Beloved Predator
লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা
পর্ব ২
____
ডাকঘরের ভেতরটা সকালের আলোতেও ঠান্ডা লাগছিল।
শাহনাজ কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, হাতে প্লাস্টিকের ব্যাগে ছয় নামের কাগজ। পঞ্চম নামে তাঁর চোখ আবার আটকে গেল। *আনোয়ার খান।*
তাঁর বাবা। যিনি আট মাস আগে হার্ট অ্যাটাকে মারা গিয়েছিলেন, অন্তত সবাই তাই জানত। শাহনাজ তখনও কালিগঞ্জে বদলি হননি। ছুটি নিয়ে গিয়েছিলেন জানাজায়।
"ম্যাডাম?" হাবিলদার রফিক পাশে এসে দাঁড়াল। চল্লিশ পেরোনো মানুষ, মোটা গোঁফ, চোখে বছরের পর বছর অপরাধ দেখার ক্লান্তি। "ডাক্তার লাশ দেখে গেছেন। শ্বাসরোধ। কিন্তু গলায় কোনো দাগ নেই, শুধু ঠোঁটের কোণে আঙুলের মতো নীলচে ছাপ।"
"তাহলে কীভাবে?"
"ডাক্তার বলছেন, গলার ভেতরের নরম অংশে নিখুঁত জায়গায় চাপ দেওয়া হয়েছে। যে করেছে সে মানুষের শরীর খুব ভালো চেনে।"
শাহনাজ কণ্ঠ স্বাভাবিক রাখতে জোর খাটালেন। "রফিক সাহেব, এই পাঁচ নামের ফাইল আমার টেবিলে চাই। আজই। আনোয়ার খানের ফাইল সবার আগে।"
রফিকের ভুরু সামান্য কুঁচকে গেল, কিন্তু সে কিছু জিজ্ঞেস করল না। "জি, ম্যাডাম।"
শাহনাজ সিঁড়িতে বেরিয়ে এসে লম্বা শ্বাস নিলেন। ভিড়ের একপাশে আব্রাহাম দাঁড়িয়ে ছিল। চোখে উদ্বেগ, হাত সামান্য তুলে ইশারা করল: *আমি আছি।* সেই ইশারায় বুকের ভার একটু হালকা হলো।
___
থানায় ফিরতেই তানিয়া হোসেন সোজা তাঁর টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। স্থানীয় দৈনিকের সাংবাদিক, ত্রিশের কোঠায় বয়স, কাঁধে ব্যাগ, চোখে ধারালো দৃষ্টি।
"ইন্সপেক্টর, একটা প্রশ্ন।" সে একটা খবরের কাটিং টেবিলে রাখল। "দুই বছরে এই শহরে পাঁচজন মারা গেছে। আব্দুস সালাম, হাফিজুর রহমান, কামাল মজুমদার, সুলতান মিয়া আর আনোয়ার খান। প্রতিটা মৃত্যুকে পুলিশ দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক মৃত্যু বলেছে।"
শাহনাজের মুখের পেশি শক্ত হয়ে গেল। "আপনি নামগুলো কোথায় পেলেন?"
"ডাকঘরের সামনে একজন বলছিলেন, লাশের পাশে কাগজ ছিল। আমি শুধু মিলিয়ে দেখলাম, পাঁচজনের একটা মিল আছে।" তানিয়া একটু ঝুঁকল। "পাঁচজনই বিশ বছর আগে ধানকলের আগুনের রাতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন।"
ঘরে নীরবতা নামল।
"এটা এখনই ছাপবেন না," শাহনাজ ধীরে বললেন। "খুনি পত্রিকা পড়ে। আপনি পরের শিকারকে সাবধান করতে চাইলে আগে আমাকে ধরতে দিন।"
তানিয়া কিছুক্ষণ তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। "দুই দিন। তারপর যা পাব, ছাপব।"
সে বেরিয়ে গেলে রফিক দরজায় মাথা গলাল। "ম্যাডাম, ইব্রাহিম সাহেবের মেয়ে এসেছে।"
_____
রুমানা বসে ছিল থানার বেঞ্চে, দুই হাঁটু বুকের কাছে টেনে। বয়স একুশ-বাইশ। ভোরে সালেহার ফোনে খবর পেয়ে ঢাকা থেকে প্রথম বাসে রওনা দিয়েছে, দুপুরে পৌঁছেছে। চোখ লাল, ঠোঁট ফাটা।
শাহনাজ পাশে বসলেন। কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ পর রুমানাই মুখ খুলল।
"গতকাল রাতে আব্বু ফোন করেছিল। বলেছিল, কাল একটা কাজ করব, অনেক আগে করা উচিত ছিল।" তার গলা ভেঙে গেল। "কী কাজ জিজ্ঞেস করলাম, বলল কাল বলবে।"
"আর কিছু? কোনো নাম, কোনো জায়গা?"
রুমানা মাথা নাড়ল, তারপর থেমে বলল, "আব্বুর একটা পুরনো খাম ছিল, ডাকঘরের ড্রয়ারে। ছোটবেলায় ছুঁতে গেলে এমন বকা দিয়েছিল যে আর কখনও হাত দিইনি। আর একবার বলেছিল, আসল কাগজটা ড্রয়ারে নেই। *যদি কখনও আমার কিছু হয়, বটগাছের নিচে খুঁজিস।*"
শাহনাজের মনে পড়ল, ডাকঘরের ড্রয়ার খোলা ছিল, ভেতরে শুধু স্ট্যাম্প আর রেজিস্টার। খাম নেই।
তিনি উঠে দাঁড়ালেন। "রফিক সাহেব, গাড়ি বের করুন।"
____
বটগাছের গোড়ার মাটি অস্বাভাবিক নরম ছিল। সদ্য খোঁড়া।
রফিক আর দুই কনস্টেবল কোদাল চালাল। এক ফুট নিচে একটা টিনের বাক্স বেরোল। ভেতরে কিছু নেই। শুধু তলায় লেগে আছে একটা পোড়া দেশলাইকাঠি।
শাহনাজ ধীরে মাথা তুললেন। "ড্রয়ারের কপি আর এই আসল কাগজ, দুটোই নিয়ে গেছে।"
"মানে খুনি ইব্রাহিম সাহেবের কাছ থেকেই জেনে নিয়েছে, কোথায় আছে," রফিক বলল। "ম্যাডাম, মনে হচ্ছে সে আমাদের চেয়ে অন্তত এক ধাপ এগিয়ে।"
"এক ধাপ নয়। সে আমাদের পথ দেখাচ্ছে। কোথায় যাব, কী দেখব, সবটাই সে ঠিক করে দিচ্ছে।"
রুমানা একটু দূরে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদছিল। শাহনাজ তার কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রাখলেন। "আমি কথা দিচ্ছি, যে এটা করেছে তাকে ধরব।"
রুমানা চোখ মুছে বলল, "আব্বু বলত, সত্যের একটা দোষ আছে। দেরিতে এলে সে নিজেই বিপদ হয়ে যায়।"
____
সন্ধ্যায় শাহনাজ ফিরলেন ক্লান্ত পায়ে। থানার সামনে আব্রাহাম অপেক্ষা করছিল, হাতে একটা কাগজের ব্যাগ।
"খাওনি, আমি জানি। খিচুড়ি আর ডিম ভাজা এনেছি। খুব ভালো কিছু নয়, কিন্তু গরম।"
শাহনাজ কিছু বলতে চাইলেন। শব্দ বেরোল না, চোখ ভিজে গেল, আর এই প্রথম কারও সামনে সেটা লুকালেন না। আব্রাহাম কিছু জিজ্ঞেস করল না। দুই হাতে তাঁকে জড়িয়ে ধরল। শার্টে সাবানের মৃদু গন্ধ, আর তার নিচে এমন উষ্ণতা, যা তিনি অনেক বছর অনুভব করেননি।
"আমার বাবার নাম ছিল ওই তালিকায়," তিনি ফিসফিস করে বললেন। "আট মাস ধরে ভেবেছি, হার্ট অ্যাটাকে..."
আব্রাহামের হাত এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। মাত্র এক মুহূর্ত। তারপর সে আরও শক্ত করে তাঁকে ধরল। "তুমি একা নও। যা-ই বেরোক, আমি তোমার পাশে আছি।"
সেই রাতে তারা থানার ছাদে বসে খিচুড়ি খেল। নিচে কালিগঞ্জের হলুদ বাতি, ওপরে ধীরে সরে যাওয়া কুয়াশা। আব্রাহাম এতিমখানার শীতের রাতের গল্প বলল। একটা ছেঁড়া কম্বল, আর একটা স্বপ্ন, যেদিন কেউ তার জন্য অপেক্ষা করবে।
"আজ করছে," সে হেসে বলল, শাহনাজের হাতে হাত রেখে।
শাহনাজ তার কাঁধে মাথা রাখলেন। "তুমি ভাগ্যিস ছিলে আজ। বটগাছের নিচে খুঁড়ে যখন কিছু পেলাম না, মনে হচ্ছিল সব শেষ।"
"বটগাছের নিচে খুঁড়ে কিছু পাওনি? তাহলে খুনি আগেই..." আব্রাহাম থেমে গেল, তারপর নরম গলায় বলল, "ভাবতে ভালো লাগছে না। তুমি ঘুমাও আজ।"
শাহনাজ কথাটা শুনলেন, কিন্তু তখন তাঁর মন অন্য কোথাও ছিল।
রাত বারোটায় আব্রাহাম তাঁকে বাসার সামনে পৌঁছে দিল। "তুমি আগে ভেতরে যাও। আমি দেখব, দরজা বন্ধ হলো।"
শাহনাজ ভেতরে গিয়ে জানালার পর্দা সরালেন। আব্রাহাম নিচে দাঁড়িয়ে মুখ তুলে তাকিয়ে আছে। হাত নাড়ল। তারপর হেঁটে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
____
রাত দুইটা দশে শাহনাজের ঘুম ভাঙল।
ঘর অন্ধকার। শুধু টেবিলের ঘড়ির টিকটিক। তিনি বালিশের নিচ থেকে পিস্তল নিয়ে উঠে বসলেন। শব্দটা আবার হলো। খুব হালকা, বাইরের বারান্দায়। কেউ কাঠের মেঝের ওপর ধীরে ধীরে হাঁটছে।
নিঃশব্দে দরজার পাশে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ালেন। পায়ের শব্দ থামল, ঠিক দরজার ওপারে। তারপর ফাঁক দিয়ে ভেসে এল একটা শব্দ। নিচু, ভাঙা, ছন্দময় শ্বাসের শব্দ।
শাহনাজ এক লাফে দরজা খুলে পিস্তল তাক করলেন।
বারান্দা ফাঁকা।
শুধু মেঝেতে একটা ভাঁজ করা সাদা কাগজ, তার ওপর একটা পোড়া দেশলাইকাঠি। কাগজে সুন্দর, গোটা হাতের লেখায় একটাই লাইন:
*"আনোয়ার খানের মেয়ে, আপনার বাবা কিন্তু নিরপরাধ ছিলেন না।"*
শাহনাজের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল।
নিচের রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের আলোর সীমানার ঠিক বাইরে, কুয়াশার ভেতর, একটা কালো ছায়া দাঁড়িয়ে ছিল। মাথায় হুডি, মুখে মাস্ক। সে মুখ তুলে সোজা তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে।
তারপর ধীরে, প্রায় সৌজন্যের ভঙ্গিতে, মাথা নোয়াল।
আর কুয়াশায় মিলিয়ে গেল।
শাহনাজ এক মুহূর্ত নড়তে পারলেন না। তারপর পিস্তল হাতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে ছুটলেন।
রাস্তা ফাঁকা। কুয়াশা এত ঘন যে দশ হাত দূরের কিছুও দেখা যায় না। ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে তিনি চারদিকে তাকালেন। কোথাও কেউ নেই, শুধু মাটিতে ভেজা পায়ের ছাপ, যা কয়েক পা গিয়েই কুয়াশার ভেতর হারিয়ে গেছে।
ছাপগুলো দেখে তাঁর ভুরু কুঁচকে গেল। জুতোর মাপ মাঝারি, গোড়ালির কাছে সামান্য ক্ষয়। তিনি কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলেন, কিছু একটা মনে পড়ি-পড়ি করেও পড়ল না।
কাঁপা হাতে ফোন বের করলেন। প্রথম যে নামটা মনে এল, সেটাই ডায়াল করলেন।
দ্বিতীয় রিংয়েই ওপাশ থেকে ধরল। "শাহনাজ?" আব্রাহামের গলা, একটু হাঁপানো, যেন দৌড়ে এসেছে। "এত রাতে? কী হয়েছে?"
"আব্রাহাম... সে এসেছিল। আমার দরজার সামনে।"
"আমি আসছি," সে সঙ্গে সঙ্গে বলল। "দাঁড়াও, কোথাও যেও না।"
ফোন কেটে গেল। শাহনাজ কুয়াশার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, আর তখনই খেয়াল করলেন, এত রাতে ঘুম ভেঙে ফোন ধরা মানুষের গলা এত পরিষ্কার হয় না।
কিন্তু ভাবনাটা তিনি আবার সরিয়ে দিলেন।
চলবে.......