ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমিই আমার হৃদয়হরণী

২৩তম পর্ব

লেখক: আশু

#তুমিই_আমার_হৃদয়হরণী পর্ব-২৩

#লেখিকা_আশু

হাসপাতালের সেই স্নিগ্ধ ভোরের পর পার হয়ে গেছে আরও তিনটি দীর্ঘ বছর।

সিকদার ভিলার বাগানে এখন আর কেবল হাসনাহেনা বা রক্তকরবীর শান্ত সুবাস ভেসে বেড়ায় না, বরং সকাল থেকে সন্ধ্যা পুরো বাড়িময় ঘুরে বেড়ায় এক জোড়া ছোট্ট পায়ে পরা রূপোর নুপুরের মিষ্টি রুনঝুন শব্দ।

আয়াত সিকদার—যার বয়স এখন সাড়ে তিন বছর। অবিকল আরিমানের মতো তীক্ষ্ণ শান্ত কালো চোখ, আর ইমার মতো মিষ্টি দুধে-আলতা গায়ের রং। ও পুরো সিকদার পরিবারের নয়নের মনি। মাহতাব সিকদার আর ওনার স্ত্রী আজকাল সংসারের সব দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে নাতনিকে নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। আর আরিমান? যে মানুষকে একসময় ইউরোপের মাফিয়া জগত ‘দ্য ব্ল্যাক ড্রাগন’ নামে চিনত, সেই আরিমান সিকদার এখন মেয়ের এক হাসিতে গলে জল হয়ে যাওয়া এক আদর্শ বাবা!

আজ শুক্রবারের সুপ্রভাত। ঢাকার আকাশ একেবারে পরিষ্কার, নীলচে রোদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে সিকদার ভিলার তিনতলার মাস্টার বেডরুমের বারান্দায়।

বারান্দার মেঝেতে ছোট্ট একটি তোশকে বসে আয়াতের চুলে ঝুঁটি বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা করছিল ইমা। ইমার পরনে হালকা নীল রঙের জামদানি শাড়ি, চুলগুলো আলতো করে খোঁপা করা। অন্যদিকে, ছোট্ট আয়াত তুলতুলে হাতে একটা ড্রয়িং খাতায় ইচ্ছেমতো লাল-নীল রঙের পেন্সিল দিয়ে আঁচড় কাটছিল।

"আয়াত সোনা, একদম নড়বে না তো! আম্মু তো ঝুঁটিটা বাঁধতেই পারছি না," ইমা আদরমাখা ধমক দিল।

আয়াত গোল গোল চোখে তাকিয়ে হাত দুটো নাড়িয়ে বলল, "আম্মু! দেকো, আমি বাবার ছবি একেছি! বাবা দেখত্তে বড় বাঘ!"

কথাটা শুনেই ইমা হেসে ফেলল। ঠিক সেই মুহূর্তে বারান্দার ভারী পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকল আরিমান। পরনে ক্যাজুয়াল ধূসর রঙের ট্রাউজার আর সাদা টি-শার্ট। ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে ও এগিয়ে এলো।

"কে বলল আমি বাঘ, হঁ?" আরিমান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে তোশকে বসে পড়ল।

আয়াত খিলখিল করে হেসে উঠে এক লাফে আরিমানের চওড়া কোলের ওপর উঠে বসল এবং দু-হাতে আরিমানের গলা জড়িয়ে ধরল। "তুমি তো বাঘ বাবা! তুমি চিড়িয়াখানার বাঘের মতো সাউট দাও!"

আরিমান মেয়ের তুলতুলে গালে নিজের দাড়ি ঘষে দিয়ে বলল, "তাই? আর তুমি হলে বাঘের বাচ্চা! তাই না?"

"আহ্ আরিমান! ছাড়ো ওকে," ইমা কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল। "মেয়েকে সকালে একটু পড়তে বসিয়েছিলাম, আর তুমি এসে ওর মাথার দুষ্টুমি আরও বাড়িয়ে দিলে! চুলটাও ঠিকমতো বাঁধতে দিলে না।"

আরিমান ইমার দিকে তাকাল। সেই চার বছর আগের গভীর, হিংস্র চোখের জায়গায় এখন কেবলই উপচে পড়া ভালোবাসা আর প্রশান্তি। ও আলতো করে ইমার হাতটা ধরে নিজের ঠোঁটে ছোঁয়াল।

"আমার হৃদয়হরণী যখন পাশে থাকে, তখন বাড়ির পরিবেশ একটু দুষ্টু-মিষ্টি না হলে কি চলে বল?" আরিমান নিচু গলায় বলল।

ইমা লাজুক হেসে মুখ নিচু করে নিল। এত বছর এক ছাদের নিচে থাকার পরেও আরিমানের এই গভীর দৃষ্টি ইমার হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

দুপুরবেলা।

ডাইনিং টেবিলে সবাই মিলে দুপুরের খাবার খেতে বসেছেন। মাহতাব সিকদার আয়েশ করে ইলিশ মাছের পেটি চিবোচ্ছেন, আর ওনার স্ত্রী আয়াতকে চামচ দিয়ে স্যুপ খাইয়ে দিচ্ছেন।

ইরফান অফিসে কোনো এক কাজের নথিপত্র নিয়ে এসে আরিমানের পাশে বসেছিল।

"আরিমান," ইরফান ফাইলটা টেবিলে রেখে বলল, "ইতালির লেক কোমোর যে ভিলাটা তুই চ্যারিটি ট্রাস্টের কাছে হ্যান্ডওভার করেছিলি, ওরা সেখান থেকে একটা বড় চিলড্রেন হসপিটাল আর অরফানেজ কমপ্লিট করেছে। আগামী মাসে ওরা তোকে আর ইমুকে ওপেনিং সেরেমনিতে ইনভাইট করেছে।"

আরিমান এক মুহূর্তের জন্য থামল। লেক কোমোর নাম শুনলেই এখনো ওর চোখের সামনে সেই রক্তের হোলিখেলা, লুসিয়ানোর লাশ আর ইমার কান্নার দৃশ্য ভেসে ওঠে।

ইমা টেবিলের নিচ দিয়ে আরিমানের হাতটা আলতো করে চেপে ধরল। ও আরিমানের চোখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল, যার অর্থ—‘অতীত এখন অতীত, আমরা সব অন্ধকার পার করে এসেছি।’

আরিমান ইমার আঙুলগুলো নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে ইরফানকে বলল, "ওদের বলবি আমরা যাব। যে মাটিতে একসময় রক্ত ঝরেছিল, সেখানে যদি শত শত এতিম বাচ্চার হাসির আওয়াজ ওঠে—তারচেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে না।"

মাহতাব সিকদার ছেলের এই রূপ দেখে এক পরম স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "আল্লাহ তোদের চিরকাল এভাবে সুখে রাখুক রে বাবা। তোদের এই হাসিমুখ দেখার জন্যই হয়তো আমি আর তোর মা এতদিন বেঁচে ছিলাম।"

বিকেল বেলা।

সিকদার ভিলার পেছনের বিশাল দিঘির পাড়ে একটা কাঠের বেঞ্চে পাশাপাশি বসেছিল আরিমান আর ইমা।

ছোট্ট আয়াত ঘাসের ওপর প্রজাপতির পেছনে দৌড়াদৌড়ি করছিল, আর কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে মার্কো ও নতুন সিকিউরিটি গার্ডরা নিঃশব্দে পাহারা দিচ্ছিল। মার্কো এখন সিকদার গ্রুপের অফিসিয়াল হেড অব সিকিউরিটি, মাফিয়া দুনিয়ার সাথে তারও আর কোনো লেনদেন নেই।

ইমা আরিমানের কাঁধে নিজের মাথাটা রাখল। বিকেলের ঠাণ্ডা বাতাস ওদের গায়ে এসে লাগছিল।

"কী ভাবছ আরিমান?" ইমা মিহি গলায় জিজ্ঞেস করল।

আরিমান ওনার এক বাহু দিয়ে ইমার কাঁধ জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল। তারপর ইমার কপালে পরম স্নেহে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল।

"ভাবছি চার বছর আগের সেই অভিশপ্ত রাতগুলোর কথা," আরিমান দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে বলল। "সেদিন আমার অহংকার আর রক্তের নেশা ছিল। আমি ভেবেছিলাম ক্ষমতা দিয়ে তোকে আটকে রাখব। কিন্তু তুই আমাকে সব কিছু থেকে ফিরিয়ে আনলি।"

ইমা মুচকি হেসে আরিমানের বুকে হাত রাখল।

আরিমান ইমার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে ওর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মেলাল। অল্প কয়েক সেকেন্ডের এক গভীর, পরম তৃপ্তির চুম্বন।

"তুই আমার অন্ধকারের আলো ইমু," আরিমান ফিসফিস করে বলল। "তুই আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত, তুই আমার হৃদয়হরণী..."

ইমা আরিমানের বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে হাত দুটো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। দূরে ঘাসের ওপর ছোট্ট আয়াত তখন প্রজাপতি ধরতে পেরে খুশিতে চিৎকার করে উঠছিল—"বাবা! আম্মু! দেকো আমি পেজাপতি পেয়েছি!"

আরিমান আর ইমা দুজন একসাথে হেসে উঠল।

বিকেলের সোনালী সূর্যটা রক্তিম রূপ নিয়ে ঢাকার আকাশে ঢলে পড়ছিল। কিন্তু সিকদার ভিলার ওপর যে নতুন ভোরের আলো ফুটে উঠেছে, তা আর কখনো আঁধারে তলিয়ে যাবে না। অন্যায় ও অপরাধের রাজ্য ধ্বংস হয়ে গড়ে উঠেছে ভালোবাসার এক অমর কাব্য—যেখানে আরিমান সিকদার আর ইমার ভালোবাসা চিরকালের জন্য পূর্ণতা পেয়েছে।

চলবে.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন