ফন্ট সাইজ:
থিম:
তবুও তোমার প্রেমে আমি পড়েছি

পর্ব 8

লেখক: অধরা মিনহা

— “তুমি বলেছিলে, আমি আমার গরিব স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে তোমাদের কাছে ফিরে এলে তুমি নৌশিকে ডিভোর্স দিয়ে দেবে। ওকে ওর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেবে। আমি ফিরে এসেছি। এবার তুমি তোমার কথা রাখো। ফিরিয়ে দাও নৌশিকে ওর বাবা-মায়ের কাছে।”

রুমাইরার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই। নেই কোনো অভিমানও। তবে প্রতিটা শব্দে দৃঢ়তা ছিল, যা বলে দিচ্ছে, রুদ্রিককে তার দেওয়া কথা রাখতেই হবে। লিভিং রুমের মাঝখানে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে রুদ্রিক। তার ঠিক পাশেই নৌশি। মেয়েটার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে আছে। তবে শুধু নৌশিই না, মির্জা বাড়ির প্রতিটা মানুষই একই বিস্ময়ে থমকে গেছে। তারা কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না, রুমাইরা সত্যিই ফিরে এসেছে! রুদ্রিকও থ মেরে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ স্থির হয়ে আছে রুমাইরার ওপর। সত্যিই কি রুমাইরা ফিরে এসেছে? নাকি সে স্বপ্ন দেখছে?

কিন্তু যদি সত্যিই রুমাইরা ফিরে এসে থাকে, তাহলে তো তার খুশি হওয়ার কথা। এটাই তো সে চেয়েছিল। তার বোন ফিরে আসুক। তাদের সম্মান তাদের কাছে ফিরে আসুক। তাহলে তার বুকের ভেতর এমন অদ্ভুত শূন্যতা কেন? কেন আনন্দের বদলে বুকের ভেতরটা ভার হয়ে আসছে? নৌশিকে তো সে বিয়ে করেছিল শুধুই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। নুহান তার বোনকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল আর সেই ক্ষোভ, সেই প্রতিশোধের আগুন থেকেই তো নুহানের ভাতিজি নৌশিকে সে বিয়ে করেছিল।

তাহলে আজ রুমাইরা ফিরে আসার পর তার এত অস্থির লাগছে কেন? লিভিং রুমে এখন রুদ্রিক, নৌশি, রেজওয়ান মির্জা, ফাহমিদা আইরিন আর রোহান সবাই দাঁড়িয়ে। প্রত্যেকের মুখে বিস্ময়। আর সেই বিস্ময়ের সঙ্গে মিশে আছে বহুদিন পর কাছের মানুষকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। আইরিন আর নিজেকে সামলে রাখতে পারেন না। মেয়েকে চোখের সামনে পেয়ে ছুটে গিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন। এতদিনের জমে থাকা কান্না একসঙ্গে বেরিয়ে এলো ওনার চোখ দিয়ে। কাঁদতে কাঁদতে বলেন,
— আমার মেয়ে ফিরেছে। আমার কাছে ফিরেছে। কতদিন পর দেখছি আমার মেয়েটাকে। একদম শুকিয়ে গেছে।

রেজওয়ান মির্জাও এবার এগিয়ে এলেন। মেয়েকে আগলে নিয়ে কাঁপা গলায় বলেন,
— আমার মেয়ে ফিরে এসেছে। আমার আর কোনো কষ্ট নেই। আমার একমাত্র মেয়ে ফিরে এসেছে। আমার জানটা ফিরে এসেছে।

রোহানও আর দূরে থাকতে পারে না। এগিয়ে এসে বোনকে জড়িয়ে ধরে বলে,
— ভাইয়া তোকে অনেক মিস করেছি।

রুমাইরা রোহানের হাতটা শক্ত করে ধরে মৃদু কণ্ঠে বলে,
— আমিও তোমাদের অনেক মিস করেছি। এসে গেছি আমি তোমাদের কাছে।

আইরিন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন,
— আমরা সব ভুলে গেছি। তুমিও সব ভুলে যাবে। আবার আগের মতো আমাদের আদুরের মেয়ে হয়ে থাকবে। পাপার জান, ভাইদের কলিজা হয়ে।

রুমাইরা চুপ করে রইল। তার চোখে ব্যথার ছায়া। বহুদিন পর নিজের মানুষগুলোর কাছে ফিরে এসেও তার বুকের বিন্দু পরিমাণ খুশি নেই। থাকবে কিভাবে? নিজের ভালোবাসার বিসর্জন দিয়ে এসেছে যে! রুমাইরা এবার ভাইয়ের দিকে তাকায়। নিজের কষ্ট চাপা দিয়ে শান্ত গলায় বলে,
— হুম। আমি সব ছেড়েই চলে এসেছি। এবার ভাইয়া তুমি তোমার কথা রাখো। নৌশিকে ওর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দাও!

নৌশি এতক্ষণ নির্বাক হয়ে সবকিছু দেখছিলো। এবার আর নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। রুমাইরার দিকে তাকিয়ে বিস্মিত এবং কষ্টভরা কণ্ঠে বলে,
— এটা কী করেছো চাচীমনি? তোমাদের ভালোবাসা এভাবে শেষ করে দিলে?

রুমাইরা কিছুক্ষণ নৌশির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীর গলায় বলে,
— আমাদের ভালোবাসার জন্য নির্দোষের জীবন কেন নষ্ট হবে? তুমি তো কিছু করোনি। তাহলে তোমার জীবন কেন নষ্ট হবে?

নৌশির চোখ ছলছল করে উঠে,
— আমার জন্য তোমরা এভাবে তোমাদের জীবনটা.......

বাকিটা আর বলতে পারে না নৌশি। তার আগেই রুমাইরা নৌশির কথা থামিয়ে দিয়ে বলে,
— তোমার বাবা-মা ভালো নেই তোমাকে ছাড়া। তোমার মার তো......

কথাটা শুনেই নৌশির মুখের সমস্ত রং বদলে গেল। সে দ্রুত এক পা এগিয়ে এসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে,
— কী হয়েছে আমার আম্মুর? বলো না চাচীমনি? কী হয়েছে আমার আম্মুর?

রুমাইরা নরম গলায় বলে,
— তুমি না থাকায় না খেয়ে শরীর খারাপ করে ফেলেছে।

নৌশির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠে। ভাঙা গলায় বলে,
— আমি যাবো আমার আম্মু-বাবার কাছে!

রুমাইরা মাথা নাড়িয়ে বলে,
— হুম। এখন আর কোনো বাধা নেই।

কথাটা বলেই রুমাইরা আবার রুদ্রিকের দিকে তাকায়।তার চোখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।
— ভাইয়া, তুমি এবার তোমার কথা রাখো। নৌশিকে ডিভোর্স দিয়ে দাও।

রেজওয়ান মির্জা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠেন,
— দিয়ে দিবে। আমাদের মেয়ে ফিরে এসেছে। আমরা আর ওই বাড়ির কারোর সাথে কোনো রকম সম্পর্ক রাখতে চাই না। রুদ্রিক, এক্ষুনি লয়ারকে কল করে বলো ডিভোর্স পেপার রেডি করতে!

কথাটা শুনতেই রুদ্রিকের মনে হলো বুকের ভেতরটা যেন আচমকা কেউ চেপে ধরেছে। তার দমবন্ধ লাগছে। পুরো শরীর অবশ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে, দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্তিটুকুও আর পায়ের মধ্যে নেই। কিন্তু কেন? কেন এমন হচ্ছে? রুমাইরা তো ফিরে এসেছে। যার জন্য এতকিছু করেছে, সে তো আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে।তাহলে আনন্দের বদলে বুকের ভেতর এই অদ্ভুত অস্থিরতা কেন?

রুমাইরা আবারও বলে,
— ভাইয়া, তুমি লয়ারকে কল করো। এক্ষুনি নৌশিকে ডিভোর্স দাও। আমি চাই না ও আর এক মুহূর্তও এই আজাবের মতো সম্পর্কে থাকুক।

রুদ্রিক নির্বাক। সে কী বলবে, সেটাই বুঝতে পারছে না।নুহান তার বোনকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। সেই নুহানের ভাতিজিকে সে বিয়ে করেছিল শুধুমাত্র প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। তাহলে আজ কেন নৌশিকে ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবতেই তার বুকের ভেতরটা এমন কেঁপে উঠছে? গলার ভেতর কেন কাটার মতো একটা যন্ত্রণা আটকে আছে?সে নিজেই তো বলেছিল রুমাইরাকে, রুমাইরা ফিরে এলে নৌশিকে ফিরিয়ে দেবে তার পরিবারের কাছে। ডিভোর্স দিয়ে দেবে। তাহলে আজ রুমাইরার মুখে সেই কথাগুলো শুনে তার এত কষ্ট হচ্ছে কেন?

নৌশিকে ডিভোর্স দিতে হবে, এই ভাবনাটা কেন তার বুকের ভেতর শূন্যতা তৈরি করছে? সে তো সেদিন অটল গলায় কথাগুলো বলেছিল। তাহলে আজ সেই কথাগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তার এমন অস্থিরতা কেন? রুদ্রিক ধীরে ধীরে নৌশির দিকে তাকায়। মেয়েটা উদগ্রীব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।খাঁচার পাখি মুক্ত আকাশে উড়ে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে যেমন করে খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে, নৌশিও ঠিক তেমন করেই তাকিয়ে আছে। সেও কি মুক্তি চায়?অবশেষে কি তার আর নৌশির সম্পর্কের সমাপ্তি হবে?

রুদ্রিকের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠে। কণ্ঠও কেঁপে উঠে।
তবুও কোনো রকম নিজেকে সামলে বলে,
— এখন রাত নয়টা বাজে। এখন কীভাবে ডিভোর্স দিবো? তাছাড়া আকরাম সাহেব এখন দেশের বাইরে। এখন ডিভোর্স দেওয়া সম্ভব না। দুদিন পর আসবেন।

রেজওয়ান মির্জা দৃঢ় গলায় বলেন,
— ওনি বাইরে থাকলে অন্য লয়ারের সঙ্গে কথা বলো। ডিভোর্স আজই দিয়ে দাও। আজকেই সব শেষ করে ফেলা ভালো।

রুদ্রিক এবার রাগ মিশিয়ে শক্ত গলায় বলে,
— বললাম তো, উনি দেশের বাইরে। দেশে আসবেন দুদিন পর। তখনি ওনাকে দিয়ে ডিভোর্স করাবো। দুদিনে ক্ষতি হয়ে যাবে না।

রুমাইরা কিছুক্ষণ চুপ করে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শান্ত গলায় বলে,
— আচ্ছা, ঠিক আছে। ডিভোর্স নাহয় দুদিন পরেই দিও। আজকে নৌশি বাড়ি ফিরে যাক। নুহান বাইরে অপেক্ষা করছে নৌশির জন্য। নৌশিকে নিতে।

নুহান বাইরে অপেক্ষা করছে কথাটা শুনতেই নৌশির মুখটা মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠে। নৌশি উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠে,
— চাচ্চু বাইরে? আমি এক্ষুনি যাবো চাচ্চুর কাছে!

বলেই নৌশি দ্রুত যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। কিন্তু রুমাইরা তাকে থামিয়ে বলে,
— যাবে। তার আগে ভাইয়ার রুমে তোমার যা যা আছে, সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে যাও। দেরী করো না। তোমার পরিবারের সবাই তোমার অপেক্ষায়।

নৌশি সামান্য ভেবে বলে,
— আমার বেশি কিছু নেই। আমি এক্ষুনি সব গুছিয়ে আনছি।

কথাটা বলেই নৌশি লিভিং রুম থেকে চলে যায়। রুদ্রিক একবার চোখ তুলে সেদিকে তাকায়। তারপর আবার মাথা নিচু করে ফেলে। এতক্ষণ ধরে সে মাথা নত করেই দাঁড়িয়ে আছে। কারো চোখের দিকেও তাকাচ্ছে না। যেন চোখ তুলে তাকালেই তার ভেতরের সমস্ত অস্থিরতা সবার সামনে প্রকাশ হয়ে যাবে। রেজওয়ান মির্জা আবার মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। দীর্ঘদিন পর নিজের মেয়েকে কাছে পাওয়ার আনন্দে ওনার কণ্ঠও ভারী হয়ে এসেছে। বলেন,
— আমার যে কী খুশি লাগছে, আমার মেয়ে আমাদের কাছে ফিরে এসেছে। এতদিন থাকা ছন্নছাড়া বাড়িটা আজ আবার পূর্ণ হয়েছে।

রুদ্রিক এবার চোখ তুলে। প্রথমে তাকায় তার পাপার দিকে। তারপর রুমাইরার দিকে। রুদ্রিকের মুখে এখনো স্পষ্ট অস্থিরতা। রুমাইরা পাপার মুখে বাড়ি পূর্ণ হওয়ার কথা শুনে চোখ নামিয়ে ফেলে। চোখের কোণে কষ্ট। হ্যাঁ, পরিবার ঠিকই পূর্ণ হলো। কিন্তু মাঝখান থেকে তাদের ভালোবাসাটা অপূর্ণই রয়ে গেল। তার আর নুহানের সংসারটাও অপূর্ণ রয়ে গেল। পেয়েও হারিয়ে ফেলেছে তারা একে-অপরকে। একসঙ্গে থাকা হলো না। যে সংসারটা অল্প সময়ের জন্য পেয়েছিল, সেই ক্ষণিকের সংসারের স্মৃতিই এখন বুকটা ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। তবুও উপায় নেই।

তাদের ভালোবাসার জন্য একটা নির্দোষ মেয়েকে কষ্ট পেতে হবে, তার জীবন ধ্বংস হয়ে যাবে, এই দায় তারা সারাজীবন বয়ে বেড়াতে পারবে না। তাই ভালোবাসাকে বিসর্জন দিতে হবে। রুদ্রিকের বুকের ভেতরের অস্থিরতা ক্রমেই বাড়তে লাগল। আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না রুদ্রিক। লিভিং রুম থেকে বেরিয়ে গেল।ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে। কিন্তু তার পায়ে যেন কোনো শক্তি নেই। পা চলছে না। তবুও জোর করে পা দুটোকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রুদ্রিক নিজের রুমের কাছে এসে থেমে যায়। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ভেতরে তাকাতেই তার চোখ আটকে গেল নৌশির ওপর।

নৌশি তার কলেজ ব্যাগে কলেজের ড্রেস ভরছে। রুদ্রিক ধীরে ধীরে পা ফেলে রুমে ঢুকতেই নৌশির চোখ গিয়ে পড়ে তার ওপর। দুজনের চোখাচোখি হলো। রুদ্রিকও তাকিয়ে রইল নৌশির দিকে। মেয়েটার মুখে হাসি। স্বস্তির হাসি। হয়তো তার থেকে মুক্তি পাচ্ছে, বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যাবে বলেই এই হাসি। ভেতরের জমে থাকা খুশিটা ঠোঁটের কোণে এসে ধরা দিয়েছে।

নৌশি নিজের পরনে থাকা রুদ্রিকের টি-শার্টটার দিকে ইশারা করে হেসে বলে,
— আপনার এই টি-শার্টটা পরে চলে যাচ্ছি। পরে একদিন হসপিটালে গিয়ে দিয়ে আসবো নে।

রুদ্রিক কোনো উত্তর দেয় না। নৌশি এবার এগিয়ে গিয়ে রুদ্রিকের মেডিকেল ব্যাগটা হাতে তুলে নেয়। তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— এটাতে আমার চিপস, চকলেটগুলো আছে। এগুলো নিয়ে নিচ্ছি!

রুদ্রিক এবারও নিরুত্তর। নৌশি ব্যাগ খুলে নিজের চিপস আর চকলেটগুলো বের করে নিজের ব্যাগে ভরে নেয়।তারপর ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নেয়। তারপর হাসি দিয়ে রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
— আপনার প্রতিশোধের সমাপ্তি হলো! অবশেষে ফিরে যাচ্ছি আমি আমার পরিবারের কাছে। ভালো থাকবেন।

কথাটা বলেই নৌশি রুম থেকে বেরিয়ে গেল। রুদ্রিক সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। একদম স্থির। তার শরীরটা রুমের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে, অথচ তার সমস্ত অস্তিত্ব নৌশির সঙ্গে বেরিয়ে গেছে। বুকটা ফেটে যাচ্ছে রুদ্রিকের।অস্থিরতায় দিকদিগন্ত ভুলে গেছে। মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু একটা কথাই মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে, নাবিহা চলে যাচ্ছে। নাবিহা চলে যাচ্ছে! হঠাৎ করেই রুদ্রিক দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল। সামনে তাকাতেই দেখে, নৌশি করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে রুদ্রিক চিৎকার করে উঠে,
— নাবিহাআআআআ! প্লিজ যেও না!

চিৎকারটা পুরো রুম কাঁপিয়ে দেয়। আর সেই চিৎকারের সঙ্গেই রুদ্রিকের ঘুম ভেঙে গেল। সে ধড়মড় করে উঠে বসে। জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল। ঘেমে একদম বাজে অবস্থা অথচ এসি চলছে। রুম একদম ঠান্ডা। হাঁপাচ্ছে রুদ্রিক। বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। রুদ্রিক হাত দিয়ে কপালের বিন্দু বিন্দু ঘামটুকু মুছে। নৌশি ঘুমের মধ্যে বিভোর। ঘুমের মাঝেই রুদ্রিক তার নাম ডেকে এত জোরে ডাকায় বিরক্ত হয়ে ঘুমের মধ্যেই বিড়বিড় করে বলে,
— উফফফ! এখন আবার কী করেছি? কিছুই করিনি!

রুদ্রিক স্থির চোখে তাকিয়ে রইল নৌশির দিকে। মেয়েটা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। রুদ্রিকের বুকের ধুকপুকানি এখনো থামেনি। সে আবারো চারপাশে তাকায়। ওটা স্বপ্ন ছিল?এমন ভয়ংকর স্বপ্ন? আরেকটুর জন্য মনে হচ্ছে, প্রাণটাই যেন বেরিয়ে যাবে। রুদ্রিক নিজের মুখে হাত বুলিয়ে নেয়।গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। স্বপ্নটা শেষ হওয়ার পরও রুদ্রিকের বুকের ভেতর ভয়টা রয়ে গেছে। পানির ভীষণ প্রয়োজন। সাইড টেবিলের দিকে তাকিয়ে রুদ্রিক দেখে, সেখানে পানি নেই। সে পা থেকে কম্বলটা সরিয়ে বেড থেকে নামে। তারপর সেন্ডেল পায়ে দিয়ে নিঃশব্দে রুম থেকে বেরিয়ে এল।

করিডোর পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামে। তারপর ডাইনিং রুমে এসে পৌঁছায়। টেবিল থেকে একটা গ্লাস তুলে জগ থেকে পানি ঢালল। তারপর এক নিঃশ্বাসে ঢকঢক করে পুরো গ্লাসের পানি খেয়ে ফেলে। পানি খাওয়া শেষ করে গ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে ফিরে আসতে নিতেই সিঁড়ির কাছে পেছন থেকে ডাক আসে,
— এত রাতে তুমি?

রুদ্রিক থেমে পেছনে ফিরে তাকায়। দেখে, রেজওয়ান মির্জা দাঁড়িয়ে আছেন। রুদ্রিক শান্ত গলায় বলে,
— পানি খেতে এসেছি।

রেজওয়ান মির্জা কিছুক্ষণ ছেলের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে রইলেন। রুদ্রিককে বাহির থেকে বেশ অস্থির লাগছে। চেহারায় তা ফুটে উঠছে। রেজওয়ান মির্জা গম্ভীর গলায় বলেন,
— তোমাকে ঠিক লাগছে না। কিছু হয়েছে?

রুদ্রিক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীর গলায় বলে,
— রাইহা ফোন দিয়েছিল দুপুরের দিকে।

রেজওয়ান মির্জার ভ্রু কুঁচকে যায়।
— কী কথা হয়েছে?

রুদ্রিক একটু থেমে বলে,
— শর্ত দিয়েছি। বলেছি, নুহানকে ডিভোর্স দিয়ে চলে আসতে। তাহলে আমি......

রেজওয়ান মির্জার চোখের তীক্ষ্ণতা গভীর হলো। কন্ঠে আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— তাহলে তুমি কী?

রুদ্রিকের গলা কেঁপে উঠে। কিছুক্ষণ শব্দ খুঁজে পেল না বলার। অবশেষে খুবই ধীরে বলে,
— তাহলে আমি..... নাবিহাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবো! ফিরিয়ে দিবো ওকে ওর পরিবারের কাছে।

রেজওয়ান মির্জা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করেন,
— রাইহা কী বলেছে?

রুদ্রিক নিচের দিকে তাকিয়ে বলে,
— মানা করে দিয়েছে!

রেজওয়ান মির্জা শান্ত গলায় বলেন,
— মানা করলেও আশা আছে।

রুদ্রিক প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে পাপার দিকে তাকায়। তার চোখের সেই প্রশ্ন বুঝতে পেরে রেজওয়ান মির্জা গম্ভীর গলায় বলেন,
— তৎক্ষণাৎ না বুঝে না করেছে। পরে বিষয়টা নিয়ে ভাববে। ভালো করেছো! দেখো, এমনও হতে পারে রাইহা চলে আসতে পারে আমাদের কাছে। নুহান নিজের জন্য নিজের ভাতিজির জীবন নষ্ট করবে না। ওর ভাই-ভাবি এটা মেনেও নিবে না। তাই আশা আছে রাইহার ফিরে আসার।

রুদ্রিক চুপ করে রইল। কোনো উত্তর দেয় না। রেজওয়ান মির্জা আরো কয়েক সেকেন্ড ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারপর ঘুরে চলে যেতে নিতেই রুদ্রিক হঠাৎ বলে উঠে,
— রাইহা ফিরে আসলে, পাপা?

রেজওয়ান মির্জা থেমে গেলেন। তারপর ঘুরে ফিরে তাকালেন রুদ্রিকের দিকে। রুদ্রিক এতক্ষণ মাটির দিকে দৃষ্টি নামিয়ে রেখেছিল। এবার ধীরে ধীরে চোখ তুলে পাপার দিকে তাকায়। তারপর খুব ছোট্ট করে বলে,
— তারপর?

রেজওয়ান মির্জা ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। রুদ্রিক আসলে কী জানতে চাইছে? কী বোঝাতে চাইছে? তিনি সেটা বোঝার চেষ্টা করলেন। কয়েক মুহূর্ত পর বলেন,
— তারপর আর কী? আমাদের মেয়ে আমরা পেয়ে যাবো। ওদের মেয়ে ওদের ফিরিয়ে দিবে! ওই মেয়ে আমরা রেখে কী করবো? নিতান্তই শোধ নিতে ওই মেয়ের সঙ্গে তোমার বিয়েতে রাজি হয়েছি, নয়ত ওমন গরিব পরিবারের মেয়েকে জীবনেও ছেলের বউ বানাতাম না। উচ্চবংশীয় ছেলের সাথে উচ্চবংশীয় পরিবারের মেয়েই মানায়।

শেষ কথাটা রেজওয়ান মির্জা বেশ জোর দিয়েই বলেন।যেন রুদ্রিককে কথাটা ভালোভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছেন।যেন ভুলতে বসা কোনো সত্যকে আবার তার সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। তা রুদ্রিকের বুঝতে কোনো অসুবিধা হলো না। রুদ্রিক আর সেখানে দাঁড়িয়ে রইল না। নিঃশব্দে পা বাড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। করিডোর পেরিয়ে নিজের রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। দরজা খুলতেই তার চোখ গিয়ে আটকে গেল বেডের ওপর।
নৌশি ঘুমিয়ে আছে কম্ফোর্টার মুড়িয়ে। রুদ্রিক যখন রুম থেকে বের হয়েছিল, তখন নৌশি এক পাশে ঘুমিয়ে ছিল। কিন্তু এখন পুরো বেডের মাঝখানে এসে পড়েছে মেয়েটা। পুরো বিছানাটাই নৌশির একার দখলে।

রুদ্রিক নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকে দরজাটা লাগিয়ে দেয়।তারপর খুব সাবধানে পা ফেলে নৌশির কাছে এগিয়ে যায়। একদম সতর্কতার সঙ্গে। বেডের কাছে গিয়ে নৌশির মাথার কাছে বসে রুদ্রিক। তারপর নৌশির দিকে ঝুঁকে পড়ে। খুব কাছ থেকে দেখতে লাগল মেয়েটাকে, খুব গভীরভাবে। ঘুমন্ত নৌশিকে কতটা নিষ্পাপ লাগছে!একদম ছোট্ট বাচ্চার মতো ঠোঁট ফুলিয়ে ঘুমিয়ে আছে।মুহূর্তেই রুদ্রিকের ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠে। কেন জানি ইচ্ছে করে হাত বাড়িয়ে মেয়েটাকে ছুঁয়ে দিতে। একটু আদর করে দিতে।

রুদ্রিক নৌশির দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবে, ঘুমিয়ে আছে কতটা শান্ত! অথচ ঘুম থেকে উঠলেই চারপাশে অশান্তির ঝড় তুলে রাখে। দুষ্টুমিতে পুরো রানি। রুদ্রিক হেসে বিরবির করে বলে,
— ইঁচড়েপাকা মেয়ে!

রুদ্রিকের চোখের সামনে ভেসে উঠে আজকের হসপিটালের দৃশ্যগুলো। আজ সারাদিন মেয়েটা কী পরিমাণ দুষ্টুমি করেছে! তার মেডিকেল ব্যাগটা তো একেবারে চিপস আর চকলেটে ভর্তি করে ফেলেছে।
রুদ্রিকের দৃষ্টি এবার গিয়ে পড়ে মেডিকেল ব্যাগটার দিকে। ওটার ভেতরে এখনো কিছু চকলেট আর চিপস রয়েছে। বাকিগুলো বাসায় এসে খুলে বসে খেয়েছে নৌশি। আর খেতে খেতে পুরো রুমে চিপস আর চকলেটের প্যাকেট ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলেছে। পরে সেগুলো আবার রুদ্রিককেই পরিষ্কার করতে হয়েছে।

পুরো হসপিটালটাও মেয়েটা টইটই করে ঘুরেছে। যেন এক জায়গায় শান্ত হয়ে থাকা মেয়েটার হিস্ট্রিতেই নেই। নৌশির একের পর এক কাণ্ডকারখানা মনে পড়তেই রুদ্রিকের হাসিটা আরো প্রশস্ত হয়ে গেল। মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়ে নিঃশব্দে হাসতে লাগল রুদ্রিক। ঘুমন্ত নৌশির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এই মুহূর্তে রুদ্রিকের কাছে সবকিছুই অদ্ভুতভাবে সুন্দর লাগছে। বুকের অস্থিরতাটাও কমে গেছে।

চলবে?

#তবুও_তোমার_প্রেমে_আমি_পড়েছি
#লেখনীতেঃ_অধরা_মিনহা
#পর্ব_৮

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 8 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন