— "তুই আমার বোনকে পালিয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিস আর আমি তোর ভাতিজিকে তুলে এনে বিয়ে করেছি। তুই আমাদের বাড়ির মেয়ে নিয়েছিস, মেয়ের বদলে আমিও মেয়ে এনেছি! আমার বোন যেমন আমাদের সঙ্গে সব সম্পর্ক শেষ করে তোর কাছে চলে গেছে, আমিও তোর ভাতিজিকে তোদের সঙ্গে সব সম্পর্ক শেষ করেই নিয়ে এসেছি! তাই ভাতিজির আশা আর করবি না।"
বেলকনিতে দাঁড়িয়ে নিচের বাড়ির ফ্রন্ট প্যাসেজে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা নৌশির চাচ্চু নুহান, নৌশির বাবা জাবেদ আহমেদ এবং মা আয়েশা আক্তারের উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলে রুদ্রিক। কথা শেষ করে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কফির মগে চুমুক দেয় রুদ্রিক।
সঠাম, শক্ত পোক্ত শরীর। খালি গায়ে কালো ট্রাউজার পরা। বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটাও রাজকীয়। আর রাজকীয় চেহারায় ফুটে আছে নির্মম প্রতিশোধের আগুন। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা নুহান, জাবেদ আহমেদ আর আয়েশা আক্তারকে দেখে মনে হচ্ছে, তারা তাদের সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। আয়েশা আক্তারের চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে দুই হাত জোড় করে রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলেন,
— বাবা, আমি তোমার পায়ে পড়ছি। আমার মেয়েটাকে দিয়ে দাও। আমার মেয়েটা তো কিছু করেনি। ওকে কেন কষ্ট দিচ্ছো? আমার মেয়ে ছাড়া আমি একটা দিনও কোথাও থাকিনি!
রুদ্রিকের চোখে বিন্দুমাত্র মায়া দেখা গেল না। বরং ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে তাচ্ছিল্যের হাসি।
— তাই? তাহলে আপনার দেবর যখন আমার বোনকে পালিয়ে নিয়ে যায়, তখন আপনার মনে হয়নি আমার বোনও কারোর মেয়ে? উল্টো তাকে বাসায় বসিয়ে বিয়ে পড়িয়েছেন!
নুহান আর চুপ করে থাকতে পারে না। মাথা নিচু করে কষ্টভরা গলায় বলে,
— ভাই, ভাবির কোনো দোষ নেই। ওনারা জানতেন না। আমি হঠাৎ করেই রুমুকে নিয়ে গেছি। তাছাড়া রুমুও সম্মতিতে গেছে। জোর করে নিয়ে যাইনি!
কথাগুলো রুদ্রিকের কানে যেতেই মুহূর্তের মধ্যে তার কপালের রগগুলো ফুলে উঠে। চোখে নেমে আসে হিংস্রতা। সে প্রচণ্ড রাগে শ্বাস নিতে নিতে হাতের কফির মগটা নিচে নুহানের দিকে ছুড়ে মারে। নুহান সঙ্গে সঙ্গে এক পা পিছিয়ে গেল। মগটা তার গায়ে না লেগে সোজা মাটিতে পড়ে তার পায়ের কাছে।
রুদ্রিক গর্জে উঠে,
— বের হয়ে যা আমার বাড়ি থেকে। আর কখনো সাহস করবি না তুই এবং তোর গুষ্টির কেউ আমার বাড়ির রাস্তা দিয়ে যাওয়ার! জীবনে নৌশির মুখ দেখতে পারবি না, তোরা। আমি দেখতে দেব না।
কথা শেষ করেই গর্জে উঠে গার্ডদের উদ্দেশে,
— গার্ডস! এদের ধাক্কা দিয়ে বের করো বাড়ি থেকে!
অনুমতি পেয়েই গার্ডরা এগিয়ে এলো। তাদের নিয়ে যেতে উদ্যত হতেই জাবেদ আহমেদ নিজের দুই হাত দিয়ে স্ত্রী আয়েশাকে আগলে নেন যেন গার্ডরা তাকে কোনোভাবে স্পর্শ করতে না পারে। দুজনেই কাঁদতে কাঁদতে হাত জোড় করেন রুদ্রিকের সামনে। জাবেদ আহমেদ আকুতি করে বলেন,
— আচ্ছা, আমরা চলে যাচ্ছি। কিন্তু একবার আমাদের মেয়েটাকে দেখতে দাও? আমরা মেয়েটাকে একটু দেখব! শেষবারের মতো?
রুদ্রিক ঠান্ডা গলায় বলে,
— ঘুমাচ্ছে নৌশি! সারারাত ঘুমায়নি। আমাকেও ঘুমাতে দেয়নি মেয়েটা। বড্ড জ্বালাতন করেছে।
কথাটা সে ইচ্ছে করেই বাজে ইঙ্গিত দিয়ে বলে। যার অর্থ বুঝতে জাবেদ আহমেদ কিংবা আয়েশা আক্তারের কষ্ট হয় না। দুজনের মুখ মুহূর্তেই বিবর্ণ হয়ে গেল। তাদের বলার মতো আর কোনো কথা রইল না। শুধু চোখের পানি ঝরতে থাকে। কাঁদবেন না? ওনাদের মেয়েটার জীবনটাই তো নষ্ট হয়ে গেল! অন্যদিকে নুহানও অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সে অপরাধী। তার কারণেই আজ তার ভাই-ভাবিকে এমন অপমান সহ্য করতে হচ্ছে। তার কারণেই নৌশিকে এতকিছু সহ্য করতে হয়েছে। তার কারণেই নৌশির জীবনের এই পরিণতি। তার নিজের করা কাজের শাস্তি এখন তার ভাই-ভাবি আর নৌশি পাচ্ছে।
ওদের তিনজনকে এখনো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রুদ্রিক আবারও কঠিন গলায় বলে উঠে,
— কী হলো, গার্ডস? এখনো দাঁড়িয়ে আছে কেন?
এবার গার্ডরা আর এক মুহূর্তও দেরি করে না। তারা তেড়ে এলো। নুহান, জাবেদ আহমেদ আর আয়েশা আক্তার নিরুপায় হয়ে হাঁটা ধরলেন। অপমানের ভারে প্রত্যেকের পা ভারী হয়ে গেছে। পা চলছে অথচ মনে হচ্ছে কেউই এগোতে পারছে না। আয়েশা আক্তার যেতে যেতে একবার পেছন ফিরে তাকালেন। চোখে এখনো ক্ষীণ আশা।একটুখানি মেয়েটাকে দেখতে চান তিনি। শুধু একবার।একটুখানি নৌশির মুখটা দেখতে চান। মায়ের চোখে শেষবারের মতো মেয়ের মুখটা তুলে নিতে চান বুকের মধ্যে। কিন্তু সেই সুযোগটুকুও তিনি পেলেন না।
রুদ্রিক স্থির দাঁড়িয়ে ওদের চলে যাওয়া দেখতে লাগল।ওদের এভাবে অপদস্ত হতে দেখে, অপমানিত হতে দেখে তার ভেতরে এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছে। ওদের কষ্টে জর্জরিত মুখগুলো দেখে তার অন্তর সন্তুষ্ট হয়েছে।
সে ওদের এমন অসহায়ই দেখতে চেয়েছিল। এভাবেই।
ঠিক এভাবেই। রুদ্রিক চেয়েছিল ওরা হাড়ে হাড়ে টের পাক, তার বোনকে নিয়ে ওরা ভালো করেনি। ওটা ছিল ওদের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত। আর সেই সিদ্ধান্তের জন্য ওদের সারাজীবন সাফার করতে হবে।সারাজীবন! রুদ্রিকের ঠোঁটের এক কোণে বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠে।
বেলকনি থেকে এবার রুমের দিকে পা বাড়ায়। নুহানকে এভাবে নত হয়ে আকুতি মিনতি করতে দেখে তার মনটা কিছুটা শান্ত হয়েছে। তবে বেশি না। মাত্র এক পারসেন্ট!আরো অনেক বাকি। আরো অপদস্ত হবে ওরা। আরো হেয় হবে। তার বাড়ির সম্মান নিয়েছে ওরা! এখন ওদের বাড়ির সম্মান তার কাছে। আর সেই সম্মানকে সে এমনভাবে পিষে মারবে, এমন কষ্ট দেবে, যে কষ্টে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে সবাই! এই প্রতিশোধ এখানেই শেষ না। এটা কেবল শুরু।
রুদ্রিক রুমের ভেতর পা রাখতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। তার দৃষ্টি আটকে গেল ফ্লোরের দিকে। নৌশি সেখানে বসে আছে। কপাল মাটিতে ঠেকানো। এলোমেলো ভঙ্গিতে।রুদ্রিক আরো দুই পা এগিয়ে যেতেই তার পায়ের শব্দ নৌশির কানে গেল। নৌশি ধীরে ধীরে মাথা তুলে। রুদ্রিক আবার স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। কিছুক্ষণের কান্নাই মেয়েটার চোখ দুটো ফুলে আছে। চেহারায় ক্লান্তি, অসহায়ত্ব। কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটার অবস্থা একেবারে খারাপ হয়ে গেছে। বিধ্বস্ত লাগছে নৌশিকে।
এতক্ষণ ধরে সে ভেতর থেকে সব শুনেছে। তার বাবা মায়ের কান্না। তাদের হাহাকার। তাদের অসহায় অনুরোধ।
আর তারই সঙ্গে রুদ্রিকের একের পর এক অপমান।নৌশির বুকটা ফেটে যাচ্ছে। নিজের বাবা মা আর চাচ্চুকে এভাবে অপমানিত হতে দেখে তার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। মানুষগুলোকে এমন অসহায় অবস্থায় সে মেনে নিতে পারছে না। এমন ভাঙা, এমন অপমানিত রূপে!
আর সবকিছুর জন্য দায়ী একজনই। রুদ্রিক!
কিছুক্ষণ আগের ঘটনা। মাত্রই নৌশির ঘুম ভেঙেছে। ঘুমজড়ানো চোখ দুটো পিটপিট করে খুলে ধীরে ধীরে উঠে বসেছিল নৌশি। তখনি তার চোখ পড়ে সামনে সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে রুদ্রিক। পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে। হাতে কফির মগ। ধীরে ধীরে তাতে চুমুক দিচ্ছে। খালি গায়ে ট্রাউজার পরা। আর তার দৃষ্টি সোজা নৌশির দিকে। মুহূর্তের মধ্যেই নৌশির মনে রাতের কথা।রুদ্রিক তাকে রুমে ফেলে দিয়ে চলে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ কেঁদেছিল নৌশি। কাঁদতে কাঁদতেই একসময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
আর এখন ঘুম ভাঙতেই আবার সামনে বসে আছে এই মানুষটা। রুদ্রিক সিরিয়াস মুখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নৌশির দিকে
একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। নৌশি বিরক্তি হয়। মনে মনে ভেংচি কাটে। এত দেখার কী আছে? আর তাকে দেখবেই বা কেন? কালকেই তো নিজের মুখে বলেছে, শখ করে তাকে আনেনি। ভালোবেসেও আনেনি। তাহলে এখন কেন এভাবে তাকিয়ে আছে? নৌশি বিরক্তি নিয়ে কোনো কথা না বলে বেড থেকে নেমে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো। মুখটা ভেজা। মুখ মুছতে তোয়ালে লাগবে।সামনেই চোখে পড়ে টাওয়াল স্ট্যান্ড। সেখানে সুন্দর করে রাখা একটা তোয়ালে।
কিন্তু নৌশি দ্বিধায় পড়ে যায়। তোয়ালেটা ব্যবহার করবে কি না, বুঝতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত সরাসরি রুদ্রিকের দিকে না তাকিয়ে অন্যদিকে তাকিয়েই ইনডিরেক্টলি জিজ্ঞেস করে,
— এই তোয়ালেটা দিয়ে মুখ মুছব?
রুদ্রিক গম্ভীর গলায় উত্তর দেয়,
— না। এটা আমার। রুমে টিস্যু আছে।
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে একটা ভেংচি কাটে। মনে মনে ফালতু বলে গালি দিয়ে বেডের পাশে থাকা সাইড টেবিল থেকে টিস্যু নিয়ে মুখটা মুছে নেয়। তারপর ব্যবহৃত টিস্যুটা ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। তখনি দূর থেকে ভেসে এলো পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর,
— নৌশি আম্মা, কই তুমি?
নৌশি চমকে উঠে। এই গলা সে চেনে। এটা তার বাবার কন্ঠ। তড়িৎ গতিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় বেলকনির দিকে।রুদ্রিকও সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়েছে। ভ্রু কুঁচকে গেছে তার। নৌশি দ্রুত পায়ে বেলকনির দিকে এগিয়ে যেতে নেয়। তার বাবা এসেছে! বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠে। বেলকনির চৌকাঠের কাছে পৌঁছাতেই রুদ্রিক নৌশির হাত ধরে থামিয়ে দেয়। নৌশি অবাক চোখে রুদ্রিকের দিকে তাকায়। রুদ্রিকের মুখভঙ্গি কঠিন হয়ে আছে।
রুদ্রিক হিমশীতল কন্ঠে বলে,
— তুমি যেতে পারবে না।
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে অন্য হাত দিয়ে রুদ্রিকের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— আমি যাবো। আমার বাবা এসেছে। আমি আমার বাবার কাছে যাবো।
এবার রুদ্রিকের ভেতরের রাগ চোখেমুখে স্পষ্ট ফুটে উঠে। নৌশির হাতটা আগের থেকে আরো শক্ত করে চেপে ধরে রাগী গলায় বলে,
— রাতের কথাগুলো ভুলে গেছো? আবার বলতে হবে?
রুদ্রিকের কথা শুনতেই নৌশির মনে পড়ে গেল গত রাতের কথা। রুদ্রিক স্পষ্ট করে তাকে নিষেধ করেছিল, সে তার পরিবারের কারো সঙ্গে দেখা করতে পারবে না।
কোনো রকম যোগাযোগও করতে পারবে না। এমনকি কেউ কারো মুখ পর্যন্ত দেখতে পারবে না। আর নৌশি যদি তার কথা না শোনে, তাহলে তার পুরো পরিবারকে মেরে ফেলবে। এমন হুমকিই দিয়েছিল রুদ্রিক। নৌশি থমকে গেল।
রুদ্রিক আবারো কঠিন স্বরে বলে উঠে,
— প্রতিশোধপরায়ণ রুদ্রিক রওনক মির্জা অনেক হিংস্র। যেটা তুমি কালকে দেখছো। তোমার পরিবারের রক্ত আমার হাতে লাগাতে আমি দুবার ভাববো না, যদি তুমি আমার কথার বিরুদ্ধে যাও।
কথাগুলো শুনে নৌশির বুকটা কেঁপে উঠে। কিছুক্ষণ আগে যে মেয়েটা বাবার কাছে ছুটে যেতে চাইছিল, সে এবার ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলো। চোখ দুটো ছলছল করে উঠে। রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে অসহায় কণ্ঠে বলে,
— প্লিজ, আজই শেষবার। আমাকে একটু দেখতে দিন ওদের? একটু কথা বলতে দিন? আর কখনো বলবো।
রুদ্রিকের চোখেমুখে বিন্দুমাত্র কোমলতা এলো না।নির্দয়ভাবে বলে উঠে,
— না। তুমি রুমে থাকবে।
কথাটা বলেই রুদ্রিক নৌশির হাত ছেড়ে দিয়ে বেলকনিতে চলে গেল। নৌশি আর নড়তে পারে না। পরিবারকে হারানোর ভয় তার পুরো শরীর অবশ করে দিয়েছে। ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে। তারপর হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ে।
নৌশি অশ্রুসিক্ত দৃষ্টিতে সামনের দিকে দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্রিকের দিকে তাকায়। নৌশির চোখ বেয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। কাঁদতে কাঁদতেই কষ্টভরা গলায় বলে,
— এসেছেন অপমান করে আমার পরিবারকে আপনার বিশাল গার্ডসদের সামনে?
রুদ্রিক পকেটে হাত ঢুকিয়ে অবলীলায় বলে,
— হুমম। খুব সামান্য ছিলো।
নৌশি অবাক হয়। এত অপমান, এত অপদস্ত করার পরও বলছে, সামান্য? তার বাবা মা হাত জোড় করে কেঁদেছে।অসহায়ের মতো অনুরোধ করেছে। তবুও এই মানুষটার মন গলেনি?!
নৌশি কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠে,
— আমার বাবা মা আপনার কাছে হাত জোড় করেছে। অসহায় হয়ে ছিলো। তবুও আপনি শোনেননি! আমার দোষটা কী?
রুদ্রিকের চোখমুখশক্ত হয়ে গেল। ঠান্ডা গলায় বলে,
— তোমার দোষ, যে আমার বোনকে পালিয়ে নিয়ে গেছে, তুমি তার ভাতিজি! এটাই যথেষ্ট!
নৌশির চোখে এবার ক্ষোভ ফুটে উঠে,
— আপনি আপনার গার্ডদের দিয়ে আমার বাড়ির লোকদের ধাক্কা মেরে বের করেছেন! একটুও বিবেকে বাঁধেনি আমার পরিবারকে এভাবে অসম্মান করতে?
রুদ্রিক নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর দেয়,
— না।
নৌশি বিশ্বাস করতে পারছে না। কাঁদতে কাঁদতে প্রশ্ন করে,
— মানুষ এত পাষাণ হয়?
রুদ্রিক তাচ্ছিল্য করে হেসে বলে,
— আশ্চর্য! আমাদের সাথে যেটা হয়েছে সেটা তোমাদের সাথে করলে আমরা পাষাণ? দিস ইজ নট ফেয়ার, নৌশি সুইটহার্ট!
নৌশি চোখ মুছে ক্ষোভভরা কণ্ঠে বলে উঠে,
— আমরা কী করেছি? আপনার বোনকে কি আমি কিংবা আমার বাবা মা পালিয়ে নিয়ে গেছিলো? আপনার বোন নিজ ইচ্ছায় ভালোবাসায় গেছে!
রুদ্রিক এবার দুপা এগিয়ে এলো। চোখে আগুনের ফুলকি। আঙুল তুলে নৌশির দিকে তাকিয়ে বলে,
— তোমাদের কারণে আজ আমার বোন আমার থেকে দূরে! ওকে আমরা জীবনেও মেনে নিবো না। কিন্তু তোমাদের সাথে আমি যা করবো না? নৌশি সুইটহার্ট, নরক দেখবে তুমি ও তোমার পরিবার! আমার বোনকে আমার কাছ থেকে নিয়েছে না? জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি, মাই ডিয়ার নৌশি।
কথাটা বলে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না রুদ্রিক। কাভার্ড খুলে একটা কালো টি-শার্ট বের করে সেটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা রুম থেকে বেরিয়ে যায়। দরজাটা পেরিয়ে রুদ্রিকের পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল। নৌশি আবারও সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। মাথা নুইয়ে ফেলে। তারপর বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত কষ্ট বের করে শব্দ করে কেঁদে উঠে। এমন কান্না যার ভেতরে ছিল নিজের পরিবারের জন্য অসহায় ভালোবাসা, অপমানের যন্ত্রণা।
রুদ্রিক নিচে লিভিং রুমে এসে দেখে, সোফায় বসে আছে ফাহমিদা আইরিন আর রেজওয়ান মির্জা। দুজনেই একটু আগে নৌশির পরিবারের আসা নিয়ে কথা বলছে। রুদ্রিককে দেখতেই রেজওয়ান মির্জা ঠোঁটের কোণে সন্তুষ্টির হাসি ফুটে উঠে। বলেন,
— একদম ঠিকভাবে অপমান করেছো ওদের। আমার মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার পর আবার সাহস কী করে হয় আমার বাড়িতে পা রাখার!
রুদ্রিকের চোখেমুখে এখনো প্রতিশোধের আগুন। শান্ত অথচ ভয়ংকর স্বরে বলে,
— ওয়েট করো। আরো পাবে। এদের জীবন থেকে শান্তি জিনিসটা মুছে গেছে। এখন শুধু চারদিকে অশান্তি।
— হুম।
রুদ্রিক আর কথা বাড়ায় না। বলে,
— চল, ব্রেকফাস্ট করতে।
ফাহমিদা আইরিনও সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ান।
— হ্যাঁ। আবার হসপিটালে যেতে হবে।
তিনজনই ডাইনিং রুমের দিকে এগিয়ে গেল। ডাইনিং রুমে এসে যে যার চেয়ারে বসে পড়ে। রুদ্রিকও চেয়ারে বসে মেইডদের উদ্দেশ্যে বলে,
— আমার রুমে ব্রেকফাস্ট দিয়ে আসো, নৌশির জন্য।
কথাটা বলে নিজের প্লেটে সিদ্ধ ডিম আর ব্রেড নেয়। মেইডও রুদ্রিকের কথামতো একটা প্লেটে ব্রেকফাস্ট সাজিয়ে ট্রে হাতে নিয়ে রুমের দিকে হাঁটা দেয়।
রেজওয়ান মির্জা রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে গম্ভীর গলায় বলেন,
— এত অ্যাটেনশন দিচ্ছো কেন ওই মেয়েকে? রুমে গিয়ে খাবার দিয়ে আসতে হবে?
রুদ্রিক কোনো উত্তর দেয় না। সে যেন কথাটা শুনতেই পায়নি। নাইফ দিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে ব্রেডে বাটার লাগাতে লাগল। বাটার লাগানো শেষ হলে নাইফ দিয়ে ব্রেড কেটে কাটা চামচ দিয়ে তুলে খেতে শুরু করে গম্ভীর মুখে। রেজওয়ান মির্জা কথার কোনো জবাব না পেয়ে নিজের ব্রেকফাস্টে মনোযোগ দিলেন। কিছুক্ষণ পর মেইড আবার হাতে ট্রে নিয়ে ফিরে এলো।
রুদ্রিকের সামনে এসে দাঁড়িয়ে মাথা নত করে বলে,
— নৌশি ম্যাম বলেছেন উনি খাবেন না। আমাকে খাবার নিয়ে আসতে বলেছেন।
মেইড ট্রেটা টেবিলের ওপর রেখে দেয়। রুদ্রিক কথাটা শুনেও কিছু বলে না। শুধু একবার চোখ তুলে তাকায় ট্রেটার দিকে। যেভাবে খাবার নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেভাবেই ফিরে এসেছে। একটুও ছোঁয়া হয়নি।
ফাহমিদা আইরিন এবার বিরক্ত গলায় বলেন,
— ওর পরিবার অন্যায় করেছে, আবার এই মেয়েই আমাদের তেজ দেখাচ্ছে?! রুদ্রিক এই মেয়ের লাগাম টানো। মাথায় চড়তে দিবে না। পায়ের কাছে রাখতে। এক সেকেন্ডের জন্যও ভুলতে দিবে না ওর পরিবার কত বড় অন্যায় করেছে।
রুদ্রিক এবারো কোনো উত্তর দেয় না। কেবল নীরবে নিজের ব্রেকফাস্ট শেষ করে। ব্রেকফাস্ট শেষ করে রুমে ফিরে এসে রুদ্রিক দেখে নৌশি ঠিক আগের জায়গাতেই বসে আছে। যেভাবে তাকে রেখে গিয়েছিল, ঠিক সেভাবেই বিধ্বস্ত হয়ে। মনে হচ্ছে মেয়েটার মধ্যে কোনো প্রাণশক্তিই অবশিষ্ট নেই। রুদ্রিক কাভার্ড খুলে একটা প্যান্ট আর শার্ট বের করে। প্যান্ট চেঞ্জ করে শার্টটা ইন করে নেয়। তারপর আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। হাতার অংশ ফোল্ড করতে করতে আয়নায় নৌশির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে,
— খাওনি কেন?
নৌশি কোনো উত্তর দেয় না। তার অবস্থার কোনো পরিবর্তন হলো না। এমনকি চোখের দৃষ্টিটাও একটুও নড়ল না। মনে হলো, সে যেন রুদ্রিকের কথাই শুনতে পায়নি। রুদ্রিক হাতা ফোল্ড করা শেষ করে হাতে ঘড়ি পরতে পরতে আবার বলে,
— কতদিন না খেয়ে থাকবে? কতদিন?
এবারও নিরুত্তর নৌশি। রুদ্রিক এবার আয়না থেকে মুখ ফিরিয়ে সরাসরি নৌশির দিকে তাকায়। কঠিন গলায় বলে,
— এই আশায় থেকো না, আমি তোমাকে সেধে খাওয়াবো! তোমার ফ্যামিলি আমাদের সাথে যা করেছে, তাতে তো তোমাকে খাবারই দেওয়ার কথা না।
কথাটা শুনে এবার চোখ তুলে তাকায়। চোখ দুটো অশ্রুসিক্ত। লাল হয়ে আছে কান্নায়। জোরে বলে উঠে,
— তো খেতে দিয়েছেন কেন? চেয়েছি আমি? আপনাদের খাবারের ওপর লানত আমার!
কথাটা রুদ্রিকের কানে যেতেই তার মুখ থমথমে হয়ে গেল। রাগে একটা গভীর শ্বাস নেয়। তারপর আবার আয়নার সামনে ফিরে দাঁড়ায়। নিজের এলোমেলো চুলগুলো চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে নিয়ে চিরুনিটা ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে এবার নৌশির দিকে এগিয়ে এলো।
নৌশির সামনে এসে এক হাঁটুতে ভর দিয়ে মাটিতে বসে পড়ে। তারপর সামান্য ঝুঁকে তীক্ষ্ণ এবং শক্ত দৃষ্টিতে নৌশির চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,
— আমিও দেখবো কতদিন না খেয়ে থাকতে পারো! আজ থেকে এক ফোঁটা পানিও খেতে পারবে না। যতক্ষণ না তুমি মুখ ফুটে খাবার চাইবে!
নৌশিও জেদ দেখিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠে,
— চাইবো না।
রুদ্রিকের তীর্যক হেসে বলে,
— চ্যালেঞ্জ অ্যাকসেপ্টেড, মিসেস রওনক মির্জা!
কথাটা বলেই রুদ্রিক বেড থেকে এপ্রোনটা তুলে হাতে নেয়। তারপর সোফার ওপর রাখা মেডিকেল ব্যাগটা হাতে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। নিচে নেমেই সে সব মেইডকে ডেকে পাঠায়। সবাই সামনে আসতেই কঠিন সকলকে উদ্দেশ্য করে বলে,
— আমার পারমিশন ছাড়া কেউ নৌশিকে পানি পর্যন্ত দিবে না। খাবার দেওয়ারও প্রয়োজন নেই।
সকলে মাথা নেড়ে আচ্ছা বুঝায়। রুদ্রিক আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না। বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। রুদ্রিক রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই নৌশি আবারো কান্নায় ভেঙে পড়ে। বুকের ভেতরটা ভীষণ পুড়ছে তার। নিজের বাবা মায়ের কথা মনে পড়লেই বুকটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে।
--
রাত তখন আনুমানিক বারোটা। রুদ্রিক মাত্রই হসপিটাল থেকে ফিরেছে। গাড়ি পার্ক করে লিভিং রুম পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে। করিডোর পেরিয়ে নিজের রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর দরজার হ্যান্ডেলে হাত রেখে মোচড় দিতেই দরজাটা খুলে গেল। দরজা খুলতেই রুদ্রিকের ভ্রু কুঁচকে গেল। রুম অন্ধকার। একেবারে অন্ধকার। চারদিকে নিস্তব্ধতা। কোনো শব্দ নেই। মনে হচ্ছে, রুমে কেউ নেই। রুদ্রিক রুমের ভেতরে পা রাখে। অন্ধকার দেখে বিরক্ত গলায় নৌশির উদ্দেশ্য বলে,
— রুম এমন অন্ধকার করে রেখেছো কেন?
কথাটা বলেই লাইটের সুইচের দিকে এগিয়ে গেল।
সুইচ চাপতেই মুহূর্তের মধ্যে পুরো রুমে আলো জ্বলে উঠে। আর তখনি রুদ্রিকের চোখ আটকে গেল ফ্লোরে। নৌশি উপুড় হয়ে পড়ে আছে। মাথাটা রাখা তার ডান হাতের ওপর। বাম সোজা হয়ে পড়ে আছে। মুখটা লম্বা চুল দিয়ে পুরোপুরি ঢাকা। রুদ্রিক সেদিকে পাত্তা না দিয়ে ড্রেসিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে হাতের ঘড়িটা খুলতে খুলতে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে,
— এক বেলা না খাওয়াতেই এই অবস্থা? সামনে দিনগুলোতে তাহলে কি হবে?
কোনো উত্তর নেই। রুমের নিস্তব্ধতা আরো ভারী হয়ে উঠে। রুদ্রিক এবার ফিরে তাকিয়ে হেসে বলে,
— হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে? স্যালাইন লাগাতে হবে?
নৌশি এবারও নড়ে না। একটুও না। রুদ্রিক শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে আবারো নৌশিকে খোঁচা দেয়।
— অ্যাক্টিং ভালো করো। আশা করি ভালো রোল পাবে মুভিতে!
এবারও কোনো উত্তর নেই। নৌশি একইভাবে পড়ে আছে।হাত পায়ের কোনো নড়াচড়া নেই। রুদ্রিকের ভেতরটা হঠাৎ সামান্য কেঁপে উঠে। সন্দেহ হয়। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে সে নৌশির দিকে তাকিয়ে রইল।গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল মেয়েটাকে। তারপর ধীরে ধীরে মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। কপালে ভাঁজ পড়ে চিন্তার। এবার আর দেরি করে না রুদ্রিক। দ্রুত নৌশির দিকে এগিয়ে গেল। দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে মাটিতে বসে হাত বাড়িয়ে নৌশিকে স্পর্শ করতেই চমকে উঠে। রুদ্রিকের
মনে হলো, সে আগুন ছুঁয়ে ফেলেছে! নৌশির শরীর ভয়ংকর গরম।
রুদ্রিক দ্রুত নৌশির মুখের ওপর পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দেয়। দেখে মুখটা ফ্যাকাসে প্রাণহীনের মতো হয়ে আছে। ঠোঁটগুলো নীল হয়ে আছো সামান্য। রুদ্রিকের বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠে। এমন অবস্থায় নৌশিকে দেখে মুহূর্তের জন্য তার চোখেমুখে ভয় ফুটে উঠে। সে তাড়াতাড়ি নৌশির কপালে হাত রাখে। শরীর মাত্রাতিরিক্ত গরম হয়েছে। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে! এতক্ষণ যে রাগ, জেদ আর প্রতিশোধের আগুন তার ভেতরে ছিল, মুহূর্তেই সবকিছু ছাপিয়ে গেল অন্য এক অনুভূতি। আতঙ্ক। নৌশিকে হারানোর আতঙ্ক!
রুদ্রিক এক মুহূর্তও দেরি করে না। নৌশির শরীরের নিচে হাত ঢুকিয়ে তাকে সামান্য উপরে তুলে নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়। তারপর এক হাতে নৌশির গাল আলতো করে ছুঁয়ে ব্যাকুল কণ্ঠে ডাকতে থাকে,
— নৌশি? এই নৌশি? শুনছো? শুনছো আমার ডাক? উঠো নৌশি? নৌশি উঠো না? আমি এসেছি। আমি এসেছি প্লিজ উঠো!
চলবে?
#তবুও_তোমার_প্রেমে_আমি_পড়েছি
#লেখনীতেঃ_অধরা_মিনহা
#পর্ব_২