ফন্ট সাইজ:
থিম:
তবুও তোমার প্রেমে আমি পড়েছি

পর্ব 1

লেখক: অধরা মিনহা

“আমার চাচ্চু চাচীকে পালিয়ে নিয়ে বিয়ে করায় চাচীর ভাই আমাকে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে!”

চার ঘণ্টা আগে মির্জা বাড়ির ছোট মেয়ে রুমাইরা রাইহা মির্জাকে পালিয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে আমার ছোট্ট চাচ্চু। আর সেই বিয়ের প্রতিশোধ নিতে চার ঘণ্টা মধ্যেই চাচীর বড় ভাই রুদ্রিক রওনক মির্জা আমাকে কলেজ থেকে ফেরার পথে তুলে এনে নিজের বাড়িতে বিয়ে করে ফেলেছে! হ্যাঁ। ঠিকই পড়েছেন। বিয়ে। প্রতিশোধের বিয়ে। আর সেই প্রতিশোধের বলি আমি নাবিহা আরা নৌশি। যে মেয়েটা চার ঘণ্টা আগেও ভাবছিল, বাসায় ফিরে মায়ের বকুনি খেয়ে তারপর আরাম করে ঘুমাবে।

আর এখন? এখন আমি আমার চাচীর ভাবী! ভাবতেই আমার গা গুলিয়ে উঠছে। ইশ! চাচীকে এখন থেকে কী বলে ডাকব? আর আমাকে উনি কী বলে ডাকবেন? এই সম্পর্কের হিসাব করতে গেলেই আমার মাথার ভেতর কেমন যেন জট পাকিয়ে যায়। আমি এখন বসে আছি মির্জা বাড়ির বিশাল লিভিং রুমে। দেশের বিখ্যাত হার্ট সার্জন রুদ্রিক রওনক মির্জার নতুন বধূ হয়ে! আর হ্যা বধূ হয়ে ঠিকই, তবে বধূ বেশে না। পরনে হাঁটুসমান সাদা শার্ট, তার ওপর কোট, সঙ্গে জিন্স।

আমার স্বামী অর্থাৎ আমার চাচীর বড় ভাই রুদ্রিক রওনক মির্জা, ৩০ বছর বয়সেই দেশের শীর্ষস্থানীয় হার্ট সার্জনদের একজন। শুধু দেশেই না, বিদেশেও একজন সেরা হার্ট সার্জন হিসেবে তার ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। রুদ্রিকের বাবা ড. রেজওয়ান মির্জা। পেশায় ডাক্তার এবং নামকরা কিডনি বিশেষজ্ঞ। আর ওনার মা ডক্টর ফাহমিদা আইরিন। গাইনী বিভাগের ডাক্তার। ওনাদের তিন সন্তান। সবার বড় রুদ্রিক।

তারপর রুদ্রিকের থেকে ছয় বছরের ছোট ভাই রোহান রাইদান মির্জা। রোহান দেশে LLB Honours শেষ করেছে। এরপর ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য বিদেশে যাবে, এমনটাই চাচীর কাছ থেকে শুনেছিলাম। আর আমার চাচী রুমাইরা রাইহা মির্জা রুদ্রিকের একমাত্র বোন। বর্তমানে MBBS-এর পঞ্চম বর্ষে পড়ছে। অথচ সেই চাচীই আজ পালিয়ে বিয়ে করেছে আমার ছোট্ট চাচ্চুকে! আর তার ফলাফল ভোগ করছি আমি।

আমি মাথা নিচু করে বসে আছি। কারণ মাথা তুললেই সামনে বসে থাকা রুদ্রিকের রক্তচক্ষুর সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যাচ্ছে। আর সেটা হওয়ার পর আমার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কতটুকু সে ব্যাপারে আমি যথেষ্ট সন্দিহান। আধা ঘণ্টা আগেই রুদ্রিকের নামে কবুল বলে দিয়েছি। যদিও প্রথমে বলতে চাইনি। কেনই বা চাইব? একজন মানুষকে জীবনে প্রথম দেখলাম আর সে আমাকে তুলে এনে বিয়ে করে ফেলল!

কিন্তু আমার মতামতের মূল্য যে এই বাড়িতে শূন্য, সেটা বুঝতে আমার বেশি সময় লাগেনি। বিশেষ করে রুদ্রিক চাচ্চুর হাতে সাতটা দাবাং মার্কা থাপ্পড় খাওয়ার পর। একটা, দুইটা হলে হয়তো সহ্য করা যেত। কিন্তু সাতটা থাপ্পড় খাওয়ার পর আমার আত্মসম্মানও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। তাই শেষ পর্যন্ত কবুল বলে দিয়েছি। আমার বাম পাশে রুদ্রিকের মা, বাবা আর ভাই বসে আছেন। আর আমার ঠিক সামনের সোফায় বসে আছে আমার সদ্য বিবাহিত স্বামী রুদ্রিক।

আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন এই মুহূর্তে আমাকে জীবন্ত অবস্থায় পুঁতে ফেললেও তার মনের শান্তি হবে না। আমার শ্বশুর-শাশুড়ির রিঅ্যাকশনও খুব একটা ভালো না। তারা সবাই আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন ওদের মেয়ে-বোনকে আমার চাচ্চু না, আমিই পালিয়ে নিয়ে গেছি! যাক। এসব পরে দেখা যাবে। এই মুহূর্তে আমার নিজের গালের জ্বালা কমানো দরকার।সাতটা থাপ্পড় খেয়ে আমার সুন্দর গাল দুটো লাল হয়ে আছে। অসম্ভব জ্বলছে। আমি ধীরে ধীরে মাথা তুললাম।

সদ্য শাশুড়ি হওয়া মানুষটার দিকে তাকালাম। অবশ্য তিনি আবার আমার সম্পর্কে নানু হন। সম্পর্কটা এত জটিল যে নিজেরই সন্দেহ হয়, আমি আদৌ বিয়ে করেছি, নাকি কোনো পারিবারিক গণিত পরীক্ষায় বসেছি!

আমি খুব স্বাভাবিক গলায় বললাম,
— নানু, একটু বরফ দিবেন? গালে লাগাবো! খুব জ্বলছে।

ব্যস। আমার এই একটা কথা পুরো ঘরে গ্রেনেড বিস্ফোরণের কাজ করে। সবাই একসঙ্গে আমার দিকে তাকায়। এমন দৃষ্টি, যেন আমি বরফ চাইনি, বাড়ির সম্পত্তির অর্ধেক চেয়ে বসেছি! রুদ্রিকও আমার দিকে তাকায়। তার চোখের দৃষ্টি আরো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠে। রুদ্রিকের মা ফট করে দাঁড়িয়ে গেলেন। চোখেমুখে স্পষ্ট বিস্ময়। তিনি বলেন,
— কে নানু?

আমি চোরের মতো চেহারা করে বললাম,
— আপনি। আপনি তো চাচী আম্মুর মা। আর চাচীর মা তো আমার নানুই হয়।

আমার উত্তর শুনে এবার রুদ্রিকের বাবা রুদ্রিকের দিকে তাকালেন। দাঁতে দাঁত চেপে বলেন,
— এই মেয়ে কি বলছে? একে চুপ করাবে?

রুদ্রিক এতক্ষণ বসে ছিল। এবার সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। পরনে সাদা শার্ট আর কালো ফর্মাল প্যান্ট।চেহারায় কোনো হাসি নেই। চোখে শুধু রাগ। সে এগিয়ে এসে আমার হাত টেনে ধরে আমাকে দাঁড় করিয়ে দেয়।তারপর রেজওয়ান মির্জার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলেন,
— চিন্তা করো না, পাপা। আমি ওকে আজ রাতের মধ্যে শ্বশুরবাড়ির আদবকায়দা শিখিয়ে দিবো।

আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠে। আজ রাতের মধ্যে?!
রুদ্রিক আর কিছু না বলে আমার হাত শক্ত করে ধরে টেনে সিঁড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগল। আমি তার সঙ্গে হাঁটছি না। প্রায় আছাড় খেতে খেতে, হোঁচট খেতে খেতে, কোনো রকমে তাল মিলিয়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে একজন আসামিকে থানায় নিয়ে যাচ্ছে!

আমি নাবিহা আরা নৌশি। বয়স সতেরো। উচ্চতা পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি। গায়ের রং ফর্সা। চেহারা নাকি ভীষণ সুন্দর।আমি না মানুষ বলে আরকি! এবার ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি।আমার বাবা জাবেদ আহমেদ একটা বেসরকারি স্কুলে শিক্ষক পদে চাকরি করছেন। মা আয়েশা আক্তার গৃহিণী। আমার দশ বছরের একটা ছোট বোন আছে। নাম নায়রা আরা নুহি। এবার ক্লাস সিক্সে পড়ে।

আমাদের পরিবারের আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হলেন আমার বাবার ছোট ভাই, আমার ছোট চাচ্চু নুহান আহমেদ। চাচ্চু একটা বেসরকারি ব্যাংকে Probationary Officer হিসেবে চাকরি করেন। আর এই চাচ্চুই গত চার বছর ধরে প্রেম করছে রুদ্রিকের বোন রুমাইরা রাইহা মির্জার সঙ্গে। চার বছরের প্রেম। কিন্তু প্রায় তিন মাস আগে চাচীর পরিবার তাদের সম্পর্কের কথা জেনে যায়।তারপর চাচীকে চাচ্চুর সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

রুদ্রিকসহ পরিবারের সবাই এই বিয়ের বিরুদ্ধে ছিল।কারণ তারা আমাদের মতো সাধারণ পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তা করতে রাজি ছিল না। তাদের পরিবার উচ্চবংশীয়, সুনামধন্য। আর আমরা? সাধারণ মানুষ। তাই আমাদের পরিবারে তারা নিজেদের ঘরের মেয়েকে বিয়ে দেবে, এমনটা ভাবার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু আজ সব হিসাব উল্টে গেছে। রুমাইরা চাচী পালিয়ে গিয়ে আমার চাচ্চুকে বিয়ে করেছে।

আর চাচীকে পালিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যেই রুদ্রিক আমাকে কলেজ থেকে তুলে এনে বিয়ে করেছে প্রতিশোধ নিতে। অর্থাৎ আমার চাচীর ভাই, যিনি তিন ঘন্টা আগে আমার চাচ্চু হয়েছিলেন এখন তিনি মিস্টেকলি আমার স্বামী হয়ে গেছেন! জীবন মাঝে মাঝে সত্যিই অদ্ভুত রসিকতা করে। রুদ্রিক আমাকে টেনে একটা রুমের সামনে নিয়ে থামে। দরজা খুলে আমাকে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। পরের মুহূর্তেই ধপাস করে আমাকে বেডের ওপর ছুড়ে মারল। আমি ছিটকে গিয়ে বেডের ওপর পড়লাম।

কয়েক মুহূর্ত পর নিজেকে সামলে ধীরে ধীরে উঠে বসলাম। সামনে তাকাতেই দেখলাম রুদ্রিক আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমার বুকের ভেতরটা আবার ধকধক করতে শুরু করে। রুদ্রিক আমার সামনে এসে ঝুঁকে পড়ে। আমি ভয়ে পেছনের দিকে হেলে গেলাম। লোকটাকে আমার একদমই সুবিধার লাগছে না। তার ওপর এখন আমরা একা একটা রুমে। লোকটার বাড়িতে। আর আমার সামনে এমন একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, যে আমাকে চার ঘণ্টার মধ্যে অপহরণ থেকে বিয়ে পর্যন্ত নিয়ে এসেছে!

রুদ্রিক হঠাৎ আমার দুই পাশে বিছানায় নিজের দুই হাত রেখে আমাকে মাঝখানে আটকে ফেলল। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম,
— চাচ্চু প্লিজ সরেন।

রুদ্রিকের ভ্রু কুঁচকে গেল।
— চাচ্চু কে?

আমি চোখ বড় বড় করে বললাম,
— চাচীর ভাই চাচ্চু! আপনি আমার চাচ্চু!

রুদ্রিক দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— একটু আগে সাতটা থাপ্পড় খেলে না? এখন আরো সাতটা দিয়ে চাচ্চু ডাক বন্ধ করে দিবো!

আমি সঙ্গে সঙ্গে চুপ। কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকার পর খুব সাবধানে জিজ্ঞেস করলাম,
— তো কি ডাকবো?

রুদ্রিক গম্ভীর গলায় বলে,
— কি ডাকবে? হাসবেন্ডকে কি ডাকে মানুষ?

আমি একটু ভেবে বললাম,
— গোলামের পুত!

রুদ্রিকের চোখ কপালে উঠে গেল।
— কিহ?! কি বললে?!

আমি তাড়াতাড়ি হাত পা নাড়িয়ে বললাম,
— আরে আরে, আপনাকে বলিনি! মানুষ তো হাসবেন্ডকে গোলামের পুত ডাকে!

রুদ্রিক কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলে,
— সাহসও করবে না। নাহলে পুঁতে ফেলবো জায়গায়।

নৌশি একটা ভেংচি কাটে। তারপর বলে,
— শত্রুতা তো আপনার চাচ্চুর সাথে! তাহলে আমাকে কেন বিয়ে করলেন?

রুদ্রিক নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে,
— কারণ তোমার চাচ্চুকে আমি বিয়ে করতে পারবো না।

নৌশি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে,
— কে বলছে পারবেন না? কত ছেলেই তো দেখি ছেলেদের বিয়ে করে। বরং আপনি আমাকে বিয়ে না করে চাচ্চুকে বিয়ে করলে চাচ্চুর জন্য আরো বেশি শাস্তি হতো। দুনিয়ায় এতো এতো সুন্দর মেয়েদের বদলে আপনার মতো দামড়ার ব্যাডার সাথে সংসার করে আজীবন কষ্ট পেতো।

কথাটা শেষ হতে না হতেই রুদ্রিক নৌশির দিকে কটমট করে তাকায়। সেই দৃষ্টির তীব্রতা দেখে নৌশি সামান্য ভয় পেল। একটা ঢোক গিলে নরম গলায় বলে,
— আচ্ছা, হয়েছে। বিয়ে করেছেন, প্রতিশোধ নিয়েছেন। এখন আমাকে বাসায় যেতে দিন।

কথাটা শুনেই রুদ্রিকের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠে। হাসিটা মোটেও সুবিধার না। রুদ্রিক বলে,
— কে বলেছে প্রতিশোধ নেওয়া শেষ? এটা তো শুরু, ডার্লিং! রাতে তোমার সাথে বাসর করে সেই ক্লিপ তোমার চাচ্চুকে পাঠাবো!

রুদ্রিকের কথা এবং সেই বাঁকা হাসি দুটোর কোনোটাই নৌশির পছন্দ হলো না। সে অস্বস্তিতে এদিক-সেদিক তাকায়। রুদ্রিকের বুকে হালকা করে হাত রেখে তাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু রুদ্রিক উল্টো নৌশিকে ধাক্কা দিয়ে বেডে শুইয়ে দেয়। পরক্ষণেই নিজে উঠে নৌশির ওপর ঝুঁকে পড়ে। নৌশি প্রচুর ভয় পায়। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে,
— চাচ্চু উঠুন!

রুদ্রিক উঠে না। বরং নৌশির দুই হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে বিছানার সঙ্গে চেপে ধরে। তারপর নিচু গলায় বলে,
— আরেকবার চাচ্চু বলার পরিণাম অনেক খারাপ হবে, নৌশি সুইটহার্ট। আমাকে স্বামী হিসেবে ব্রেইনে সেট করো। আর এটাকে তোমার শ্বশুরবাড়ি।

নৌশি কিছু বলার আগেই হঠাৎ রুদ্রিকের ফোনের তীক্ষ্ণ রিংটোন বেজে উঠে। নৌশি কিছু বলতে যাচ্ছিল। রুদ্রিক সঙ্গে সঙ্গে নৌশির ঠোঁটে আঙুল চেপে ইশারা করে,
— শশশশ.....চুপ!

নৌশি বিরক্ত হয়ে বলে,
— উঠুন আপনি। কষ্ট হচ্ছে আমার।

রুদ্রিক নৌশির কথায় বিশেষ পাত্তা দিল না। সে নৌশির ওপর থেকে সামান্য উঠে পকেট থেকে মোবাইল বের করে। তারপর আবার আগের মতো শুইয়ে ফোনে তাকায়।
স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে একটা আননোন নাম্বার। তবে নাম্বারটা অচেনা হলেও কলদাতা কে, সেটা রুদ্রিক খুব ভালোভাবেই জানে। এই মুহূর্তে আর কেই বা ফোন করবে? রুদ্রিক একবার নৌশির দিকে তাকায়। নৌশিও মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে,
— চাচ্চু কল করেছে!

রুদ্রিক নৌশিকে একটা সুন্দর হাসি দিয়ে কলটা রিসিভ করে। তারপর লাউডস্পিকারে দিয়ে দেয়। রুদ্রিক কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে নুহান চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করে,
— আমার ভাইজি কোথায়, রুদ্রিক?

রুদ্রিক মুখ খোলার আগেই নৌশি চেঁচিয়ে উঠে,
— চাচ্চু! আমি ওনার নিচে। উনি আমার উপরে উঠে আছেন! আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে! আমি এই হাতি লোকের নিচে চাপা পড়ে মরে যাবো!

রুদ্রিক সঙ্গে সঙ্গে নৌশির দিকে কটমট করে তাকাশ। দৃষ্টি দেখে মনে হলো, সুযোগ পেলেই মেয়েটাকে কাঁচা চিবিয়ে খাবে! নৌশিও রুদ্রিকের সেই দৃষ্টি দেখে ঠোঁট ফুলিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ওদিকে নুহান নৌশির কণ্ঠ শুনে আরো উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে। সে ব্যাকুল গলায় বলে,
— নাবু, আমার আম্মা, তুমি ঠিক আছো? ভয় পেও না। চাচ্চু বাবাই আছি তো।

রুদ্রিক তীর্যক হেসে বলে,
— ভালো থাকবে না কেন? আদর-সোহাগ কি কম দিচ্ছি?

— আমার ভাইজি তোমার কাছে কেন?

রুদ্রিক এবার চোয়াল শক্ত করে বলে,
— যে কারণে আমার বোন তোমার কাছে!

ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর নুহান অবাক কন্ঠে বলে,
— মানে?

রুদ্রিক ঠান্ডা গলায় উত্তর দেয়।
— মানে সিম্পল! নাউ নৌশি ইজ মাই অফিসিয়াল ওয়াইফ।

নৌশি আর চুপ থাকতে পারল না। জোরে গলা ফাটিয়ে বলে,
— চাচ্চু? এই রুদ্রিক চাচ্চু আমাকে ভার্সিটি থেকে তুলে এনে সাতটা থাপ্পড় মেরে আমাকে দিয়ে কবুল বলিয়েছে!

কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রুদ্রিকের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। অনেকক্ষণ ধরেই মেয়েটার মুখে শুধু 'চাচ্চু' ডাকটা শুনছে। এবার আর সহ্য হলো না। নৌশিকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য রুদ্রিক হঠাৎ নৌশির আরো কাছে ঝুঁকে পড়ে এবং ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। বাম হাত দিয়ে নৌশির দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরে বেডে। নৌশি ছটফট করতে করতে মুখ থেকে অস্পষ্ট স্বর ভেসে আসে,
— উমমমমমমমমম.....উমমমমমমমমমম.....উমমমমমমমমমমমমমমমম........

রুদ্রিকের ফোন তখন লাউডস্পিকারে। আর সেই শব্দটা স্পষ্টভাবেই নুহানের কানে পৌঁছে গেল। ওপাশ থেকে নুহানের কণ্ঠ মুহূর্তেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে,
— কি হয়েছে, আম্মা? রুদ্রিক কি করেছো তুমি নৌশিকে?

কোনো উত্তর নেই। নুহান আবার জিজ্ঞেস করে,
— নাবু? কি হয়েছে তোমার?

তারপর আবার বলে,
— নৌশি? কথা বলো আম্মা!

কিন্তু এপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না। রুদ্রিক প্রায় মিনিট দুয়েক পর নৌশিকে ছেড়ে দেয়। তারপর নিজের হাতের পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছতে মুছতে নিচু হয়ে নৌশির দিকে তাকায় দুষ্টু, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। তারপর ধীর গলায় বলে,
— আর বলবে স্বামীকে চাচ্চু?

নৌশি উত্তর দেয় না। চুপ করে ফুঁসতে থাকে। তারপর ফোনের ওপাশে থাকা নুহানের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে,
— কি বলছিলে যেন?

নুহানের গলায় তখনো উদ্বেগ স্পষ্ট।
— তুমি কি করেছো নৌশিকে?

রুদ্রিক কিছু বলার আগেই নৌশি ভেংচি কেটে, ফোনের দিকে তাকিয়ে ভে ভে করে কেঁদে উঠে,
— চাচ্চু, উনি আমাকে কিস করেছে!

কথাটা শুনেই ওপাশে নুহান একেবারে চুপ হয়ে গেল। নৌশিকে সে নিজের মেয়ের থেকে কখনো কম ভালোবাসেনি। তার ভাইজি তার কাছে শুধু ভাইয়ের মেয়ে না, নিজের সন্তানের মতো। আর সেই মেয়েটার সঙ্গে এসব হচ্ছে, শুধু তার কারণে! মেয়েটা ছোট সহজ সরল। নুহান ভেঙে পড়ে। গলা দিয়ে কথা আসে না। নুহানের এমন অসহায় হয়ে চুপ করে থাকা দেখে তার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে নিল রুমাইরা। অশ্রুসিক্ত চোখে ভেজা কণ্ঠে রুদ্রিককে বলে,
— ভাইয়া, প্লিজ তুমি নৌশিকে ছেড়ে দাও.....

কথাটা পুরো হওয়ার আগেই রুদ্রিকের গলা হুংকার দিয়ে উঠে,
— চুপ!

রুমাইরা থমকে গেল। রুদ্রিকের কণ্ঠে এমন রাগ সে আগে কখনো শোনেনি। রুদ্রিক দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— তুই ভাইয়া বলবি না! তুই আমার বোন না। তুই আমাদের কিছু হোস না। তুই মরে গেছিস আমাদের জন্য। এই মির্জা বাড়ির জন্য রুমাইরা রাইহা মির্জা মৃত! পারিবারিক কবরে একটু আগেই তার কবর দিয়ে এসেছি। ফারদার ভাইয়া ডাকবি না।

কথাগুলো শুনতেই রুমাইরা আর নিজেকে সামলাতে পারে না। সে কেঁদে উঠে। কাঁদারই কথা। এই ভাইটা তাকে জানের থেকেও বেশি ভালোবাসত! শুধু রুদ্রিক না, রোহানও তাকে কম ভালোবাসত না। দুই ভাই কখনো তার সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলেনি। মুখ ফুটে কিছু চাওয়ার আগেই সব পেয়েছে ভাইদের থেকে। তার ছোট্ট ছোট্ট আবদারগুলো পর্যন্ত তারা গুরুত্ব দিয়ে পূরণ করত।রুমাইরা ছিল তাদের আদরের একমাত্র বোন। কিন্তু সেই সম্পর্কই আজ মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে গেছে।

নুহানের সঙ্গে রুমাইরার সম্পর্কের কথা জানার পর রুদ্রিক তাকে পুরো দুই ঘণ্টা বুঝিয়েছিল। একটুও বকেনি। চিৎকারও করেনি। বরং খুব শান্তভাবে, সুন্দর করে বুঝিয়েছিল। নুহানকে ভুলে যেতে বলেছিল। বুঝিয়েছিল, তাদের মতো বংশীয়, নামীদামি পরিবারের সঙ্গে নুহানদের মতো সাধারণ পরিবারের কখনো আত্মীয়তার সম্পর্ক যায় না। সে যেন সবকিছু ভুলে যায়। নুহানকে ছেড়ে দেয়। তাহলে পরিবারের সবাই তাকে ক্ষমা করে দেবে। কিন্তু রুমাইরা কারও কথা শোনেনি।

সে পরিবারের সবার বিশ্বাস ভেঙে ভার্সিটিতে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা পালিয়ে এসেছিল নুহানের বাড়িতে। তারপর নুহানকে বিয়ে করেছে। আজ ভালোবাসা পেতে গিয়ে সে নিজের পরিবারের মানুষগুলোর ভালোবাসা হারিয়ে ফেলেছে। শুধু ভালোবাসাই না, চিরতরে মানুষগুলোও হারিয়ে ফেলেছে।যে ভাই তাকে জানের থেকেও বেশি ভালোবাসত, সেই ভাই আজ তাকে নিজের বোন বলেই মানতে চাইছে না। এই কষ্টটা কি কোনোদিন সইতে পারবে রুমাইরা?

এদিকে নুহান ধীরে ধীরে নিজের ভেতরে কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে। তারপর অসহায় গলায় বলে,
— রুদ্রিক, তোমার শত্রুতা আমার সঙ্গে। হ্যা, আমি তোমার বোনকে পালিয়ে নিয়ে এসেছি। কিন্তু এতে তো আমার ভাইজির কোনো দোষ নেই। ও বাচ্চা মেয়ে। ওকে প্লিজ তুমি পাঠিয়ে দাও?

রুদ্রিকের অবলীলায় বলে,
— ঠিক আছে। সাত আট বাচ্চার মা বানিয়ে তারপর পাঠিয়ে দিবো! কোনো চিন্তা করো না।

নুহান মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। তারপর আবার কাঁপা গলায় বলে,
— রুদ্রিক, ভাই-ভাবি পাগলের মতো কাঁদছে নৌশির জন্য। আমি ক্ষমা চাইছি তোমার কাছে। হাত জোড় করছি! তুমি বললে আমি তোমার পায়ে পর্যন্ত ধরবো। তবুও প্লিজ, তুমি নৌশিকে ছেড়ে দাও।

— সম্ভব না।

— কেন সম্ভব না?!

রুদ্রিক ঠান্ডা গলায় বলে,
— যেমনটা তোর বেলায় সম্ভব হয়নি।

নুহান কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলে,
— কি চাও তুমি? তোমার বোনকে? রুমাইরাকে ফেরত পেলে নৌশিকে দিয়ে দিবে?

রুদ্রিকের চোখে তখন প্রতিশোধের আগুন। শীতল কণ্ঠে বলে,
— তুই বোধহয় শুনিসনি! এখন আবার বলে দিচ্ছি। রেজওয়ান মির্জার কন্যা মারা গেছে। রুদ্রিক রওনক মির্জা একটু আগে তার বোনকে কবর দিয়ে এসেছে! তোর কাছে যে আছে, সে আমার বোন না। যদি আমার বোন হতো, তাহলে তোর কাছে থাকতো না।

কথাটা শেষ করেই রুদ্রিক কলটা কেটে দেয়। ফোনটা নামিয়ে বেডে রাখে। চোখ মুখ শক্ত। ভেতরে আগুন জ্বলছে। প্রতিশোধের আগুন। নুহানদের ধ্বংস করে দেওয়ার আগুন। তবে সরাসরি তাদের পুড়িয়ে মারতে চায় না রুদ্রিক। সে এমন আগুনে তাদের জ্বালাতে চায়, যে আগুন চোখে দেখা যাবে না। যে আগুন নিভিয়ে দেওয়াও সম্ভব হবে না। যে আগুন কেবল অনন্তকাল ধরে জ্বলতেই থাকবে। আর সেই আগুন হচ্ছে নৌশি।

রুদ্রিক তাকায় নৌশির দিকে। নৌশি তখন খুব মনোযোগ দিয়ে একেবারে সিরিয়াস মুখে রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে আছে। রুদ্রিক ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— কি হয়েছে? এমনভাবে দেখছো কেন?

নৌশি কোনো উত্তর দেয় না। শুধু তাকিয়ে রইল খুব মনোযোগ দিয়ে। লোকটার বয়স ২৯। দেখতে ফর্সা। কুচকুচে কালো, চওড়া ভ্রু জোড়া নিখুঁতভাবে কাটা। সেই ভ্রুর নিচে চাপা পড়া হুডেড, বাদামাকৃতির চোখ। চোখের চারপাশে ঘন ও লম্বা পাপড়ির স্পষ্ট ছায়া। নিখুঁত চোয়াল। ক্লিন শেভ করা মুখ। দেখেই বুঝা যাচ্ছে নতুন শেভ করিয়েছে। উচ্চতা ছয় ফুট। সিক্স-প্যাক বডি।

সাদা শার্টের ওপরের তিনটা বোতাম খোলা থাকায় শরীরের আভাস স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চুলগুলো মিডিয়াম লেন্থ ফ্লো কাট। সব মিলিয়ে মাশাআল্লাহ! লোকটা অসম্ভব সুদর্শন। এত সুন্দর কোনো পুরুষকে নৌশি নিজের চোখে কখনো দেখেনি। শুধু তাই না টেলিভিশনেও দেখেছে বলে মনে করতে পারছে না। এতক্ষণ যে মানুষটাকে নিয়ে ভয় পাচ্ছিল, সেই মানুষটার চেহারার দিকে তাকিয়ে এখন হঠাৎ তার সমস্ত ভয় উড়ে গেল। বরং ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে দুষ্টু একটা হাসি।

নৌশি হঠাৎ বলে উঠে,
— আমার আপনাকে জামাই মানতে নো প্রবলেম!

রুদ্রিক ভ্রু কুঁচকে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকায়।
— এতোক্ষণ না মানতে পারছিলে না? হঠাৎ আবার কি হলো তোমার?

নৌশি দুষ্টুমি হেসে বলে,
— আপনার সিক্স-প্যাক বডি, ছয় ফুট লম্বা, দেখতে ফর্সা, আবার ডাক্তার, বড়লোক! আমার জীবনে আপনার মতো মি. পার্ফেক্ট জামাই পেতাম না। আমার চৌদ্দ গুষ্টি মিলেও আমার জন্য এমন জামাই আনতে পারবে না। আমি হান্ড্রেড পারসেন্ট সিউর, আমি যে এলাকায় থাকি সেই এলাকায় কেউ এতো সুন্দর বেডা স্বপ্নেও দেখেনি।

বলেই হি হি করে শয়তানি একটা হাসি দিয়ে বলে,
— আমি ভাগ্যের জোরে পেয়ে গেছি।

রুদ্রিক ভ্রু তুলে অবাক দৃষ্টিতে নৌশির দিকে তাকিয়ে রইল। নৌশি অবশ্য সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই করল না। সে নিজের মতো করেই বলে যেতে লাগল,
— জানেন? আমার কোনো কালেই পড়ালেখা নিয়ে কোনো ইন্টারেস্ট ছিল না। কিন্তু আমি পড়ালেখা করতে না চাইলে মা গিয়ে বাবাকে বলতো, রিকশা ড্রাইভারের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিতে! রিকশা ড্রাইভারকে বিয়ে করতে হবে এই ভয়ে আমি এতকাল ধরে পড়ছি। কিন্তু এখন এতো সুন্দর জামাই পেয়ে আমি খুশিতে আত্মহারা! আবার ডাবল খুশি, পড়ালেখাও করতে হবে না। আমার স্বর্ণের কপাল!

নৌশির কথা শুনে রুদ্রিক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নৌশিকে জ্বালাতে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— আমার ইচ্ছে ছিল বোনকে ডাক্তার বানানোর! বাট বোনকে তো তোমার চাচ্চু নিয়ে নিলো! কিন্তু এখন বোনকে ডাক্তার বানাতে পারিনি তো কি হয়েছে? বউকে ডাক্তার বানাবো!

নৌশি শুয়ে থেকেই জোরে হেসে উঠে।
— এটা তো সম্ভবই না। আমি কমার্সের স্টুডেন্ট, ডাক্তার চাচ্চু!

রুদ্রিক ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত দৃষ্টিতে নৌশির দিকে তাকিয়ে রইল। তার কাছে মেয়েটাকে এখন সত্যিই পাগল মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে মাথার স্ক্রুগুলো বুঝি ঢিলা! নয়তো কেউ নিজের সদ্য বিয়ে করা স্বামীকে চাচ্চু বলে? আবার এতক্ষণ ধরে শাস্তি দেওয়ার পরও মেয়েটা কিনা দাঁত কেলিয়ে হাসছে! অন্য কোনো মেয়ে হলে এতক্ষণে কেঁদে কেঁদে পুরো ঘর ভাসিয়ে ফেলত। কিন্তু এই মেয়ে? এমনভাবে হাসছে, যেন জীবনে কোনো সমস্যাই নেই।তাকে কি সত্যিই ভয় পাচ্ছে না?

রুদ্রিক এসবই ভাবছিল তখনি নৌশি হঠাৎ রুদ্রিকের দিকে এগিয়ে এসে রুদ্রিকের গাল দুটো দুই হাতে ধরে টেনে এদিক সেদিক ঘুরিয়ে দিতে দিতে বলে,
— এতো সাদা সুন্দর জামাই আমি পেয়ে গেছি, আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না!

রুদ্রিক ভ্রু কুঁচকে নৌশির দিকে তাকিয়ে রইল। কয়েক মুহূর্ত পর হঠাৎ রুদ্রিকের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠে। রুদ্রিক নৌশির হাত থেকে নিজের গাল ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,
— তাই? এই এতো সুন্দর স্বামীর সাথে থাকতে হলে কিছু ত্যাগ তো অবশ্যই করতে হবে।

— কি ত্যাগ?

রুদ্রিকের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। ঠান্ডা গলায় বলে,
— বাবার বাড়ির কারোর সাথে কোনো রকম যোগাযোগ রাখতে পারবে না।

নৌশি থমকে গেল।
— কেন?

— আমার ইচ্ছা।

নৌশি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
— আপনার ইচ্ছা, আপনি পূরণ করুন!

রুদ্রিক এবার একটু ঝুঁকে এসে তাকায় নৌশির দিকে।
— তুমি জানো, তুমি আমার কথা না শুনলে আমি কি করবো?

— কি করবেন?

রুদ্রিকের কঠিন গলায় বলে,
— তোমার পুরো পরিবারকে মেরে ফেলবো!

নৌশির কথাটা পছন্দ হয় না। কিছুটা বিরক্তি রাগ নিয়ে বলো
— ধুর! আমি আপনাকে বর মানি না। আমি এক্ষুনি আপনাকে তালাক দিচ্ছি! এক তালাক! দুই তালাক! তিন তালাক! এখন আমি বাড়ি চলে....

কথাটা শেষ করার আগেই রুদ্রিক ঝটকা দিয়ে নৌশির গাল চেপে ধরে। নৌশির মনে হলো, চোয়ালের হাড়গুলো বুঝি ভেঙে গালের ভেতর ঢুকে যাবে! নরম গাল দুটোতে প্রচণ্ড ব্যথা করছে। এমনিতেই সাতটা থাপ্পড় খেয়ে গাল জ্বলছিল। তার ওপর আবার এভাবে শক্ত করে চেপে ধরায় ব্যথাটা আরো বেড়ে গেছে। নৌশি গাল ছাড়ানোর জন্য নিজের হাত তুলে। রুদ্রিকের হাত সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু রুদ্রিক তার অন্য হাত দিয়ে নৌশির দুই হাতও শক্ত করে ধরে ফেলে।

নৌশির গালে জোরে চাপ দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে রুদ্রিক বলে,
— তোকে কি আমি প্রেম করে নিয়ে আসছি? নাকি ভালোবেসে? আমি তোকে বিয়ে করেছি জাস্ট ফর রিভেঞ্জ! তোর চাচার সাহস কি করে হয় আমার বোনকে পালিয়ে নিয়ে বিয়ে করার? আমরা আমাদের বাড়ির মেয়ে হারিয়েছি এখন তোর বাড়িও হারিয়েছে। জীবনে আর বাপের বাড়ির আশা করবি না। না তুই ওদের মুখ দেখতে পারবি জীবনে আর না ওরা তোর দেখতে পারবে!

রুদ্রিকের কথাগুলো একটার পর একটা নৌশির কানে আঘাত করতে লাগল। তার চোখ দুটো টলমল করে উঠে।
রুদ্রিক এখনো নৌশির গাল চেপে ধরে আছে। কিন্তু নৌশি এবার সেই ব্যথার জন্য কাঁদছে না। সে কাঁদছে রুদ্রিকের কথাগুলোর জন্য। এসব কী শুনছে সে? কোন মুসিবতে এসে পড়ল সে? সে কি সত্যিই আর কখনো নিজের পরিবারকে দেখতে পারবে না? বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারবে না? ছোট বোন নুহিকে দেখতে পারবে না? চাচ্চুর সঙ্গে কথা বলতে পারবে না? এসব ভাবতেই নৌশির বুকটা হাহাকার করে উঠে।

জীবনে একদিনও নিজের পরিবার ছাড়া থাকেনি।একদিনও না। অথচ এই এক ঘণ্টার মধ্যেই তার বাড়ির কথা এত বেশি মনে পড়ছে যে মনে হচ্ছে, কতদিন হয়ে গেছে সে নিজের মানুষগুলোর কাছ থেকে দূরে আছে!মায়ের মুখটা মনে পড়ছে। বাবার কথা মনে পড়ছে। ছোট্ট বোনটার কথা মনে পড়ছে। সবাইকে মনে পড়ছে। আর এখন রুদ্রিক বলছে, সে আর কখনো তাদের দেখতে পারবে না!

রুদ্রিক আবার কঠিন গলায় বলে,
— আর শোন, আমার কথার বিপরীতে গিয়ে যদি বাবার বাড়ির কারোর সাথে কোনো রকম যোগাযোগের চেষ্টা করিস, তাহলে তোর পরিবারের সবাইকে কাফনে মোড়ানো দেখবি।

কথাটা বলেই রুদ্রিক নৌশির গালে জোরে একটা চাপ দেয়। তারপর ঝাঁটা মেরে নৌশির মুখটা ফেলে আর এক মুহূর্তও সেখানে না থেকে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। রুমটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। নৌশি বেডের ওপর পড়ে রইল। চোখজোড়া অশ্রুসিক্ত। এতক্ষণ যে মেয়েটা হাসছিল, মজা করছিল, নিজের জামাইয়ের সৌন্দর্য নিয়ে উচ্ছ্বাস করছিল, সেই মেয়েটার মুখে এখন আর হাসির চিহ্নটুকুও নেই। নৌশি ধীরে ধীরে উঠে বসে। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। এতক্ষণ সে পুরো বিষয়টাকে একটা মজা হিসেবেই নিয়েছিল। চাচী পালিয়ে বিয়ে করেছে।

তার বদলে তাকে তুলে এনে বিয়ে করা হয়েছে। রুদ্রিক রাগ করছে। সেও পাল্টা কথা বলছে। সবকিছুই একটা মজার নাটক। কিন্তু এখন? এখন নৌশি বুঝতে পারছে, এটা কোনো মজা না। এটাই তার জীবন। আর এই জীবনটা মোটেও সহজ হতে যাচ্ছে না। নৌশির ভয় লাগছে। ভীষণ ভয়।

চলবে?

#তবুও_তোমার_প্রেমে_আমি_পড়েছি
#লেখনীতে:_অধরা_মিনহা
#সূচনা_পর্ব 1

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন