— “তুমি বলছো, তুমি প্রতিশোধ নিতে বিয়ে করেছো। অথচ ওই মেয়ের সামান্য জ্বর হওয়াতেই তুমি দিন দুনিয়া, সব কাজ, পেশা ভুলে দুই দিন ধরে পাগলের মতো হয়েছিলে!”
কথাটা বলেই থামলেন রেজওয়ান মির্জা। চোখেমুখে স্পষ্ট রাগের ঝিলিক। রাগ হওয়ারই কথা। আজ হসপিটালে এসে একজন নার্সের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন, রুদ্রিক গত পরশু রাতে নৌশিকে নিয়ে হসপিটালে এসেছে। শুধু তাই না, টানা দুই দিন ধরে সে হসপিটালেই পড়ে আছে। অথচ বাড়ির কেউ এই খবর জানে না। রুদ্রিক কাউকে জানায়নি। এমনকি গত দুই দিন ধরে হসপিটাল থেকে এক পা বের করেনি।
রেজওয়ান মির্জার কথার জবাবে রুদ্রিক শান্ত গলায় বলে,
— প্রতিশোধ নিতে বিয়ে করেছি, ঠিকই। কিন্তু বিয়ে তো করেছি! নৌশি এখন আমার দায়িত্ব।
রেজওয়ান মির্জা ভ্রু কুঁচকে বলেন,
— দায়িত্বে মানুষ এত কিছু করে?
রুদ্রিকের বিনাদ্বিধায় বলে,
— আমি করি।
কথাটা খুব সাধারণভাবেই বলে রুদ্রিক। রেজওয়ান মির্জা এবার ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন,
— বিয়ের চারদিনও পেরোয়নি, অথচ তুমি ওই মেয়েটার প্রতি দুর্বল হয়ে গেছো। মেয়েটা না খেয়ে সামান্য জ্বর বাঁধিয়ে ফেলেছে, আর তুমি কিনা তার জন্য কেঁদেছো! এসব কী করছো, রুদ্রিক? ভুলে যাচ্ছো, তুমি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বিয়ে করেছো। কষ্ট দেওয়ার জন্যই তো তাকে বিয়ে করেছো! তাহলে তুমি কেন ওর কষ্ট সহ্য করতে পারছো না?
রুদ্রিক ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
— আমি কান্না করেছি, এটা তোমাকে কে বলেছে?
— যেই বলুন কিন্তু কথাটা আমার কান পর্যন্ত এসেছে!
কথাটা শেষ করে রেজওয়ান মির্জা এক মুহূর্ত থামলেন। তারপর আরো কঠিন গলায় বলেন,
— রুদ্রিক, ওই মেয়ের জন্য দরদ দেখানোর আগে এটা সবসময় মাথায় রেখো, ওই মেয়ের চাচা তোমার বোনকে পালিয়ে নিয়ে বিয়ে করেছে! আমাদের ইজ্জত মাটিতে মিশিয়েছে! আমি মানুষের সামনে মাথা তুলে কথা বলতে লজ্জাবোধ করি এটা ভেবে, আমার মেয়ে পালিয়ে গেছে একটা দুই টাকার ছেলের হাত ধরে। আর তুমি কিনা সেই ছেলের ভাতিজির জন্য চোখের জ্বর ফেলো!
রুদ্রিক ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরে। চোখে ফুটে উঠে কঠিন দৃষ্টি,
— সেট আপ! আমি নৌশির জন্য কান্না করিনি। ওগুলো তোমাকে যে বলেছে, সে মিথ্যা বলেছে। আর আমি রুদ্রিক রওনক মির্জা, অপমান গিলে খাওয়ার মানুষ না। আমারও মনে আছে, আমি নুহানের ভাতিজিকে বিয়ে করেছি একমাত্র প্রতিশোধের জন্য।
রেজওয়ান মির্জা কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীর গলায় বলেন,
— হুম। এমন আগুনই রাখবে নিজের মধ্যে।
রুদ্রিক এবার অন্যদিকে তাকিয়ে বলে,
— এখন তুমি যাও। এখানে দাঁড়িয়ে এসব কথা বলে আর হসপিটালের মানুষদের জানিয়ে ইজ্জত নষ্ট করার প্রয়োজন নেই।
— যাচ্ছি। তুমি আজ ডিউটি করবে না?
— আমার এখানে কাজ আছে। নৌশির আজকে ডিসচার্জ। ওকে বাসায় নিতে হবে। কালকে থেকে ডিউটি করব।
রেজওয়ান মির্জা আর কিছু বলেন না। পা ফেলে লিফটের দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। রুদ্রিক স্থির চোখে সেদিকেই তাকিয়ে রইল। রেজওয়ান মির্জা লিফটে উঠলেন। কয়েক মুহূর্ত পর লিফটের দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রুদ্রিক বুকের ভেতর জমে থাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দেয়। নৌশির কেবিনের দিকে আর এগোয় না। সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে দুই পা এগিয়ে সামনের রেলিংটা শক্ত করে ধরে দাঁড়ায়। দরকার ছিল একটু খোলা বাতাসের। একটু স্বস্তির। মাইন্ড রিফ্রেশ করার জন্য কয়েকটা নির্ভার মুহূর্তের।
চারপাশের অশান্তি, চাপ আর দুশ্চিন্তা মিলেমিশে শরীরটাকে ক্লান্ত করে ফেলেছে। মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে কেবল বাইরের খোলা বাতাসই তাকে একটু স্বস্তি দিতে পারে। সেই স্বস্তির সঙ্গে প্রয়োজন ছিল একটা সিগারেটেরও। রুদ্রিক পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে। ঠোঁটে গুঁজে লাইটার দিয়ে আগুন ধরিয়ে নেয়। তারপর ধোঁয়া টেনে আকাশের দিকে ছেড়ে দিতে লাগল।দূরে দাঁড়িয়ে থেকেও তার মাথার ভেতর একটাই নাম ঘুরপাক খাচ্ছে, নাবিহা!
---
— আপনাদের লাভ ম্যারেজ?
নৌশির হাত থেকে স্যালাইনের পাইপটা খুলতে খুলতে প্রশ্ন করে ডক্টর ফারিন। এতক্ষণ ব্যথায় নৌশি চোখ মুখ কুঁচকে শক্ত করে বন্ধ করে রেখেছিল। ডক্টর ফারিনের প্রশ্ন শুনে ধীরে ধীরে চোখ খুলে তার দিকে তাকায়। ডক্টর ফারিন উত্তরের আশায় নৌশির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
নৌশি কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে ছোট্ট করে বলে,
— না।
বলেই থেমে গেল নৌশি। কিন্তু পরক্ষণেই কৌতূহল চাপতে না পেরে প্রশ্ন করে,
— এই প্রশ্ন কেন?
ডক্টর ফারিনের ঠোঁটের কোণে মিষ্টি একটা হাসি ফুটে উঠে। তিনি শান্ত গলায় বলেন,
— আপনাকে যখন অজ্ঞান অবস্থায় হসপিটালে নিয়ে আসা হয়, তখন থেকেই ডক্টর রুদ্রিক অলমোস্ট থাউজ্যান্ড বারের মতো সরি বলেছে। সাধারণত মানুষ এতটা অসহায় ভালোবাসার মানুষের সামনেই হয়। তাই কৌতূহল থেকেই প্রশ্নটা।
কথাগুলো শুনে নৌশির মনে মনে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠে। রুদ্রিক তাকে ভালোবাসবে? অসম্ভব। সে তো নৌশিকে বিয়ে করেছে নিজের বোনের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। ভালোবাসা তো দূরের কথা, নৌশির প্রতি তার মনের কোথাও কোনো অনুভূতিই থাকার কথা না। আর সরি বলা? হয়তো রুদ্রিক ভেবেছিল, নৌশি মারা যাবে। তাই মৃত্যুর আগে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছিল। এর বেশি কিছু না। তখনি ডক্টর ফারিন আবার প্রশ্ন করেন,
— কতদিন হয়েছে আপনাদের বিয়ের?
নৌশি নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে বলে,
— তিনদিন।
কথাটা শুনে ডক্টর ফারিন কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। অবাক চোখে নৌশির দিকে তাকিয়ে বলেন,
— তিনদিনের সম্পর্কে কেউ কারোর জন্য এতটা উদগ্রীব হয়?!
নৌশি প্রশ্নটার কী জবাব দেবে, বুঝে উঠতে পারে না। বরং প্রশ্নটা তাকে আরো অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। সেই অস্বস্তি মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে উঠে নৌশির মুখে। ডক্টর ফারিন সেটা বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে নরম গলায় বলেন,
— সরি, ডোন্ট মাইন্ড। আমি আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিলাম। প্লিজ, ডোন্ট মাইন্ড।
নৌশি সৌজন্য রক্ষা করে হালকা হাসে
— নো, ইটস ওকে।
তখনি রুদ্রিক কেবিনে ফিরে এল। কেবিনে ঢুকেই তার চোখে পড়ে নৌশি বেডে বসে আছে। হাতে ক্যানোলা লাগানো ছিল, সেটাও খুলে ফেলা হয়েছে। আর তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন ডক্টর ফারিন। রুদ্রিক এগিয়ে এসে ডক্টর ফারিনকে জিজ্ঞেস করে,
— অল রেডি?
ডক্টর ফারিন মাথা নাড়িয়ে বলেন,
— ইয়েস। প্রেসক্রিপশনে কিছু ভিটামিন আর ক্যালসিয়ামের ওষুধ লিখে দিয়েছি। ওগুলো নিয়ম করে এক সপ্তাহ খাওয়াবেন।
রুদ্রিক প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে দেয়।
— ওকে।
এরপর ডক্টর ফারিন নৌশির দিকে ইশারা করে রুদ্রিককে জিজ্ঞেস করেন,
— ওনাকে বাড়িতে দিয়ে কি আজ ডিউটিতে আসবেন?
রুদ্রিক মাথা নাড়িয়ে বলে,
— না। কালকে থেকে ডিউটিতে আসব।
কথাটা বলেই রুদ্রিক নৌশির কাছে এগিয়ে গেল। তারপর নৌশির পেছনের দিকে হাত নিয়ে বাম হাত দিয়ে নৌশির বাহু ধরে রাখে। একই সঙ্গে ডান হাতটা নৌশির সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— আমার হাতটা ধরে নামো।
রুদ্রিকের মুখটা তখন নৌশির কাঁধ বরাবর। নৌশি একবার ঘাড়টা সামান্য ঘুরিয়ে আড়চোখে রুদ্রিকের দিকে তাকায়। তারপর শান্ত গলায় বলে,
— প্রয়োজন নেই। আমি একা নামতে পারব। আপনি সরে দাঁড়ান।
কথাটা শুনে রুদ্রিক স্পষ্টতই অপমানিত হলো। চোখ তুলে একবার তাকায় ডক্টর ফারিনের দিকে। ফারিন তখন তাদের দুজনের দিকেই তাকিয়ে আছেন। রুদ্রিক নিজের বিরক্তিটা সামলে নেয়। মুখ গম্ভীর করে বলে,
— শরীর দুর্বল তোমার, নৌশি। হাতটা ধরো।
নৌশির ভেতরে ভেতরে বিরক্তি আরো বেড়ে গেল।রুদ্রিকের গম্ভীর চেহারাটা তার একদমই ভালো লাগছে না। তবুও আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ রুদ্রিকের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধরে এবং বেড থেকে নেমে দাঁড়ায়। নৌশি নামতেই রুদ্রিক ডক্টর ফারিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
— ডক্টর ফারিন, থ্যাংকস আপনাকে।
ডক্টর ফারিন সৌজন্যমূলক একটা হাসি দিয়ে বলেন,
— ইটস মাই ডিউটি!
রুদ্রিক আর কোনো কথা না বাড়িয়ে নৌশিকে সঙ্গে নিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। ডক্টর ফারিন ব্যথাতুর হৃদয়ে তাকিয়ে থাকে ওদের চলে যাওয়ার দিকে। রুদ্রিক আর নৌশি ধীরে ধীরে চোখের আড়াল হয়ে গেল। অথচ ফারিনের চোখ সেখানেই আটকে রইল। বুকের বাঁ পাশটায় ভীষণ ব্যথা করছে। এমন ব্যথা, যার কোনো ওষুধ নেই। কোনো প্রেসক্রিপশন নেই। কোনো চিকিৎসা নেই।নিজের ভালোবাসার মানুষটার পাশে অন্য কাউকে দেখা, পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্টতম কষ্টগুলোর একটা।
নৌশির ভীষণ বিরক্ত লাগছে। এভাবে তাকে রোগীর মতো করে রুদ্রিক ধরে নিয়ে যাচ্ছে, বিষয়টা তার একদমই পছন্দ হচ্ছে না। অথচ সে এখন পুরোপুরি সুস্থ। একদম ফিট। এমনকি এতটাই ফিট যে চাইলে রুদ্রিককে একটা ঘুষি মেরে এক মাসের জন্য অজ্ঞান করে রাখতে পারবে!
রুদ্রিক নৌশিকে সঙ্গে নিয়ে রুদ্রিক লিফটে উঠে। লিফটের দরজা বন্ধ হতেই নৌশি নিজেকে রুদ্রিকের কাছ থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলে,
— ছাড়ুন আমাকে। আমি কোনো রোগী না যে এভাবে ধরে রেখেছেন।
রুদ্রিক নৌশিকে ছাড়ে না। বরং আগের মতোই গম্ভীর গলায় বলে,
— হসপিটালে যেহেতু আছো, তার মানে রোগীই!
নৌশি কিছুক্ষণ রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ মাথায় একটা শয়তানি কথা মাথায় এল। মুখে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে রুদ্রিকের দিকে মাথা তুলে বলে,
— আমি তো হসপিটালে একবার এসেছি বছরে, আর আপনি তো বছরে সারাদিনই আসেন! তার মানে আপনি বারো মাসব্যাপী রোগী!
কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই লিফটের দরজা খুলে গেল। রুদ্রিক একবার নৌশির দিকে তাকায়। নৌশির মুখে স্পষ্ট দুষ্টুমির ছাপ। রুদ্রিক কিছু না বলে আবার সামনে তাকায়। নৌশিকে সঙ্গে নিয়ে লিফট থেকে বের হতে হতে শান্ত গলায় বলে,
— না, আমি ডাক্তার!
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়,
— হাতুড়িভাঙা ডাক্তার।
রুদ্রিক আর কোনো প্রতিত্তোর করে না। চুপচাপ নৌশিকে সঙ্গে নিয়ে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে এল। হসপিটালের গেট পেরিয়ে বাইরে পা রাখতেই নৌশির মনে হলো, এতক্ষণ শরীরে লেগে থাকা সমস্ত ক্লান্তি আর দুর্বলতা মুহূর্তের মধ্যেই কোথায় উধাও হয়ে গেছে। শরীরটা হঠাৎ কেমন ফুড়ফুড়ে লাগছে। আর সবচেয়ে বেশি শান্ত হয়ে গেছে তার অন্তরটা। মনে হলো, অবশেষে সে আবার নিজের পরিচিত পৃথিবীতে ফিরে এসেছে। রুদ্রিক নৌশিকে গাড়িতে বসিয়ে দেয়। তারপর নিজেও ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগে নৌশির সিটবেল্ট লাগিয়ে দেয়। এরপর নিজের সিটবেল্টও লাগিয়ে গাড়ি স্টার্ট করে। গাড়ি চলতে শুরু করে।
কিছু দূর যাওয়ার পর হঠাৎ রুদ্রিক গাড়িটা থামায় একটা ক্যাফের সামনে। কোনো কথা না বলেই গাড়ি থেকে নেমে গেল। নৌশি অবাক হয়ে রুদ্রিকের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। মিনিট পাঁচেক পর রুদ্রিক ফিরে এল।তার দুই হাতে দুটো কফি। একটা কোল্ড কফি আর অন্যটা ব্ল্যাক কফি। গাড়িতে উঠে রুদ্রিক কোল্ড কফিটা নৌশির দিকে বাড়িয়ে দেয়,
— খাও। রিফ্রেশিং লাগবে।
নৌশিও বিনা বাক্যে কফিটা হাতে নিয়ে খেতে শুরু করে। এমনিতেই দুইদিন জ্বর থাকার কারণে তার মুখটা তিতা হয়ে ছিল। কফিটা মুখে দিতেই বেশ ভালো লাগল। নৌশি ফাইভ দিয়ে টেনে টেনে কফি খেতে লাগল। পাশাপাশি রুদ্রিকও গাড়ি চালাতে লাগল। আর গাড়ি চালানোর ফাঁকে ফাঁকে নিজের ব্ল্যাক কফিতেও ফাইভ দিয়ে টেনে চুমুক দিতে লাগল। গাড়ির ভেতর দুজনের কোনো কথা নেই।
প্রায় আধা ঘণ্টা পর গাড়িটা এসে থামে মির্জা বাড়ির সামনে। রুদ্রিক আগে গাড়ি থেকে নামে তারপর নৌশিকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে। রুদ্রিক খুব সাবধানে, ধীর পায়ে নৌশিকে নিয়ে রুমে ঢুকে। বেডের কাছে গিয়ে নৌশিকে বসিয়ে দিয়ে বলে,
— বসো তুমি। পাঁচ মিনিটের মধ্যে শাওয়ার নিয়ে বের হচ্ছি। তারপর তোমার খাওয়ার জন্য কিছু আনব।
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকিয়ে বলে,
— আমি এখন কিছু খাবো না।
রুদ্রিক কথাটাকে কানেই তুলে না। কোনো জবাব না দিয়ে কাভার্ড খুলে নিজের কাপড় বের করে। তারপর সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। রুদ্রিকের এই পাত্তা না দেওয়ায় নৌশির নাকের পাটা ফুলে উঠে। রাগে নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে যায়,
— রুদ্রিক্কা অসহ্যের বংশধর!
বলেই দুটো শ্বাস নেয়। তারপর নৌশি বেডে বসে চারদিকে চোখ বুলাতে লাগল। রুমটার অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, দুই দিন ধরে এই রুমে কেউই আসেনি। হঠাৎ নৌশির চোখ আটকে যায় ফ্লোরে পড়ে থাকা একটা শার্টের দিকে। রুদ্রিকের ছেঁড়া শার্ট। নৌশি ভ্রু কুঁচকে শার্টটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপরই চোখ গেল সাইড টেবিলের ওপর রাখা একটা মগের দিকে। মগে অর্ধেক পানি ভর্তি। আর সেই পানির মধ্যেই পড়ে আছে রুদ্রিকের ছেঁড়া শার্টের একটা অংশ। নৌশি এবার সত্যিই অবাক হয়ে গেল।অর্ধেক পানি ভর্তি মগে রুদ্রিকের ছেঁড়া শার্টের অংশ কেন?
তাহলে কি? সেদিন সে যখন অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল, তখন রুদ্রিক তাকে জ্বরপট্টি দিয়েছিল? রুদ্রিক নিজের শার্ট ছিঁড়ে তাকে জ্বরপট্টি দিয়েছিল? বিষয়টা মাথায় আসতেই নৌশির চোখ বড় হয়ে গেল। রুদ্রিক নিজের শার্ট ছিঁড়ে তাকে জ্বরপট্টি দিয়েছিল?! কিন্তু কেন? এগুলো কেন করেছে রুদ্রিক? এগুলো তো যত্ন। একজন মানুষের জন্য আরেকজন মানুষ এভাবে তখনই কিছু করে, যখন তার ভেতরে সেই মানুষটার জন্য মায়া থাকে, যত্ন থাকে। কিন্তু রুদ্রিক কেন তার জন্য এমন করবে?
রুদ্রিক তো তাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য বিয়ে করেছে।প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বিয়ে করেছে। তাহলে তার জন্য এত কিছু কেন? আবার ডক্টর ফারিনও তো বলছিলেন, রুদ্রিক তাকে অজ্ঞান অবস্থায় প্রায় অসংখ্যবার সরি বলেছে! নৌশির মাথায় কিছুই ঢুকছে না। এই লোকটা আসলে চায়টা কী? কেন তাকে জ্বরপট্টি দিল? কেন সরি বলল? আর তাকে কষ্ট পেতে দেখে রুদ্রিকের চোখে কেন জল এসেছিল? প্রশ্নগুলো একটার পর একটা এসে নৌশির মাথার ভেতর ঝড় তুলতে লাগল। ভেতরটা ছটফট করে উঠে প্রশ্নের ভারে।
উত্তর জানার জন্য অস্থির হয়ে উঠ নৌশির মন। এখন শুধু অপেক্ষা, রুদ্রিক কখন ওয়াশরুম থেকে বের হবে। বের হলেই প্রশ্ন করবে। সব প্রশ্নের উত্তর চাইবে। মিনিট দুয়েক পরই ওয়াশরুমের দরজা খুলে গেল। রুদ্রিক বেরিয়ে এল।পরনে কালো আর কালো ট্রাউজার। এক হাতে চুল মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বের হচ্ছিল রুদ্রিক। রুদ্রিককে বের হতে দেখেই নৌশি আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করে না।
সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,
— মগের পানিতে আপনার শার্টের ভেজা অংশ কেন? মাটিতে শার্ট ছিড়ে পড়ে আছে কেন?
রুদ্রিকের হাত হঠাৎ থেমে গেল। চুল মুছতে থাকা হাতটা ধীরে ধীরে নিচে নেমে এল। এক মুহূর্তের জন্য নৌশির দিকে তাকাল রুদ্রিক। তারপর বিষয়টা এড়িয়ে যেতে অন্যদিকে তাকিয়ে বলে,
— এমনি এনেছিলাম।
নৌশি ছাড়ার পাত্রী না। সঙ্গে সঙ্গে আবার প্রশ্ন করে,
— আপনি সেদিন রাতে আমাকে জ্বরপট্টি দিয়েছেন?
রুদ্রিক এবার চোখ তুলে তাকায়। নৌশিও সরাসরি রুদ্রিকের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আরো স্পষ্ট করে বলে,
— আপনি নিজের শার্ট ছিঁড়ে রাতে আমাকে জ্বরপট্টি দিয়েছেন? কী হলো, বলুন?
রুদ্রিক কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। তারপর স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলে,
— জ্বর বেশি ছিল। ইন্সট্যান্ট ট্রিটমেন্ট হিসেবে এটা ভালো। এজ এ ডক্টর আমি এটাই করেছি। রুমে পট্টি দেওয়ার মতো কাপড় ছিল না, তাই কাপড় দিয়েছি।
নৌশি এবার আর বেডে বসে থাকে না। বেড থেকে নেমে রুদ্রিকের ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করে,
— আপনি আমাকে সরি বলেছেন কেন? আমি না খেয়ে অসুস্থ হয়ে মরে গেলে আপনার কী?
রুদ্রিকের মুখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল। কণ্ঠে ফিরে এল সেই চেনা গাম্ভীর্য।
— তোমাকে জানে মেরে ফেলার জন্য আমি আনিনি! নিজের প্রতিশোধের জন্য বিয়ে করেছি। প্রতিশোধ শেষ হয়নি। শেষ হবেও না। আজীবন থাকবে প্রতিশোধ। আর সেই প্রতিশোধের জন্য তোমার জীবিত থাকা প্রয়োজন।
কথাগুলো শুনে নৌশি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলে,
— কিন্তু আপনি তো ঠিকঠাকভাবে প্রতিশোধ নিতে পারছেন না। কাঁচা খেলোয়াড় লাগছে।
রুদ্রিক সঙ্গে সঙ্গে চোখ গরম করে তার দিকে তাকায়।
— কী বলতে চাচ্ছো?
নৌশি এবার হেসে হেসে ফিরে এসে বেডে বসে পড়ে। তারপর বেশ নির্ভার ভঙ্গিতে বলে,
— নাটক কম করেন! বুঝতে আপনি ঠিকই পেরেছেন, চাচ্চু!
রুদ্রিক কথাটায় ফুঁসে উঠে। দ্রুত নৌশির কাছে এসে তার বরাবর দাঁড়িয়ে শাসানোর গলায় বলে,
— চাচ্চু কী?
নৌশি বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে আঙুল তুলে রুদ্রিকের দিকে দেখিয়ে বলে,
— আপনি!
রুদ্রিক বিরক্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলে। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— স্ক্রু ঢিলা পাগল মেয়ে একটা! মাথায় সমস্যা আছে। পরেরবার হসপিটালে নিয়ে গেলে ব্রেইনের পরীক্ষাটাও করিয়ে নিয়ে আসব!
নৌশি কিছু বলে না। শুধু ঠোঁটের কোণে সেই দুষ্টু হাসিটা ধরে রাখে। রুদ্রিককে রাগিয়ে মজা লাগছে তার।
চলবে?
#তবুও_তোমার_প্রেমে_আমি_পড়েছি
#লেখনীতেঃ_অধরা_মিনহা
#পর্ব_৪
[ গল্প সবার আগে পেতে আমার পেজটা ফলো করে রাখুন। সাধারণত ফলোয়ার ছাড়া অন্যদের ফিডে আমার গল্প পৌঁছায় না। তাই নিয়মিত গল্প পেতে পেজটা অবশ্যই ফলো রাখুন। আর হ্যা এই পর্বে কালকে সন্ধ্যা আটটার মধ্যে ২৫০০ লাইক হলে পর্ববর্তী পর্ব পেয়ে যাবেন কালকে সন্ধ্যা আটটা ত্রিশে।]