ফুটিয়ে তুলল। ও এগিয়ে গিয়ে ইমার কপালে একটা দীর্ঘ চুমু এঁকে দিল।
"শুভ সকাল, আমার হৃদয়হরণী," আরিমানের গলার আওয়াজটা মায়াবী শোনালো।
ইমা আলতো করে হেসে আরিমানের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, "শুভ সকাল! আজ এত সকালে উঠে কার সাথে কথা বলছিলেন?"
"সেক্রেটারি ," আরিমান ইমার গালে হাত রেখে বলল, "আজ আমাদের ব্লু লেগুনে যাওয়ার কথা ছিল না? শাওন আর হিয়া তো নিশ্চয়ই ডাইনিংয়ে হৈচৈ শুরু করে দিয়েছে। তুই ফ্রেশ হয়ে নে।"
সকাল সাড়ানয়টা।
রিসোর্টের প্রাইভেট জেটিতে তখন যেন একটা ছোটখাটো মেলা বসেছে। শাওন আজ আবার নতুন এক কার্টুনপ্রিন্টের শর্টস আর সানগ্লাস পরে স্নোরকেলিং গিয়ার হাতে নিয়ে নাচানাচি করছে। হিয়া আর হিমি হাসাহাসি করছে, আর ইরফান শান্ত মুখে এক কোণে দাঁড়িয়ে আরিমানের দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ চোখে তাকাল।
আরিমান ধীর পায়ে ইরফানের কাছে এগিয়ে এলো। "মেসেজটা দেখেছি ইরফান। থ্যাঙ্কস।"
ইরফান আরিমানের কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বললেন, "তৃষার ব্যাপারটা নিয়ে ঢাকা ফিরে আমরা শান্ত মাথায় অ্যাকশন নেব।"
আরিমান সানগ্লাসটা চোখে চড়িয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, ইরফান আমি আধঘণ্টার জন্য দূরে একটু 'বিজনেস মিটিং' শেষ করে আসব।"
কথা শেষ করতেই এদিকে ইমা ইতালিয়ান হোয়াইট ম্যাক্সি ড্রেস পরে হেঁটে এলো। ড্রেসের ওপর হালকা লালচে ওড়না ওড়ানো। ইমাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন নীল সমুদ্রের বুকে ভেসে ওঠা এক পদ্মফুল।
শাওন চিল্লাল, "আরে ভাই! গল্পগাথা বন্ধ করো! বোট রেডি। আজ আমি লাইভ হাঙ্গর ধরে সেলফি তুলব!"
ওরা সবাই মিলে একটা মাঝারি সাইজের বিলাসবহুল ইয়াটে চড়ে বসল। ইয়াটের চালক হিসেবে ছিল মার্কোর বিশ্বস্ত লোক।
ইয়াট যখন রিসোর্ট থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ব্লু লেগুনের কাছে পৌঁছাল, তখন চারপাশের পানি এতই নীল আর স্বচ্ছ যে নিচে সাঁতার কাটা প্রবাল প্রাচীর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। ইমা, হিমি আর হিয়া ইয়াটের ডেকে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
আরিমান হঠাৎ ইমার কাছে এসে দাঁড়াল। ও ইমার কানের কাছে ঝুঁকে নিচু গলায় বলল, "ইমু, আমি মার্কোর সাথে ছোট স্পিডবোটটায় করে ওপাশের ক্লিফটার দিকে যাচ্ছি। ওখানে আমাদের ইতালিয়ান ক্লায়েন্টের একটা ছোট কাজ আছে। তুই শাওন আর ইরফানের সাথে ইয়াটেই থাকবি। একদম পানির গভীরে যাবি না, ওকে?"
ইমা একটু অবাক হয়ে আরিমানের হাত ধরে ফেলল। "এখন কাজ? আমরা তো ঘুরতে এসেছি! আপনি এত কাজের পাগল কেন বলুন তো?"
আরিমান ইমার হাতে একটা হালকা চাপ দিয়ে পরম মায়ায় বলল, "বিশ মিনিট, ইমু। জাস্ট দশ মিনিট। তারপর পুরো দিনটা শুধুই তোর।"
ইমা আরিমানের চোখের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত আশঙ্কা অনুভব করল, কিন্তু আরিমানের কড়া আর আত্মবিশ্বাসী চাহনি দেখে ও আর না করতে পারল না। "ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি আসবেন। না এলে কিন্তু আমি শাওন ভাইয়ার সাথে পুরো ডাবের জল শেষ করে দেব!"
আরিমান একটু হেসে ইমার গালে হাত ছুঁইয়ে ইয়াটের পেছনের ডেক থেকে একটা হাই-স্পিড ট্যাকটিক্যাল বোটে গিয়ে উঠল। বোটে আগে থেকেই ছিল মার্কো এবং ওর তিনজন ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সিকিউরিটি গার্ড। বোটে চারটে অত্যাধুনিক সাব-মেশিন গান আর সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল রাখা ছিল।
বোটের ইঞ্জিন গর্জে উঠতেই ওটা মুহূর্তের মধ্যে নীল জল চিরে ক্লিফের আড়ালে লুকিয়ে থাকা লেগুনের গভীর চ্যানেলের দিকে ছুটে গেল।
ক্লিফের পেছনে বিশাল পাহাড়ের আড়ালে আস্তানা গেড়েছিল লুসিয়ানো গ্যাংয়ের তিনটে কালচে স্পিডবোট। মাঝখানের বোটে দাঁড়িয়ে ছিল লুসিয়ানোর ডানহাত, কুখ্যাত ইতালিয়ান হিটম্যান—মারিও।
মারিও বাইনোকুলার দিয়ে ইয়াটের দিকে নজর রাখছিল। ও ফোনে বলছিল, "হাঁ, শিকার একদম ফাঁদে। আরিমান সিকদার মূল ইয়াট ছেড়ে ছোট বোটে করে আমাদের দিকেই আসছে। মনে হচ্ছে ও আমাদের উপস্থিতি টের পেয়েছে। ওকে একবারে শেষ করবো!"
কিন্তু মারিও বুঝতে পারেনি যে ও যাদের শিকার ভাবছিল, সে শিকার নয় এক ক্ষুধার্থ সিংহ!
হঠাৎ সমুদ্রের নীরবতা চিরে আরিমানের স্পিডবোট একদম ৩৬০ ডিগ্রি টার্ন নিয়ে মারিও'র বোটের উল্টো দিক থেকে বাতাসের বেগে আছড়ে পড়ল।
"ফায়ার!" মারিও চিৎকার করে ওঠার আগেই আরিমানের নির্দেশে মার্কো আর ওর লোকজন ভারী অটোমেটিক রাইফেল দিয়ে গুলি চালানো শুরু করল।
সাইলেন্সার লাগানো গুলির বিকট শব্দে নীল লেগুনের পানি রক্তে লাল হতে শুরু করল।
আরিমানের হাতে ছিল একটা ব্ল্যাক ট্যাকটিক্যাল পিস্তল। ও বোটের হ্যান্ডেল ধরে একা হাতে চালকের আসনে বসেছিল, আর অন্য হাতে সুনির্দিষ্ট নিশানা করে একের পর এক শত্রুকে নিকেশ করছিল। ওনার চোখে কোনো ভয় বা দ্বিধা ছিল না, ছিল শুধু এক প্রলয়ঙ্করী ধ্বংসাত্মক আগুন। যে আগুন ইমার ক্ষতি করতে চাওয়া প্রতিটা শত্রুকে ছাই করে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত।
লুসিয়ানোর একটা স্পিডবোট আরিমানের বোটে ধাক্কা মারার চেষ্টা করতেই আরিমান বোটের গতি বাড়িয়ে এক অদ্ভুত কায়দায় ড্রাফট করল। বোটটি শূন্যে লাফিয়ে উঠে প্রতিপক্ষের বোটের ড্রাইভারকে সোজা গুলি করে ফেলে দিল পানিতে।
মাত্র বিশ মিনিটের এক ভয়ংকর ও রক্তক্ষয়ী মাফিয়া এনকাউন্টারে লুসিয়ানোর দুটো বোট সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে পানির নিচে তলিয়ে গেল। বাকি থাকা শেষ বোটে মার্িও রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল।
আরিমান নিজের বোটটা মারিও'র বোটের সাথে ভিড়াল। ও খুব ধীরপায়ে, ধবধবে সাদা টি-শার্টে এক ফোঁটা রক্তের দাগ লাগতে না দিয়ে মারিও'র বোটে পা রাখল।
মারিও ভীতিজনক চোখে আরিমানের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, "আ... আরিমান সিকদার... লুসিয়ানো তোমাকে ছাড়বে না..."
আরিমান মারিওর বুকের ওপর নিজের জুতোর তলাটা শক্ত করে চেপে ধরল। ও একদম বরফশীতল গলায় ইতালিয়ান ভাষায় ফিসফিস করে বলল, "লুসিয়ানোকে গিয়ে বলিস, আরিমান সিকদার যাকে ভালোবাসে, তার দিকে নজর দিলে আমি পুরো নেপলস শহর ড্রেনে ভাসিয়ে দেব। আর শোন... এই নীল সমুদ্র তোদের মতো আবর্জনার একদম উপযুক্ত কবরস্থান।"
একটা নিখুঁত পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক শট! মারিওর নিথর দেহটা স্পিডবোট থেকে গড়িয়ে সোজা সমুদ্রের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেল।
আরিমান পিস্তলটা নিজের পকেটে পুরে মার্কোর দিকে তাকাল। "মার্কো, ক্লিয়ার দ্য এরিয়া। বোটগুলো ডুবিয়ে দাও। ইমা যেন একটা গুলির শব্দও না শুনতে পায়।"
"ইয়েস, স্যার !" মার্কো জানাল।
৪০ মিনিট পর।
ইয়াটের ডেকে দাঁড়িয়ে ইমা বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। ওনার মনের ভেতর কেমন যেন একটা অজানা অস্থিরতা কাজ করছিল।
শাওন পাশ থেকে একটা চিপসের প্যাকেট চিবোতে চিবোতে বলল, "ভাবি, তুমি এত টেনশন করছ কেন? আরিমান ভাই তো কোনো বাচ্চা ছেলে না যে সমুদ্রে হারিয়ে যাবে! নিশ্চয়ই কোনো কোটি টাকার চুক্তি সই করছে।"
"তুমি থামবে শাওন ভাইয়া?" ইমা বিরক্ত হয়ে বলল, "বিশ মিনিট বলেছিল, এখন তো একঘন্টা পার হয়ে গেল!"
ঠিক তখনই সমুদ্রের বুকে শুভ্র ফেনা উড়িয়ে আবার ফিরে এলো সেই স্পিডবোট। ইমা একছুটে ইয়াটের রেলিংয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
আরিমান বোট থেকে লাফিয়ে ইয়াটের ডেকে উঠে এলো। ওনার চুলগুলো বাতাসের তোড়ে একটু এলোমেলো, শার্টের হাতা গুটানো, কিন্তু মুখে সেই শান্ত ও গম্ভীর অভিব্যক্তি।
ইমা রাগ দেখিয়ে আরিমানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। "কোথায় ছিলেন এতক্ষণ? আপনি জানেন আমি কতটা ভয় পাচ্ছিলাম?"
আরিমান ইমার দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ আগের সেই ভয়ংকর রূপের কোনো ছাপই এখন ওর চেহারায় নেই। ও খুব মায়াবী চোখে ইমার দিকে তাকিয়ে ইমার ফর্সা মুখটা দুই হাতে তুলে নিল।
"তোর ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই ইমু। যত দিন এই আরিমান সিকদার বেঁচে আছে, তোকে ছোঁয়ার ক্ষমতা এই দুনিয়ায় কারও নেই।"
ইমা আরিমানের চোখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল। ও বুঝতে পারল না কেন, কিন্তু আরিমানের এই কথায় এমন এক বিশ্বাস ছিল, যা ইমার ভেতরের সমস্ত অস্থিরতা এক মুহূর্তে উধাও করে দিল।
শাওন দূর থেকে চেঁচিয়ে বলল, "হয়েছে হয়েছে! রোমান্স সাময়িকভাবে বন্ধ রাখুন! এখন আমাদের পানির নিচে স্নোরকেলিং করার টাইম! সবাই ডাইভ মাস্ক পরো!"
আরিমান ইমার হাত ধরে মিষ্টি হেসে বলল, "চল, তোকে পানির নিচের দুনিয়াটা দেখাই।"
দুপুরের রোদে নীল লেগুনের শান্ত পানিতে চলল স্নোরকেলিং আর ওয়াটার স্পোর্টসের আনন্দ। ইমা আর আরিমান লাইফ জ্যাকেট পরে একসাথে পানির নিচে ডুব দিল। রঙিন কোরাল, ছোট ছোট গ্লাস ফিশ আর সামুদ্রিক কচ্ছপ দেখে ইমা পানির নিচেও হাত নেড়ে বাচ্চার মতো আনন্দ প্রকাশ করতে লাগল।
আরিমান পানির নিচে ইমার হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছিল। কাচের জল ভেদ করে আসা সূর্যের আলোয় ইমার মুখটা জলপরীর মতো দেখাচ্ছিল। আরিমান পানির নিচে ইমার খুব কাছে এসে ওর কপালে একটা হালকা স্পর্শ দিল। ইমা পানির ভেতরেই ওর চোখ দুটো বুজে সেই অনুভূতির স্বাদ নিল।
পানির ওপর ভেসে উঠতেই শাওন হাপাতে হাপাতে বলল, "ওরে বাবারে! একটা কচ্ছপ আমাকে পিছনে তাড়া করছে, তার বউকে মনে হয় ছুতে গিয়েছিলাম। আমি আর পানিতে নামছি না!"
হিয়া আর হিমি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল। পুরো ইয়াট জুড়ে আবার ফিরে এলো আনন্দের কলরোল।
সন্ধ্যা নামার মুখে সবাই যখন ওয়াটার ভিলাতে ফিরে এলো, তখন পুরো আইল্যান্ডে এক মায়াবী নীরবতা নেমে এসেছে।
ইমা ফ্রেশ হয়ে একটা মিষ্টি গোলাপি রঙের সুতির গাউন পরে ভিলার বাইরের প্রাইভেট সানের ডেকে বসে ছিল। ও হাঁটু দুটো বুকের কাছে টেনে নিয়ে সমুদ্রের পাড়ে আছড়ে পড়া ঢেউগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল।
আরিমান পেছন থেকে এসে ইমার কাঁধে একটা হালকা ব্ল্যাঙ্কেট বা চাদর জড়িয়ে দিল। তারপর ও ইমার পাশেই মেঝের ওপর বসল।
"কী ভাবছিস?" আরিমান ইমার কাধে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিল।
ইমা আরিমানের চুলে নিজের আঙুলগুলো চালিয়ে দিতে দিতে খুব নরম গলায় বলল, "ভাবছি চার বছর আগের কথা। যখন আমি আপনাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম... আমি সত্যি খুব বাধ্য হয়েছিলাম আরিমান। কিন্তু আজ এই নীল সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, আমাদের এই মিলনটা বোধহয় ওপরওয়ালাই লিখে রেখেছিলেন।"
আরিমানের বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে উঠল। ও জানে ইমা তৃষার পাপের কথা এখনো আরিমানকে বলতে পারছে না কেবল ওর ক্ষতি হওয়ার ভয়ে। কিন্তু আরিমান তো সব জেনে গেছে!
আরিমান ইমার কোল থেকে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসল। ও ইমার দুটো হাত নিজের বিশাল হাতের তালুতে তুলে নিয়ে একদম গভীর চোখে তাকাল।
"ইমু... তুই আমাকে চার বছর আগে কিছু বলিসনি, কারণ তুই তৃষাকে বাঁচাতে চেয়েছিলিস, তাই তো?"
ইমা চমকে উঠে চোখ দুটো বড় বড় করল! ওর গলার আওয়াজ আটকে গেল, "আ... আপনি... আপনি কী বলছেন?"
চলবে......