ফন্ট সাইজ:
থিম:
বিষন্ন বাসর

অধ্যায় পর্ব 3

লেখক: সাদিয়া_খান(সুবাসিনী)

#বিষন্ন_বাসর
#পর্ব-৫+৬
#সাদিয়া_খান(সুবাসিনী)

নতুন আত্মীয় বাড়ি থেকে আগামীকাল সায়মার বিয়েতে কেউ থাকবে না।নশের উদ্দিন কাউকে আমন্ত্রণ জানায়নি।একটা দায়িত্ব ছিল ওর ভাইয়ের পক্ষ থেকে, মেয়েকে বিয়ে দিয়ে সেই দায়িত্ব ও শেষ করেছে। ফোনের অপাশ থেকে এটাই শুনলো আলবিনা।শুনে তার মুখ কিছুটা বিকৃত হলো।বাংলা একটা গালি মনে মনে দিয়ে তাকালো সদ্য ভাই পাতানো স্বামীর দিকে।যে এখন তার মতোই একটা লুঙ্গি পরে বসে আছে।পার্থক্য একটাই,সে উদাম শরীরে বসে আছে তার সামনে।প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে এই দৃশ্য দেখতে হবে ভেবে খানিকটা খুশি খুশি হলো আলবিনা। জোর করে বিয়ে দিয়ে একটা উপকার তো নশের উদ্দীন করেছে, সেটা হলো তার ইন্সটাগ্রামের রিলসের ওই পর পুরুষ দেখে মন ভালো করার চেয়ে হালাল ভাবে তার স্বামীকে দেখবে।হোক ওগুলো এ আই ভিডিও তবুও তো পর পুরুষ ছিল।কথা বলতে বলতে অন্য মনষ্ক হয়ে যাওয়ায় অপর পাশের কথাগুলো ঠিক মতো শুনলো না সে।তার বাবা - মা হয়তো কিছু নিয়ে কথা কাটাকাটি করছে। সে কিছু না বলে কল কেটে দিলো।এই মুহূর্তে তার ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছে। বাপের বাড়ি হোক বা স্বামীর বাড়ি, খাবার নিজ থেকে নিয়ে খাওয়ার পরিবেশ কখনোই তার পক্ষে ছিল না।বাধ্য হয়ে এক গ্লাস পানি নিতে উঠছিল।ঠিক সেই মুহুর্তে লুঙ্গির মধ্যে পা লেগে প্রায় পড়ে যাচ্ছিলো।ভাগ্যিস মির্জার ব্যাটাটা ছিল।সে দ্রুত এসে এক হাতে তাকে আরেক হাতে লুংগির গোছাটা ধরেছে।

" তোমার পায়ে আঘাত লেগেছে?বলোনি কেন?"
"সুযোগ হয়নি।তাছাড়া বিয়ে করে বউ এনেছেন সামান্য তার জন্য ব্লাউজ পেটিকোট আনতে না পারেন দুই তিন শ টাকার একটা থ্রি পিস এনে দিতেন।থাক বাদ দিন।আমি আমার কাপড় কেচে দিয়েছি।আমাকে আগামীকাল একটা বার সকাল সকাল ও বাড়ি নিয়ে যাবেন?"
"কেন?"
"আমার কয়েকটা কাপড় নিয়ে আসতাম।আর কিছু বই খাতাও তো আছে।"
"তুমি লেখাপড়া করবে?"
"আপনারা করাবেন না? "
"আজ পুরো জেলা জেনে গেছে তুমি আমার স্ত্রী।আমার শত্রু সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা নেই আলবিনা।তবে তুমি.....
" কিন্তু "
"কোনো কিন্তু নয়।একা একা কোথাও যাওয়া যাবে না।"

আলবিনা চুপচাপ বসে রইল।কিছুক্ষণ পর একজন এসে তাদের খাবার দিয়ে গেছে। আলবিনা ধীরে ধীরে খাবার খেয়ে বিছানায় এক পাশে ঘুমিয়ে পড়েছে।অযথা কোনো নাটকীয়তা সে চায়নি কারণ এই কয়েক ঘন্টায় মির্জার ব্যাটাকে আর যাই হোক কাপুরুষ মনে হয়নি।সে তাকে জোর করবে না এটা সে বুঝে গেছে। অন্তত নিরাপদ অনুভব করছে সে।

একটা টেক্সট আসার পর দরজা খুলে বেরিয়ে গেল আলবিনার তথাকথিত মির্জার ব্যাটা।কিছু সময় পর দুটো লাগেজ দিয়ে গেল কেউ। এসির কারণে গায়ে পাতলা চাদর দিয়ে ঘুমিয়েছে মেয়েটা। পা দুটো বেরিয়ে আছে। নিজ হাতে সেই ক্ষত পরিষ্কার করে মলম লাগাচ্ছিল ঠিক তখন একজন বলল,
"ছোটো আব্বা, এমপি সাহেব ডাকতেছে আপনাকে।"

**********
বাবার ব্যক্তিগত অফিসরুমে খুব একটা আসা হয় না তার। দরজায় কড়া নেড়ে সে ভিতরে প্রবেশ করলো।
"নশের উদ্দিনের মেয়ে কেন?"
"শত্রুকে ভাঙতে হয় তার ঘরে ঢুকে। তাই তার মেয়েই।"
"ওর ভাতিজির সাথে বিয়ে ঠিক করেছিলাম।"
"মাত্র দশ লাখে সেই বিয়ে বিক্রি হয়ে গেছে।"
"মেয়েটা চালাক, রাগী এবং জেদি স্বভাবের মান। তুমি কি পারবে ওকে দিয়েই সব করাতে?"
"বাবা, মির্জা বাড়ির ছেলেরা বিয়ে একটাই করে। বউকে তারা মাথায় রাখে তাই না?"
"হুম।বউ হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতের। নিশ্চয়ই সমাদর করা উচিত।"
"সাতমহল কমপ্লেক্স এপার্টমেন্ট নাম্বার ৪বি। কিছু মনে পড়ে বাবা?"

চকিতে চমকে উঠলো সানোয়ার মির্জা।ছেলের ধুরন্ধরপনায় মুগ্ধ হয়ে বললেন,
"বাপের কুকামের হিসেব ও তো রাখতে জানো দেখছি।"
"রাখতে হয় বাবা।আমি বুঝাতে চাচ্ছি আজ আপনার গদি আমার মায়ের জন্য অনেকটা টিকে আছে।মামারা না থাকলে এইখানে অন্তত আসতেন না।সেই আপনি প্রতি সপ্তাহে দুই রাত কি করেন বাহিরে? মা জানলে অবশ্যই লোক লাগাবেন।"
"হুমকি দিচ্ছো?"
"সাবধান করছি।কবুল বলেছি তো ওই নিমকহারামের বেটি আমার বউ।ও মরলেও আমার নামেই ম'রবে।আপনি আপনার হাত সামলে রাখবেন।"

ছেলের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল সানোয়ার মির্জা। ছেলের ঠান্ডাস্বরের হুমকি তার মনে ভয় ধরায়নি ধরিয়েছে তার চাহনি।ছেলেকে হাতের বশে রাখতেই সে বিয়ে ঠিক করেছিল ওই মেয়ের সাথে।ওই মেয়েটাকে দামী শাড়ি, গয়না দিয়ে হাতে রাখা যেত কিন্তু আলবিনাকে তা সম্ভব নয়।ওর কোনো দুর্বলতা নেই। না আছে লোভ কিন্তু সবটাই যে জেদ। সিগারেট মুখে নিয়েই কল দিলো সে নশের উদ্দীনের ভাইয়ের কাছে।রাত হলেও তার হিসেব চাই আজকের এই ঘটনার।

*****
গভীর রাতে আলবিনার ঘুম ভাঙলে সে খেয়াল করলো তার লুঙ্গি ঠিক আছে কি না?সে পায়ের সাথে স্ট্যাপলার করে ঘুমিয়েছিল।ঠিক দেখে স্বস্তি পেল সে। কিন্তু পাশে খালি দেখে বারান্দায় তাকালো।সেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছে মির্জার ব্যাটা। কি বলছে শোনার জন্য কান পাততেই শুনলো,
"না মাল ফ্রেশ আছে। ডান বা বাম যেটায় নেন।এক দর ১০ লাখ। আমার বাড়িতেই আছে। ফ্রেশ না থাকলে আপনার কথা এতো রাতে শুনতাম?না কিছু সন্দেহ করবে না।হ্যাঁ প্রথমে আপত্তি করবে কিন্তু একবার বশে আনলে আর আপত্তি থাকবে না।"

চোখ মুখ শুকিয়ে গেল আলবিনার।সে মনে মনে আল্লাহ কে ডাকলো।এটাই ছিল তবে শেষ পরিণতি? ওই মির্জার ব্যাটা শেষ পর্যন্ত তার কিডনি দুটো দশ লাখে বেঁচে দিলো? আর ওই কিনা এই মানুষকে ভালোভেবে ছিল?

লাগেজ থেকে একে একে বত্রিশটা শাড়ি বের করলো আলবিনা।প্রতিটা শাড়ির সাথে আলাদা আলাদা ব্লাউজ, পেটিকোট। অবাক বিষয় হচ্ছে ড্রেসগুলোও তার একদম মাপে আনা হয়েছে। ভ্রু কুঁচকে তাকালো সে মির্জার ব্যাটার দিকে। কিছু না বলে সাদা রঙের শাড়ি নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে যাচ্ছিলো কিন্তু শুনতে পেল,
"নতুন বউ লজ্জায় লাল হয়ে থাকে। তাই তাকে লাল শাড়ি পরতে হয় বিয়ের পরের দিন সকালে।"
"ঠিক কাকে দেখে লজ্জায় লাল হবো?ভাসুর তো নেই আমার। দেবর ও নেই।আর সদ্য পাতানো স্বামী?আপনাকে দেখে আমার কেন যেন লজ্জা পায় না।"
"সত্যি?"
"তিন সত্যি, তিন কবুলের মতো সত্যি।"
"মানলাম।তোমার কোমরের ডান পাশের তিন ইঞ্চি উপরের তিলের মতো সত্যি।কিংবা কোমরের বা দিকে.......

অন্য কিছু বলার পূর্বেই আলবিনা এসে তার মুখ চেপে ধরে বলল,
" আপনি একটা ডাকাত। মির্জার ব্যাটা, আপনি.....
"তোমার তো আমার প্রতি কোনো লজ্জা নেই।তাছাড়া কেউ যদি ঠেলে ঠুলে রাতে এসে আমার উপর দিয়ে হাত পা দিয়ে ঘুমায় তখন আমার কি করার থাকে?এলাকার ছোট্টো ভাই?"
"আপনি চরম লেভের অসভ্য মানুষ।"
"বউয়ের তিল দেখলে অ'সভ্য হলে তোমার জন্ম হলো কি করে সেটা ভাবার বিষয়।"
"আল্লাহ চাইছেন তাই আমার জন্ম হয়েছে। আমার জন্ম নিয়েই সব সমস্যা।সত্যি যদি জন্মটা না হতো!"

তামাশার ছলে শুরু হওয়া কথাটা আলবিনার একটা দুর্বল জায়গায় ভীষণ কড়া ভাবে আঘাত করে বসেছে। তার জন্ম নিয়ে বরাবর সবার আপত্তি। বাপ চাচা, দাদা দাদী সবার থেকে এই জন্মের খোটাটা সে পেয়েছে। সন্তান ব্যথা পেলে বাবাগো কিংবা মাগো বলে চিৎকার করে। কিন্তু তার কাছে কোনো দিন এইটুক বলার অধিকার ছিল না।কারণ ব্যথা পেয়ে বাবাগো বলে আর্তনাদ করলে ওর দাদীর আত্মায় ছ্যাৎ করে উঠতো, বয়স্ক মানুষের কথা চিন্তা করেই আলবিনার মা নিষিদ্ধ করেছিল হাজার ব্যথা পেলেও সে যেন ভুলেও কান্না না করে। শুরুর দিকে ব্যথা পেলেও সে দূরে গিয়ে কাঁদতো, খেলতে গেলে আঘাত পেলেও বাড়িতে বলতো না।তার হাত পায়ের কত কাটা ছেড়া কেবল দুর্বা ঘাস আর কচুর কষ দিয়ে ভালো করেছে তার হিসেব নেই। এইতো এখন যেমন ওয়াশরুমে ঢুকতেই পায়ের বুড়ো আংগুলে আঘাত লেগেছে এক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে ঠান্ডা পানি দিলো অথচ চোখে পানি আসেনি। তার জায়গায় সায়মা কিংবা সেজুতি হলে সেদিন ওরা বিছানা থেকে নামতো না।হাত ধোয়ার পানি নিয়েও ওদের সামনে দিতে হতো।নশের উদ্দিন বিশ্বাস করেন মেয়ের বিয়ের আগের কপালে যদি সুখ থাকে বিয়ের পরে তারা হয় রাজরানী আর বাবার বাড়িতে মেয়েদের সব ইচ্ছে আদর যত্ন করে দিতে হয়।যদি শ্বশুরবাড়ি না পায়?

ভীষণ কান্না পেল আলবিনার। সে কাঁদলো।গতকাল থেকে কাঁদেনি। ওয়াশরুমে ফ্লোরে বসে দীর্ঘ সময় কাঁদলো।বাহিরে নিশ্চয়ই শোনা যাচ্ছে,মনে হলো দরজার সামনে নি:শব্দে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।

লাল শাড়ি পরে স্বামীর পিছন পিছন হেঁটে নিচে নামলো আলবিনা।নিয়ম অনুযায়ী সবাইকে খাবার বেড়ে দিবে।কিন্তু তার স্বামী তাকে পাশে বসিয়ে প্লেটে একটা পরোটা তুলে দিয়ে মায়ের উদ্দেশ্যে বলল,
"ওর পায়ে ব্যথা আম্মু।আজকে এসব নিয়ম কানুন বাদ দাও।ও আগে সুস্থ হোক।"
"এটুক হাঁটলে কিছুই হবে না আব্বা।ওকে আসতে দাও।"

আলবিনা উঠে দাঁড়ালো কিন্তু মা ছেলের কথা চলছেই।এই পর্যায়ে তার মা বলেই ফেলল,
"এতো বেশি আহ্লাদী হলে তোমার কোলে বসিয়ে রাখো।হাঁটার কি দরকার।"
"ঠিক বলেছো আম্মু।"

এক টানে বাড়ি ভর্তি মানুষের সামনে আলবিনাকে নিজের কোলের উপর বসিয়ে নিলো সে। লজ্জায়, অপমানে মাথা নিচু হয়ে গেল মেয়েটার। কিন্তু স্বামী নামক আ'সামীটা দিব্যি খাবার খাচ্ছে।সে ডিম তুলে তার মুখের সামনেও ধরলো।আলবিনা ভুলেও মুখ খুললো না।বাধ্য হয়ে তাকে কোলে তুলে রুমে ফিরতে ফিরতে মায়ের উদ্দেশ্যে বলল,
"দিলে তো মা আমার নতুন নতুন বউটাকে লজ্জায় ফেলে।বেচারী কিছু খেতেও পারলো না।রুমে খাবার পাঠাও।"

রুমে ফেরার পথেই আলবিনার সাথে তার কথার যুদ্ধ বাণ শুরু হয়ে গেছে।
"আপনি এতোগুলো মানুষের সামনে লজ্জায় ফেললেন কেন?ওরা কি ভাববে?আমি তো ননীর পুতুল না।"
"এটা মির্জা বাড়ি। এখানে যদি স্বামী তার স্ত্রীর পাশে না থাকে তবে স্ত্রী এক মুহুর্তও টিকে থাকবে না এই বাড়ির অন্দরমহলে। এই বাড়ির প্রতিটা ইট পাথর এর স্বাক্ষী।আজ যদি তার না বুঝানো হয় তুমি একমাত্র ক্ষমতাধর আমার জীবনে কাল ওরাই তোমাকে গি'লে খাবে।"

"বিয়েটা কেন করলেন?"
আলবিনাকে বিছানার উপরে বসিয়ে দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালো মানুষটা।চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করতে করতে বলল,
"আমার অনেক লুঙ্গি গামছা আছে। কার সাথে শেয়ার করবো মানুষ পাচ্ছিলাম না।তাই বিয়েটা করলাম।যাতে বউয়ের সাথে নিজের লুঙ্গি ভাগাভাগি করে পরতে পারি।"

আলবিনা পাশে থাকা বালিশ ছুড়ে মেরে বলল,
"আজ ফিরেন আপনি, আপনার বারোটা আমি বাজাবো।"
"এটা তুমি করতে পারো না বউ। তুমি যদি আমার অসহায়ত্বের সুযোগ নাও তাহলে আমি মুখ দেখাবো কি করে?এই সমাজে বিবাহিত পুরুষের যে কোনো দাম নেই যদি তার বউ তাকে ভালো না বাসে।আমার এতো বড় ক্ষতি তুমি করতে পারো না।"

অভিনয় দেখে আলবিনা অবাক হয়ে রইলো।সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছু বলার আগেই দরজায় কড়া নাড়লো কেউ। মির্জার ব্যাটা বেরিয়ে যাওয়ার আগে আবার ফিরে এলো।বালিশের তলা থেকে লোডেড পি'স্ত 'ল নিতেও ভুললো না।শুধু বলে গেল,
"অপেক্ষায় থাকো বউ, ফিরে এসে আমার বারোটা বাজানো আমি নিজেই আদায় করে নিবো।"

চলবে(এডিট ছাড়া,রেসপন্স করবেন)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে অধ্যায় পর্ব 3 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন