#শ্যামকন্যা
#পর্ব_৩
#ছুরাইয়া_আক্তার
শ্যামা আজ স্কুলে এসেছে তাও দেরি করে যার জন্য ক্লাসের বাহিরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে এতে অবশ্য শ্যামার কিছুই যায় আসে নি সব তার অভ্যাস হয়ে গেছে।
স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় সিফাতের সাথে দেখা হয় শ্যামার।সিফাত তাকে ডাকতেই শ্যামা বেশ লজ্জায় পরে যায় সে চলে যেতে চাইলে বাধা দেয় তার বান্ধবী শেফা।
কিরে আমাকে আটকালি কেন শেফা?
"দেখস না সিফাত ভাই ডাকছে ।
আমি যাবো না চল বাসায় যাই।
"কেন যাবি না শ্যামা?
তার সামনে গেলে কেমন জানি আমার লজ্জা লজ্জা পায়।
"বালের লজ্জা পায়, চল তো,,,
শেফা শ্যামাকে এক প্রকার টেনেই নিয়ে যায় সিফাতের কাছে এবং নিজেই বলে ওঠে,
কী হয়েছে আপনি ডাকছিলেন কেন?
সিফাত ফোন থেকে মনোযোগ সরিয়ে শ্যামাদের দিকে তাকিয়ে বলে,,
আমি তোমাকে ডাকি নি শেফা আমি শ্যামাকে ডেকেছি।
শ্যামা লজ্জা গিলে নিজেই বলে ওঠে,
জী বলুন কী বলবেন সিফাত ভাই।
সিফাত মুখকুচকে বলে,
ওহ্ শ্যামা ডোন্ট কল মি ভাইয়া, আমাকে আর ভাইয়া বলবে না বুঝেছো। শুনতে অদ্ভুত লাগে।
শ্যামা সিফাতের কথার জবাব না দিয়ে বলে,
আপনার কিছু বলার থাকলে বলুন নয়তো আমি যাই এ শেফা চল,,,
"ওয়েট ।
কথাটা সিফাব বলেই পাশে থাকা বন্ধুর দিকে হাত বাড়াতেই পাশে বসে থাকা ছেলেটি সিফাতের হাতে কাঠগোলাপ ফুলের গাছ এগিয়ে দেয় সিফাত গাছটি হাতে নিয়ে শ্যামাকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
আমি তোমাকে ভালোবাসি শ্যামা।
অবাক হচ্ছো তোমাকে ফুল দিয়ে প্রপোজ না করে গাছ দিয়ে প্রপোজ করছি।
কারন ফুলটা কয়েকদিন পর নষ্ট হয়ে যাবে সাথে আমাদের ভালবাসার প্রথম উপহারটি ও ফিকে হয়ে যাবে তাই কাঠগোলাপ ফুলের গাছ দিয়ে প্রপোজ করেছি যাতে গাছটি তোমাকে প্রতিদিন আমার হয়ে নতুন নতুন ফুল দেয় আর হ্যাঁ গাছটা বাসায় গিয়ে এমন যায়গায় গারবা যেনো ঘুম থেকে উঠে গাছটা তোমার চোখে পড়ে এতে আমায় মনে করে তোমার প্রতি সকাল শুরু হবে। ভালোবাসবে আমায়?
শ্যামা সিফাতের কথা শুনে হা হয়ে গেছে। সে আশেপাশে তাকিয়ে দেখে কোনো মানুষজন আছে কী না।আজ রফিক পাঠান গ্রামের মানুষদের খাওয়ানোর জন্য বিশাল আয়োজন করেছেন। প্রতি বছর এই কাজটি করেন রফিক পাঠান তাইতো আজ গ্রামের বেশিরভাগ মানুষরা এখন গ্রামের বড় মাঠে উপস্থিত।
শ্যামাকে চুপ করে থাকতে দেখে সিফাত আবার বলে ওঠে,
কী হলো শ্যামা তুমি কী রাজি নও।আচ্ছা ঠিক আছে আমি জোর করবো না আ,,,,,
শ্যামা সিফাতকে আর কিছু বলতে না দিয়েই সিফাতের হাত থেকে কাঠগোলাপ গাছটা নিজের হাতে নিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
আমি রাজি।আমি অনেক আগে থেকে আপনাকে পছন্দ করতাম।
সিফাত বাঁকা হেসে বলে,
শুনে খুশি হলাম, যাও এখন বাসায় যাও নয়তো বাসায় পৌঁছাতে দেরি হবে।শেফা মাই শালিকা যাও আমার বউকে বাড়ি অব্দি এগিয়ে দিয়ে আসো।
শ্যামা সিফাতের কথার বেশ লজ্জা পায় এবং শেফার হাত ধরে বলে,
আসি,,,,,, চল শেফা নয়তো বাসায় পৌঁছাতে দেরি হবে।
সারা রাস্তা শ্যামা বক বক করলেও শেফা কেমন জানি চুপচাপ ছিলো যা শ্যামার একটুও ভালো লাগে নি তাই বাড়ির সদর দরজার কাছে আসতেই শ্যামা বলে ওঠে,
শেফা কী হয়েছেরে তোর।
শেফা চমকে ঢোক গিলে বলে,
কিছু নারে মাথাটা একটু ব্যাথা করছে,
আগে বলবি না আমি বুঝি বক বক করে তোর মাথা ব্যাথা আরো বাড়িয়ে দিয়েছি।
শেফা মলিন মুখে বলে,
আরে না, যা বাসায় যা আমিও যাই বাই।
ওকে বাই।
শেফা চলে যেতেই শ্যামা দৌড়ে বাসায় ঢুকে নিজেদের ঘরে চলে যায়। শ্যামা এবং ওর মা এক সাথে এক ঘরে থাকে। তাদের বাসাটা চতুর্ভুজ আকৃতির পশ্চিম পাশে তিনটে ঘর যেখানে নুরুল ইসলাম চাঁদ বেগম এবং নিশি সিয়াম থাকে এবং পূর্ব পাশেও রয়েছে দুটো ঘর যা ছিলো তাঁরা বেগমের শশুড় শাশুড়ী ঘর বর্তমানে সেখানে শ্যামা এবং তাঁরা বেগম থাকেন।শ্যামাদের একটি ঘর বেশ বড় এবং অপরটি অত্যন্ত ছোট সেখানে একটি ছোট খাট ও একটি ছোট টেবিল ছাড়া কিছুই নেই। সে রুমে আগে নুর থাকতো সে ঘর বর্তমান ফাঁকাই থাকে শ্যামা একা একা ঘুমাতে পারে না বলেই মায়ের সাথেই ঘুমায় ।সে বরাবরই ভীতু মেয়ে তবে বাড়ির বড় জামাই মেয়ে আসলে তাদেরকে শ্যামাদের বড় ঘরেই থাকতে দেওয়া হয় এবং শ্যামা এবং ওর মা নুরের ঘরে থাকে। বাড়ির উত্তরে রয়েছে গোয়াল ঘর যেখানে দুটো গাভী এবং একটি বাসুর এবং একটি কলপাড় পায়খানা রয়েছে এবং দক্ষিণে রয়েছে রান্না ঘর তার একটু ফাঁকেই সদর দরজা বাড়ির মাঝ খানে বেশখানিক জায়গা ফাঁকা যাকে উঠান বলা হয়। উঠানে বড় ছোট বেশ কয়েকটা গাছও রয়েছে।
শ্যামা স্কুল ড্রেস খুলে গাছটা হাতে নি রান্না ঘরে চলে যায়। গিয়ে দেখে তার মা লেবু কাটছে।সে গাছটা পেছনে আড়াল করে মুচকি হেসে বলল,
মা আজ ডাল রান্না করছো?
তাঁরা বেগম লেবু কাটতে কাটতে বলেন,
হুম, যা হাতমুখ ধুয়ে আয় খাবার দিচ্ছি।
শ্যামা এবার তাঁরা বেগমের পাশে বসে মিনমিনিয়ে বলল,
আব্বা নিশিরা রফিক পাঠান সাহেবদের নিমন্ত্রণে গেছে?
"হুম
তোমারে নিয়া যায় নাই আব্বা,
তাঁরা বেগম হাতের কাজ রেখে বিরক্তির স্বরে বললেন,
চোখে কম দেখিস আমারে নিয়া গেলে কী আমি এখানে থাকি।
শ্যামা নিজের বোকামিতে হেসে গোমড়া মুখে বললো,
এই আব্বাটা কেমন জানি, তারা যাইয়া তো ফ্রীতেই গান্ডে-পিন্ডে খাবার গুলা গিলবেই তাহলে তোমারে নিয়া গেলে কী হতো আব্বার তো আর টাকা পয়সা লাগতো না।
তাঁরা বেগম ফের নিজের কাজ রেখে শ্যামার দিকে তাকিয়ে বলে,
এতো বেশি বকিশ কেন। তোর কী যাইতে মন চাচ্ছে গেলে রেডি হ,,,
এবার শ্যাম মুখ কুচকে বলে,
তুমি জানো না আমার এসব ভালো লাগে না।ওখানে খাইতে গেলে নিজেরে কেমন ফকির ফকির লাগে আমার কোনো আত্মসম্মান নাই নাকি।
শ্যমার কথা শুনে তাঁরা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
গরিবদের এতো আত্মসম্মান থাকতে নাই নয়তো না খেয়ে মরবি।
এবার শ্যামা বিরক্ত হয়ে বলে,
ওসব বাদ দেও তো।
পর মূহুর্তে আড়ালে রাখা গাছটি তাঁরা বেগমের সামনে ধরে মুচকি হেসে বলল,
এই যে গাছটা দেখছো এটা আমার সিফাত ভাই দিয়েছে সাথে সে যে আমায় ভালোবাসে সেটাও জানিয়েছে। আমি আজ খুব খুশি মা।
তাঁরা বেগম চমকে উঠলেন সাথে বেশ চিন্তায় পরে গেলেন। তিনি কীছুটা ভয় নিয়েই বললেন,
শ্যামা এসব থেকে দুরে থাক যদি তোর বাপের কানে কিছু যায় খুব খারাপ হয়ে যাবে।
আহ্ মা তুমি চিন্তা করো না তো কেউ জানবে না আমাদের সম্পর্কে, নিশি যে এতো প্রেম করে আব্বা তো ঠিকি যানে কই ওরে তো কেউ কিছু বলে না তাহলে আমারে কেন বলবে।
তাঁরা বেগম শ্যামার কথা শুনে তাকে বোঝানোর স্বরে বললেন,
কারন আছে শ্যামা তুই আর নিশি এক না। ওর গায়ে দাগ লাগলেও রুপের জোরে টিকে যাবে কিন্তু তুই কোনো রুপবতি না তোর গায়ে একটা দাগ পরলে বিয়ে দেওয়া আগের থেকে আরো কঠিন হয়ে যাবে।
শ্যামা ওর মাকে আর কিছু বলতে না দিয়েই রাগ নিয়ে বলে,
আমি এমন হলে আমার দোষ কোথায়। সব সময় আমায় কেন সব মানিয়ে নিতে হবে।আমার ছোট ছোট ইচ্ছা গুলো পূরন করতে গেলে এতো বাঁধার সম্মুখীন হতে হয় কেন। আমি দাদির কাছে শুনেছি আব্বা আমাকে চায় নি একটা ছেলে চেয়েছিলো কিন্তু দুর্ভাগ্য যে আমি হয়েছিলাম তাও আবার কালো যা কোনো কালে আব্বার পছন্দ ছিলো না। আব্বা নাকি ছোট বেলা থেকে কালো মানুষদের পছন্দ করতেন না।তাই আমাকেও পছন্দ করেন না এর থেকে কষ্টের বিষয় আমার কাছে আর দ্বিতীয়টি নেই যাই হক মা সিফাত ভাইও আমাকে ভালোবাসে সে কখনো আমাকে ছেড়ে দিবে না সে আমাকে বউ বলেছে দেখিও আমি তার ঘরে তার বউ হয়েই যাবো।
শ্যামা রান্না ঘর থেকে একটা চামিচ নিয়ে বেড়িয়ে যায় এবং তাদের ঘরের বারান্দার সামনে মাটি খুরতে থাকে গাছ লাগানোর উদ্দেশ্যে।
এদিকে শ্যামা তার মাকে চিন্তায় ফেলে দেয় তিনি শ্যামার দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বলেন,
দোয়া করি তোর ইচ্ছে যেন পূর্ণ হয় শ্যামা।একজন মায়ের দোয়া যেনো খোদায় বিফলে না জেতে দেয়।
___
এভাবে প্রায় বেশ কয়দিন কেটে যায়।কয়েকদিন না একমাস তো পার হয়েছে প্রায়। এখন শ্যামা রেগুলার ক্লাস করে যা আগে করতো না, ক্লাস শেষে দেখা করতো সিফাতের সাথে বেশ আনন্দের দিন কাটছে শ্যামার। সিফাতের এতো কেয়ার ভালোবাসা সব কিছুই যেনো স্বপ্ন মনে হয় সাথে ভয়ও হয় এই বুঝি স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলো আবার সে মনে মনে যদি এটা স্বপ্ন হয়ে থাকে তাহলে যেনো কখনো তার ঘুম না ভাঙ্গে।আজ সিফাত তাকে নিয়ে গ্রামের শেষ সীমানা অথাৎ নদীর পাড়ে নিয়ে এসেছে আজ নিশি স্কুলে আসে নি তাই তারা ঘুরতে বেড়িয়েছে। প্রায় তারা এমন করে এই জায়গায় ঘুরতে আসে। নদীর পাড়টা অনেক সুন্দর বসার জন্য রয়েছে ব্যবস্থা। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের খাবারেরও ব্যবস্থা রয়েছে।
সিফাত শ্যামাকে ফুচকার প্লেট এগিয়ে দিয়ে বলে,
শ্যামা খাওয়া শুরু করো।
শ্যামা আশেপাশে দেখতে দেখতে বলে
আপনি খাবেন না,
"তুমি খাও তোমার খাওয়া হলেও আমার খাওয়া হবে। আর এভাবে কী দেখছো নতুন আসলে নাকি এ জায়গায় ।
না আজকে অন্যদিনের তুলোনায় বেশ ভীর লাগছে এ জায়গায়।
"ওহ এই ব্যাপার আর একটু সামনে আজ মেলা বসেছে তাই শহরের দিকের মানুষরা এ দিকে ঘুরতে আসছে, প্রতি শুক্রবার ও সরকারি ছুটি পড়লে বা মেলা বসলে এদিকটা জমজমাট হয়ে পড়ে।
শ্যামা আবাক হয়ে বলে,
শহর থেকে এদিকে মানুষ আসে?
"হ্যা তুমি জানো না, ঐ যে ঐ রাস্তাটা দেখছো না ঐ রাস্তা দিয়ে দুই বা এক ঘন্টার মতো পথ পেরোলেই শহর।
ও আচ্ছা আমাকে একদিন নিয়ে যাবেন শহরে?
"আচ্ছা সময় করে নিয়ে যাবো।এখন তারাতাড়ি খাও।মেলায় ঘুরবে না এখানে যদি খেতে দেরি করো মেলায় আর ঘোরা হবে না বলে দিলাম।
শ্যামা ফুচকা খেতে খেতে বলে,
খাচ্ছি তো আমার এখান থেকে আপনি খান তাহলে তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে।
সিফাত একটা ফুচকা তুলে নিজের মুখে দিল আবার একটা নিয়ে শ্যামার দিকে বাড়িয়ে দিল এতে শ্যামা বেশ লজ্জায় পরে যায় । শ্যামাকে ফুচকাটি মুখে না নিতে দেখে সিফাত দুষ্টু হেসে বলে,
শ্যামবতী আমার ফুচকাটি মুখে নেও নয়তো আমার হাত ব্যাথা হয়ে যাবে। এতোদিনেও তোমার লজ্জা ভাঙলো না।
শ্যামা লজ্জায় সিফাতের দিকে না তাকিয়ে ফুচকাটি মুখে নিলো। চিবোতে চিবোতে মনে মনে বলে ভাবলো,
ইচ্ছে করে লজ্জায় ফেলছে বজ্জাত লোক।
শ্যামা বাসায় পৌঁছাতেই নিশির সাথে দেখা হয়। শ্যামা নিশিকে পাশকাটিয়ে চলে যেতে নিলেই নিশি বলে ওঠে,
কী রে কই গেছিলিরে?
"কই আবার স্কুলে।
একটু আগে শেফার সাথে রাস্তায় দেখা হলো তুই তো ওর সাথে ছিলি না সিফাত ভাইয়ের সাথে মেলায় গিয়েছিলি বাহ্ ভালো তো।
শ্যামা নিশির কথা শুনে চমকে ওঠে,
তোকে এসব ফালতু কথা কে বলছে
কী ভেবেছিলি আমি কিছু জানবো না তোর জানেজিগার দোস্ত শেফাই সব বলেছে।
শ্যামা কী বলবে আর ভেবে পায় না ভিষণ ভয় করছে। যদি নিশি আব্বাকে বলে দেয় ভয়ে যেন চোখে পানি এসে জমেছে।
তখনি নিশি বলে ওঠে,
এমনে ভয় পাইতে হবে না আমি কাউকে কিছু বলবো না শুধু আমার কথা গোপন রাখলেই হলো।
শ্যামা মূহুর্তে নিজের ভয়কে ভুলে চিন্তিত হয়ে বলে,
কোন কথা ?
কাল স্কুলের পিছনে যা দেখছিলি
তখনি শ্যামার মনে পরে যায় জঘন্য এক ঘটনা দৃশ্য,
এ গ্রামের ছেলে সুজয় এর সাথে কালকে নিশিকে দেখেছে স্কুলের পিছনে তাও আবার জঘন্য আবস্থায়।নিশি এবং সুজয় উভয়ে দুজনের ঠোঁটের নেশায় লিপ্ত ছিলো। ভাবতেই শ্যামার গা শিউরে উঠল।
কীরে বুঝছির আমার কথা গোপন থাকলে তোর কথাও গোপন থাকবে।
"আচ্ছা,
শ্যামা আর কিছু না বলে ঘরে চলে যায় ঘরে ঢুকতেই মাকে এ অবেলায় ঘুমোতে দেখে একটু চমকে যায় পর মুহূর্তেই মনে পরে ইদানীং তার মায়ের অবস্থা ভালো না ঠান্ডা ভাসছে মায়ের আবার এজমার সমস্যা আছে। ডাক্তার দেখিয়ে আসছে তবে সুস্থ হতে হয়তো সময় নিচ্ছে।
শ্যামা তার মাকে বিরক্ত না করে কাপড় গামছা নিয়ে গোছলের উদ্দেশ্য কলপারে চলে যায়।
যেহেতু নিশি সব জেনেই গেছে তাই শ্যামার আর তেমন ভয় হয় না সিফাতের সাথে ঘুরতে।আজ ও এসেছিলো নদীর পাড়ে ঘুরতে কিন্তু সিফাতের বাবা ফোন দেওয়ায় সিফাতকে চলে যেতে হয়েছে অবশ্য যাওয়ার আগে শ্যামাকে বাসায় যাওয়ার ভারা দিয়ে গেছে এবং দ্রুত বাসায় চলে যেতে বলছে।
দেখতে দেখতে সিফাত এবং শ্যামার সম্পর্কের তিনমাস চলছে। প্রায় ঘুরতে যাওয়া শ্যামাকে এটা ওটা কিনে দেওয়া রোজ ছুটির সময় শ্যামার স্কুলের সামনে দাড়িয়ে থাকা পর্যন্ত সিফাত ও শ্যামার ভালোবাসার মুহুর্ত গুলো সীমাবদ্ধ।
আজকের আকাশটায় কেমন জানি মেঘ জমেছে আর নদীর পাড়ে প্রচুর বাতাস যা শ্যামার মন ছুয়ে দিচ্ছে।
পাবলিকদের বসার জন্য যে ইট সিমেটে দিয়ে বেঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে সেই বেঞ্চে শ্যামা বসে বসে নদীর উতলা ঢেউ দেখছে আর হাতে রয়েছে একটা ডেইরি মিল্ক যেটা সিফাত কিনে দিয়ে গেছে।
সিফাত হলো শেখ পরিবারে ছোট ছেলে এবার অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পরে বর্তমানে বেকার।তার বাবার বেশ টাকা পয়সা আছে তবে বেশ অহংকারী ব্যক্তি সিফাতের মাও কম না তারও পা যেনো মাটিতে পরে না।
শ্যামার ভাবনার মাঝে কারো কন্ঠ শুনে পাশে তাকায় দেখে একটা ছেলে হুইলচেয়ার বসে নদীর দিকে তাকিয়ে আছে এবং একজন মাঝবয়েসী লোক কিছু বলছেন এবং কিছুক্ষণ পর মাঝবয়েসী লোকটা কোথায় যেনো চলে গেলেন। শ্যামা হুইলচেয়ার বসা ছেলেটিকে ভালোকরে দেখে নিলো এবং ভবলো।
নিসন্দেহে ছেলেটা সুদর্শন তবে আমার সিফাত এর থেকেও সুদর্শন এই ছেলেটার গায়ের রং সিফাতের থেকে একটু চাপা কিন্তু চেহারায় কিউট কিউট ভাব তবে আমার সিফাত এর থেকে বেশি বিউটিফুল হুহ্।
নিজের ভাবনায় শ্যামা নিজেই লজ্জা পেয়ে গেলো।তার আজকাল কী যে হয়েছে অন্য ছেলেদের দেখলেই তার সাথে সিফাতের তুলনা শুরু করে, শ্যামার এসব ভাবনার মাঝেই ঐ ছেলেটা হুইলচেয়ারটা পিছনে নিতে গেলে দুর্ভাগ্যবসতো হুইলচেয়ারটি সামনে এগিয়ে যায় শ্যামা তা দেখে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে হুইলচেয়ারটি পিছন থেকে টেনে ধরে আতংকিত হয়ে উচ্চ স্বরে বলে,
এই আপনি কী করছিলেন এখুনি তো বাধ ঘেঁষে নদীতে পড়ে যেতেন।
শ্যামা হুইলচেয়ার টেনে ছেলেটিকে নিরাপদ জায়গায় দাড় করায় এবং লোকটির পাশে দাড়িয়ে থাকে সেই মাঝবয়েসী লোকটার অপেক্ষায়। লোকটির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলতে থাকে,
এই লোক কি কথাও বলতে পারে না।এনাকে তো আগে দেখেছি বলে মনে হচ্ছে না এ গ্রামে নতুন এসেছে নাকি। নাকি শহর থেকে এসেছে।
এভাবে তাকিয়ে কি দেখছো মেয়ে এর আগে কখনো সুন্দর ছেলে দেখো নি ।
শ্যামা তার ভাবনার মাঝে এমন গম্ভীর কণ্ঠে কথাগুলো শুনে চমকে হুইলচেয়ার বসা ছেলেটির দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলে,
আমি তো আপনার দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম আপনি কথা বলতে পারেন না। কিন্তু দেখছি আপনি কথা বলতে পারেন কিন্তু ভালো ভাবে কথা বলতে পারেন না। আপনাকে এতো বড় বিপদ থেকে বাচালাম আর আপনি কিছুই বললেন না।
ছেলেটি শ্যামার দিকে তাকিয়ে আগের মতো গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
ধন্যবাদ মিস।
ছেলেটির কথা শুনে শ্যামা অন্য দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে ধীরে বলে,
লাগে না ওমন রসকসহীন ধন্যবাদ হু।
তখনি ঐ মাঝবয়েসী লোকটা হাতে কোন আইসক্রিম নিয়ে হাজির হয়। শ্যামা তাকে দেখে হুইলচেয়ারে বসা ছেলেটিকে দেখিয়ে বলে,
চাচা এনাকে কোথাও একা রেখে গেলে নিরাপদ জায়গায় রেখে যাবেন নয়তো দুর্ঘটনা ঘটাটে সময় নিবে না ইনি, আমি না আটকালে এখন তিনি নদীতে পড়ে সাঁতার কাটতেন।
শ্যামা কথাটি বলে চলে যেতে নিলে হুইলচেয়ারে বসা ছেলেটি বলে,
মিস চাইলে এই আইসক্রিমটা নিতে পারেন আমি আপনাকে ছোট একটি উপহার হিসেবে দিচ্ছি।
শ্যামা কিছুক্ষণ ভ্রুকুচকে তাকিয়ে বলে,
লাগবে না ,আপনার আইসক্রিম আপনি খান।
ছেলেটি শ্যামার যাওয়ার দিকে দৃষ্টি রেখে পাশে দাড়ানো লোকটিকে তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো,
আব্দুল চাচা কি বলেন তো আজকাল ভালো ব্যবহারের দাম নেই। সম্মান দিয়ে বা ভালো ভাবে কথা বললে অন্যদের ভাব বেড়ে যায়।
ছেলেটির কথা শ্যামা স্পষ্ট শুনতে পেলেও আর ফিরেও তাকালো না পিছনে সামনে এগিয়ে গেলো।শ্যামা বাসায় যাওয়ার জন্য অটোটে উততেই দেখা হলো সতি দেবীর সাথে যিনি শ্যামার প্রতিবেশি তবে শ্যামার সাথে তার ভালোই সম্পর্ক। তিনি শ্যামাকে দেখে হেসে বললেন,
কী শ্যামা তুই ঘাটে আসছিলি যে?
শ্যামাও সামান্য হেসে বলল,
মাসি বান্ধবীদের সাথে বেড়াতে আসছিলাম। তুমি কোথায় গেছিলে?
আমি তো মন্দিরে মাকে দর্শন করতে গিয়েছিলাম।
ওহ।
শ্যামা সতি মাসির সাথে গল্প করতে করতে রাস্তা শেষ করলো, সতি দেবীর বাড়ি আগে পড়ায় তিনি অটো থেকে নামলেন সাথে শ্যামাও নামলো আর তিন মিনিট হাঁটলেই তার বাড়ি।কিন্তু নামতেই বিপদ ঘটলো তার আব্বা রাস্তার ওপারে সিয়ামরে নিয়ে দাড়িয়ে আছে তিনি ইতিমধ্যে শ্যামাকে দেখেও ফেলছেন।যেহেতু রাস্তার ওপারে সতি মাসির বাড়ি তাই তিনি শ্যামাকে নিয়ে রাস্তা পার হলেন এবং নুরুল ইসলামকে দেখে বললেন,
দাদা আদাব,কেমন আছেন?
ভালোই আছি তুমি কেমন আছো? আর দেখি না তোমায় আমার বাসায় আসতে?
আছি ভালোই ,সময় হয় না আজকাল একটু ব্যাস্ত আছি তো।
ওহ সময় করে ঘুরে এসো বাড়ি থেকে। তা শ্যামা তুই কই গেছিলি স্কুল তো সেই কখন ছুটি দিছে নিশিও কখন বাসায় আসছে।
শ্যামা ভয়ে যায় যায় অবস্থা এখন কী বলবে আব্বাকে। এই ব্যাক্তিরে সে জমের মতো ভয় পায়।মায়ের সামনে যাই বলুক না কেন আব্বার সামনে এলেই সব সাহস ফুস করে উরে যায়,
আব্বা আমি আসলে আ,,,আ
শ্যামা আমতা আমতা করতে দেখে এবার নুরুল ইসলাম ধমকে বলেন,
কী হলো এতক্ষন লাগে কইতে?
সতি দেবি পরিস্থিতি বুঝতে পেড়ে বলে ওঠে,
আরে দাদা বাচ্চাটারে এমন ধমকাচ্ছেন কেন ও আমার সাথে মন্দিরে গেছিলো। স্কুল থেকে ফেরার পথে ওর সাথে দেখা হয়েছিলো তাই ওরে নিয়া গেছি।
ওহ্ এইডা কইতে এতক্ষণ লাগে, যা সিয়ামরে সাথে নিয়া বাসায় যা আমার একটু কাজ আছে।
বলে নুরুল ইসলাম চলে যান এবং শ্যামা সিয়ামকে সাথে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে আগাতেই সিয়াম বলে ওঠে,
শ্যাম্পু আপা জানো তোমার লাগি বড় আম্মা আব্বার কাছে অনেক কথা শুনছে তোমার আসতে এতো দেরি হওয়ায় সেই রাগারাগি করছে আজ তো বড় ফুবু আসছে সেই অনেক বাজে কথা বলছে তোমার নামে সাথে আমার মাও আছে।
শ্যামা মুহূর্তেই চটে গিয়ে সিয়ামের মাথায় টোকা মেরে বললো,
আর একবার শ্যাম্পু কইলে তরে কিন্তু ড্রেনে চুবামু সিয়ামের বাচ্চা।
সিয়াম মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে,
যাও যাও বাড়িত যাও কে কারে চুবায় দেখমুনে।
এসব কথা শুনে শ্যামার ভয় আরো বেড়ে যায়,
এই বড় ফুবু একটা ব্রিটিশ সবসময় আমার আর মার পিছনে লেগে থাকে না জানি বাসায় গিয়ে কী হয় আব্বার বকা খাইয়া মা নিশ্চিয় রাইগা বোম হয়ে আছে।এমনি সময় তো আমার আসা যাওয়া নিয়া আব্বার মাথা ব্যাথা থাকে না নিশ্চয় ঐ ব্রিটিশ বুড়ি উল্টাপাল্টা কিছু বলছে। এই ফুবু ব্রিটিশটা বাসায় আসবে জানলে তো স্কুলেই জাইতাম না।
#চলবে