Beloved Predator
লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা
পর্ব ৩
____
চার মিনিটের মাথায় আব্রাহাম পৌঁছে গেল।
শাহনাজ তখনও ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে। আব্রাহাম দৌড়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরল। গায়ে হালকা জ্যাকেট, চুলে কুয়াশার জলকণা, নিঃশ্বাস দ্রুত।
"তুমি ঠিক আছ? কিছু করেনি তো?"
"না। শুধু এটা রেখে গেছে।"
আব্রাহাম কাগজটা পড়ল। মুখের রং বদলাল না, কিন্তু সে শেষ লাইনের দিকে একটু বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকল। "*আপনার বাবা কিন্তু নিরপরাধ ছিলেন না।* এর মানে কী, শাহনাজ?"
"জানি না।" শাহনাজের গলা শুকনো শোনাল। "কিন্তু জানতে হবে।"
আব্রাহাম তাঁর কাঁধে হাত রাখল। "আজ রাতে একা থেকো না। আমি তোমার ঘরের সামনে বসে থাকব।"
"তার দরকার নেই।"
"আছে।" সে হাসল, কিন্তু চোখে সত্যিকারের উদ্বেগ। "তুমি ইন্সপেক্টর হতে পারো, কিন্তু আমার কাছে তুমি শুধু শাহনাজ।"
সে সত্যিই সিঁড়ির ধাপে বসে রইল, ভোর পর্যন্ত। শাহনাজ ভেতর থেকে দরজার ফাঁকে একবার তাকিয়ে দেখলেন, আব্রাহাম হাঁটুতে কনুই রেখে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। দৃশ্যটা তাঁকে শান্তি দেওয়ার কথা ছিল।
শুধু একটা ছোট কাঁটা মনের ভেতর খচখচ করছিল। আব্রাহামের ফ্ল্যাট থেকে এখানে গাড়িতেও পনেরো মিনিট লাগে। সে এসেছে চার মিনিটে।
হয়তো কাছাকাছি কোথাও ছিল,ভাবলেন। হয়তো ঘুমায়নি।
তিনি ভাবনাটা সরিয়ে রাখলেন।
________
সকাল আটটায় শাহনাজ বাসার কোণের ঘরে ঢুকলেন, যেখানে তিন মাস ধরে একটা কাঠের বাক্স না-খোলা পড়ে আছে। আনোয়ার খানের জিনিসপত্র। জানাজার পর আত্মীয়রা সব গুছিয়ে দিয়েছিল। শাহনাজ খুলে দেখার সাহস পাননি।
আজ পেলেন।
ভেতরে ফায়ার সার্ভিসের ধূসর ইউনিফর্ম, ভাঁজ করা। একটা ঘড়ি যার কাচ ফাটা। একটা ছোট প্রার্থনার টুপি। আর সবচেয়ে নিচে, কাপড়ে মোড়ানো, একটা কালো মলাটের খাতা। কোণা ক্ষয়ে গেছে, মলাটে পোড়া দাগ।
শাহনাজ বিছানায় বসে খাতা খুললেন। বাবার হাতের লেখা।
বেশির ভাগ পাতা সাধারণ দিনলিপি। কোন গাড়ি মেরামত হলো, কোন রাতে ডিউটি। তারপর একটা পাতায় তারিখ, বিশ বছর আগের।
রাত ১০:৪০। ধানকলে আগুনের খবর। গাড়ি নিয়ে পৌঁছালাম ১১:১০-এ।
গেটে তিনজন লোক দাঁড়ানো। একজন আমাকে একদিকে ডেকে নিয়ে বলল, পেছনের গেট নম্বর তিন যেন বন্ধই থাকে। ওপরের নির্দেশ।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ভেতরে মানুষ থাকলে?
সে বলল, কেউ নেই।
আমি বিশ্বাস করিনি। তবু তালা খুলিনি।
শাহনাজের হাত কাঁপতে লাগল। তিনি পাতা উল্টালেন।
রাত ১১:৩০। ভেতর থেকে চিৎকার শুনেছি। অনেকগুলো গলা। আমি গেটের দিকে এগোতে চাইলাম। আমাকে একটা খাম ধরিয়ে দেওয়া হলো। ভেতরে টাকা। অনেক টাকা। মেয়েটার ভবিষ্যৎ ভাবলাম। আমি পিছিয়ে এলাম।
আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন।
শাহনাজের চোখ ঝাপসা হয়ে এল। মেয়েটা,, তিনি নিজে। তখন তাঁর বয়স ছিল সতেরো।
যে বাবাকে তিনি সারাজীবন আদর্শ ভেবেছেন, যার ইউনিফর্ম দেখে পুলিশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন, সেই বাবা তাঁর পড়াশোনার টাকার জন্য ছয়টা মানুষকে পুড়তে দিয়েছিলেন।
শাহনাজ কিছুক্ষণ মুখে হাত চেপে বসে রইলেন। তারপর আবার খাতায় ফিরলেন।
____
পরের কয়েকটা পাতায় বাবা নিজেকেই বকেছেন, আর অনেক কিছু কেটেছেন। একটা পাতা অর্ধেক ছিঁড়ে নেওয়া। যতটুকু বাকি, তাতে লেখা:
...যে লোকটা নির্দেশ দিয়েছিল,তার নাম আমি লিখতে সাহস পাচ্ছি না। কেউ খাতা খুঁজলে...
বাকিটা ছেঁড়া। শুধু একটা অক্ষরের অর্ধেক দেখা যাচ্ছে, লাইনের শেষে। বাঁকানো একটা রেখা, যেন "জ"-এর শুরু।
শাহনাজ পাতাটা আলোর সামনে তুলে ধরলেন। ছেঁড়ার ধার তাজা নয়, অনেক পুরনো। বাবা নিজেই ছিঁড়েছিলেন।
তিনি পরের পাতায় গেলেন, তারপর আরও পরের। বেশির ভাগ সাদা। শেষ দিকে, মৃত্যুর কয়েক মাস আগের তারিখে, কাঁপা হাতের লেখা:
পাঁচজন রয়ে গেছি আমরা, যারা সেই রাতে মুখ বন্ধ রেখেছিলাম। শুনেছি, একজন একজন করে সবাই চলে যাচ্ছে। হয়তো এটাই বিচার। আমি অপেক্ষা করছি।
আর একটা কথা। ওই রাতে ভেতর থেকে কাঁদার শব্দ শুনেছিলাম। একটা শিশুর গলা। শুধু একজনের।
সরকারি তালিকায় ছয়জন লেখা হলো। আমি জানি, ভেতরে সাতজন ছিল।
শাহনাজ খাতা বুকে চেপে ধরলেন। দম আটকে এল।
সাতজন।
আর যে ছায়াটা জানালা দিয়ে লাফিয়ে বেরিয়েছিল...
তিনি উঠে দাঁড়ালেন, কিন্তু পা টলে গেল। দেয়াল ধরে নিজেকে সামলে নিলেন। জানালার বাইরে সকালের রোদ, পাখির ডাক, স্বাভাবিক দিন। অথচ তাঁর ভেতরে সবকিছু ভেঙে পড়ছে।
______
থানায় রফিক তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল।
"ম্যাডাম, বাকি চারজনের ফাইল এনেছি।" সে টেবিলে ফাইলের স্তূপ রাখল। "আর একটা জিনিস চোখে পড়ল। পাঁচটা কেসেই পুরনো রিপোর্টের মার্জিনে কেউ পেনসিলে একটা ছোট্ট আগুনের চিহ্ন এঁকে রেখেছে। এত ছোট যে নজরে পড়ে না।"
শাহনাজ ফাইল খুললেন। সত্যিই, প্রতিটা রিপোর্টের কোণায় পেনসিলে আঁকা একটা ছোট্ট শিখা।
"কে এঁকেছে?"
"বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু ফাইলগুলো তো এই থানার রেকর্ডরুমে থাকে। কেউ ঢুকেছিল।"
"রেকর্ডরুমের রেজিস্টার দেখুন। কে কখন ঢুকেছে।"
রফিক মাথা নাড়ল। তারপর একটু ইতস্তত করে বলল, "ম্যাডাম, আপনি ঠিক আছেন? মুখটা..."
"আমি ঠিক আছি।" শাহনাজ এমনভাবে বললেন যে রফিক আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
দুপুর বারোটায় তাঁর ফোন বাজার কথা ছিল। আব্রাহাম বলেছিল, মিটিং শেষ করে ফোন করবে। বারোটা পেরোল। সাড়ে বারোটা। শাহনাজ নিজেই ফোন করলেন। বন্ধ।
একটায় আবার করলেন। বন্ধ।
তাঁর বুকের ভেতর অকারণ অস্থিরতা জমতে লাগল। তিনি নিজেকে বোঝালেন, ব্যাংকে মিটিং থাকলে মানুষ ফোন বন্ধ রাখে। কিন্তু আজ সকালের পর, বাবার খাতার পর, মাথার ভেতর সবকিছু সন্দেহের মতো ঘুরছিল।
দুইটা বিশে অবশেষে ফোন এল।
"শাহনাজ, সরি, সরি।" আব্রাহামের গলা ক্লান্ত, একটু ভারী, যেন অনেকক্ষণ কথা না বলে থাকার পর। "মিটিং খুব লম্বা হয়ে গেল, আর ফোনের চার্জও শেষ। এইমাত্র চার্জ দিলাম। তুমি ঠিক আছ?"
"আছি।" শাহনাজ থামলেন। "আব্রাহাম, তুমি কোথায়?"
"অফিসে। কেন?"
"না, এমনি।" তিনি জানালার বাইরে তাকালেন। "রাতে দেখা হবে?"
"অবশ্যই। আমি রান্না করব। আজ তোমার জন্য মাছের ঝোল।" সে নরম হাসল। "আর শোনো, যা-ই হোক, নিজের ওপর দোষ নিও না। তোমার বাবার কাজের জন্য তুমি দায়ী নও।"
শাহনাজ ফোনটা নামাতে গিয়ে থমকে গেলেন।
তিনি আব্রাহামকে বাবার খাতা বা বাবার কাজের কথা কিছু বলেননি। বলেছিলেন শুধু, তাঁর বাবা নিরপরাধ ছিলেন না, চিরকুটে যা লেখা ছিল। তার বেশি কিছু নয়।
"বাবার কাজ।"
আব্রাহাম কোন কাজের কথা বলল?
হয়তো চিরকুটের কথা ভেবেই বলেছে। হয়তো। শাহনাজ মাথা ঝাঁকিয়ে নিজেকে শান্ত করলেন। ঘুমের অভাব। চাপ। সব কথায় অর্থ খোঁজার অভ্যাস।
আব্রাহাম আমার সবচেয়ে ভরসার মানুষ।
তিনি নিজেকে এই কথাটা তিনবার বললেন।
______
সন্ধ্যায় শাহনাজ আবার খাতাটা নিয়ে বসলেন, একা, থানার অফিসে, দরজা বন্ধ করে।
এবার অন্য একটা জিনিস চোখে পড়ল, যা সকালে খেয়াল করেননি। খাতার মলাটের ভেতরের দিকে, কাগজের ভাঁজে, একটা ছোট্ট ছবি গোঁজা। পুরনো সাদা-কালো ছবি।
ধানকলের সামনে তোলা, আগুনের আগের কোনো দিনে। ছবিতে কয়েকজন শ্রমিক হাসিমুখে দাঁড়িয়ে। সামনের সারিতে ছয়জন বড়, আর তাদের পায়ের কাছে বসে আছে একটা ছোট ছেলে, বয়স আট-নয়, হাতে একটা কাঠের খেলনা ট্রাক। বড় বড় চোখ, কপালে এক গুচ্ছ চুল।
ছবির পেছনে বাবার হাতের লেখা: "সাত নম্বর। নাম জানি না। ধানকলের মালিকের ঝাড়ুদারের ছেলে।"
শাহনাজ ছবির দিকে তাকিয়ে রইলেন। ছেলেটার মুখে এমন কিছু আছে, যা তাঁর পরিচিত মনে হচ্ছিল। কিন্তু কোথায়? কীভাবে?
তিনি ছবিটা আলোর কাছে ধরলেন। আর ঠিক তখনই টেবিলের ফোনটা বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
শাহনাজ ধীরে ফোন তুললেন। "হ্যালো?"
কোনো উত্তর নেই। শুধু ওপাশ থেকে ভেসে এল একটা শব্দ। নিচু, ভাঙা, ছন্দময় শ্বাসের শব্দ।
শাহনাজের রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেল।
"তুমি কে?" তিনি ফিসফিস করে বললেন।
শ্বাসের শব্দ থামল। তারপর একটা বিকৃত, যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর, যেন কেউ গলায় যন্ত্র লাগিয়ে কথা বলছে, নরম, ধীর, প্রায় স্নেহের সুরে বলল:
"এবার আপনি জানলেন, ইন্সপেক্টর। সাত নম্বরের কথা।"
একটু বিরতি।
*"এখন বলুন, ছবিটা কেমন লাগল?"*
লাইন কেটে গেল।
শাহনাজ ধীরে ধীরে মাথা তুলে অফিসের জানালার দিকে তাকালেন। বাইরে অন্ধকার, রাস্তার ওপারে কোনো আলো নেই।
কিন্তু তাঁর স্পষ্ট মনে হলো, খাতাটা যে তাঁর হাতে আছে, ছবিটা যে তিনি এই মুহূর্তে দেখছেন,কেউ সেটা জানে।
কেউ তাঁকে দেখছে।
চলবে...