#তুমিই_আমার_হৃদয়হরণী পর্ব-২৪
#লেখিক_আশু
সূর্য ঢলে পড়ার সাথে সাথে সিকদার ভিলার দিঘির পানিতে যেন তরল সোনার রঙ ছড়িয়ে পড়ল। আয়াত প্রজাপতিটা হাত থেকে উড়িয়ে দিয়ে খিলখিল করে হাসতে হাসতে আরিমান আর ইমার দিকে দৌড়ে এলো।
"বাবা! পেজাপতিটা উড়ে গেল!" আয়াতের কণ্ঠে কান্নার ভাব হলেও চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক।
আরিমান ঝুঁকে এক টানে মেয়েকে কোলে তুলে নিল। "উড়ে গেছে তো কী হয়েছে সোনা? বাবা তোমাকে এরচেয়েও সুন্দর হাজারটা প্রজাপতি এনে দেবে।"
"না বাবা, ওদের বাচ্চাদের জন্য প্রজাপতিগুলো ছেড়ে দিতে হয়, তাই না আম্মু?" আয়াত ইমার দিকে তাকিয়ে আধো আধো বোলে বলে উঠল।
ইমা মুচকি হেসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
আরিমান একমুহূর্ত আয়াতের দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। মাত্র সাড়ে তিন বছরের একটা শিশুর মনের মধ্যে এই যে মমত্ববোধ, এই যে অন্যকে ভালোবাসার শিক্ষা—তা কেবল ইমার কারণেই সম্ভব হয়েছে। যে মানুষটা একসময় মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়াকে হাতের খেল ভাবত, তার ঘরেই আজ এমন এক নিষ্পাপ আত্মার আলো।
"হয়েছে, এবার চলেন সবাই। হিমেল বাতাস ছাড়ছে, আয়াতের ঠান্ডা লেগে যাবে," ইমা মিষ্টি ধমক দিয়ে বলল।
আরিমান আয়াতকে একহাতে আর অন্যহাতে ইমার হাত শক্ত করে ধরে ভিলার দিকে হাঁটা দিল। মার্কো দূর থেকে ওদের দেখে মুখে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটিয়ে মাথা নিচু করল। রক্ত আর গুলির শব্দে ভরা জীবন ছেড়ে এই শান্ত, সুশৃঙ্খল পরিবেশেই যেন সিকদার পরিবারের আসল পরিচয় খুঁজে পাওয়া গেছে।
পরদিন সকালে, ইতালির ভ্রমণের প্রস্তুতি শুরু হলো।
লেবেলে সিকদার ভিলার ওপর কোনো একসময় মাফিয়ার ছায়া পড়েছিল, কিন্তু আজ সেই ভিলাই রূপান্তরিত হয়েছে মানবতার এক আশ্রয়ে।
আরিমান তার স্টাডি রুমে বসে ইতালির চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের নথিপত্রে সই করছিল। ইমা দরজায় এসে দাঁড়াল। হাতে এক কাপ গরম কফি।
"এখনো কাজ করছ?" ইমা টেবিলে কফির কাপটা রাখল।
আরিমান ইমার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে নিল। "কাজ নয় ইমু, অতীতকে পাকাপাকিভাবে মুছে ফেলার চুক্তি সই করছি। লেক কোমোর যে বাড়িটাতে রক্তের দাগ লেগেছিল, আজ থেকে সেখানে লেখা থাকবে—'আয়াত শিশু হাসপাতাল ও চ্যারিটি ট্রাস্ট'।"
ইমার চোখে জল এসে গেল। ও আরিমানের গালে হাত রেখে আলতো করে বলল, "তুমি সত্যিই বদলে গেছ আরিমান।"
" শুধুই তোর জন্যই ইমু। তুই না থাকলে আরিমান সিকদার হয়তো কোনো এক অন্ধকার গলিতে লাশ হয়ে পড়ে থাকত। তুই আমাকে সঠিক বানিয়েছিস," আরিমান ইমার কপালে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল।
মাসখানেক পর—লেক কোমো, ইতালি।
যে পাহাড়ি অঞ্চলে একসময় সাইরেনের বিকট শব্দ আর গুলির আওয়াজ প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করত, আজ সেখানে শুধুই আনন্দের কোলাহল।
বিশাল ভিলা ডি সিকদার এখন সম্পূর্ণ নতুন রূপ পেয়েছে। আগের সেই রক্তবর্ণের দেয়াল বা ভারী মেহগনি কাঠের থমথমে পরিবেশ আর নেই। সাদা আর নীল রঙের সুবিন্যস্ত ছোঁয়ায় পুরো হাসপাতাল ভবনটিকে এক আলোকময় স্বর্গে পরিণত করা হয়েছে।
ইন্টারপোল বা পুলিশ কর্মকর্তা যারা একসময় আরিমানের পিছু নিয়েছিল, তাদের অনেকেই আজ বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত। তারা বিস্ময়ভরা চোখে দেখছিল—ইউরোপের একসময়ের প্রতাপশালী আন্ডারওয়ার্ল্ড লিডার আজ শত শত এতিম বাচ্চার সাথে হাসিমুখে কথা বলছে, তাদের হাতে উপহার তুলে দিচ্ছে।
আয়াত নতুন ফ্রক পরে ছোট শিশুদের সাথে দৌড়াদৌড়ি করছিল। ডন সেবাস্টিয়ান আর ব্যারিস্টার রফিক একপাশে দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছিলেন।
"বিশ্বাস হতে চায় না সেবাস্টিয়ান," ব্যারিস্টার রফিক বললেন, "যে মানুষটাকে আইন কখনো শোধরাতে পারেনি, তাকে ভালোবাসা এভাবে বদলে দিল!"
ডন সেবাস্টিয়ান হেসে বললেন, "আইন মানুষকে ভয় দেখায় রফিক সাহেব, কিন্তু সত্যি ভালোবাসা মানুষকে পুনর্জন্ম দেয়। ইমা সিকদার সেই অলৌকিক কাজটিই করেছেন।"
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আরিমানকে মঞ্চে আহ্বান জানানো হলো।
আরিমান শান্ত ভঙ্গিতে মাইকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। পুরো চত্বরজুড়ে শত শত মানুষের হাততালি।
"শুভ অপরাহ্ন," আরিমান গভীর ও ধীর কণ্ঠে শুরু করল। "এই মাটিতে একসময় অন্যায় ও সহিংসতার কালো ছায়া ছিল। আমি আমার অতীতের অপরাধ ঢাকতে চাই না, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি—পাপের একমাত্র উত্তর হলো চরম অনুশোচনা আর ভালোবাসার মাধ্যমে ভালো কাজ করা। আজ থেকে এই প্রতিষ্ঠানটি সেইসব নিরপরাধ শিশুদের জন্য উৎসর্গ করা হলো, যাদের আশ্রয়ের প্রয়োজন। আর এই পুরো পরিবর্তনের পেছনে একজন মানুষের অবদান সবচেয়ে বেশি—আমার স্ত্রী, ইমা সিকদার।"
পুরো চত্বর তোলপাড় করে করতালি বেজে উঠল।
মঞ্চের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইমার চোখ দিয়ে আনন্দের জল ঝরে পড়ল। আয়াত দৌড়ে এসে আরিমানের পা জড়িয়ে ধরল। আরিমান নিচু হয়ে মেয়েকে বুকে তুলে নিল এবং ইমাকে কাছে ডেকে আনল।
বিকেলের রোদে লেক কোমোর শান্ত পানির ওপর আলো ঝিলমিল করছিল। অতীতের সব অন্ধকার, ভয় আর রক্তক্ষরণের দাগ মুছে গিয়ে আজ এক নতুন ইতিহাস লেখা হলো।
আরিমান সিকদারের বিশাল সাম্রাজ্য আজ আর মাফিয়া ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে নেই; তা দাঁড়িয়ে আছে ভালোবাসা, ক্ষমা আর বিশ্বাসের এক শক্ত ভিত্তির ওপর। আর সেই সাম্রাজ্যের একমাত্র রানী হয়ে রাজত্ব করছে ইমা—আরিমানের সত্যিকারের হৃদয়হরণী।
চলবে....