— নৌশি? এই নৌশি? শুনছো? শুনছো আমার ডাক? উঠো নৌশি। নৌশি, উঠো না? আমি এসেছি। আমি এসেছি, প্লিজ উঠো!
নৌশি কোনো উত্তর দেয় না। দেবে কীভাবে? অবচেতন মানুষ কি আর ডাকে সাড়া দিতে পারে? রুদ্রিকের বুকের ভেতর আচমকাই অজানা এক ভয় জমাট বাঁধে। ভয়টা এত তীব্র যে কয়েক মুহূর্তের জন্য তার নিঃশ্বাস পর্যন্ত আটকে আসে। কাঁপা হাতে নৌশির নাকের কাছে হাত নেয় রুদ্রিক। কয়েক সেকেন্ড পর বুঝতে পারে, শ্বাস চলছে। তবে খুবই ক্ষীণ। এতটাই ক্ষীণ যে মনে হচ্ছে, যেকোনো মুহূর্তে সেই শ্বাসটুকুও থেমে যেতে পারে। রুদ্রিক আবার প্রাণ ফিরে পায়। নৌশি জ্ঞান হারিয়েছে। এক মুহূর্তও দেরি না করে রুদ্রিক তাড়াতাড়ি নৌশিকে কোলে তুলে নেয়। তারপর ছুটে গিয়ে তাকে বিছানায় শুইয়ে দেয়।
নিজের গলার টাইটা দ্রুত ঢিলা করে রুদ্রিক ছুটে যায় ওয়াশরুমে। এক মগ পানি নিয়ে ফিরে আসে। নৌশির শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। জ্বরটা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আগে যেভাবেই হোক জ্বরটা কমাতে হবে। কিন্তু পানিপট্টি দেওয়ার জন্য কাপড় কোথায়? রুদ্রিক এক মুহূর্তও ভাবার সময় নেয় না। দ্রুত কাভার্ড খুলে নিজের একটা শার্ট টেনে বের করে আনে। তারপর পাগলের মতো শার্টটা ছিঁড়ে ফেলে। সবকিছু এত দ্রুত আর এত উত্তেজনার সঙ্গে করছে যে, দেখে মনে হচ্ছে নিজের দিকদিশা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছে। মাথার ভেতর কোনো চিন্তা নেই, শুধু একটাই ভয়, নৌশির কিছু হতে দেওয়া যাবে না।
রুদ্রিকের জান আটকে আছে। নিজের শার্টের ছেঁড়া অংশটা পানিতে ভিজিয়ে নৌশির কপালে রেখে দেয় রুদ্রিক। তারপর নৌশির পাশে বসে তার একটা হাত নিজের দুই হাতের মাঝে শক্ত করে ধরে রাখে। হাতটা অনবরত ঢলতে ঢলতে কাঁপা গলায় ডাকতে থাকে,
— নাবিহা? শুনছো? উঠো? প্লিজ উঠো! একটা বার জাস্ট চোখ খুলো! আর বকবো না। প্লিজ উঠো!
রুদ্রিক ভয় পেয়েছে। ভীষণ ভয়। কিছু একটা হারিয়ে ফেলার ভয়। কিন্তু কী হারানোর ভয়, কেন এমন ভয় হচ্ছে, রুদ্রিক নিজেও জানে না। শুধু বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে আছে। মাথা কাজ করছে না। মনে হচ্ছে, নৌশির মধ্যে তার নিজের জীবনটা আটকে আছে। নৌশির কপালে পানির পট্টি রেখেই রুদ্রিক দ্রুত মেডিকেল ব্যাগটা নিয়ে আসে। ব্যাগ থেকে পালস অক্সিমিটার বের করে নৌশির অক্সিজেন চেক করে। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই রুদ্রিকের বুকটা আবার কেঁপে ওঠে। অক্সিজেন রেট কম!
রুদ্রিক কয়েক সেকেন্ড নির্বাক হয়ে নৌশির দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ করেই নৌশিকে পাজ কোলা করে কোলে তুলে নেয়। দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোর পেরিয়ে নিচে নামে। নৌশিকে কোলে করেই বাইরে চলে আসে। গাড়ির কাছে পৌঁছে সামনের সিটের দরজা খুলে নৌশিকে বসাতে বসাতে বাড়ির দারোয়ানকে চিৎকার করে বলে,
— গেট খুলো ফাস্ট!
বলেই নৌশিকে সিটে ঠিক করে বসায় রুদ্রিক। নৌশি নিস্তেজ হয়ে ঘাড়টা একপাশে ফেলে দেয়। দৃশ্যটা দেখে রুদ্রিকের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। তাড়াতাড়ি নৌশির সিটবেল্ট বেঁধে দেয়। তারপর নিজেও ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দেয়। গাড়ি ছুটতে শুরু করে। নৌশির ডান হাতটা শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় ধরে রেখেছে রুদ্রিক। এক হাতে স্টিয়ারিং, অন্য হাতে নৌশির হাত। গাড়ি চালাতে চালাতেই ভাঙা গলায় বলতে থাকে,
— নৌশি, প্লিজ চোখ খুলো! একটু কথা বলো! I'm scared! Please get up, Nabiha. আমি আর কখনো তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করবো না। প্রমিজ! প্লিইইইইজজ চোখটা খুলো?
রুদ্রিকের চোখেমুখে শুধু আকুতি। নৌশির প্রতি এক অদ্ভুত আকুতি। সে শুধু চায়, নৌশি একবার চোখ মেলে তার দিকে তাকাক। একবার শুধু চোখ খুলে তাকে দেখুক। একটা কথা বলুক। কিন্তু নৌশি পড়ে আছে অচেতন অবস্থায়। কোনো সাড়া নেই। রুদ্রিক উন্মাদের মতো গাড়ি চালাতে থাকে। গাড়ির স্পিড ফুল। ঝড়ের গতিতে ছুটছে গাড়ি। যেকোনো মুহূর্তে ভয়াবহ এক্সিডেন্ট ঘটে যেতে পারে। কিন্তু সেদিকে রুদ্রিকের কোনো খেয়াল নেই। তার মাথায় এখন একটাই চিন্তা, নৌশিকে হসপিটালে নিতে হবে।
নৌশির অক্সিজেন রেট কম। সময় নষ্ট করা যাবে না।রুদ্রিকের বুক কাঁপছে। শুধু বুক না, পুরো শরীর কাঁপছে তার। তবুও গাড়ির গতি কমছে না। কিছুদূর যেতেই সামনে দেখা যায় বিশাল জ্যাম। রুদ্রিক এক নাগাড়ে হর্ণ বাজাতে থাকে। কিন্তু জ্যাম একটুও নড়ে না। আর তখনি রুদ্রিক গাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। উন্মাদের মতো ছুটে সামনে থাকা ট্রাফিক পুলিশের কাছে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
— আমার বউকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে! আর্জেন্ট! সব গাড়ি সরিয়ে আমার গাড়িটাকে রাস্তা দিন!
ট্রাফিক পুলিশ শান্ত গলায় বলে,
— সরি, এটা সম্ভব না। এই সাইডের রোডটা আপাতত বন্ধ থাকবে। আগে ওই দিকের গাড়িগুলো যেনে নিক!
কথাটা শুনেই রুদ্রিকের মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে। সে মুহূর্তেই ট্রাফিক পুলিশের কলার চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— তুই পারবি না মানে? তুই জানিস আমি কে?
কিন্তু পরক্ষণেই রুদ্রিকের চোখ চলে যায় নিজের গাড়ির দিকে। গাড়ির ভেতর নৌশি পড়ে আছে। অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। অক্সিজেন রেট খুব কম। দ্রুত হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে। এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করা যাবে না। রুদ্রিক থেমে যায়। কলার ছেড়ে দিয়ে দ্রুত নিজের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে। মানিব্যাগের ভেতরে থাকা সব টাকা বের করে আনে। আনুমানিক ত্রিশ কিংবা চল্লিশ হাজার টাকা হবে। টাকাগুলো লোকটার হাতে তুলে দিয়ে রুদ্রিক বলে,
— আমার বউয়ের অবস্থা খুব খারাপ। কোনো ঝামেলা চাচ্ছি না, তাই আপাতত টাকাগুলো রেখে দ্রুত রোড ক্লিয়ার করে দাও আমাকে! যদি রোড ক্লিয়ার না করো, তাহলে আমি ডক্টর রুদ্রিক রওনক মির্জা নিজের সর্বোচ্চ পাওয়ার খাটিয়ে তোমার জীবনটা হেল করে দিবো।
কথাটা বলেই রুদ্রিক কলার ছেড়ে দেয়। লোকটা ঢোক গিলে রুদ্রিকের দিকে তাকায়। তার চোখেমুখে স্পষ্ট ভয়।
টাকাগুলো হাতে নিয়ে দ্রুত পকেটে ঢুকিয়ে মাথা উপর-নিচ করে বলে,
— আমি এক্ষুনি রোড ক্লিয়ার করে দিচ্ছি।
রুদ্রিক আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না। তাড়াতাড়ি নিজের গাড়ির কাছে ফিরে আসে। দরজা খুলে গাড়িতে বসে পড়ে। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে আবার নৌশির দিকে তাকায়।সামনে ট্রাফিক পুলিশ একে একে সবগুলো গাড়ি সাইড করাতে থাকে। রাস্তা ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে শুরু করে।
রুদ্রিক নৌশির হাতটা আবার শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নেয়। তার চোখে ভয়, কণ্ঠে কাঁপুনি। তবুও রুদ্রিক নৌশিকে বলে,
— আমি তোমার কিছু হতে দিবো না। তোমার কিছু হবে না। এক্ষুনি আমরা হসপিটালে পৌঁছে যাবো। তারপর সুস্থ হয়ে যাবে। তোমার সেন্স ফিরবে। তুমি কথা বলবে আমার সাথে।
ততক্ষণে সামনের সব গাড়ি সরে যায়। রাস্তা কিছুটা ফাঁকা হতেই রুদ্রিক আবারও ফুল স্পিডে গাড়ি চালাতে শুরু করে। তার বুকের ভেতর শুধু ধুকপুক, ধুকপুক শব্দ। প্রতিটা মুহূর্ত তার কাছে অসহ্য দীর্ঘ মনে হচ্ছে। আর এক মুহূর্তও দেরি করা যাবে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই রুদ্রিক নৌশিকে নিয়ে হসপিটালে পৌঁছে যায়। গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গেই রুদ্রিক এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করে না। পাগলের মতো অস্থির হয়ে নৌশিকে কোলে তুলে গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত হসপিটালের ভেতরে ঢুকে পড়ে। হসপিটালের ভেতরে ঢুকেই সামনে একজন নার্সকে দেখতে পায়। রুদ্রিক তাকে দেখেই জোরে উত্তেজনা নিয়ে আদেশের সুরে বলে ওঠে,
— তাড়াতাড়ি কেবিন রেডি করো!
হসপিটালটা রুদ্রিকদের নিজেদের। আর রুদ্রিক নিজেও এই হসপিটালের ডাক্তার। কিন্তু আজ তাকে দেখে কেউই বিশ্বাস করতে পারছে না, এই মানুষটাই সেই রুদ্রিক।এভাবে উৎভ্রান্তের মতো রুদ্রিককে হসপিটালে ঢুকতে দেখে আশপাশের সবাই বিস্মিত হয়ে যায়। নার্সটাও কিছুটা বোকার মতো রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে থাকে।নার্সের এমন তাকিয়ে থাকা দেখে রুদ্রিক এবার চেচিয়ে ওঠে,
— কী বলেছি আমি? কেবিন রেডি করতে! ওর কোনো ক্ষতি হলে সবকটাকে জানে মারবো!
রুদ্রিকের গলার সেই ভয়ংকর কঠিন স্বর শুনে নার্স এবার ভয়ে কেঁপে ওঠে। তাড়াতাড়ি বলে,
— স্যার, সেকেন্ড ফ্লোরে ২০৩ কেবিনটা খালি।
রুদ্রিক আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না। নৌশিকে কোলে নিয়েই লিফটের দিকে এগোতে এগোতে বলে,
— ডক্টর ফারিনকে ডাকো তাড়াতাড়ি।
লিফটের সামনে এসে রুদ্রিকের চোখ পড়ে লিফটের দিকে। লিফট তখন চার তলায়। অর্থাৎ লিফট আসতে সময় লাগবে। এই সময়টুকুও রুদ্রিকের কাছে অনেক বেশি। সে লিফটের জন্য অপেক্ষা না করে নৌশিকে কোলে নিয়েই সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করে। এক সেকেন্ডও নষ্ট করা যাবে না। নৌশির অবস্থা ভালো না। পেছন পেছন নার্সরাও ছুটতে থাকে। অবশেষে কেবিনের সামনে পৌঁছে রুদ্রিক ধুম করে দরজা খুলে নৌশিকে বেডের ওপর শুইয়ে দেয়।
তারপর নার্সের দিকে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি বলে,
— তাড়াতাড়ি অক্সিজেন মাস্ক দাও! ফাস্ট।
নার্সও আর দেরি করে না। দ্রুত অক্সিজেন মাস্ক এনে দেয়। রুদ্রিক নৌশিকে অক্সিজেন মাস্ক পরাতে পরাতে নার্সকে জিজ্ঞেস করে,
— ডক্টর ফারিনকে খবর দিয়েছো?
নার্স সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়,
— জি স্যার। একজন গেছেন।
কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কেবিনের দরজা খুলে যায়। দ্রুত পায়ে ভেতরে প্রবেশ করে একটা মেয়ে। বয়স আনুমানিক সাতাশ কিংবা আটাশ হবে। দেখতে ফর্সা এবং বেশ সুন্দর। পরনে হলুদ রঙের সালোয়ার-কামিজ, গলায় ওড়না পেঁচানো। তার গায়ে ডাক্তারদের এপ্রোন। মেয়েটার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সে বেশ চিন্তিত। দ্রুত ছুটে এসেছে। কেবিনে ঢুকেই বিচলিত কণ্ঠে রুদ্রিককে জিজ্ঞেস করে,
— কী হয়েছে ডক্টর রুদ্রিক?
কথাটা বলেই তার চোখ গিয়ে পড়ে বেডের দিকে। একজন মেয়ে বেডে শুয়ে আছে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক।মেয়েটার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর ফারিন আবার রুদ্রিকের দিকে তাকায়। রুদ্রিক দ্রুত বলে,
— ডক্টর ফারিন, তাড়াতাড়ি ওর চিকিৎসা চালান।
ফারিন বেডে শুয়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— উনি কে?
প্রশ্নটা শুনেই রুদ্রিক জোরে ধমকে ওঠে,
— আমি বলেছি আপনাকে চিকিৎসা চালাতে! আপনি তাড়াতাড়ি তা করেন!
রুদ্রিকের ধমকে ফারিন কেঁপে ওঠে। এই প্রথম রুদ্রিক তাকে এভাবে ধমক দিয়েছে। আর ধমকটাও সাধারণ কোনো ধমক ছিল না। তার গলার সেই ভয়ংকর রাগ পুরো রুমটাকে কাঁপিয়ে দেয়। ডক্টর ফারিনও মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। একবার সে রুমে থাকা নার্সগুলোর দিকে তাকায়। নার্সদের সামনে এভাবে ধমক খেয়ে ফারিন বেশ লজ্জা পায়। তবে নিজের অপমান বা রুদ্রিকের আচরণ নিয়ে ভাবার সময় এখন নেই। সে সেসব ছেড়ে দ্রুত নৌশির দিকে এগিয়ে যায়। নৌশির চোখের পাতা টেনে চোখ পরীক্ষা করে, চোখের নিচটাও দেখে নেয়। তারপর রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কী হয়েছে ওনার?
রুদ্রিক দ্রুত উত্তর দেয়,
— প্রচুর জ্বর। সেন্স হারিয়েছে। এন্ড পালস খুব ধীরে চলছে। অক্সিজেন রেটও খুব কম!
ফারিন মাথা নেড়ে বলে,
— ওকে, আমি দেখছি।
বলেই নার্সকে নির্দেশ দেয়,
— বিপি মেশিন দাও।
নার্স দ্রুত বিপি মেশিন এগিয়ে দেয়। ফারিন নৌশির বিপি চেক করতে থাকে। কয়েক মুহূর্ত পর বিপি মাপা শেষ করে ফারিন তাড়াতাড়ি নার্সকে বলে,
— বিপি একদম লো! শরীরও খুব দুর্বল। স্যালাইন লাগবে!
রুদ্রিক সঙ্গে সঙ্গে ডক্টর ফারিনের কাছে এগিয়ে আসে।তার কণ্ঠে অস্থিরতা নিয়ে বলে,
— কী স্যালাইন? নাম বলুন? আমি নিয়ে আসছি।
ফারিন স্যালাইনের নাম বলে দেয়। রুদ্রিক এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না। দ্রুত কেবিন থেকে বেরিয়ে যায় স্যালাইন আনতে। এদিকে ডক্টর ফারিন নার্সকে কয়েকটা ইনজেকশন আনতে বলে। নার্সও সঙ্গে সঙ্গে ইনজেকশন আনতে চলে যায়। তারপর ফারিন নৌশির অন্য হাতে সিরিঞ্জ দিয়ে রক্ত নেয় টেস্ট করানোর জন্য। রক্ত নেওয়া শেষ হলে ফারিন কিছুক্ষণ নৌশির দিকে তাকিয়ে থাকে।এই মেয়েটাকে সে চেনে না। কখনো দেখেনি। দেখে মনেও হচ্ছে না, মেয়েটা রুদ্রিকের কোনো রিলেটিভ। কারণ রুদ্রিকের কাছের রিলেটিভদের প্রায় সবাইকেই ফারিন চেনে। এছাড়া এমন কোনো রিলেটিভও নেই, যার জন্য রুদ্রিককে এভাবে পাগল, ছন্নছাড়া আর উদগ্রীব হতে দেখা গেছে।
কিন্তু আজ? আজকের রুদ্রিক যেন সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষ। ফারিনের কৌতূহল আরো বেড়ে যায়। মেয়েটা কে?রুদ্রিকের সঙ্গে তার সম্পর্কটাই বা কী? মনের ভেতর থেকে উত্তরটা জানার একটা তীব্র ইচ্ছা জাগে ফারিনের।সামান্য কষ্টও হচ্ছে তার। রুদ্রিককে অন্য একটা মেয়ের জন্য এভাবে এতটা এগ্রোসিভ আর অস্থির হতে দেখে ভেতরে ভেতরে তার মনটা কেমন যেন করে ওঠে। কিন্তু জিজ্ঞেস করার সাহস হচ্ছে না। একটু আগেই তো রুদ্রিক তাকে ধমক দিয়েছে। সেই ধমকের পর আবার মেয়েটার পরিচয় জানতে চাওয়ার সাহসটুকুও আর করে না ফারিন।
এরই মধ্যে রুদ্রিক আর নার্স ফিরে আসে। রুদ্রিক তাড়াতাড়ি করে স্যালাইন নিয়ে নৌশির কাছে আসে। ডক্টর ফারিন নৌশির হাতে ক্যানেলা লাগিয়ে স্যালাইন লাগিয়ে দেয়। এরপর নার্সের কাছ থেকে ইনজেকশন নিয়ে দ্রুত নৌশিকে দুটো ইনজেকশন দেয়। একটা জ্ঞান ফেরার জন্য। আরেকটা বিপি বাড়ানোর জন্য। ইনজেকশন দেওয়া শেষ করে ফারিন রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
— জ্ঞান ফেরার এবং বিপি বাড়ার ইনজেকশন দিয়েছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে আসবে।
রুদ্রিক কিছু বলে না। শুধু নৌশির দিকে তাকিয়ে থাকে।ফারিন এরপর একটা প্রেসক্রিপশনে কয়েকটা পরীক্ষার নাম লিখে নার্সের হাতে নৌশির রক্তের স্যাম্পল দিয়ে বলে,
— এই টেস্টগুলো তাড়াতাড়ি করো।
নার্স মাথা নেড়ে স্যাম্পল নিয়ে বেরিয়ে যায়। আর রুদ্রিক?
সে বেডের পাশে থাকা চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ে। তারপর নৌশির ডান হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোর মধ্যে শক্ত করে ধরে রাখে। চোখ স্থির নৌশির মুখের দিকে। অদ্ভুত এক উদগ্রীবতা তার চোখেমুখে। সে অপেক্ষা করছে, এই বুঝি নৌশি চোখ খুলবে। এই বুঝি তাকে ডাকবে।
ডক্টর ফারিন লক্ষ করক, রুদ্রিকের ঠোঁট নিঃশব্দে কিছু একটা বলছে। হয়তো খুব আস্তে আস্তে বলছে, তাই তার কানে শব্দগুলো পৌঁছাচ্ছে না। তবে ঠোঁটের নড়াচড়া দেখে বুঝতে পারে, রুদ্রিক সরি বলছে। রুদ্রিক মেয়েটার দিকে তাকিয়ে অনবরত সরি বলে যাচ্ছে। রুদ্রিকের চোখেমুখে স্পষ্ট অস্থিরতা। ডক্টর ফারিন অবাক হয়ে ভাবে, এই মেয়েটা কে? রুদ্রিকের এতটা কাছের যে, তার সামনে রুদ্রিক এভাবে অবলীলায় সরি বলছে!
রুদ্রিকের আচরণ দেখে এটাও বুঝতে পারছে, মেয়েটা রুদ্রিকের খুব কাছের কেউ। খুবই কাছের। কারণ রুদ্রিকের আচরণই সেটা বলে দিচ্ছে। বেডে পড়ে থাকা মেয়েটার চেয়েও রুদ্রিক বেশি কষ্ট পাচ্ছে। তার চোখদুটো অসহায়। মুখটা ভীষণ ভেঙে পড়া। এমন রুদ্রিককে ফারিন আগে কখনো দেখেনি। মনে হচ্ছে, নৌশির কিছু হয়ে গেলে রুদ্রিক নিজেও ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। মিনিট পাঁচেক কেটে যায়। কেবিনে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা। হঠাৎ রুদ্রিকের হাতের মুঠোয় থাকা নৌশির হাতের দুটো আঙুল সামান্য নড়ে ওঠে। রুদ্রিক মুহূর্তেই বুঝতে পারে। সে সোজা হয়ে বসে পড়ে।চোখেমুখে হঠাৎ উত্তেজনা আর অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে।
তারপর কাঁপা কণ্ঠে নৌশিকে ডাকতে থাকে,
— নৌশি, উঠেছো? শুনতে পাচ্ছো আমার কথা?
নৌশি আবছা ঝাপসা চোখে খুব হালকা করে চোখ মেলে।
কিন্তু পরক্ষণেই আবার চোখ বন্ধ করে ফেলে। মাথাটা কেমন ঘোড়াচ্ছে করছে। চারপাশটা ঝাপসা লাগছে। কী হচ্ছে, কোথায় আছে, কিছুই ঠিকমতো বুঝতে পারছে না।রুদ্রিক আর চেয়ারে বসে থাকতে পারে না। সে চেয়ার ছেড়ে নৌশির মাথার কাছে ঝুঁকে পড়ে। আলতো হাতে নৌশির চুলে হাত বুলিয়ে নৌশিকে ডাকতে থাকে,
— নৌশি, আমার কথা শুনছো? একটু কিছু বলো!
কোনো উত্তর আসে না। রুদ্রিক এবার নৌশির গালে হাত রেখে আবার ডাকে,
— এই নৌশি? উত্তর দিচ্ছো না কেন? তুমি একটু কথা বলো।
তারপর রুদ্রিক ফারিনের দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে,
— ডক্টর ফারিন, নৌশি কেন একটু রেসপন্স করে চুপ হয়ে গেছে?
ফারিন শান্ত গলায় বলে,
— ডক্টর, শান্ত হন। আপনি নিজেও একজন ডক্টর। জানেন, পেশেন্টকে একটু সময় দিতে হবে! তার সেন্স ফিরছে।
কিন্তু রুদ্রিক কোনোভাবেই শান্ত হতে পারছে না। সে অস্থির কণ্ঠে বলে,
— আমি শান্ত হতে পারছি না। আমার অস্থিরতা বাড়ছে। নৌশি, তুমি চোখ খুলো, তবেই আমি শান্ত হবো!
কথাটা শুনে ডক্টর ফারিনের শরীরটা কেমন শিরশির করে ওঠে। নৌশি কে? যার জন্য সবসময় শান্ত, ঠান্ডা থাকা রুদ্রিককে প্রথমবারের মতো এমন অবুঝ আর অস্থির হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে? রুদ্রিকের এই রূপ ফারিন আগে কখনো দেখেনি। এবার আর চুপ থাকতে না পেরে ফারিন প্রশ্ন করেই বসে,
— উনি আপনার কী হন?
রুদ্রিক নৌশির দিক থেকে চোখ না সরিয়েই বলে,
— আমার ওয়াইফ।
কথাটা শুনে ফারিন থ মেরে যায়। সামান্য পিছিয়ে যায়। পুরো শরীর হঠাৎ স্থির হয়ে গেছে। মনে হয়, তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেছে। এটা রুদ্রিকের স্ত্রী? রুদ্রিক কবে বিয়ে করলো? ফারিনের মাথাটা ঘুরে যায়। কিছুতেই কথাটা বিশ্বাস করতে পারে না সে। ধীরে ধীরে আবার নৌশির দিকে তাকায়। বেডে অচেতন হয়ে পড়ে আছে মেয়েটা। মুখটা চুপসে গেছে। চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, প্রচণ্ড ক্লান্ত আর দুর্বল।
ফারিন কিছুক্ষণ নীরব থেকে অবিশ্বাসের স্বরে বলে,
— আপনি মজা করছেন?
রুদ্রিক এবার ফারিনের দিকে তাকায়। চোখে সামান্য বিরক্তি, সঙ্গে রাগও। তারপর ঠান্ডা এবং কঠিন গলায় বলে,
— চোখের সামনে বেডে জ্বরে কাতরাচ্ছে আমার ওয়াইফ আর আমি আপনার সাথে মজা করবো, মিস ফারিন?
ফারিনের কণ্ঠ কেঁপে ওঠে। হাত দুটোও থরথর করে কাঁপতে থাকে। অনেক কষ্টে আস্তে করে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে,
— কবে বিয়ে করেছেন?
রুদ্রিক এবার প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে বলে,
— এত কথা আপনার জানতে হবে না।
ফারিন আর কিছু বলে না। শুধু থমকে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মনে হচ্ছে, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে তার পুরো দুনিয়াটা উলটপালট হয়ে গেছে। তখনি নৌশির চোখের পাতা আবার নড়ে ওঠে। তার ঠোঁট থেকে অস্পষ্ট একটা শব্দ বের হয়,
— উমমমমমমম......
রুদ্রিক আবারও বিচলিত হয়ে ওঠে। সে তাড়াতাড়ি নৌশির ডান হাতটা নিজের হাতে নিয়ে শক্ত করে ধরে বলে,
— বলো নৌশি? আমি আছি তোমার কাছে।
নৌশি ধীরে ধীরে চোখ খুলে। প্রথমে সবকিছু ঝাপসা লাগে। তারপর ধীরে ধীরে ঝাপসা ভাবটা কাটতে শুরু করে। চারপাশের সবকিছু একটু একটু করে স্পষ্ট হতে থাকে। চোখের সামনে ঝাপসা ঝাপসা করে একটা মুখ ভেসে ওঠে। প্রথমে অস্পষ্টতার কারণে চিনতে পারে না নৌশি। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর মুখটা স্পষ্ট হয়ে যায়।রুদ্রিক! মাথাটা ঝিম করে সঙ্গে সঙ্গেই নৌশির মনে পড়ে যায় সকালের সব ঘটনা। শরীরে একটুও শক্তি নেই। তবুও নিজের বাম হাতটা ধীরে ধীরে তুলে মুখের অক্সিজেন মাস্কটা খুলতে খুলতে বলে,
— আপনি চলে যান।
রুদ্রিক সঙ্গে সঙ্গে নৌশিকে থামিয়ে দেয়। অক্সিজেন মাস্কটা খুলতে দেয় না। দ্রুত বলে,
— এটা খুলো না। তোমার অক্সিজেন রেট খুব কম!
নৌশি এবার রুদ্রিকের হাতে ধরা নিজের ডান হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করে। একই সঙ্গে রুদ্রিককে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিতে চায়। রুদ্রিক সেটা বুঝতে পারে। সে সামান্য পিছিয়ে গিয়ে বলে,
— আচ্ছা, আমি সরে দাঁড়িয়েছি। তুমি অক্সিজেন মাস্কটা খুলো না।
কিন্তু নৌশি এবারও তার কথা শোনে না। মুখ থেকে মাস্কটা খুলে ফেলে জোরে একটা শ্বাস নেয়। তারপর রাগে, অভিমানে বলে,
— আপনার খাবারের সাথে আপনার চিকিৎসার উপরেও আমার লানত! আপনার সবকিছুতে আমার লানত!
কথাটা বলে নৌশি আবার একটা শ্বাস নেয়। তারপর আরো রাগ নিয়ে বলে,
— আপনার উপরও আমার লানত! আপনার চেহারার উপর আমার লানত, রাক্ষস!
রুদ্রিক কিছু বলার আগেই হঠাৎ তার মনে পড়ে যায়, নৌশি সারাদিনে কিছুই খায়নি। রুদ্রিক তাড়াতাড়ি ফারিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
— ডক্টর ফারিন, তাড়াতাড়ি ওর জন্য কিছু খাবার আনুন। ও সারাদিন কিছু খায়নি।
ফারিন তখনো নিজের মধ্যে ছিল না। রুদ্রিকের কথা শুনে হঠাৎ বাস্তবে ফিরে আসে। সে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।তারপর কেবিন থেকে বেরিয়ে যায় খাবার আনতে। এদিকে খাবারের কথা শুনেই নৌশি আবার রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,
— লানত আপনার খাবারের উপর! বললাম না? চলে যান!
রুদ্রিক আর তর্ক করে না। ধীরে নৌশির কাছে এগিয়ে আসে। তারপর নৌশির মাথায় হাত বুলিয়ে খুব শান্ত গলায় বলে,
— শান্ত হও, নাবিহা। তোমার শরীর অনেক দুর্বল। জোরে কথা বললে আরো বেশি খারাপ হবে!
রুদ্রিকের কথা শুনে নৌশির চোখ থেকে হঠাৎ জল গড়িয়ে পড়ে। কাঁপা কণ্ঠে বলে,
— আপনি আমার সাথে যা করেছেন, তাতে শান্ত হতে চাই না আমি।
রুদ্রিক এবার নৌশির ঠোঁটে আলতো করে আঙুল চেপে ধরে বলে,
— চুপ, নাবু! আর কথা বলবে না। নয়তো সেদিনের মতো আবার ঠোঁট চেপে চুপ করাবো!
নৌশি নাক টেনে চুপ করে যায়। কেন চুপ করে, সে নিজেও জানে না। হয়তো শরীরটা ভীষণ খারাপ লাগছে।হয়তো কথা বলার মতো শক্তিই আর নেই। নৌশি চুপ হয়ে যাওয়ায় রুদ্রিক কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকে।নৌশির চোখ বন্ধ। চোখের কার্নিশে অশ্রুর দাগ লেগে আছে। রুদ্রিক খুব যত্ন করে সেই অশ্রু মুছে দেয়। তারপর খুন নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলে,
— সরি, নাবু। তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। আর কষ্ট দিবো না।
কথাটা নৌশির কানে পৌঁছায় না। তবে তখন দুজনের মুখ খুব কাছাকাছি। ঠিক সেই মুহূর্তেই কেবিনের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় ফারিন। তার হাতে একটা স্যুপের বাটি। কিন্তু দরজার কাছে এসেই সে থমকে দাঁড়ায়।সামনের দৃশ্যটা দেখে তার বুকের ভেতরটা খুব বাজেভাবে আঘাত পায়। পা দুটো হঠাৎ নিশ্চল হয়ে গেছে। সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পাচ্ছে না। কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে ফারিন। তারপর সেখান থেকেই কাঁপা গলায় ডাক দেয়,
— ডক্টর রুদ্রিক?
রুদ্রিক পেছন ফিরে তাকাতেই দেখতে পায় ফারিন হাতে একটা ট্রে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রুদ্রিক নৌশির হাত ছেড়ে উঠে ফারিনের কাছ থেকে ট্রেটা নিয়ে নেয়। তারপর আবার এসে নৌশির পাশে রাখা চেয়ারটায় বসে পড়ে।ফারিন আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। কিছুক্ষণ চুপচাপ তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে থেকে সেখান থেকে চলে যায়। রুদ্রিক বাটি থেকে চামচে সামান্য স্যুপ তুলে নৌশির মুখের সামনে ধরে খুব নরম গলায় বলে,
— নৌশি, হা করো!
নৌশি চোখ মেলে তাকায়। তার মুখের একদম সামনে স্যুপভর্তি চামচ নিয়ে রুদ্রিক বসে আছে। নৌশি চামচটা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তারপর দৃঢ় গলায় বলে,
— আপনি আপনার চ্যালেঞ্জ ভুলে যাচ্ছেন!
কথাটা শুনতেই রুদ্রিকের মনে পড়ে যায় সকালের সেই চ্যালেঞ্জের কথা। মুহূর্তেই তার মুখটা ছোট হয়ে যায়। কোনো রকম অহংকার আর দ্বিধা ছাড়া বলে,
— দিনদুনিয়া ভুলে গেছি তোমাকে এই অবস্থায় দেখে। তুমি আছো সামান্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে।
নৌশি এবার ঘাড় ফিরিয়ে রুদ্রিকের দিকে তাকায়। তার চোখ গিয়ে থামে রুদ্রিকের চোখে। চোখ দুটো খুব নরম।
অসহায়। দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, মানুষটার ওপর দিয়ে গত কিছুক্ষণে কী গেছে। তবুও নৌশির মন গলে না। অভিমানটা এখনো শক্ত হয়ে বুকের ভেতর জমে আছে।
নৌশি দৃঢ় গলায় বলে,
— আপনি ভুলতে পারেন, আমি না। আমার চ্যালেঞ্জ মনে আছে। খুব ভালোভাবে তা পালনও করবো!
রুদ্রিক এবার একটু নিচু গলায় বলে,
— আমি হেরে গেছি। আমি বলছি খাওয়ার কথা।
নৌশি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়,
— আপনার হারারই কথা ছিল। কিন্তু হেরে গেছেন বলে খেয়ে নিবো এমন না। শুরুতে যেটা বলেছি, এখনো এটাই বলছি, আপনার খাবারের উপর আমার লানত!
কথাটা বলেই নৌশি আবার চোখ বন্ধ করে ফেলে। রুদ্রিক কয়েক সেকেন্ড নিঃশব্দে নৌশির দিকে তাকিয়ে থাকে।তার হাতে তখনও স্যুপের বাটি। কিন্তু নৌশির মুখে কোনো খাবার তুলে দেওয়ার মতো জোর তার মধ্যে নেই। হঠাৎ খুব নরম স্বরে বলে ওঠে,
— আই'ম সরি, নৌশি। প্লিজ, খাও একটুখানি?
কথাটা কানে যেতেই নৌশি থেমে যায়। ধীরে ধীরে চোখ খুলে রুদ্রিকের দিকে তাকায়। রুদ্রিকও তার দিকেই তাকিয়ে আছে। রুদ্রিকের চোখ টলমল করছে পানিতে।কণ্ঠটাও বড্ড অসহায় শোনাচ্ছে। নৌশি অবাকের মতো চেয়ে থাকে। এই মানুষটাই তো সকালে তার সামনে কতটা হিংস্র ছিল! আর এখন? সেই মানুষটাই কতটা অসহায় হয়ে তার সামনে বসে আছে! এসব কি শুধু তার অসুস্থতার জন্য? কিন্তু সে অসুস্থ হলে রুদ্রিকের কী? বরং রুদ্রিকের তো খুশি হওয়ার কথা।
নৌশি তো কষ্ট পাচ্ছে। নিজের বোনের প্রতিশোধ নিতে পারছে। যে প্রতিশোধের আগুন বুকে নিয়ে তাকে বিয়ে করেছিলো তাহলে এখন প্রতিশোধ নেওয়ার সময় হলে কেন কষ্ট পাচ্ছে? কেন রুদ্রিকের চোখে জল? নৌশিকে কষ্ট পেতে দেখে কেন তার চোখ ভিজে যাচ্ছে? কেন এতটা অস্থির হয়ে পড়েছে সে? নৌশি কোনো উত্তর খুঁজে পায় না। তবুও অজান্তেই তার জেদী মনটা একটু একটু করে গলে যায়। রুদ্রিকের চোখের জল দেখে। তার অসহায় কণ্ঠ শুনে। রুদ্রিক এবার আগের চেয়েও বেশি অসহায় আর কোমল স্বরে নৌশির দিকে তাকিয়ে বলে,
— আমি আর কখনো তোমাকে বকবো না। প্লিজ, খেয়ে নাও?
কথাটা বলেই রুদ্রিক বাম হাত দিয়ে নিজের বাম কান ধরে। ডান হাত দিয়ে নৌশির হাতটা তুলে নিজের হাতের তালুর মধ্যে নিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। তারপর বলে,
— এই যে, কানে ধরে সরি বলছি। আই'ম সরি নৌশি। অনেক অনেক অনেক সরি, নৌশি সুইটহার্ট। আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। প্লিজ, তুমি খাবারটা খাও! তোমার শরীর অনেক খারাপ। খাবার খেয়ে ওষুধ খেতে হবে।
কিন্তু অজানা এক জেদ নৌশির ভেতরে রয়ে গেছে। সে শক্ত গলায় বলে,
— আপনার সরি লাগবে না আমার। আমি খাবোও না।
রুদ্রিক আরো ভেঙে পড়ে। তারপর নৌশির হাতটা নিজের হাতে ধরে অনুনয়ের স্বরে বলে,
— সরি বলছি তো। প্রমিজ করছি, আর কখনো তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করবো না। এবারের জন্য জাস্ট আমার কথাটা শুনে নাও? নৌশি? খেয়ে নাও? প্লিজ, একটাবার কথাটা শোনো? রিকোয়েস্ট করছি।
কথাটা বলেই রুদ্রিক আবার নৌশির মুখের সামনে স্যুপের চামচটা ধরে। নৌশি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। রুদ্রিকের চোখের দিকে তাকায়। জল স্পষ্ট। সেই চোখে এবার কোনো রাগ নেই। আছে শুধু অনুরোধ। একটু খাবার খেয়ে নেওয়ার অনুরোধ। কেন জানি, নৌশি আর জেদ ধরে রাখতে পারে না। রুদ্রিকের সেই চোখের দিকে তাকিয়ে তার শক্ত হয়ে থাকা অভিমানটা নিঃশব্দে গলে যায়। নৌশি ধীরে ধীরে স্যুপটা মুখে নেয়।
সঙ্গে সঙ্গেই রুদ্রিকের মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তির হাসি। মুহূর্ত আগেও যে মুখটা দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়েছিল, সেই মুখেই হঠাৎ আলো জ্বলে ওঠে। রুদ্রিক মৃদু হেসে বলে,
— থ্যাংকিউ, নৌশি সুইটহার্ট।
চলবে?
#তবুও_তোমার_প্রেমে_আমি_পড়েছি
#লেখনীতে:_অধরা_মিনহা
#পর্ব_৩