ফন্ট সাইজ:
থিম:
বিষন্ন বাসর

অধ্যায় পর্ব 2

লেখক: সাদিয়া_খান(সুবাসিনী)

#বিষন্ন_বাসর
#পর্ব-৩+৪
#সাদিয়া_খান(সুবাসিনী)

চাচা ফুপুরা তখন একে একে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। কেউ কেউ বলছে মেয়েটাকে মানুষ করতে তো আর কম টাকা পয়সা খরচ করেনি, বাপ মায়ের এটুক আবদার যদি পূরণ না করতে পারে এই মেয়ে থেকে কি লাভ?আবার কেউ বলল, মেয়েটার আজ বিয়ে হচ্ছে। সে সারা জীবনের জন্য পর হচ্ছে, অন্তত কেউ তো মেয়েটাকে একটু জড়িয়ে ধরে স্বান্তনা দাও।অথচ কেউ কিছুই করলো না।দুয়ারে হয়তো কোথাও একটা কিছু ভেঙ্গে পড়েছিল।কচ করে ঢুকে গেল আলবিনার পায়ে। দাঁত মুখ খিচে এক মুহুর্ত দাঁড়ালো। আম্মা ভাবলো হয়তো মেয়ে তার ডাকেই থেমেছে। আলবিনা ধীরে ধীরে বসলো।মাটি লাগা পায়ের থেকে কাঁচের তিনটে টুকরো বের করলো।বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য মরিচ বাতি দিয়ে পুরো বাড়ি সাজানো হয়েছে, সেগুলোই ভেঙে পড়েছিল। অন্য সময় হলে কেঁদে বাড়ি মাথায় না তুললেও প্রিয় মানুষটাকে অন্তত দেখাতো। আজ সে সামনে থাকলেও ফিরে চাইলো না।এগিয়ে গেল গেটের দিকে। বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা মোটর সাইকেলের অবস্থা দেখে মনে মনে আলবিনা বলল,
"মির্জার ব্যাটার দাপট আছে।না হলে নশের উদ্দীনের বাড়ির সামনে নির্বাচনী প্রচারণায় একটা বাইক আসতে পারে না আর তার মেয়েকে....
তার মেয়ে? পুরো বাক্য আর ভাবতে পারে না আলবিনা।কোথাও সুঁচ ফোটার যন্ত্রণা হয় তার। নিজের বাবা মা কীভাবে এতোটা স্বার্থপর হতে পারে? বাবা কীভাবে পারে এক মেয়ের জন্য অন্য মেয়েকে এভাবে ভাসিয়ে দিতে? আলবিনা সবচেয়ে ছোটো মেয়ে।সবাই ওর মাকে সায়মার মা কিংবা সাহেলের মা বলে ডাকে।সায়মা সাহেল জমজ হয়েছিল।এরপর সেজুতি, সবশেষে আলবিনা। সেজুতির মা বলে না বলে ওর মন খারাপ হতো তাই আব্বা আম্মাকে সেজুতির মা বলে ডাকে।বড়রা পরিবারের জন্য সবসময় বেশি ভাবে বলে ভালোর ভাগটা তাদের।মাঝের সন্তানের প্রতি না কি সব সময় অবহেলা হয় তাই ওর ভাগেও ভালোটা।আর ছোটো হিসেবে সবার আদর তো আলবিনা পাচ্ছেই। বাড়তি করে তাকে আদর দেওয়ার কি আছে? কিছু নেই বলেই পাঁচ বছর পার হলেও কেউ মনে করে তাকে স্কুলে ভর্তি করানোর কথা,দাঁত নড়লেও কেউ দাঁত ফেলে দেয়নি কিংবা জুটেনি কান ফোটানোর পর একজোড়া দুল।বাকী দুই বোনের মতো।তবুও আলবিনার কোনো আফসোস ছিল না। সে বড় দুই বোনের বেঁচে যাওয়া কাপড়, বাড়তি শখ আহ্লাদ সবটা নিয়েই নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছিল।আজ এই যে এক কাপড়ে বাড়ি ছাড়ছে এটা তার নিজের উপবৃত্তির টাকা দিয়ে কেনা। নিজের গোছানো এক টুকরো জগৎ ছেড়ে বেরিয়ে যেতেও কোনো আফসোস হলো না।কষ্ট হলো বাড়ির পিছনে অযত্নে বেড়ে উঠা মরিচ গাছটার জন্য।ওই ভাঙ্গা কুলোটার জন্য যেটায় দ সে ফুল কুড়িয়ে আনতো কিংবা ওই ছোঁচা বিড়ালটার জন্য। বিড়ালটার বাচ্চা হবে, কই খাবার খুঁজবে?তার ভাগের মাছটার আধখানা দিয়ে দুই বার ভাত মেখে দিতো সে। কান্না দলা পাকিয়ে এলো।গাড়িতে উঠে কাঁচের জানালায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে রইল। ভাবলো 'রিজিকের মালিক আল্লাহ।আমি কিছুই না।'

মনে হলো পুরো রাস্তা মটরসাইকেলের প্যারেড চলছিল।মির্জা বাড়ির গেটের সামনে ঢুকতেই একে একে আতশ বাজি হতে লাগলো।হৈচৈ শুরু হয়ে গেছে। ভীত বিড়ালিনীর ন্যায় ওই মির্জার ব্যাটার পিছনেই লুকালো আলবিনা।তার মাথায় এখন ঘোমটা দেওয়া।হুট করে দুটো বাজি একসাথে ফোটার কারণে সে শব্দে বেশ ভয় পেয়ে তার সদ্য বিবাহিত স্বামীর চাদরের একটা কোণা ধরেছে। স্বামী কি বুঝলো কে জানে?সে পিছন ফিরে তাকে দেখে মুহূর্তেই পাঁজা কোলে তুলল। সবাই হৈ হৈ করে উঠেছে। বাড়ির সদর দরজায় দাঁড়িয়ে সে উচ্চস্বরে বলল,
"এইযে মির্জা সাহেবের বৌ! মির্জার ব্যাটা আজ বিয়ে করে মির্জার ব্যাটার বৌ নিয়ে ঘরে ফিরেছে। বৌ ঘরে তুলুন।"

বয়স পঞ্চাশের এক মহিলা বেরিয়ে এলো ধীরে ধীরে। তার গায়ে সাধারণ শাড়ি কিন্তু বুঝা যাচ্ছে এইবাড়িতে সেই কত্রী।আলবিনা নিচু হয়ে সালাম দিলো।সালামের উত্তর নিয়ে সে বলল,
"তোমার সাথে বিয়ে কেন?বিয়ে তো হওয়ার কথা ছিল অন্য কারোর সাথে।আর আজ হুট করে কেন বিয়ে?"
"আমি জানি না।"
"বেশ জানতে হবে না।ঘরে যাও। দেখে তো মনে হচ্ছে বাপের বাড়ি থেকে এক কাপড়ে বিদায় করেছে।যাও কাপড় পাঠাচ্ছি।হাত মুখ ধুয়ে নাও।"

আলবিনা ঠোঁট কামড়ে হাসলো।এক নরক থেকে তবে অন্য নরকে এসে পড়লো সে? কিছু সময় পর একটা লাল রঙা শাড়ি এলো।কেবল শাড়ি সাথে আর কিছুই না। যে শাড়িটা দিয়ে গেল সে বলল,
"তোমার সাথে লাগেজে নিশ্চয়ই তোমার মাপের বাকী কাপড় আছে?ওগুলো দিয়ে পরো।আমরা তো আর তোমার জন্য কিছু কিনিনি।"

আলবিনা কিছু না বলে কাপড়টা হাতে নিলো।সবাই চলে যাওয়ার পর ক্লোজেট খুলে মির্জার ব্যাটার টিশার্ট এবং এক রঙা একটা লুঙ্গি বের করে ঢুকল ওয়াশরুমে।সে বুঝে গেছে নিজেকে যতোটা দুর্বল দেখাবে লোক তাকে তত ভাঙবে। যদি মরতে হয় তবে মির্জার ব্যাটাকে নিয়েই ম'রবে।ওর বিয়ের স্বাদ জন্মের তরে ঘুচাবে।

আলবিনার মায়ের বিয়ের গয়নাগুলো যেদিন ভাগ হয়েছিল তার সন্তানদের মাঝে সেদিন আলবিনার ভাগে কিছুই পড়েনি।সবাই বলেছিল ওর বিয়েটা হবে সবার পরে, ভাই বোনেরা গয়না দিয়ে ভরিয়ে দিবে অথচ মেয়েটা খালি পায়ে জুতো ছাড়া হেঁটে গেছে।ওর জুতোর একটা ঘরের সামনে উল্টো পড়ে আছে অন্য কোথায় কে জানে? আলবিনার মা সেই জুতোটা হাতে নিয়ে অন্য জুতো খুঁজতে লাগলো।বেশ দূরে একটা চেয়ারের নিচে পেয়েও গেল।জুতো জোড়া হাতে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করতেই দেখলো সেজুতি আর সায়মা বেরিয়ে আসছে আলবিনার ঘর থেকে।দুই বোনের হাত ভর্তি আলবিনার জমানো চুড়ি। নানান প্রকার চুড়ি। কাঁচের চুড়ি,কাঠের চুড়ি আবার সুতোর চুড়ি।প্রতিদিন হেঁটে গিয়ে টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে, সালামি জমিয়ে কিনেছিল মেয়েটা। আজ সেগুলো দুই বোনের হাতে দেখে সে বলল,
"বিনার ঘরে ওর জিনিসপত্র রেখে আয়।"
"কেন আম্মা?ও তো নেই। নিলে কি হবে?তাছাড়া আব্বা বললো ওকে আর বাড়িতে আনবে না।এগুলো পড়েই থাকবে।"
"রেখে আয়।"
"না আম্মা। ও ধরতে দিতো না।আজ সুযোগ পেয়েছি।"
"তোরা দিতিস ওকে কিছু?দিয়েছিস কখনো নিজের ভাগের কিছু?মনে পড়ে স্কুলের এক অনুষ্ঠানে তোর সোয়েটার গায়ে দিয়ে গিয়েছিল?আর তুই সবার সামনে ওর গা থেকে সেটা খুলে নিয়েছিলি।অথচ তুই তার দুই বছর আগেই ওটা পরা বাদ দিয়েছিলি আর সেজুতি তোর মনে নেই?তোর একটা স্বাদের কলম নিয়ে ও পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল বলে তুই ওর সব ফুলগাছগুলো তুলে ফেলেছিলি? কি দিয়েছিস ওরা তোকে?আমিও দেইনি, দিব কি করে? আমিও যে তোদের মতোই।আজ দেখ আমার বিয়ের গয়না তোরা ভাগে পেয়েছিস, তোরা না কি ওকে বানিয়ে দিবি।আর আমার ছোট্ট বিনা এক কাপড়ে খালি পায়ে বাপের ঘর ছেড়েছে।কেন এসব হলো আমি বুঝি নাই সেজুতি?তোর কি মনে হয়?মা খুব বোকা?না রে মা বোকা না।তুই আনিসকে পছন্দ করিস বলে মেয়েটার কপাল থেকে সব কেড়ে নিলো তোর বাপ তাই না?যে আগুনে আমার মেয়েকে তোরা ঠেলে দিয়েছিস না?দেখবি সেখানেই ও রাজরানী হয়ে থাকবে।মির্জারা ঘরের বৌকে মাথায় তুলে রাখে।আমি দোয়া করি আমার বিনা সুখী হোক।"

এক মুহুর্ত অপেক্ষা করে না ভদ্রমহিলা। নিজের ঘরে ঢুকে গয়নার বাক্স নিয়ে বসে। নিজের শাড়ি আর গয়নাকে আজ সমান চার ভাগে ভাগ করে। আর কারোর কথা শুনে, অবুঝ বুঝ নিয়ে মেয়েকে ঠকাবে না সে। তার স্বামী ঘরে ঢুকে এসব দেখে বিস্মিত হলো।বড় মেয়ের ভাগটা স্বামীর সামনে রেখে বাকীটা আলমারিতে তুলে রাখলো।নশের উদ্দিন গয়না কম দেখে জিজ্ঞেস করলো,
"গয়না কম কেন?বাকীগুলো দাও।"
"আজ যে মেয়ে এক কাপড়ে বিদেয় হলো তার ভাগ নিয়ে কাল বুঝিয়ে দিয়ে আসবেন।"
"ওর জন্য আমি কোনো দিন কোনো কিছু বানাইনি।ওর কিছু লাগবে না।"
"ও আপনার মেয়ে না?"
দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন নশের উদ্দীন। লুকোচুরি না করে বললেন,
"ওকে দেখতে ইচ্ছে করে না আমার।ও যখন কষ্ট পায় মনে হয় অভিনয় করছে। ভাত দিয়ে পালছি, থাকতে দিয়েছি এর থেকে আর কিছু ইচ্ছে করে না।বাড়তি খরচ মনে হয়।কতোবার ভেবেছি এতিম খানায় নিয়ে দিয়ে আসি কিংবা শহরে কাজে দিয়ে দিব কিন্তু তুমি কষ্ট পাবে বলে দেইনি।না হলে ওর জন্য আমি গার্মেন্টসে চাকরিও ঠিক করেছিলাম।"

হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল আলবিনার মা।তার পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেছে। মনে মনে প্রার্থনা করলো,মেয়েটা চলে গিয়ে তবে বেঁচে গেছে।

******************
মির্জা বাড়ির একটা নিয়ম হচ্ছে নতুন বর-বৌ সবাইকে একত্রে বসিয়ে এক পাত বেড়ে খাওয়াবে তারপর স্বামীর সাথে এক প্লেটে ভাত খাবে কিন্তু আজ ছেলের নিষেধের কারণে গিন্নি কোনো আয়োজন করেনি।মেয়েটা হেঁটে যাওয়ার সনয় খেয়াল করেছে পা খুড়িয়ে হাঁটছে। পারিবারিক ডাক্তারকে খবর দিয়েছে। হাতের কাজ সেরে যার হাত দিয়ে কাপড় পাঠিয়েছিল তাকে ডেকে পাঠালো।
"কাপড় দিয়ে এসেছিস?কি করছে মেয়েটা?"
"বসেছিল দেখলাম।কি দেখে আব্বায় ওই মেয়ে আনলো তার থেকে আমাদের রোদেলা আম্মা কত ভালো ছিল। আম্মায় মেলা কষ্ট পাবো যখন ওই বৌ দেখব।"
"রোদেলা ওর জায়গায় ঠিক আছে। বৌয়ের জন্য তার কোনো যত্নে কম হবে না।"

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সেটাও শুনলো আলবিনা।স্বামীর র'ক্ষিতাও তবে আগে থেকেই এই বাড়িতে আছে। হাসলো সে সাথে লুঙ্গিটা বেশ টাইট করে বেধে একপাশে একটু গুঁজে দিলো।হালকা লাগছে এখন।শরীর ছেড়ে আসছে তার ঠিক সেই সময় দরজা খুলে প্রবেশ করলো আলবিনার একমাত্র স্বামী।আলবিনা তাকে দেখে অনেকটা চমকে গেছে। তাকে দেখেও না দেখার ভান করে পাঞ্জাবি খুলল যুবক।উদাম শরীরে হাতে বায়োডিন এবং তুলো নিয়ে ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
"বৌ এর দায়িত্ব পালন করো মির্জার ব্যাটার বৌ।ড্রেসিং করে দাও।"
"ঘরের বৌ আমি, নার্স না।"
"আমার তো মনে হলো তুমি বৌ না। আমার এলাকার ছোট্ট ভাই।বাই দ্যা ওয়ে ছোট্ট ভাই আমার লুঙ্গিতে আরাম পাচ্ছেন?একটু খেয়াল রাখবেন আমি পুরুষ হয়েই রাতে লুঙ্গি ঠিক রাখতে পারি না আপনি এটা পরে কিভাবে ঘুমাবেন?"

চলবে( রেসপন্স করবেন)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে অধ্যায় পর্ব 2 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন