Beloved Predator
লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা
পর্ব ৪
______
সারারাত শাহনাজ ঘুমাননি। ভোরে থানায় এসে রেকর্ডরুমের রেজিস্টার খুললেন।
রফিক আগেই দেখে রেখেছিল। "ম্যাডাম, গত তিন মাসে রেকর্ডরুমে ঢুকেছে আটজন। সবাই থানার লোক, সবার সই আছে। শুধু একটা এন্ট্রিতে নাম নেই, শুধু তারিখ আর সময়। রাত দুইটা।"
"রাত দুইটায় রেকর্ডরুমের চাবি কার কাছে থাকে?"
"ডিউটি অফিসারের। আর একটা ডুপ্লিকেট আছে, তালা-মিস্ত্রি বানিয়েছিল। গত বছর হারিয়ে গিয়েছিল।"
শাহনাজ নিচু গলায় বললেন, "মানে কেউ ভেতরে এসে আমাদের ফাইলে আগুনের চিহ্ন এঁকে গেছে, আর আমরা কিছুই টের পাইনি।"
তিনি পাঁচটা ফাইলের সারি টেবিলে সাজালেন। পাঁচজনের মৃত্যু, পাঁচটা আলাদা রিপোর্ট। কিন্তু প্রতিটা ফাইলের শেষ পাতায় একই নাম:
মৃত্যু নিশ্চিতকারী চিকিৎসক: ডা. মাহবুব করিম।
"কালিগঞ্জে একজনই এমবিবিএস, ম্যাডাম," রফিক বলল। "স্বাভাবিক।"
"স্বাভাবিক," শাহনাজ আস্তে উচ্চারণ করলেন। "কিন্তু বিশ বছর আগে ধানকলের আগুনের মৃত্যু-সনদও তো তিনিই লিখেছিলেন, তাই না?"
রফিক ফাইলের তাক হাতড়ে পুরনো একটা হলদে কাগজ বের করল। নিচে সই: ডা. এম করিম। আর ওপরে লেখা: মৃতের সংখ্যা: ছয়।
শাহনাজ ছবিটা ব্যাগ থেকে বের করলেন। "গাড়ি রেডি করুন।"
______
ডা. করিমের চেম্বার শহরের পুরনো বাজারের পাশে, দোতলা বাড়ির নিচতলায়। বয়স পঞ্চাশের কাছে, মাথায় পাতলা চুল, চোখে ভয় লুকানোর পুরনো অভ্যাস। শাহনাজকে দেখে তিনি জোর করে হাসলেন।
"ইন্সপেক্টর, আসুন। কেউ অসুস্থ?"
শাহনাজ কোনো ভূমিকা করলেন না। ছবিটা টেবিলে রাখলেন, হাতে সেই ছোট ছেলেটা, কাঠের ট্রাক।
করিমের মুখ থেকে রক্ত সরে গেল।
"বিশ বছর আগের সনদে লিখেছিলেন ছয়জন। ভেতরে ছিল সাতজন। আপনি জানতেন।"
"আমি..." করিমের গলায় শব্দ আটকে গেল। "ইন্সপেক্টর, আপনি বুঝতে পারছেন না। আমি তখন নতুন পাস করা ডাক্তার। ওরা বলল, ছয়টা লাশ আছে, ছয়টাই লিখতে হবে। সপ্তমটা পাওয়া যায়নি, আমি ভাবলাম পালিয়েছে।"
"পালিয়েছে?"
"পালিয়েছে। বেঁচে গেছে। আমি ভাবলাম, ভালোই তো।" তাঁর হাত কাঁপছিল। "পরে ভাবলাম, একটা বাচ্চা, কোথায় যাবে? ভুলে গিয়েছিলাম। বিশ বছর ধরে ভুলে থাকার চেষ্টা করেছি।"
শাহনাজ তাঁর দিকে স্থির তাকিয়ে রইলেন। "ডাক্তার সাহেব, গত দুই বছরে আপনার সইয়ে পাঁচজন মানুষের মৃত্যু 'স্বাভাবিক' লেখা হয়েছে। তাদের পাঁচজনই সেই রাতে ধানকলের কাছে ছিল।"
করিম এবার সত্যিই ভেঙে পড়লেন। চেয়ারে বসে দুই হাতে মুখ ঢাকলেন। "আমি জানতাম না, ইন্সপেক্টর। খোদার কসম। ওদের কারও শরীরে কোনো দাগ ছিল না। আমি ভেবেছি স্বাভাবিক। কিন্তু আমার ভেতর..." তিনি মুখ তুললেন, চোখ লাল। "ওই রাত থেকে আমার ভেতর কিছু একটা অপেক্ষা করছে। জানতাম একদিন কেউ আসবে।"
"কাল সকালে আপনি থানায় এসে সব বলবেন। লিখিত।"
"আসব।"
"আজ রাতে আপনার চেম্বারের বাইরে দুজন কনস্টেবল থাকবে।"
করিম মাথা নাড়লেন, কিন্তু শাহনাজ লক্ষ করলেন, তিনি দরজার দিকে নয়, জানালার দিকে তাকিয়ে আছেন।
_______
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় শাহনাজ আব্রাহামের ফ্ল্যাটের ঘণ্টা বাজালেন।
দরজা খুলল এপ্রন পরা আব্রাহাম, হাতে চামচ, কপালে ঘামের সরু রেখা। "ঠিক সময়ে! আমি ভাবছিলাম, কাজ ফেলে আসতে পারবে না।"
ফ্ল্যাটটা ছোট, পরিপাটি। বইয়ের তাক, জানালার ধারে ছোট্ট টবে গাছ, টেবিলে মোমবাতি। রান্নাঘর থেকে মাছের ঝোলের গন্ধ ভেসে আসছে।
"মোমবাতি?" শাহনাজ ভুরু তুললেন।
"আজ তোমার দিনটা অনেক ভারী গেছে। একটু সুন্দর কিছু প্রাপ্য।"
তারা খেতে বসল। আব্রাহামের রান্না সত্যিই ভালো, আর গল্পে সে জানে কীভাবে ভারী মুহূর্ত হালকা করতে হয়। কীভাবে একবার ব্যাংকে একজন গ্রাহক ভুল করে পুরো মাসের বেতন উত্তোলন করতে এসে কেঁদে ফেলেছিল। কীভাবে সে তাকে চা খাইয়ে শান্ত করল। শাহনাজ প্রথমবার সারাদিনের পর শব্দ করে হাসলেন।
খাওয়ার পর আব্রাহাম থালা সরিয়ে হাত বাড়াল। "এসো।"
জানালার ধারে দুজনে পাশাপাশি দাঁড়াল। নিচে কালিগঞ্জের রাত, দূরে নদীর বুকে একটা নৌকার আলো।
"আমি ভয় পাই," শাহনাজ আস্তে বললেন। "বাবার খাতা পড়ার পর থেকে। যাকে আদর্শ ভেবেছি, সে এমন কিছু করেছে। আমি কার ওপর রাগ করব, বুঝতে পারছি না।"
আব্রাহাম তাঁর দিকে ঘুরল। চোখে কিছু একটা ঝলকে উঠল, ভালোবাসা, নাকি অন্য কিছু, শাহনাজ বুঝতে পারলেন না। "মানুষ ভুল করে, শাহনাজ। কিন্তু তুমি তোমার বাবা নও। তুমি যা করছ, সেটাই তোমার পরিচয়।"
সে ধীরে তাঁর কপালে চুমু দিল। তারপর গালে। তারপর শাহনাজ নিজেই মুখ তুলে ধরলেন। বাইরে রাত গভীর হচ্ছিল, ভেতরে মোমের আলো কাঁপছিল।
কিছুক্ষণ পর আব্রাহাম একটু সরে এসে হাসল। "আমি কফি বানাব। দাঁড়াও।"
________
রাত দশটা দশে আব্রাহামের ফোন বাজল।
সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকাল। "ব্যাংকের ম্যানেজার। এই সময়ে?" ফোন কানে লাগিয়ে সে বারান্দায় গেল। দরজা আধভেজা। শাহনাজ কফির কাপ হাতে সোফায় বসে অপেক্ষা করলেন।
দশ মিনিট। পনেরো মিনিট। বিশ মিনিট।
শাহনাজ উঠে বারান্দার দিকে গেলেন। আব্রাহাম নেই।
"আব্রাহাম?"
কোনো সাড়া নেই। বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে নিচে তাকালেন। রাস্তা ফাঁকা। ঠিক তখন সিঁড়ির দরজা খুলে আব্রাহাম ঢুকল, নিঃশ্বাস দ্রুত।
"সরি, সরি। ম্যানেজার ফোনে কথা বলতে বলতে নিচে যেতে বলল। কাগজে সই লাগবে, একজন লোক এসেছিল। বড্ড বিরক্তিকর।" সে হাসল। "কফি ঠান্ডা হয়ে গেল?"
শাহনাজ তার দিকে তাকালেন। আব্রাহামের কপালে ঘাম, জুতোর তলায় ভেজা মাটি।
"রাত সাড়ে দশটায় ব্যাংকের কাগজে সই?"
"ব্যাংকিংয়ের জীবন, ইন্সপেক্টর। কী আর বলব।"
শাহনাজ হাসলেন। হাসিটা তাঁর চোখে পৌঁছাল না। তিনি আব্রাহামের জুতোর দিকে আবার তাকালেন, গোড়ালির কাছে সামান্য ক্ষয়। কাল ভোরের কুয়াশায় দেখা সেই ভেজা পায়ের ছাপ তাঁর মনে ভেসে উঠল।
"আব্রাহাম, তোমার জুতো কত নম্বর?"
"নয়। কেন?"
"এমনি। আমার কৌতূহল।"
তাঁর ফোন বেজে উঠল। রফিক।
"ম্যাডাম!" রফিকের গলা কাঁপছে। "ডা. করিম... চেম্বারে... আপনি তাড়াতাড়ি আসুন।"
_______
ডা. করিমের চেম্বারের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। রফিক আর কনস্টেবলরা কাঁধ দিয়ে ঠেলে ভাঙল।
ভেতরে ডাক্তার চেয়ারে বসা, মাথা পেছনে হেলানো, চোখ খোলা। মুখে কোনো আতঙ্ক নেই, যেন মৃত্যু এসে তাঁকে অবাক করতে পারেনি। ঠোঁটের কোণে নীলচে আঙুলের ছাপ।
দুই কনস্টেবলকে বাইরে পাহারায় রাখা হয়েছিল, জানালার দিক থেকে কেউ ঢুকেছে। জানালার ছিটকিনি ভেতর থেকে খোলা, বাইরের দেয়ালে ভেজা কাদার ছাপ।
শাহনাজ টেবিলের দিকে এগোলেন। সেখানে সাজানো তিনটে জিনিস। একটা পোড়া দেশলাইকাঠি। একটা কলম, ছাপানো। আর ভাঁজ করা একটা কাগজ।
কাগজ খুলতেই ভেতরে সেই চেনা সুন্দর হাতের লেখা। এবার তালিকায় তিনটে নাম।
*ডা. মাহবুব করিম। নাসির আহমেদ। জামাল চৌধুরী।*
প্রথম নামের ওপর লাল কালির কাটা দাগ, এখনও ভেজা।
নিচে ছোট করে লেখা: *"প্রথম তালিকা ছিল যারা দেখেও চুপ ছিল। এটা তাদের, যারা আগুন লাগিয়েছিল।"*
শাহনাজ কাগজটা হাতে নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। বুকের ভেতর দ্রুত কিছু হিসাব চলছিল: ডাক্তারের মৃত্যুর সময়, আব্রাহামের বারান্দার বিশ মিনিট, জুতোর ক্ষয়, আর "ব্যাংকের কাগজে সই"।
তারপর, কোনো কারণ ছাড়াই, তিনি নিজেকে ধমক দিলেন। *বোকার মতো ভাবছ। আব্রাহাম সারাক্ষণ তোমার সঙ্গে ছিল।*
ঠিক তখন রফিক এসে বলল, "ম্যাডাম, জানালার বাইরের কাদায় একটা অদ্ভুত জিনিস পাওয়া গেছে।"
শাহনাজ বাইরে গেলেন। টর্চের আলোয় কাদার মধ্যে এক ফোঁটা কিছু জ্বলজ্বল করছে। তিনি ঝুঁকে দেখলেন, একটা ছোট রুপোর বোতাম, শার্টের হাতার।
নীল শার্টের হাতার বোতাম, ঠিক যেমন ব্যাংকের কর্মীরা পরে।
শাহনাজ বোতামটা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরলেন। হাত কাঁপছিল না। এটাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভয় দেখাল।
_______
ভোর চারটায় ফ্ল্যাটে ফিরে শাহনাজ বিছানায় বসে রইলেন।
ফোন বাজল। আব্রাহাম।
"তুমি ঠিক আছ? আমি পৌঁছে দিতে চেয়েছিলাম, তুমি তো দৌড়ে চলে গেলে।"
"আমি ঠিক আছি।"
"আমি কি আসব?"
শাহনাজ চোখ বন্ধ করলেন। তাঁর হাতের মুঠোয় তখনও প্লাস্টিকের ব্যাগ, ভেতরে ছোট্ট রুপোর বোতাম।
"না," তিনি আস্তে বললেন। "আজ একা থাকব।"
ওপাশে এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর আব্রাহাম নরম গলায় বলল, "ঠিক আছে। কিন্তু শাহনাজ, মনে রেখো, আমি আছি। সবসময়।"
ফোন কেটে গেল। শাহনাজ তাঁর হাতের দিকে তাকালেন, আর প্রথমবার ভাবলেন, এই সবসময় কথাটা কি ভালোবাসা,নাকি পাহারা।
চলবে...